Category: মতামত

Get updates on Bengali News analysis discussion, opinion editorial from the Madhyom news portal madhyom.com, West Bengal leading news portal Madhyom.com

  • Jogendra Nath Mandal: ‘‘কেন আমি মুসলিম লিগকে সমর্থন করি?’’

    Jogendra Nath Mandal: ‘‘কেন আমি মুসলিম লিগকে সমর্থন করি?’’

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি – পর্ব ১

    মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

    পূর্ব বাংলার পিছিয়ে পড়া হিন্দু সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য জীবনভর আমার প্রয়াস সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে, এমন সময়ে চরম হতাশা এবং দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে আমি আপনার মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করছি। আমার মনে হয় আমার জানানো উচিত কেন ভারতীয় উপমহাদেশের এই গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে আমি এই সিদ্ধান্ত নিলাম।

    ১। আমার পদত্যাগের কারণগুলো বলার আগে, আমার মনে হয় মুসলিম লিগের সঙ্গে থাকাকালীন যে যে ঘটনাগুলো ঘটেছিল তার সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। ১৯৪৩ সালে ফেব্রুয়ারিতে লিগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার কথায় আমি তাঁদের সঙ্গে বাংলার প্রাদেশিক আইনসভায় কাজ করার বিষয়ে সম্মত হই। ১৯৪৩ সালের মার্চে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভার পতনের পর, আমার সঙ্গে থাকা আইনসভার ২১ জন নমঃশূদ্র সদস্যের প্রত্যক্ষ সমর্থনে তদানীন্তন মুসলিম লিগের পরিষদীয় দলনেতা খাজা নাজিমুদ্দিন ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে মন্ত্রিসভা গঠন করতে সক্ষম হন। আমাদের সমর্থনের পিছনে কিছু শর্ত ছিল। যেগুলি হল, মন্ত্রিসভায় তিনজন নমঃশূদ্র মন্ত্রীকে রাখতে হবে, নমঃশূদ্রদের শিক্ষার উন্নয়নে ৫ লক্ষ টাকা সহায়তা প্রদান করতে হবে এবং সরকারী চাকরির ক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক অনুপাতের বাইরে তফশিলি প্রার্থীদের নিয়োগ করা।

    ২। এসব শর্তের বাইরেও মুসলিম লিগকে সমর্থন করার পিছনে আমার কিছু প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। প্রথমত, বাঙালি মুসলিমদের সঙ্গে নমঃশূদ্রদের অর্থনৈতিক স্বার্থের মিল রয়েছে। মুসলিমরা ছিল মূলত কৃষক-শ্রমিক এবং তফশিলিরাও তাই। মুসলিমদের একটি অংশের মত নমঃশূদ্রদেরও একটি অংশ ছিল মৎস্য শিকারী। দ্বিতীয়ত, তারা উভয়েই ছিল শিক্ষার দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। আমাকে বোঝানো হয়েছিল যে লিগ এবং এর মন্ত্রিসভার সঙ্গে আমার সহযোগিতা ব্যাপক পরিসরে আইনগত এবং প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়তা করবে। এই পদক্ষেপসমূহ ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সুবিধাকে আমল না দিয়ে বাংলার এই বিশাল জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক উন্নতিতে ভূমিকা রাখবে এবং সাম্প্রদায়িক শান্তি-সৌহার্দ্য আরও মজবুত হবে, এমনটিই বলা হয়েছিল। এখানে উল্লেখ করা যায় যে খাজা নাজিমুদ্দিন তাঁর মন্ত্রিসভায় তফশিলি জাতির ৩ জন সদস্যকে নিয়েছিলেন এবং আমার সমাজ  থেকে ৩ জনকে সংসদ সচিব হিসেবেও নিয়োগ করেছিলেন।

    সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভা

    ৩। ১৯৪৬ সালে মার্চ মাসের সাধারণ নির্বাচনের পর জনাব এইচ.এস সোহরাওয়ার্দী সেই মাসেই লিগের সংসদীয় দলনেতা হন এবং ১৯৪৬ সালের এপ্রিল মাসে লিগের মন্ত্রিসভা গঠন করেন। ফেডারেশনের টিকিটে কেবলমাত্র আমিই আমার সমাজের মধ্যে নির্বাচনে জয়লাভ করতে সক্ষম হই। আমি জনাব সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলাম। ওই বছরের ১৬ অগাস্ট কলকাতায় মুসলিম লিগ ‘প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস’-এর ডাক দেয়। আপনার জানা আছে যে শেষ পর্যন্ত এটা এক গণহত্যার রূপ নিয়েছিল। হিন্দুরা লিগের মন্ত্রিসভা থেকে আমার পদত্যাগপত্র দাবী করে। আমি প্রতিদিন চিঠির মাধ্যমে হুমকি পেতে থাকি। আমার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। কিন্তু আমি আমার নীতিতে অবিচল থাকি। তারসঙ্গেই, আমি আমার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আমাদের পত্রিকা ‘জাগরণ’ এর মাধ্যমে নমঃশূদ্রদের কাছে আবেদন জানাই তারা যেন নিজেদের কংগ্রেস এবং মুসলিম লিগের এই রক্তাক্ত লড়াই থেকে দূরে রাখে। আমার অস্পৃশ্য সমাজভুক্ত প্রতিবেশীগণ যেভাবে আমাকে ক্রুদ্ধ হিন্দুদের হাত থেকে নিরাপত্তা দিয়েছিল তা আমি কৃতজ্ঞতাভরে স্মরণ করি। কলকাতা হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে শুরু হয় নোয়াখালীর দাঙ্গা। সেখানে শত শত হিন্দু সমাজভুক্ত মানুষকে (নমঃশূদ্র সহ) হত্যা করা হয় এবং জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়। হিন্দু মহিলারা অপহরণ এবং ধর্ষণের শিকার হন। আমার সমাজভুক্ত মানুষেরও জীবন-জীবিকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে আমি ত্রিপুরা ও ফেনী যাই এবং কিছু দাঙ্গাপীড়িত এলাকা পরিদর্শন করি। হিন্দুদের দুর্দশা আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে, কিন্তু তারপরেও আমি মুসলিম লিগের সঙ্গে সহযোগিতা চালিয়ে যাই। কলকাতার বিশাল গণহত্যার পরেই সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে এক অনাস্থা প্রস্তাব আনা হয়। ভোটাভুটি আয়োজিত হয়। শুধুমাত্র আমার চেষ্টার ফলেই কংগ্রেসে পক্ষের চারজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান সদস্য এবং চারজন তফশিলি সদস্যের সমর্থন জোগাড় করা সম্ভব হয় যা ব্যতীত মন্ত্রিসভার পতন ছিল অবশ্যম্ভাবী।

    ৪। ১৯৪৬ সালের অক্টোবরে একরকমের অপ্রত্যাশিতভাবেই জনাব সোহরাওয়ার্দীর মাধ্যমে আমার কাছে প্রস্তাব আসে ভারতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে একটি পদ গ্রহণ করার জন্য। এক ঘণ্টার মধ্যে আমাকে আমার সিদ্ধান্ত জানাতে বলা হয়। বেশকিছু সময় দোদুল্যমান থাকার পর আমি এই শর্তে রাজি হই যে আমার নেতা ড.বি.আর অম্বেডকর যদি আমাকে ওই জায়গায় না চান তবে আমাকে পদত্যাগের অনুমতি প্রদান করা হবে। ভাগ্যক্রমে, তিনি লন্ডন থেকে টেলিগ্রামের মাধ্যমে তাঁর অনুমতি প্রদান করেন। অন্তর্বতী সরকারের আইন সদস্য হিসেবে যোগদানের লক্ষ্যে দিল্লির উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে আমি তৎকালীন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী জনাব সোহরাওয়ার্দীকে রাজি করাতে সক্ষম হই যে তিনি আমার স্থানে ২ জনকে আমার সমাজ থেকে মন্ত্রিসভায় জায়গা দেবেন। তিনি তফশিলি জাতির ফেডারেশন গ্রুপ থেকে ২ জনকে সংসদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দিতেও সম্মত হন।

    ৫। আমি ১৯৪৬ সালের ১ নভেম্বর অন্তর্বতী সরকারে যোগ দিই। এক মাস পর কলকাতাতে আমি যাই। তখন জনাব সোহরাওয়ার্দী আমাকে জানালেন পূর্ব বাংলার বিভিন্ন জায়গাতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার কথা। বিশেষ করে গোপালগঞ্জ মহকুমার কিছু জায়গাতে যেখানে নমঃশূদ্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠ। তিনি আমাকে অনুরোধ করলেন সেই অঞ্চলগুলো পরিদর্শনে যেতে এবং মুসলিম ও নমঃশূদ্রদের মাঝে সমঝোতা করতে। সেইসব এলাকার নমঃশূদ্ররা মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমি কয়েক ডজন সভা করে তাদেরকে সেই পথ থেকে দূরে সরিয়ে আনি। একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থেকে ওই এলাকাগুলি মুক্তি পায়।

    (ক্রমশ…………)

     

    দেশের খবর, দশের খবর, সব খবর, সবার আগে পেতে ফলো করুন আমাদের Facebook এবং Twitter পেজ।
     

  • Visva Bharati: বিশ্বভারতীর জমি বিন্যাস ও তার বিচিত্র সমীকরণ

    Visva Bharati: বিশ্বভারতীর জমি বিন্যাস ও তার বিচিত্র সমীকরণ

    সোমেশ্বর

    বিশ্বভারতীর অন্যতম প্রধান সমস্যা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক্যাম্পাস’ সীমায়িত বা ‘ডিমারকেটেড’ নয়। একটি ধর্মীয় আশ্রম হিসাবে যে প্রতিষ্ঠানের যাত্রা এবং একটি স্কুল যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল, সেখানে স্বাভাবিক কারণেই সীমাবদ্ধ ‘ক্যাম্পাস’ আরম্ভ থেকে ছিল না। কিন্তু ক্রমে ক্রমে এই না থাকার অসুবিধা অনুভূত থাকে। দেখা যায়, গুরুদেবের আশ্রমের বহু জমি তার ভক্তরা নিজের মনে করে দখল করে নিয়েছেন। ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী অ্যাক্ট পাশ হওয়ার সময় বিশ্বভারতীর এলাকা হিসাবে ৩০০০ হেক্টরের একটি বিস্তীর্ণ ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হলেও বাস্তবে সেই জমির সবটার ওপর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সম্পূর্ণ অধিকার ছিলো না। বিশ্বভারতী সম্ভবত এদেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় যার এলাকায় আস্ত একটা গ্রাম আছে। এরপর ১৯৮৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘শ্রীনিকেতন শান্তিনিকেতন উন্নয়ন পর্ষদ’ গঠন করে বিশ্বভারতী এলাকাকেও তাদের ‘উন্নয়ন – এলাকার’ মধ্যে ধরে নিলো। বাইরে থেকে যে ভূমিখণ্ড বিশ্বভারতীর ‘ক্যাম্পাস’ বলে মনে হয় তার ভিতরের চরিত্র বিচিত্র। এই বিচিত্র ‘ক্যাম্পাসে’ তিন ধরণের জমি বা ঘরবাড়ি আছে – বিশ্বভারতীর মালিকানার এবং দখলে আছে, বিশ্বভারতীর মালিকানার কিন্তু দীর্ঘমেয়াদী লিজে দেওয়া জমি বা তার ওপর বাড়ি এবং সম্পূর্ণ ব্যক্তি মালিকানাধীন জায়গা বা বাড়ি। জমির এই জটিল চরিত্রের জন্যই সীমানা প্রাচীর দেওয়ার সমস্যা, সীমানা প্রাচীর নির্মাণে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া এবং ‘ক্যাম্পাসে’র ভিতর দিয়েই ব্যক্তিগত জমি বা বাড়িতে যাতায়াতের আব্দার সহ্য করা।

    রবীন্দ্রনাথের পুত্র রথীন্দ্রনাথের সময়েই জমি দীর্ঘ মেয়াদী লিজ দেওয়া শুরু হয়। মূলত তৎকালীন বিশ্বভারতীর সঙ্গে বিভিন্নভাবে যুক্ত মানুষ জনকেই এই লীজ দেওয়া শুরু হয়। বিশ্বভারতীর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ছিলেন না এমন মানুষদেরও সেসময় জমি লীজ দেওয়া হয়। মুলতঃ এই উদ্দেশেই ‘ফ্রেন্ডস অফ বিশ্বভারতী’ বা বিশ্বভারতী সুহৃদ সমিতি গঠন করা হয়েছিলো। অমর্ত্য সেন এর দাদু ক্ষিতিমোহন সেন জমির লীজ পেয়েছিলেন বিশ্বভারতীর শিক্ষক হিসাবে; অমর্ত্য সেন এর বাবা আশুতোষ সেন জমির লীজ পেয়েছিলেন বিশ্বভারতীর ‘সুহৃদ’ হিসাবে। আলাদা আলাদা সময়ে দুটি লিজ দেওয়া হয়েছিলো। ক্ষিতিমোহন সেনকে দেওয়া জমিতে নির্মিত বাড়ি এখনও ভোগ করছেন অমর্ত্য সেন এর মামাতো ভাই ও তাদের পরিবার। রথীন্দ্রনাথের সময়ে দেওয়া ৯৯ বছরের লীজ যাদের নামে দেওয়া হয়েছিলো তারা সবাই প্রয়াত হয়েছেন। লীজের শর্ত হিসাবে সেসব জমিতে বা বাড়িতে তাদের বংশধররা বসবাস করছেন। আবার এমন অনেকেই আছেন যারা লীজের সময়সীমা শেষ না হলেও সেইসব জমি বা বাড়ি বিশ্বভারতীকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আবার খুব কৌশলে কিছু জমি যে হাতবদল হয়নি – তাও নয়। বেশিরভাগ দীর্ঘমেয়াদী লীজ ২০৪১ / ৪২ সালে শেষ হয়ে যাবে। যদি বিশ্বভারতীর আগামীদের প্রশাসন লীজ না নবীকরণ করেন, তাহলে এই সমস্ত জমি বা বাড়িই বিশ্বভারতীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। কিন্তু সমস্যার এখানেই শেষ নয়। এরপরেও ব্যক্তি মালিকানার যেসব বাড়ি থেকে যাবে সেগুলোও বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক পরিবেশ বজায় রাখার পথে বাধা হতে পারে। একটা উদাহরণ দিই – ধরুন আপনি বাইরে থেকে বেড়াতে এসেছেন , সঙ্গীত ভবন সংলগ্ন মাঠে ঘুরছেন, হটাত আপনার চোখে পড়ছে মাঠের সীমানায় একটা আস্ত রেস্টুরেন্ট। আপনি বিস্মিত হবেন – ক্যাম্পাসের ভিতরে এটা কি করে হলো। আসলে ওটি ক্যাম্পাসের মধ্যে থাকা একটি প্রাইভেট বাড়িতে। যেহেতু ‘প্রাইভেট’ অতএব যা খুশী করা যায়। বিশ্বভারতীর মধ্যে দিয়ে যে দীর্ঘ রাস্তা – শ্রীনিকেতন থেকে ভূবন ডাঙ্গা অব্দি (অমর্ত্য সেনের বাড়ির সামনে দিয়ে) তা এক সময়ে রাজ্য সরকার বিশ্বভারতীকে হস্তান্তরিত করে। বিশ্বভারতীর নিয়ন্ত্রণে থাকার জন্য ওই রাস্তায় যান চলাচল ও মানুষ চলাচলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পক্ষে আইন – শৃঙ্খলা – পরিবেশ বজায় রাখা সুবিধা হয়। কিন্তু অসুবিধা বোধ করেন ক্যাম্পাসের কিছু বাসিন্দা। মুলতঃ তাদের দাবীতেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সেই রাস্তার অধিকার আবার ফিরিয়ে নেন। অর্থাৎ যে খানিকটা ক্যাম্পাসের ‘সীমাবদ্ধতা’ ছিলো তাও নষ্ট হয়ে যায়। বিশ্বভারতীর জমিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুলিশসহ অন্ততঃ তিনটে দফতর অবস্থিত। বিশ্বভারতীর জমির ওপর দিয়েই ওইসব জমিতে যাতায়াতের রাস্তা।

    একটি প্রতিষ্ঠান তার দখল হয়ে যাওয়া জমি দখলমুক্ত করবে এবং ভবিষ্যতে যাতে আবার বেআইনিভাবে দখল না হয় তার জন্য প্রাচীর দিয়ে ঘিরবে – এর মধ্যে অন্যায় কোথায়? কিন্তু বিশ্বভারতীতে কর্তৃপক্ষের এই স্বাভাবিক উদ্যোগকেই অস্বাভাবিক বলে মনে করেন তথাকথিত আশ্রমিক, বুদ্ধিজীবী ও গুরুদেবের কিছু ভক্ত। মেলার মাঠে সীমানা নির্মাণের সময় যা যা ঘটেছে তা এযাবৎ দেশের অন্য কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটেছে বলে জানা নেই; সম্ভবত কাশ্মীরেও ‘বুলডোজার’ দিয়ে একটি প্রাচীন তোরণ ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি! বেআইনি পারকিং করে তোলা আদায় সহ নানা বেআইনি কাজের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিলো মেলার মাঠ, ধীরে ধীরে বেআইনি দখলদাররা মাঠ গ্রাস করতে শুরু করে। কারণ এরা সবাই মনে করে – ‘আমাদের শান্তিনিকেতন’ – অতএব যা খুশী করা যাবে। বিশ্বভারতীর জমি উদ্ধারের কাজ বা সীমানা প্রাচীর যে বিদ্যুৎ চক্রবর্তী প্রথম শুরু করলেন তা নয়। ২০০৪ সাল থেকেই এই উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এমনটা নয় যে – তৎকালীন উপাচার্যরা নিজেদের উদ্যোগে এবং ইচ্ছায় এই কাজ শুরু করেছিলেন। ২০০৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে জমি পুনুরুদ্ধারে উদ্যোগী হতে বলা হয় । ২০০৬ এ গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর নেতৃত্বে গঠিত ‘হাই লেভেল কমিটি’ তাদের সুপারিশে পরিস্কার ইংরাজিতে লিখেছিলো – ‘The campus boundary will be demarcated and boundary walls and fencing will be constructed to improve and protect the property from encroachment.’ যে দ্রুততার সঙ্গে বিশ্বভারতীর জমি উদ্ধারের কাজ হওয়া উচিত ছিল তা হচ্ছে না – এখনো দখলে থাকা বিশ্বভারতীর সিংহভাগ জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। সীমানা প্রাচীর বা বেড়া দেওয়ার কাজ অনেকটা করা সম্ভব হলেও রাজ্য সরকার পি ডবলু ডি র রাস্তা ফেরত নিয়ে নেওয়ায় ক্যাম্পাস ঘেরার এই উদ্যোগ অনেকাংশে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে ।

    অমর্ত্য সেনের জমি সম্পর্কে সাম্প্রতিক বিতর্কের মধ্যে একটি প্রশ্ন অনেকের মধ্যে এসেছে – ‘আচ্ছা ওনার মতো একজন বিশ্বখ্যাত মানুষ, ভারতরত্ন কে ওই জমিটা উপহার হিসাবে দিয়ে দেওয়া যেত না?’ অধ্যাপক সেন অর্থনীতিতে তার অবদানের জন্য সুইডেনের পুরষ্কারটি পাওয়ার পর ‘প্রতীচী ট্রাস্ট’ গঠন করেন। শোনা যায়, বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসের মধ্যে ‘প্রতীচী ট্রাস্ট’ এর অফিস করার জন্য একটি জায়গা চাওয়া হয়েছিলো। অধ্যাপক সেন নিজে চেয়েছিলেন নাকি তার হয়ে কোনো ব্যক্তি এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা স্পষ্ট নয়। কিন্তু তৎকালীন উপাচার্য বা কর্মসমিতি এই প্রস্তাবে রাজী হয়নি, অর্থাৎ তাঁকে ক্যাম্পাসে জায়গা দেওয়া হয়নি। সেই উপাচার্য প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু সেসময়ের দু একজন আধিকারিক এখনো আছেন। তারা হয়তো বলতে পারবেন কেন তাঁকে ক্যাম্পাসে জমি দেওয়া হয়নি। একই ভাবে তার পৈত্রিক বাড়ির জমি নিয়ে এই যে বিতর্ক তা যে শুধুমাত্র বর্তমান উপাচার্যের মস্তিস্কপ্রসুত, তাও নয়। এই জমি নিয়ে মাঝে মাঝেই কথা উঠেছে। শোনা যায়, একজন প্রাক্তন উপাচার্য, যিনি এখনো জীবিত – এই জমি সংক্রান্ত বিবাদের সমাধান করার জন্য ওনার কাছে, ওনার বাড়িতে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি সেভাবে সাড়া পাননি। অনেকেই বলবেন এসব ‘শোনা যায়’, ‘জানা যায়’ – কথার প্রমাণ নেই। সত্যিই নেই, কারণ এসবের কোনো লিখিত প্রমাণ থাকে না। যদি এই তথ্যগুলো ঠিক না হয়, তাহলে অধ্যাপক সেনের পরিচিত জন অবশ্যই প্রতিবাদ করতে পারেন। এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই যে অমর্ত্য সেনের মতো এত উচ্চাসনে থাকা ব্যক্তি যেভাবে অপ্রীতিকর একটি বিতর্কে জড়িয়ে গেছেন তার নিরসন হওয়া উচিত। বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ বা ভারত সরকার কি চাইলেই ওই জমি উপহার হিসাবে তাঁকে দিতে পারেন? খানিকটা নিয়ম কানুন বদলে হয়তো সেটা পারেন, তবে সেক্ষেত্রে আরও নতুন নতুন বিতর্কের জন্ম হবে, বিশ্বভারতীর জমি সমস্যা জটিলতর হবে। নোবেল প্রাইজ প্রাপক বা ভারতরত্ন না পেলেও সেসময় জমির লীজ প্রাপকরা স্ব স্ব ক্ষেত্রে অনেকেই বিখ্যাত। এখন তাদের স্বল্পখ্যাত বংশধররা সবাই যদি উপহার পাবার দাবী তোলেন তখন কি হবে? বামফ্রন্ট সরকার লবনহ্রদে যে জমি দিয়েছিলো সেখানেই এখন ‘প্রতীচী-ট্রাস্টের’ একটি অফিস; শান্তিনিকেতনে ক্যাম্পাসের বাইরে তারা নিজেদের উদ্যোগে একটি অফিস করেছেন। বর্তমান সরকার শান্তিনিকেতনে বিশ্বভারতী ক্যাম্পাসের বাইরে আর একটি জমি দিয়ে, ‘প্রতীচী’ বাড়ির আদলে আর একটি বাড়ি তৈরী করে ওনাকে উপহার দিলে কারো কোন আপত্তি থাকার কথা নয়।

    চাহিদার তুলনায় বিশ্বভারতীর জমির পরিমাণ কম। বিশ্বভারতীকে একটি সম্পূর্ণ আবাসিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে আরও হোস্টেল ভবন নির্মাণ করতে হবে। এই মুহূর্তে সেখানে হস্টেল সংখ্যা অত্যন্ত কম। ভবিষ্যতে আরও শ্রেণীকক্ষ, খেলার মাঠ, গবেষণাগার ইত্যাদি নির্মাণের জন্য আরও জমির প্রয়োজন হবে। এজন্য একদিকে বেআইনিভাবে দখল হওয়া জমি উদ্ধার করতে হবে অন্যদিকে নিজেদের জমি রক্ষা করতে হবে।

     

    দেশের খবর, দশের খবর, সব খবর, সবার আগে পেতে ফলো করুন আমাদের Facebook এবং Twitter পেজ। 

  • Bengali New Year: বাংলা বর্ষপঞ্জির শুরু কোথায়? জানুন বঙ্গাব্দের জন্ম বৃত্তান্ত

    Bengali New Year: বাংলা বর্ষপঞ্জির শুরু কোথায়? জানুন বঙ্গাব্দের জন্ম বৃত্তান্ত

     জিষ্ণু বসু 

    আমাদের বাংলা ক্যালেন্ডারের সঙ্গে মাসের দিনসংখ্যা অনেকটাই আলাদা বাংলাদেশে। কেন এই পার্থক্য? দেশভাগের আগে তো একটাই বাংলা ছিল। এই বঙ্গভূমিতে কোন বর্ষপঞ্জি অনুসৃত হতো? ঢাকার দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ আর কলকাতার স্যার সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কি আলাদা পয়লা বৈশাখ মানতেন? সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল কোন বর্ষপঞ্জি মেনে নববর্ষ পালন করতেন?

    প্রাচীনকাল থেকে বাংলার মাটিতে চলে আসা এই যে চান্দ্র-সৌর বর্ষপঞ্জি তার শুরুটাই বা কোথায়? স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে আজ থেকে ১৪৩০ বছর আগেই বঙ্গাব্দের যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু সেখানেও বিতর্ক আছে। অনেকেই এখন বলছেন, ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দকে শুরু ধরে সম্রাট আকবর কর্তৃক এই বঙ্গাব্দ চালু হয়েছিল।

    বাংলা মাসের দিন পালটানো বা সূচনা কাল নিয়ে বিতর্ক বড় করে উঠে এল গত শতাব্দীর ছ’য়ের দশকে। ১৯৬৪ সালে সারা বাংলাদেশ জুড়ে ভয়ানক দাঙ্গা হল। সেদেশ থেকে হিন্দুদের বিতাড়ন মানে ‘এথনিক ক্লিনসিং’ শুরু হল পাকিস্তান সরকারের তত্ত্বাবধানে। কিন্তু মানুষ তাড়ালেই তো শুধু হবে না, পূর্ব পাকিস্তান তো একটা গোটা স্বতন্ত্র সংস্কৃতি। হিন্দুর পরম্পরাকে বাদ দিলে তো তার অর্ধেকের বেশিটাই খালি হয়ে যাবে। এই সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে বাংলা বর্ষপঞ্জি যার ভিত্তিটা সূর্যসিদ্ধান্তের উপরে স্থাপিত।

    বাংলা বর্ষপঞ্জি পরিবর্তনের জন্য পাকিস্তানের তদানীন্তন সরকার একটি কমিটি তৈরি করেছিল। যার প্রধান ছিলেন মহম্মদ শহিদুল্লাহ। ১৯৬৬ সালে শহিদুল্লাহ সাহেবের কমিটি তাদের রিপোর্ট জমা দেয়। কমিটির সুপারিশ অনুসারে বাংলার প্রথম পাঁচটি মাস ৩১ দিন হবে ঠিক হল, আর বাকি মাসগুলি ৩০ দিনের। লিপ-ইয়ার হলে ফাল্গুন মাস ৩১ দিন ধরে নেওয়া হবে। যেহেতু তিথি নক্ষত্রের হিসাব রাখতে হবে না তাই প্রতি বছরই ১৪ এপ্রিল তারিখে হবে পয়লা বৈশাখ। এই রিপোর্টেই ৪ নম্বর পয়েন্ট হিসাবে উল্লেখ ছিল যে বঙ্গাব্দের সূচনা করেছিলেন সম্রাট আকবর খ্রিস্টীয় ১৫৮৪ সালে। তারও ২৯ বছর আগে মানে তাঁর মসনদে বসার সাল ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ অর্থাৎ ৯৬৩ হিজরি সালকে বঙ্গাব্দের শুরু হিসেবে ঘোষণা করেন।

    পাকিস্তান সরকারের এই রিপোর্ট নিয়ে বিতর্কের বিস্তর অবকাশ আছে। ১৪ এপ্রিলকেই পয়লা বৈশাখের দিন স্থির করা এককথায় অবৈজ্ঞানিক। সূর্যসিদ্ধান্ত মতে, বছরের দিনসংখ্যা ৩৬৫.২৫৮৭৫৬ আর গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার হিসাবে ৩৬৫.২৪২২ দিন। মানে পার্থক্য হল ০.০১৬৫৫৬ দিন। শহিদুল্লাহ সাহেব যখন রিপোর্ট জমা দিয়েছিলেন সেদিন থেকে আজকের মধ্যেই প্রায় একদিনের (০.৮৯৪ দিনের) পার্থক্য হয়ে গিয়েছে।

    বছরের প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনের হিসেবটাও সমীচীন নয়। ভারতীয় বর্ষপঞ্জির অন্যতম বিশেষত্ব হল নক্ষত্রের অবস্থান। মাসেদের নামও এর সঙ্গে সম্পর্কিত। বঙ্গাব্দের শুরুর বছর মানে ৫৯৪ খ্রিস্টাব্দে ভার্নাল ইক্যুইনক্স বা মহাবিষুবের দিন ছিল ২০ মার্চ। ঠিক তার পরেই ২৭ মার্চ ছিল অমাবস্যা। বঙ্গাব্দের প্রথম অমাবস্যার দিন রেবতী নক্ষত্র, সূর্য, চন্দ্র ও পৃথিবী ঠিক এক সরলরেখায় ছিল। রেবতীকে আদি নক্ষত্র ধরেই বঙ্গাব্দের মাসের রচনা। কিছু মাসকে ইচ্ছেমতো ৩১ দিন ধরে নিলে বঙ্গদেশের পণ্ডিত মানুষদের এতশত বছরের সাধনার ধনকে জলাঞ্জলি দেওয়া হবে।

    শহিদুল্লাহ কমিটি বলেছিলেন, সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে বঙ্গাব্দ শুরু করেন। আকবর তাঁর জ্যোতির্বিদ ফতল্লাহ শিরাজিকে হিজরি সালের সঙ্গে সূর্য সিদ্ধান্তের বর্ষগণনার হিসাব মিলিয়ে বর্ষপঞ্জি রচনার কথা বলেন। তখন আকবরের রাজত্বের ২৯ বছর হয়ে গেছে। তাই তাঁর মসনদে বসার বছর অর্থাৎ ১৫৫৬ সাল বা ৯৬৩ হিজরিকে প্রথম বঙ্গাব্দ ধরতে বলেন। এরপর থেকে সৌরবর্ষ যোগ করলে বঙ্গাব্দ পাওয়া যায়। যেমন ২০২০ খ্রিস্টাব্দ মানে ৯৬৩ + (২০২০- ১৫৫৬) = ১৪২৭ বঙ্গাব্দ।

    এই মিলিয়ে দেওয়া নিয়েও অনেকে আপত্তি করেছেন। বিজ্ঞানী পলাশবরন পাল তাঁর ‘সাল তারিখের ইতিহাস’ বইতে একটি সরল যুক্তি দিয়েছেন। আকবর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ১৫৮৫ সালে, তাহলে সিদ্ধান্ত তখন থেকে কার্যকরী করাই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দ মানে ৯৯৩ হিজরি, সেক্ষেত্রে আর উপরের ম্যাজিক সমীকরণ মিলবে না।

    আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আজকের যুগে আকবরের রাজত্বের ২৯ বছর বাদ দেওয়া সহজ, কিন্তু আকবরের দরবারও চলত হিজরি সাল হিসাবে। হিজরি সাল হিসাবে ১২টি ২৯.৫ দিনের চন্দ্রমাসের যোগফল মানে ৩৫৪ দিনে বছর। তাই দু’টি সময়ের ব্যাবধান হিজরি সাল গণনা হিসাবে ৩০ বছরের কিছু বেশি। ফতল্লাহ শিরাজি বাদ দিলে ৩০ বিয়োগ করতেন ২৯ কখনওই নয়। তাই বাদ দিয়ে অঙ্ক মেলানোর প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে আধুনিক।

    তাছাড়া আকবরের জীবদ্দশায় মোগলরা বাংলায় রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে উঠে আসেনি। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে মোগলদের কাছে বাংলার আফগান শাসক দাউদ খান করর্নি পরাজিত হন। কিন্তু তারপরেও লাগাতার যুদ্ধ চলে। জাহাঙ্গিরের শাসনকাল পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলেছে। তাই ১৫৮৫ সালে সারা বাংলাতে শান্তিতে রাজত্ব করার অবস্থা বাদশা আকবরের ছিল না। তখন মোগল রাজত্ব কাবুল, মুলতান থেকে পূর্বে পাটনা পর্যন্ত মোট ১২টি সুবায় ভাগ ছিল। সম্রাট আকবর বেছে বেছে আপাত অস্থির বাংলাতেই তাঁর অব্দ শুরু করলেন কেন? স্বাভাবিক যুক্তিবোধে এর সঠিক উত্তর মেলে না।

    আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরিতে বঙ্গাব্দ বা বাংলায় বিশেষ সন প্রবর্তনের কোনও উল্লেখ নেই। বিভিন্ন বিষয় আলোচনার সময়ে অনেক সাল তামামি আছে কিন্তু বাংলা অব্দ নিয়ে একটি শব্দও নেই। হিজরি সাল হিসাবে ভারতবর্ষের ফসলের কর আদায়ের অসুবিধে হচ্ছে, তাই ফতল্লাহ শিরাজিকে তারিখ-ই-ইলাহি তৈরি করতে বলেছিলেন সম্রাট। এরকম হতেই পারে যে বাংলায় প্রচলিত বর্ষপঞ্জিকে দেখে এমনই একটা চান্দ্র-সৌর অব্দ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শস্যশ্যামলা বঙ্গদেশে এটি ফসলের কালের সঙ্গে মিলত, কাবুলে বা মুলতানে নিশ্চয়ই মিলত না। তাই আকবরের ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গেই দ্বীন-ই-ইলাহির মত তারিখ-ই-ইলাহিও হারিয়ে যায়।

    কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’ কবিতায় যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের কথা বলেছেন। ‘যুদ্ধ করিল প্রতাপাদিত্য তুই কি না সেই ধন্য দেশ’, এই প্রতাপাদিত্য মোগলদের সঙ্গেই যুদ্ধ করেছিলেন। ১৫৮৪ সালে তিনিও রাজ্যপাট হাতে পান। তিনি যশোরে শিক্ষাবিস্তারের জন্য জেস্যুইট মিশনারিদের গির্জা বানাতে দিয়েছিলেন। তাঁর নৌবহরে পর্তুগিজ কুশল কারিগর ছিলেন। অর্থাৎ এক স্পন্দনশীল বাংলা সেদিন দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ছিল, রাজমহল জয় করেই বঙ্গাব্দ প্রচলনের প্রশ্নই ওঠে না।

    ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে ‘ক্যালেন্ডার রিফর্ম কমিটি’ গঠিত হয়েছিল। অধ্যাপক মেঘনাদ সাহা এই কমিটির সভাপতি হয়েছিলেন। এই কমিটির সুপারিশ অনুসারেই ‘শালিবাহন শক’ বর্ষপঞ্জিকে ভারতবর্ষের জাতীয় বর্ষপঞ্জি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। ১৯৫৫ সালে এই কমিটির পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। এই কমিটি দেখেছিল যে ভারতীয় কালগণনা পদ্ধতি ছিল অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত। আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের পরে গ্রিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা হলেও গ্রিক জ্যোতির্বিদ্যা থেকে ভারতের কিছু নেওয়ার ছিল না।

    বাংলার সাল গণনার বিষয়েও এখানে আলোকপাত করা হয়েছে। চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ শতকের শুরুর সময় পর্যন্ত বাংলা মূলত গুপ্ত সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। তারপর ৭৫০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত পাল রাজারা শাসন করেন। সেন রাজারা কর্ণাটকের ক্ষত্রিয় ছিলেন। তাঁরাই বাংলায় শকাব্দ সাল গণনা রীতি নিয়ে আসেন। মুসলমান শাসনের সময় নবাব দরবারে হিজরি সাল চলত। কিন্তু শিক্ষিত সমাজে “শক” বর্ষপঞ্জিই ব্যবহৃত হতো। বাংলার সাধারণ মানুষ ‘পরগনাতি অব্দ’ নামে একটি বর্ষপঞ্জি মানতেন। তারিখ-ই-ইলাহির পরে থেকে নবাব দরবারেও সূর্যসিদ্ধান্তই মানা হতো।

    গুপ্তযুগের পরে এবং পালযুগের আগে ছোট সামন্ত রাজারা রাজত্ব করেছেন। হর্ষচরিতে মৌখরি বংশের প্রতিনিধি শশাঙ্কের বর্ণনা আছে। কামরূপ-বিজয়ী এই শশাঙ্কের রাজধানী ছিল অধুনা মুর্শিদাবাদের কাছে কর্ণসুবর্ণতে। আজ থেকে ১৪৩০ বছর আগে শশাঙ্কই গৌড়ের রাজা ছিলেন। তাই বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রবর্তক হিসাবে শশাঙ্কের সপক্ষেই যুক্তির পাল্লাই ভারী। তবে নিশ্চয় তখন একে বঙ্গাব্দ বলা হতো না। কিন্তু, বাংলা সাল গণনা তখন থেকেই শুরু।

    নীতীশকুমার সেনগুপ্ত ১৯৫৭ সালের ব্যাচে বেঙ্গল ক্যাডারের আইএএস। দুই বাংলার প্রতি টান থেকে একটি গবেষণামূলক গ্রন্থ লিখেছেন তিনি, ‘ল্যান্ড অফ টু রিভার্স: এ হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল ফ্রম দ্য মহাভারত টু মুজিব।’ লেখক দেখিয়েছেন বাঁকুড়ার ডিহারগ্রাম ও সোনাতপনে হাজার বছরের প্রাচীন শিব মন্দিরে বাংলা অব্দের উল্লেখ আছে।

    মেঘনা গুহঠাকুরতা ও উইলিয়ম ভ্যান শেন্ডোলের বই ‘দ্য বাংলাদেশ রিডার: হিস্ট্রি, কালচার, পলিটিক্স’ প্রকাশিত হয়েছে ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে। বইটিতে বাংলার বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের কৃতিত্ব গৌড়েশ্বর শশাঙ্ককেই দেওয়া হয়েছে।
    বঙ্গাব্দ নিয়ে বিস্তর গবেষণার সুযোগ আছে। বাঙালি বুদ্ধিমান, বাঙালি যুক্তিবাদী সেইসঙ্গে বাঙালির ছোঁয়া বিশ্বজুড়ে। তাই যে মতটা যুক্তিগ্রাহ্য এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সেটিকেই মানবে আধুনিক বাঙালি। কিন্তু আরগুমেনটেটিভ তর্কবাগীশ বাঙালিও অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যুক্তিবোধের থেকে আর্ষপ্রয়োগকেই বেশি মেনে নেয়। সমস্যাটা সেখানেই।

    (লেখক কলকাতার সাহা ইনস্টিটিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স-এ কর্মরত)

     

    দেশের খবর, দশের খবর, সব খবর, সবার আগে পেতে ফলো করুন আমাদের FacebookTwitter এবং Google News পেজ।

  • Tripura: ত্রিপুরার রায়— কীভাবে জনজাতি মানুষের মন জয় করেছে বিজেপি

    Tripura: ত্রিপুরার রায়— কীভাবে জনজাতি মানুষের মন জয় করেছে বিজেপি

    সোমেশ্বর

    ত্রিপুরা বিধানসভার নির্বাচন ও ভোট গণনার আগে বেশ কিছু ভিডিও ক্লিপ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ঘুরতে দেখা যাচ্ছিল। দেখা যাচ্ছিল ত্রিপুরা সিপিএমের সম্পাদক জিতেন্দ্র চৌধুরী এখানে-ওখানে ঘুরছেন, সঙ্গে দলীয় সদস্য-সমর্থক, কোথাও বা কংগ্রেস নেতা–কর্মীরা। পুলিশ বা সরকারী কর্মীদের বিভিন্ন সময়ে ধমকাচ্ছেন, কখনও বাংলায়, বেশি রেগে ইংরাজিতে বলছেন, ‘‘জানেন আমি কে?’’ এও দেখা যাচ্ছিল সেইসব পুলিশ বা সরকারী কর্মীরা তাঁর সামনে জড়সড় হয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছেন এবং ধমক খেয়ে চুপ করে যাচ্ছেন। এসব দেখে অনেকেই ভাবতে শুরু করেছিলেন যে, বিজেপি এবার ত্রিপুরা থেকে যাচ্ছেই আর বাম-কংগ্রেস সরকারের মুখ্যমন্ত্রী তথা দশরথ দেবের পর ত্রিপুরার দ্বিতীয় জনজাতি মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন জিতেন্দ্র চৌধুরী। 

    ত্রিপুরার রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে বাম-কংগ্রেস জোটের প্রবক্তা ছিলেন জিতেন্দ্রবাবু এবং চার বারের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার এই জোটের বিরুদ্ধে থাকা সত্ত্বেও দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জিতেন্দ্রবাবুর ওপর ভরসা করেছিলেন। ফল প্রকাশের পর দেখা গেল দলের হাল যা হবার হয়েছে। তিনি নিজেই সাব্রুমের মতো একটি জনজাতি অধ্যুষিত কেন্দ্র থেকে দ্বিমুখী লড়াইয়ে মাত্র ৩৯৬ ভোটে জিতেছেন যেখানে তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন একজন অ-জনজাতীয়— শঙ্কর রায়। এখানে তিপ্রামোথা কোনও  প্রার্থী দেয়নি। নোটায় ভোট পড়েছে ১২৪৮টি। 

    ঠিক যে কারণে মহম্মদ সেলিমকে পশ্চিমবঙ্গে সামনে আনা হয়েছে সম্ভবত সেই কারণেই জিতেন্দ্র চৌধুরীকে তুলে ধরা হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচনের ফলে দেখা গেল— বাম নয়, বিজেপি এবং তিপ্রামোথা-ই জনজাতিদের আস্থা অর্জনে বেশি সফল হয়েছে। বিজেপি জোটে ৭ জন জনজাতীয় বিধায়ক, বাম–কংগ্রেস জোটে মাত্র একজন— জিতেন্দ্রবাবু নিজে। তিপ্রামোথার তেরো জনই জনজাতীয় সমাজের। এর মধ্যে চরিলাম কেন্দ্রে জিষ্ণু দেববর্মা তিপ্রামোথার প্রার্থীর থেকে মাত্র ৮৫৮ ভোট কম পেয়েছেন আর আম্বাসা কেন্দ্রে বিজেপি তিপ্রামোথার কাছে ৪৯৩ ভোটে হেরেছে।

    উত্তরপূর্ব ভারতের আর ছটা রাজ্যের থেকে ত্রিপুরা খানিকটা ভিন্ন। অন্যত্র সেখানকার জনজাতিরা সংখ্যায় অধিক কিন্তু ত্রিপুরায় দেশভাগের পর বন্যার মতো আসা বাঙালি উদ্বাস্তুদের আগমনে সেখানকার জনজাতিরা ক্রমশ সংখ্যালঘু হয়ে পড়েন। যদিও ত্রিপুরার রাজ পরিবার একটি হিন্দু রাজপরিবার ছিল এবং সেখানকার পাহাড়বাসী, বনবাসী প্রজারাও সনাতন সংস্কৃতির অনুসারী ছিলেন কিন্তু হঠাৎ আসা বাঙালি হিন্দুদের আধিপত্য তাঁদের মধ্যে খানিকটা হলেও ক্ষোভের সঞ্চার করেছিল। এই ক্ষোভকে কাজে লাগিয়েই শুরু হয় একদিকে জনজাতি রাজনীতি অন্য দিকে মিশনারীদের মদতে উগ্রপন্থা। 

    ত্রিপুরার বামপন্থী মুখ্যমন্ত্রী বিবিসি-র প্রতিনিধি সুবীর ভৌমিককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, ব্যাপটিস্ট  মিশনারীরা ওই রাজ্যে উগ্রপন্থী সংগঠন এনএলএফটিকে-কে মদত দিচ্ছে। ত্রিপুরার রাজ পরিবার স্বাধীন রাজ্য হিসাবে কিম্বা ভারতভুক্তির পর কখনও জনজাতি রাজনীতি করেনি। বর্তমান ‘রাজা’ প্রদ্যোৎ কিশোর দেব— ‘বুবাগ্রা’র ঠাকুরদা, বাবা এবং মা সবাই সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থেকে সংসদীয় রাজনীতি করেছেন। ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজপরিবারের সঙ্গে এমনকি গোয়ালিয়রের সিন্ধিয়া পরিবারের সঙ্গেও ত্রিপুরা রাজপরিবারের বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এমন একটা পরিবারের সদস্য হিসাবে ‘বুবাগ্রা’ নিজেকে আঞ্চলিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়েছেন। বলাই বাহুল্য মোথার আগামীদিনের রাজনীতি যত বেশি জনজাতিকেন্দ্রিক হবে ত্রিপুরায় জনজাতি ও বাঙালিদের মধ্যে সৌহার্দ্য ততটাই বিঘ্নিত হবে এবং ত্রিপুরার উন্নয়ন ব্যহত হবে।

    তিপ্রা মোথার নেতাদের যদি শুভবুদ্ধির উদয় হয় এবং তাঁরা যদি কোনও সর্বভারতীয় দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জনজাতি স্বার্থের দিকে নজর রাখে তবে সবদিক দিয়েই ভাল হয়। সুখের কথা তিপ্রা মোথা শুরু থেকেই সংসদীয় রাজনীতির পথে আছে। আজকে মোথার যিনি সভাপতি সেই বিজয় রাঙ্খল তাঁর মধ্য চল্লিশে উগ্রপন্থী সংগঠন টিএনভি গড়েছিলেন। জনজাতিদের একটা বড় অংশ যাঁরা শিক্ষিত, সচেতন এবং অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছেন তাঁরা বুঝেছেন পৃথক তিপ্রাল্যান্ডের দাবি নিয়ে কিছু লোক নেতা হয়ে গিয়েছে মাত্র কিন্তু বাস্তবে এটা হওয়ার নয়। একারণেই জনজাতি এলাকাতেও বিজেপি একাধিক আসনে জিতেছে।

    উত্তরপূর্ব ভারতের বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে ভারত বিরোধিতা নিরসন করতে নিঃশব্দে তিনটি সংগঠন কাজ করে গেছে। এগুলি হল— রামকৃষ্ণ মিশন, কন্যাকুমারী ভিত্তিক বিবেকানন্দ কেন্দ্র এবং আরএসএস প্রভাবিত বনবাসী কল্যাণ আশ্রম। এক সময় এইসব রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে সেবার আড়ালে ধর্মান্তরণ করে জনজাতিদের মধ্যে ভারত বিরোধিতার বীজ বপন করত বিভিন্ন মিশনারী সংস্থা। কিন্তু যখন থেকে উক্ত তিনটি সংগঠন কাজে নামে তখন থেকেই ধীরে ধীরে এইসব রাজ্যের জনজাতি এলাকার মানুষের মধ্যে চেতনা ফিরে আসতে থাকে। ত্রিপুরার প্রত্যন্ত গ্রামে বনবাসী কল্যাণ আশ্রম বেশ কয়েক দশক ধরে কাজ করে চলেছে। 

    ১৯৮৪ সালে রাজীব গান্ধী প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের উগ্রপন্থী সংগঠন ‘টিএনভি’-র সঙ্গে হওয়া চুক্তির সুফল হিসাবে আগরতলার কাছে বিবেক নগরে প্রায় পনেরো একর জায়গার ওপর একটি বহুমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, ওই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে জনজাতি ছেলেরা সেখানে ভর্তি হয়, হোস্টেলে থাকতে শুরু করে। এমনকি ধর্মান্তরিত খ্রিস্টান জনজাতির মানুষের বহু ছেলে এখানে ভর্তি হয়। তিরিশ বছরের বেশি সময় ধরে এখান থেকে পাশ করে যারা জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তারা ভারত বিরোধিতার আগে বা বিছিন্নতাবাদী আন্দোলনের আগে দুবার ভাববে। আর শিলংয়ের বিদেশি মিশনারীদের স্কুলে যারা পড়ে আসবে তাদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ভারতীয় সনাতন সংস্কৃতির প্রতি সেই টান থাকবে না। আশা করা যায় পরপর দুবার ক্ষমতাসীন ত্রিপুরার বিজেপি সরকার জাতীয়তাবাদী এইসব সংগঠনগুলোকে সমর্থন দেবে। নির্বাচনের ফল অন্যরকম হলে আবার ভারত-বিরোধী শক্তি ওই রাজ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করত।

    ত্রিপুরা নির্বাচনের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বিষয় সেই বাংলাভাষীরা যারা দীর্ঘদিন ধরে ওই রাজ্যে বামেদের টিকিয়ে রেখেছিল তারা একবার নয় দ্বিতীয়বার বিজেপিকে ভোট দিতে দ্বিধা করেনি। ত্রিপুরার শিক্ষিত, মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের ছেলেমেয়েদের একটা বড় অংশ এখন পড়াশোনা, জীবন জীবিকার জন্য রাজ্যের বাইরে থাকে। তাদের মাধ্যমে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ার সেখানকার বাঙালিরা বুঝতে পারছে কীভাবে একটা রাজ্যকে দীর্ঘসময় অনুন্নত করে রাখা হয়েছিল। একসময় যারা অত্যাচারিত হয়ে পূর্ববঙ্গ ছেড়ে এই রাজ্যে বসত করেছিল তাদের আজকের প্রজন্ম বুঝতে পারছে সীমান্তবর্তী এই রাজ্যকে নিরাপদে রাখতে হলে কেমন সরকার প্রয়োজন। 

    ‘বুবাগ্রা’ যত যাই করুন তাঁর ‘রাজনৈতিক দর্শন’ বিধানসভার কুড়িটা আসনের বাইরে তাকে খুব একটা কিছু দেবে না। দ্বিতীয় বিজেপি সরকারের এমন কিছু করা উচিত যাতে তিরিশ শতাংশ জনজাতির সঙ্গে সত্তর শতাংশ বাঙালিও সমানভাবে সরকারি সুযোগ–সুবিধা পেতে পারে। সেই সঙ্গে সেখানকার জনজাতিদের এটা বোঝাতে হবে তথাকথিত জনজাতি সংগঠনগুলো এক আধজন– বিজয় রাঙ্খল, শ্যামাচরণ ত্রিপুরা বা প্রদ্যোৎ কিশোরদের উচ্চাসনে পৌঁছে দেবে কিন্তু সামগ্রিকভাবে জনজাতি সমাজের কোনও বিকাশ হবে না।

  • Jogendra Nath Mandal: ‘‘কেন আমি পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলাম?’’

    Jogendra Nath Mandal: ‘‘কেন আমি পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলাম?’’

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি -পর্ব ৭

    ষষ্ঠ পর্বের পর…

    পূর্ব বঙ্গের বর্তমান চিত্র

    ৩১। এখন পূর্ব বাংলার অবস্থা কেমন? দেশভাগের পর থেকে প্রায় ৫০ লক্ষ হিন্দু দেশ ছেড়ে গেছে। গত ফেব্রুয়ারির দাঙ্গা বাদেও এর পিছনে বহু কারণ কাজ করেছে। মুসলিমদের বয়কটের কারণে আইনজ্ঞ, মেডিকেল প্র্যাকটিশনার, দোকানদার, বিক্রেতা ও বণিক সহ প্রায় সব পেশার হিন্দুদেরই জীবিকার খোঁজে পশ্চিমবঙ্গে চলে যেতে হয়েছে। আইনগত পদ্ধতি অনুসরণ না করেই হিন্দু বসতবাড়ির সম্পূর্ণ মালিকানা কিনে নেয়া এবং বাড়ির মালিকদের কোনোরূপ ভাড়া পরিশোধ না করার ফলে তারা ভারতে আশ্রয় খুঁজতে বাধ্য হচ্ছে। হিন্দু জমিদারদের খাজনা দেওয়া বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তদুপরি, হিন্দুদের নিরাপত্তার প্রতি সবসময়ের হুমকি হিসেবে আছে আনসার যাদের ব্যাপারে আমি সব জায়গা থেকে অভিযোগ পেয়েছি। শিক্ষা এবং তা প্রদানের ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাজে ইসলামিকরণের নামে হস্তক্ষেপ হাইস্কুল এবং কলেজের শিক্ষকদের তাদের পরিচিত পরিবেশের বাইরে ছুঁড়ে ফেলেছে। তারা এই বাংলা ছেড়ে যাচ্ছে। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই বন্ধ হয়ে গেছে। আমি জানতে পেরেছি যে কিছুদিন আগে শিক্ষা দপ্তর একটি সার্কুলার প্রকাশ করেন যাতে সব সম্প্রদায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য পবিত্র কোরান আবৃত্তি বাধ্যতামূলক করা হয়। আরেকটি সার্কুলারের মাধ্যমে প্রধান শিক্ষকদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বিভিন্ন ব্লক জিন্নাহ, ইকবাল, লিয়াকত আলী, নাজিমুদ্দীন প্রমুখ ১২ জন পরিচিত মুসলিমদের নামে নামকরণ করতে বলা হয়। অতি সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত এক শিক্ষা সম্মেলনে রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন যে পূর্ব বাংলার ১৫০০ ইংরেজি স্কুলের মধ্যে মাত্র ৫০০টি চালু আছে। মেডিকেল প্র্যাকটিশনারেরা দেশ ছেড়ে যাওয়ায় রোগীদের সঠিক চিকিৎসা প্রাপ্তির আশা দুরাশায় পরিণত হয়েছে। হিন্দু বসতবাড়িতে পূজা-অর্চনা করতেন এমন প্রায় সকল পুরোহিত দেশ ত্যাগ করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরগুলো পরিত্যক্ত পড়ে রয়েছে। ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের জন্য বিয়ের মত সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো যেখানে একজন পুরোহিতের উপস্থিতি অত্যাবশ্যক সেসব পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। দেব-দেবীর মূর্তি প্রস্তুতকারী শিল্পীরাও দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। পুলিশ এবং সার্কেল অফিসারদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্মতিতে দমনমূলক নীতির মাধ্যমে ইউনিয়ন বোর্ডগুলোর সভাপতির পদ থেকে হিন্দুদের সরানো হয়েছে।  হিন্দু প্রধান শিক্ষক ও বিদ্যালয়ের সচিবদেরও মুসলিমদের দ্বারা প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। হাতে গোনা যে অল্প কজন হিন্দু সরকারি চাকরিজীবি আছেন তাদের জীবন দুর্বিসহ করে তোলা হয়েছে। হয় তাদের জুনিয়র মুসলিম সহকর্মীরা তাদের পিছনে ফেলে উপরে উঠে যাচ্ছে অথবা যথেষ্ট বা কোনও কারণ ছাড়াই তাদের অব্যাহতি দেয়া হচ্ছে। অতি সাম্প্রতিককালেই একজন হিন্দু পাবলিক প্রসিকিউটরকে কোনও কারণ ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। শ্রীযুক্তা নেলি সেনগুপ্ত এর এক বিবৃতিতে ঘটনাটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা আছে। অন্তত তাঁকে কেউ মুসলিম বিদ্বেষী বলে চিহ্নিত করতে পারবে না।

    হিন্দুরা রীতিমত নিরাপত্তাহীন

    ৩২। হিন্দুদের সম্পত্তি চুরি-ডাকাতি এবং হত্যাকাণ্ডও আগের মত চলছে। থানা পুলিশ হিন্দুদের অভিযোগ নিচ্ছে না। অবশ্য হিন্দু মেয়েদের জোরপূর্বক অপহরণ এবং ধর্ষণের সংখ্যা আগের থেকে কমে গেছে। এর কারণ হল পূর্ব পাকিস্তানে ১২ থেকে ৩০ বছর বয়সে কোন হিন্দু মেয়ে আর নেই। আর যারা পালাতে পারে নাই তারা মুসলিম গুণ্ডাদের হাত থেকে বাঁচে নাই। আমি অনেক খবর পেয়েছি নিম্নবর্ণের হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণের খবর। হিন্দুরা বাজারে পাট এবং কৃষিপণ্য বিক্রি করতে যায়। মুসলিম ক্রেতারা খুব কম সময়ই পুরো দাম দেয়। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানে আইনের শাসন নেই, বিশেষ করে হিন্দুদের জন্য।

    পশ্চিম পাকিস্তানে জোরপূর্বক ধর্মান্তরকরণ

    ৩৩। পূর্ব পাকিস্তানকে  সরিয়ে এখন পশ্চিম পাকিস্তান, বিশেষ করে সিন্ধের দিকে মনোনিবেশ করা যাক। দেশভাগের পর পশ্চিম পাঞ্জাবে প্রায় লাখ খানেক অস্পৃশ্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষ ছিল। এদের মধ্যে একটা বড় অংশকে ইসলামে ধর্মান্তর করা হয়। সরকারের কাছে বারংবার আবেদনের পরেও অপহৃত ১২ জন নমঃশূদ্র মেয়ের মাঝে কেবল মাত্র ৪ জনকেই এখনও পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে। অপহৃত মেয়েদের নাম ও তাদের অপহরণকারীদের নাম সরকারের নিকট পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এই অপহরণের ঘটনার অফিসার-ইন-চার্জের সাম্প্রতিকতম উত্তরে ছিল “তার কাজ হল হিন্দু মেয়েদের উদ্ধার করা এবং ‘অচ্ছুতেরা’ (অস্পৃশ্য/নমঃশূদ্র) হিন্দু নয়”। যে ক্ষুদ্র হিন্দু জনগোষ্ঠী এখনও সিন্ধ এবং পাকিস্তানের রাজধানী করাচিতে বসবাস করছে তাদের অবস্থা খুবই শোচনীয়। আমার কাছে করাচি ও সিন্ধ এর ৩৬৩টি হিন্দু মন্দির ও গুরুদুয়ারার একটি তালিকা আছে (যা সম্পূর্ণ তালিকা নয়) যারা এখনও মুসলিমদের দখলে রয়েছে। কিছু কিছু মন্দিরকে মুচির দোকান, কসাইখানা এবং হোটেলে পরিণত করা হয়েছে। কোনও নোটিশ ছাড়াই হিন্দুদের কাছ থেকে জমিজমা কেড়ে নিয়ে শরণার্থী ও স্থানীয় মুসলিমদের ভাগ করে দেয়া হয়েছিল, তাদের কেউই আর তা ফেরত পায় নি। ব্যক্তিগতভাবে আমি ২০০ থেকে ৩০০ হিন্দুকে চিনি যারা বহুকাল পূর্বেই এই অঞ্চলের অধিবাসী হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তাদের সম্পত্তি তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। শত্রু সম্পত্তি নয় এটা ঘোষিত হবার পরেও করাচি পিঞ্জিরাপোল এখনও ট্রাস্টিদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। করাচিতে আমি বহু হতভাগ্য বাবা ও স্বামীর কাছ থেকে আবেদন পেয়েছি অপহৃত হিন্দু মেয়েদের সম্পর্কে, যাদের বেশিরভাগই ছিল নমঃশূদ্র। এ ব্যাপারে আমি দ্বিতীয় প্রাদেশিক সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। কিন্তু এ ব্যাপারে অগ্রগতি ছিল শূন্য। আমি অত্যন্ত দুঃখ পাই একথা জেনে যে সিন্ধে এখনও অবধি বসবাস করা নমঃশূদ্রদের এক বিরাট অংশকে জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে।

    পাকিস্তান, হিন্দুদের জন্য অভিশাপ

    ৩৪। উপরের সংক্ষিপ্ত চিত্র থেকে এটা বলাই চলে যে সবদিক দিয়েই পাকিস্তানের হিন্দুরা আজ নিজভূমে পরবাসী। তাদের একমাত্র দোষ হল তারা হিন্দুধর্মের অনুসারী। মুসলিম লিগের নেতৃবৃন্দ বারবার বলছেন পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র আছে এবং থাকবে। ইসলামকে সকল বৈশ্বিক পঙ্কিলতা দূরীকরণের পথ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। পুঁজিবাদ ও সমাজবাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্বমূলক মতবাদের মধ্যে আপনি ইসলামিক গণতন্ত্রের আনন্দজনক সমতা ও ভ্রাতৃত্ববোধকে তুলে ধরছেন। শরিয়ত অনুসারে মুসলিমরা একচ্ছত্র শাসক এবং হিন্দু ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায় তাদের নিরাপত্তায় বেঁচে থাকা জিমির মত। এর জন্য তাদের আবার দামও দিতে হয়। এবং অন্য সকলের চেয়ে আপনি ভাল করে জানেন প্রধানমন্ত্রী সাহেব, এর পরিমাণ কতটুকু। দীর্ঘ বিবেচনার পর আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছি যে পাকিস্তান হিন্দুদের বসবাসের পক্ষে উপযুক্ত স্থান নয়। এখানে তাদের ভবিষ্যত হল ধর্মান্তরিত হওয়া অথবা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। উচ্চ বংশীয় এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর বেশিরভাগই এর মধ্যে পূর্ব বাংলা ছেড়ে গেছে। যেসকল অভিশপ্ত হিন্দু পাকিস্তানে থেকে যাবে আমার আশঙ্কা ধীরে ধীরে পরিকল্পনামাফিক তাদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হবে নয়ত ধ্বংস করে দেয়া হবে। এটা আসলেই অবাক করার মত ব্যাপার যে আপনার মত একজন শিক্ষিত, সংস্কৃতিমনস্ক, অভিজ্ঞ ব্যক্তি মানবতার প্রতি হুমকিস্বরূপ এবং সকল সমতা ও শুভবোধের ধ্বংসকারী এরূপ মতবাদে পরিপূর্ণ হবার নজির রেখে যাচ্ছেন। আমি আপনাকে এবং আপনার সাথীদের বলতে চাই যে যেরূপ খুশি ব্যবহার করা হোক বা লোভ দেখানো হোক না কেন, হিন্দুরা নিজেদের জন্মভূমিতে নিজেরা জিমি হিসেবে গণ্য হতেও পিছপা হবে না। আজকে হয়ত অনেকে দুঃখে নয় ভয়ে নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু আগামীকাল তারা জীবনের অর্থনীতিতে নিজেদের স্থান আদায় করে নেবার জন্য সংঘর্ষে ঝাঁপিয়ে পড়বে। কে বলতে পারে ভবিষ্যত কি লুকিয়ে রেখেছে? যখন আমি নিশ্চিত যে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারে আমার অবস্থান হিন্দুদের কোনও উপকারেই আসছে না তখন নিজের বিবেকের কাছে নিজেকে পরিষ্কার রাখার জন্যই আমি পাকিস্তান এবং বিদেশের হিন্দুদের মনে এমন কোনও মিথ্যে আশার জন্ম দিতে চাই না যে তারা এখানে সম্মান এবং জীবন-জীবিকা ও সম্পত্তির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা সহকারে বসবাস করতে পারবে। হিন্দুদের নিয়ে বলার ছিল এটুকুই।

    মুসলমানদেরও সামাজিক স্বাধীনতা নেই

    ৩৫। সেই মুসলিমদের কী খবর যারা মুসলিম লিগ এবং তার দুর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্রকে সমর্থন করেন না? পাকিস্তানে সামাজিক স্বাধীনতা বলতে কিছু নাই। উদাহরণস্বরূপ খান আবদুল গাফফার খান নামক সেই ধর্মপ্রাণ মুসলিমের কথা চিন্তা করুন। কিংবা তার দেশপ্রেমিক ভাই ডা খান সাহিবের পরিণতি চিন্তা করুন। উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং পূর্ব বাংলার নেতাদের আপনারা বিনা বিচারে আটকে রেখেছেন। বাংলাতে মুসলিম লিগের বিজয় পতাকা বহনকারী জনাব  সোহরাওয়ার্দিকে এখন সরকারের ইচ্ছায় চলতে হয় এবং মুখ খুলতেও অনুমতি লাগে।  বাংলার প্রবীণ বৃদ্ধ নেতা, লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপনকারী জনাব ফজলুল হক বর্তমানে ঢাকা হাই কোর্টের চারদেয়ালের মাঝে তার একাকী জমিতে লাঙ্গল চড়াচ্ছেন এবং তথাকথিত ইসলামিক চিন্তাতে লিপ্ত যেটা সম্পূর্ণ অমানবিক। আর পূর্ব বাংলার সাধারণ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কথা চিন্তা করুন তারা ভালো আছে বলতে পারবে না। তারা আশ্বাস পেয়েছিল স্বায়ত্তশাসন এবং আঞ্চলিক স্বাধিকারের। কিন্তু তারা আসলেই কী পেয়েছে? যদিও পাকিস্তানের অন্যান্য প্রদেশের মিলিত জনসংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষ এখানে থাকে, তবুও পূর্ব বাংলা পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশে পরিণত হয়েছে। এই অবিচারের পরও করাচির কোন অধিকার নেই সেখান থেকে আদেশ জারি করার। পূর্ব বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠীর আগ্রহ এই বিচিত্র ইসলামিক প্রজাতন্ত্র পাথর ছুঁড়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে মরু সিন্ধু এবং পাঞ্জাব থেকে সাহায্য পাওয়ার বদলে।

    আমার নিজের দুঃখভারাক্রান্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা

    ৩৬। পাকিস্তানের সমগ্র চিত্র আর অন্যের প্রতি অবিচার আর শোষণের কথা বাদ দিলেও আমার নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। আপনি প্রধানমন্ত্রী এবং শাসকদলের প্রধান হিসেবে আপনার নিজের অবস্থান ব্যবহার করে আমাকে একটি প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে বলেছিলেন এবং আমি গত ৮ সেপ্টেম্বর তা করেছিও। আপনি জানতেন আমি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং অর্ধসত্যের সংমিশ্রণে কোন বক্তব্য দিতে রাজি না। কিন্তু আমি একজন মন্ত্রী এবং আপনার অধীনে কাজ করছি। তাই আমার পক্ষে এই অনুরোধ রক্ষা করা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। কিন্তু এই মিথ্যার ভার আর বহন করা আমার পক্ষে বহন করা সম্ভব নয় এবং আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি আপনার মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করবো। এই পদত্যাগপত্র আমি এখনই আপনার হাতে জমা দিচ্ছি এবং আমি আশা করছি আপনি বিন্দুমাত্র দেরি না করে তা গ্রহণ করবেন। অবশ্যই আপনার পূর্ণ অধিকার রয়েছে এই পদত্যাগপত্র নিয়ে কী করবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এবং মন্ত্রিসভাকে নিজের মতো পরিচালন করার যাতে সমস্ত ইসলামিক উদ্দেশ্য পূরণ হয়।

     

    ইতি 
    যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
    ৯ অক্টোবর ১৯৫০ 

     

    (সমাপ্ত)

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি -পর্ব ৬

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি -পর্ব ৫

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি -পর্ব ৪

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি -পর্ব ৩

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি – পর্ব ২

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি – পর্ব ১

     

    দেশের খবর, দশের খবর, সব খবর, সবার আগে পেতে ফলো করুন আমাদের FacebookTwitter এবং Google News পেজ

     

  • Jogendra Nath Mandal: ‘‘কেন পাকিস্তান হিন্দুদের বেঁচে থাকার অধিকার দিল না?’’

    Jogendra Nath Mandal: ‘‘কেন পাকিস্তান হিন্দুদের বেঁচে থাকার অধিকার দিল না?’’

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি -পর্ব ৬

    পঞ্চম পর্বের পর…

    ২৬। আমি জনাব নুরুল আমিনকে এই পদের জন্য ৩ জনের নাম সুপারিশ করেছিলাম। এদের মধ্যে একজন ছিলেন ঢাকা হাইকোর্টের এমএ, এলএলবি, অ্যাডভোকেট। তিনি প্রথম ফজলুল হক মন্ত্রিসভার সময়কালে ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলার মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি প্রায় ৬ বছর ধরে কলকাতার কয়লা খনি বোর্ডের সভাপতি ছিলেন। তিনি নমঃশূদ্রদের ফেডারেশনের সহ-সভাপতি ছিলেন। আমার দ্বিতীয় সুপারিশে ছিলেন একজন বিএ, এলএলবি। তিনিও ৭ বছর যাবৎ আইনসভার সদস্য ছিলেন। আমি জানতে চাই ঠিক কোন কারণে জনাব নুরুল আমিন এই দুজন ভদ্রলোককে বাদ দিয়ে এমন একজনকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিলেন সঙ্গত কারণেই যার নিয়োগের বিরোধিতা আমি করেছিলাম। কোনও প্রতিবাদের মুখোমুখি হবার ভয় ছাড়াই আমি বলতে পারি জনাব নুরুল আমিন বারারিকে দিল্লি চুক্তি অনুসারে মন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়াই এর চরম প্রমাণ যে পূর্ব বাংলার সরকার এখানকার হিন্দুদের জীবন-জীবিকা, সম্মান ও ধর্ম ঠিক রেখে জীবনধারণের উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য সম্পাদিত দিল্লি চুক্তিকে কখনওই গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে বিবেচনা করেনি।

    সরকারি মদতে হিন্দুদের নির্মূল করার চেষ্টা

    ২৭। আমি এই প্রসঙ্গে আমার পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে যে পূর্ব বাংলা সরকার এই প্রদেশ থেকে হিন্দুদের সম্পূর্ণরূপে উৎখাত করতে চায়। এই বিষয়ে আমি আপনাকে একাধিকবার সাক্ষাতে অনেক কথা বলেছি। আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি পশ্চিম পাকিস্তান হিন্দু নিধনে সম্পূর্ণরূপে সক্ষম হয়েছে এবং পূর্ব পাকিস্তানে এই প্রক্রিয়ায় সফলতার সঙ্গে অগ্রসর হচ্ছে। ডি এন বারারির নিয়োগ এবং আমার এই বিষয়ে অসম্মতির পরও পাকিস্তান সরকারের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করে তারা কী অর্থে নিজেদের ইসলামিক প্রজাতন্ত্র দাবি করে। পাকিস্তান না হিন্দুদের বেঁচে থাকার অধিকার দিয়েছে না পূর্ণ নিরাপত্তা দিয়েছে। এখন তারা হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের মারতে চায় যাতে পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক জীবন তাদের দ্বারা আর প্রভাবিত না হতে পারে।

    যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর বিষয়টিকে এড়িয়ে চলা

    ২৮। আমি বুঝতে পারি না নির্বাচকমণ্ডলীতে এই বিষয়ে কেন এখনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। সংখ্যালঘু সাব-কমিটি তৈরির পর ৩ বছর পার হয়ে গেছে। তিনবার মিটিংও হয়ে গিয়েছে। গত ডিসেম্বরে কমিটির সভায় যৌথ বা পৃথক নির্বাচকমণ্ডলীর ব্যাপারে কথা উঠলে পাকিস্তানের সকল স্বীকৃত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণ পশ্চাৎপদ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর জন্য সংরক্ষিত আসন রেখে যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর স্বপক্ষে মত দেন। আমরা নমঃশূদ্রদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা রেখে যৌথ নির্বাচকমণ্ডলীর দাবি জানাই। গত অগাস্টের আরেক সভাতেও এই ব্যাপারে কথা উঠে। কিন্তু এর উপর কোনওরূপ আলোচনা ছাড়াই সভা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে পাকিস্তানী শাসকদের কালহরণ নীতির পিছনে কোন উদ্দেশ্য কাজ করছে তা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হবার কথা নয়।

    হিন্দুদের দুঃসহ ভবিষ্যৎ

    ২৯। এখন বলি দিল্লি চুক্তির ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমি বলতে পারি এখন হিন্দুদের অবস্থা শুধু হতাশাজনক নয় বরং সম্পূর্ণ আশাহীন এবং ভবিষ্যৎ অন্ধাকার অমনিশায় আচ্ছন্ন। পূর্ব বাংলার হিন্দুদের ভিতর আস্থা ফিরিয়ে আনতে কিছুই করা হচ্ছে না। চুক্তিটি মুসলিম লিগ কাগজের ভিতরই সীমাবদ্ধ রেখেছে। বিপুল সংখ্যক হিন্দু শরণার্থী বিশেষ করে নমঃশূদ্র সম্প্রদায়ের পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এলেও এটা প্রমাণ করে না যে হিন্দুদের আস্থা ফিরে এসেছে। বরং এটা প্রমাণিত হয় পশ্চিমবাংলা বা ভারতের ভিতর তাদের পুনর্বাসনের কোনও সুযোগ নেই। উদ্বাস্তু জীবনের বেদনাই তাদের মাতৃভূমিতে ফিরতে বাধ্য করেছে।
    পাশাপাশি অনেকেই ফিরে আসছে তাদের অস্থাবর সম্পত্তি সঙ্গে নিয়ে যেতে এবং স্থাবর সম্পত্তির একটা গতি করতে। পূর্ব বাংলায় অতি সাম্প্রতিককালে কোনও বড় রকমের সাম্প্রদায়িক হিংসা ঘটেনি, কিন্তু এর কৃতিত্ব দিল্লি চুক্তিকে দিলে তা ভুল হবে। কোনও চুক্তি বা আপস ছাড়াই এটা একসময় বন্ধ হত, সহজভাবে বলতে গেলে এটা এভাবে চলতে থাকা ছিল অসম্ভব।

    ৩০। স্বীকার করতেই হবে দিল্লি চুক্তি সমস্যা সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। এই চুক্তির ভিতর ছিল কিছু শর্ত যাতে ভারত এবং পাকিস্তানের ভিতর বিবদমান সমস্যাগুলো সমাধান করা যায়। কিন্তু চুক্তির ছয় মাস পরেও কিছুই হয়নি। অন্যদিকে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে দেশে এবং বিদেশে অপপ্রচার চালিয়েই যাচ্ছে পুরোদমে। মুসলিম লিগ দ্বারা সারা পাকিস্তান জুড়ে কাশ্মীর দিবস পালন করা এর একটি উদাহরণ। পাকিস্তান শাসিত পাঞ্জাবের গভর্নরের সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেছেন পাকিস্তানের শক্তিশালী সেনাবাহিনী দরকার ভারতের মুসলিমদের রক্ষায়, পাকিস্তানের আসল চেহারা দেখিয়ে দিয়েছে। এই ধরনের বক্তব্য দুইদেশের ভিতর শুধু উত্তেজনাই বাড়াবে।

    (ক্রমশ…..)

     

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি -পর্ব ৫

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি -পর্ব ৪

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি -পর্ব ৩

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি – পর্ব ২

    জিন্নার হিন্দু মন্ত্রীর পাঁচালি – পর্ব ১

     

    দেশের খবর, দশের খবর, সব খবর, সবার আগে পেতে ফলো করুন আমাদের Facebook এবং Twitter পেজ।

     

  • Bengal Politics: ডিসেম্বরেই কি ফের ভাঙাগড়ার খেলা হবে বঙ্গ রাজনীতিতে?

    Bengal Politics: ডিসেম্বরেই কি ফের ভাঙাগড়ার খেলা হবে বঙ্গ রাজনীতিতে?

    কালাম সিহায়ি

    ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগে আসন্ন মরশুমের জন্য দল বদলের “ট্রেড উইন্ডো” বন্ধ হয়ে গেল। কলকাতা নাইট রাইডার্স লকি ফার্গুসন, শার্দুল ঠাকুর এবং রহমানুল্লাহ গুরবাজকে ট্রেড করে দলে নিয়েছে৷ অর্থাৎ অন্য দলের সঙ্গে খেলোয়াড় অদলা বদলি করে এদের নিয়েছে। বদলে আবার কোনও খেলোয়াড়কে ছেড়ে দিয়েছে।

    খেলোয়াড় আদান-প্রদানের এই নিয়ম ফুটবল থেকে আমদানি করা। ক্লাব ফুটবলের মরশুম শুরু হওয়ার আগে অথবা মরশুম চলাকালীনও কিছু সীমিত সময়ের জন্য এই “ট্রেড উইন্ডো” বা লেনদেনের সুযোগ পায় ক্লাবগুলি। এই ভাবে নতুন খেলোয়াড় দলে নিয়ে অথবা পুরনো কাউকে বাদ দিয়ে দলকে আরও শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা করে ক্লাবগুলি।

    সাতের দশকে কলকাতার ফুটবলের কত রোমহর্ষক নাটক ঘটত এই ফুটবলারদের দলবদলকে কেন্দ্র করে। কত রক্তারক্তি, বোতল ছোড়াছুড়ি, বোমার লড়াই হতো সমর্থকদের মধ্যে। দলবদলের ১৫টি দিন, ১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ ফুটবল উত্তেজনার পারদ আকাশছোঁয়া হয়ে যেত।

    এবার মূল বিষয়ে আসা যাক। খেলার মাঠে দলবদল তো আকছার হয়ে থাকে, কিন্তু রাজনীতির ময়দানে যখন “খেলা হবে” স্লোগান দেওয়া রেওয়াজে পরিণত হয়েছে তখন খেলার মাঠের এই দলবদলের রীতি রাজনৈতিক ব্যক্তিরা গ্রহণ করলে দোষ কি!

    বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে কমিউনিস্টদের মধ্যে দল ভাঙানোর প্রচলন কোনওদিনই তেমনভাবে লক্ষ্য করা যায়নি। বিশেষ করে যখন বাংলায় দুই দল কেন্দ্রিক রাজনীতির প্রচলন অর্থাৎ কংগ্রেস ও বামফ্রন্টের মধ্যে দড়ি টানাটানি, তখন এই প্রথা লক্ষ্য করা যায়নি তেমনভাবে।

    তৃণমূল কংগ্রেস জন্ম হওয়ার পরে এই ‘কনসেপ্ট’ প্রয়োগ হয় বাংলায়। প্রথমে সুব্রত মুখোপাধ্যায়ের মত বড় মাপের কংগ্রেস নেতা তৃণমূলের সঙ্গে আসন সমঝোতা করতে গিয়ে তৃণমূলে যোগ দেন। মুকুল রায়ের হাত ধরে নদিয়া জেলা সহ একের পর এক পুরসভার কংগ্রেস কাউন্সিলর ভাঙিয়ে নিয়ে বোর্ড দখল করে তৃণমূল। শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে প্রায় একই চিত্র দেখা যায় মালদা ও মুর্শিদাবাদ জেলায়। এক সময় রাজ্য রাজনীতিতে এই দল ভাঙানো বিষয়টি চমক থেকে একেবারে সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষত ২১ জুলাই তৃণমূলের শহিদ সমাবেশের মঞ্চে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেতে থাকে যে এবার কোন কোন বিরোধী দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মঞ্চে যোগদান করতে দেখা যাবে। ২০১১ ও ২০১৬ সালে কংগ্রেসের প্রতীকে জেতা বিধায়কদের সংখ্যা প্রায় অর্ধেকে এসে ঠেকে। কেউ কেউ আবার বিধানসভার ভেতরে কংগ্রেস আর বাইরে তৃণমূল। এমনকি প্রবীণ বাম নেতা ও প্রাক্তন মন্ত্রী আব্দুর রেজ্জাক মোল্লাও যোগ দেন তৃণমূলে! ছোট বড় বহু বাম নেতা যেমন উদয়ন গুহ, পরেশ অধিকারী, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় সহ আরও অনেকে তৃণমূলে নাম লেখান।

    তবে একটা উল্টো স্রোত বইতে শুরু করে ২০২০ সালে এসে, অর্থাৎ ২০২১-এর নির্বাচনের এক বছর আগে থেকে। এবারে শাসক তৃণমূল দলের বিধায়করা তৃণমূল ছেড়ে বিজেপির দিকে ভিড়তে শুরু করেন। প্রতিনিয়ত বিধায়ক, মন্ত্রী ও এমনকী শাসক দলের সাংসদও বিজেপির মঞ্চে উঠে পতাকা হাতে তুলে নেন।

    একুশের নির্বাচনের আগে যে যোগদান মেলা বিজেপি শুরু করেছিল তা একুশের নির্বাচনের ফলাফলের পরে ব্যুমেরাং হয়ে যায়। একাধিক বিধায়ক–সাংসদ, যাঁরা নির্বাচনের আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপি দলে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা নির্বাচনে পরাজয়ের পরে বিজেপির সংস্রব ছেড়ে আবার তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দেন। শুভেন্দু অধিকারীর মত ব্যতিক্রমী অবশ্যই আছেন, কিন্তু তা হাতে গোনা যায়। তাই হয়তো দলবদল নিয়ে এবার বিজেপি একটু বেশি সাবধানী। বেনোজল আটকাতে কার্যকরী ফিল্টার বসাতে মরিয়া বিজেপি, বিশেষ করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব।

    শুভেন্দু অধিকারীর স্পষ্ট বক্তব্য যে, “পিছন দরজা দিয়ে নয়, গণতান্ত্রিকভাবে সামনের দরজা দিয়েই ক্ষমতা দখল করবে বিজেপি। বাংলায় ডবল ইঞ্জিন সরকার স্থাপন হবে। তৃণমূলের ৮০ শতাংশ বিধায়কই অসৎ। এরা সকলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মিডলম্যানের ভূমিকা পালন করে যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে অযোগ্যদের চাকরি বিক্রি করেছে। তাই এদের নিয়ে সরকার গঠন নয়। দলে আর বেনোজল ঢোকানো হবে না।”

    বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদাদের বার্তা হল— ‘‘তৃণমূলের নেতাদের জন্য নয়, কর্মীদের জন্য আমাদের দরজা খোলা। এই মুহূর্তে তৃণমূলের কোনও নেতা বিজেপিতে আসতে চাইলে তাঁদের দলে নেওয়া হবে না। এমনই সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য বিজেপি। তৃণমূলের সব নেতাই দুর্নীতিগ্রস্ত। তাই নেতা নয়, কর্মীদের আমরা দলে নেওয়ার ক্ষেত্রে দরজা খোলা রাখছি। শুধু তৃণমূলই নয়, কোনও রাজনৈতিক দলের নেতাদের নেওয়ার ক্ষেত্রেই আমাদের আগ্রহ নেই। আমরা সব দলের কর্মীদের জন্য দরজা খোলা রাখছি৷’’

    তৃণমূলের কৌশল আবার একটু ভিন্ন। বিজেপিকে ভাঙাতে কোনও চেষ্টাই বাকি রাখেনি তারা। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রায়শই বলে থাকেন যে, ‘‘অনেকেই বিজেপি ছেড়ে আমাদের দলে আসতে চাইছেন। তৃণমূল দরজা খুললে বিজেপি দলটাই উঠে যাবে।’’

    মঙ্গলবার আবার ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক বলেন, ‘‘আমরা চাইলে ডিসেম্বরের মধ্যে ওদের ৩০টা বিধায়কও থাকবে না।’’ সেই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, ‘‘দল ভাঙানোর খেলা খেলি না।’’ প্রসঙ্গত, আগেও হলদিয়ার জনসভায় তিনি দাবি করেন যে দরজা খুললে বিজেপি দলটাই উঠে যাবে কিন্তু উনি দরজা বন্ধ করে রেখেছেন।

    কিন্তু বিষয়টি হল যে, ২১ জুলাইয়ের মঞ্চে অনেকেই যোগদান করবেন বলে শোনা গিয়েছিল। প্রচুর বিজেপি বিধায়ক ও সাংসদের নাম নিয়ে জল্পনা সৃষ্টি হলেও আদতে কেউই মঞ্চে আসেননি। আর ২২ জুলাই থেকে যেভাবে একে একে তৃণমূলের মহাসচিব, মন্ত্রী, বিধায়ক, জেলা সভাপতি জেলবন্দি হয়েছেন আর এজেন্সির জেরায় বিড়ম্বনায় পড়েছেন, তাই আর কেউ ওই পথ মাড়াবেন এটা খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। যদি কেউ এখনও সেই সম্ভাবনার লাভ ক্ষতি বিশ্লেষণ করে থাকেন তাহলে ওনার রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচয় নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হবে।

    দলবদলের রীতি যে একেবারে বন্ধ রয়েছে তা নয়। আসন্ন গ্রাম পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে দলবদলের কিছু টুকরো খবর প্রকাশিত হচ্ছে প্রায়শই, তবে তা একেবারে স্থানীয় স্তরে।

    ▪️মালদহের চাঁচলের অলিহণ্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতের রাজনগর বুথের পঞ্চায়েত সদস্য ফুলমণি দাস তৃণমূল দল ছেড়ে শতাধিক তৃণমূলের মহিলা কর্মীদের নিয়ে কংগ্রেসে যোগ দেন।

    ▪️আবার অলিহন্ডা গ্রাম পঞ্চায়েতেরই শাসকদলের পঞ্চায়েত সদস্য নজরুল ইসলাম ওরফে মুকুল তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে যোগদান করেছেন। তাঁর সঙ্গে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন প্রায় ৫০ তৃণমূল কর্মী।

    এক মাসের ব্যবধানে শাসকদলের দু’জন পঞ্চায়েত সদস্যের দলত্যাগ করা পঞ্চায়েত ভোটের আগে যথেষ্ট ‘তাৎপর্যপূর্ণ’।

    ▪️আলিপুরদুয়ারের ফালাকাটায় ধাক্কা খেল তৃণমূল। শালকুমার গ্রাম পঞ্চায়েতে শাসকদলের দুই পঞ্চায়েত সদস্য— গণেশ দাস ও যমুনা সুব্বা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগদান করায় সংখ্যা গরিষ্ঠতা হারাতে চলেছে শাসকদল।

    ▪️‘অনুব্রতহীন’ বীরভূমের মুরারই দু’নম্বর ব্লকের পাইকরে তৃণমূল পঞ্চায়েত সদস্য বাবুল আখতারের নেতৃত্বে কংগ্রেসে যোগ দিলেন এলাকার অন্তত দেড়শো কর্মী-সমর্থক।

    ▪️মুর্শিদাবাদের লালগোলা ব্লকের দেওয়ানসরাই পঞ্চায়েতের দখল নিল বাম কংগ্রেসের জোট। তৃণমূলের সদস্যরাই অনাস্থা নিয়ে আসে প্রধান আব্দুল কাদেরের বিরুদ্ধে।

    ▪️নির্দল থেকে তৃণমূল কংগ্রেসে আসা ঝালদা পুরসভার কাউন্সিলর শীলা চট্টোপাধ্যায় পদত্যাগ করলেন৷ যার ফলে পুরুলিয়ার ঝালদা পুরসভায় অনাস্থা চেয়েছে কংগ্রেস। আস্থা ভোটেকে বোর্ডের দখল নিতে পারে সেটাই দেখার।

    এদিকে আবার ডিসেম্বর মাসের দিকে তাকিয়ে রাজ্যবাসী। না শীতকালের আমেজ, বড়দিনের কেক অথবা চড়ুইভাতির আয়োজনের কথা ভেবে নয়। কনকনে ঠান্ডায় রাজ্যবাসী রাজনীতির উত্তাপ নেওয়ার অপেক্ষায়। আলিপুর আবহাওয়া দফতর পারদ নামার ইঙ্গিত দিলেও রাজনৈতিক সচেতন বাঙালি বুঝে গেছেন যে রাজনৈতিক পারদ ক্রমশ বাড়ছে। বিগত কয়েক মাস ধরে দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার থেকে শুভেন্দু অধিকারী সহ মাঝারি এমনকী ছোট স্তরের সব বিজপি নেতার মুখেই শোনা গিয়েছে, ‘‘তৃণমূল সরকার ডিসেম্বরে পড়ে যাবে অথবা কার্যত থাকবে না।’’ সরকার চালাতে ব্যর্থ হবেন মুখ্যমন্ত্রী, এমনকি ২০২৩ জানুয়ারি মাসের বেতন দিতে পারবে না সরকার। আর্থিক ভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়বে রাজ্য সরকার।

    এমনকী মুখ্যমন্ত্রীও নাকি ক্যাবিনেট বৈঠকে মন্ত্রীদের সচেতন করেছেন ডিসেম্বরে বাড়তি সতর্ক থাকতে। এবার প্রশাসনিক বৈঠকে পুলিশ প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের সাবধান করেছেন “ডিসেম্বর ধামাকার” সম্বন্ধে। এবার ডিসেম্বর নিয়ে বিজেপিকে পাল্টা হুঁশিয়ারি দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

    তাই ডিসেম্বর মাস নিয়ে অপার কৌতূহল তৈরি হলেও  রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের ধারণা যেমন আইপিএলের “ট্রেড উইন্ডো” আগামী মরশুমের জন্য বন্ধ হয়ে গেল, ফ্র্যাঞ্চাইজি দলগুলি যেমন আর সরাসরি নিজেদের মধ্যে ক্রিকেটার অদল বদল করতে পারবে না, ঠিক তেমনি আপাতত বঙ্গ রাজনীতিতে কোনও দলই অন্য দলের রাজ্যস্তরের কোনও বড় খেলোয়াড়কে “সই” করাবে না। আপাতত “ট্রেড উইন্ডো” বন্ধ।

  • Birsa Munda: আদিবাসীদের অধিকারের জন্য লড়েছিলেন বিরসা

    Birsa Munda: আদিবাসীদের অধিকারের জন্য লড়েছিলেন বিরসা

    তরুণকুমার পণ্ডিত

    ১৫ নভেম্বর ‘জনজাতি গৌরব দিবস’। গত বছর থেকে এই দিনটি অর্থাৎ বিরসা মুন্ডার (Birsa Munda) জন্মদিনটিকে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার ‘জনজাতি গৌরব দিবস’ হিসেবে পালন করছে। ১৮৭৫ সালের ১৫ নভেম্বর ঝাড়খণ্ডে ‘আদিবাসী ভগবান’ বিরসা মুন্ডা জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং সমাজ সংস্কারক রূপে মাত্র ২৫ বছর বয়সে শহিদের মৃত্যুবরণ করে অমর হয়ে গেছেন। মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য অত্যাচারী ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে জনজাতি সমাজকে সঙ্গে নিয়ে তিনি লড়াই করে মুন্ডা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিরসা মুন্ডার বীরত্বপূর্ণ কার্যকলাপ এবং মহৎ কাজ, তাঁকে অসংখ্য অনুগামীর কাছে মহান তথা ধরতি আবা অর্থাৎ ভগবান হিসাবে চিহ্নিত করেছিল।

    ১৮৯৪ সালে ব্রিটিশ সরকার অরণ্য আইন প্রবর্তন করে ভারতের বিস্তীর্ণ জঙ্গলমহলে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দিলে, আদিবাসীদের হাজার হাজার বছর ধরে জঙ্গলের ওপর যে অধিকার ছিল, তা কেড়ে নেওয়া হয়। সে সময় ব্রিটিশরা ছোটনাগপুর ও পূর্ব ভারতের বেশ কিছু অঞ্চলে জনজাতিদের কৃষিব্যবস্থা এবং প্রাকৃতিক সম্পদকে ধ্বংস করে একটি সামন্ততান্ত্রিক জমিদারি প্রথা চালু করেছিলেন। এছাড়াও বনবাসীদের শোষণ, তাঁদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক লোকাচারকে অপমান এবং তার ওপর হস্তক্ষেপ করে মিশনারি ক্রিয়াকলাপ নিরবিচ্ছিন্নভাবে ব্রিটিশ রাজের সক্রিয় সমর্থনে কাজ করতে থাকে। সে সময়ই কিশোর বিরসা (Birsa Munda) জনজাতিদের নিজস্ব অধিকার পুনরুদ্ধারের দাবিতে এই অঞ্চলে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১৫ বছর বসয়ে তিনি বড়গাঁওয়ে বৈষ্ণব ধর্মগুরু আনন্দ পাঁড়ের কাছে দীক্ষা গ্রহণ করে হিন্দু ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হন। রামায়ণ, মহাভারত ও অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করে পবিত্র পৈতা ধারণ করেন এবং তুলসী গাছে পূজার্চনা করে নিরামিষাশী হন। 

    ছোটনাগপুরের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ব্রিটিশরা দখল করার উদ্যোগ নিতেই বিরসা মুন্ডার (Birsa Munda) নেতৃত্বে গেরিলা বাহিনী তির-ধনুক ও অন্যান্য অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ১৮৯৫ সালে ব্রিটিশ পুলিশ বিরসাকে বন্দি করে দু’বছরের কারাদণ্ড দেয়। ছাড়া পাওয়া মাত্রই ফের তিনি ব্রিটিশ বিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। ১৮৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর রাঁচি ও গুপ্তি শহরে বিরসা বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণে বেশ কিছু পুলিশ-সহ নিহত হন অনেক মানুষ। আক্রমণের জবাবে ব্রিটিশ সরকার ১৫০ জনের সেনাবাহিনী নিয়ে পাল্টা আক্রমণ করে ডোম্বারি পাহাড়ে। নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করে ৪০০ জন আদিবাসীকে। কিন্তু, বিরসা মুন্ডাকে ধরতে না পেরে তার মাথার দাম ৫০০ টাকা ঘোষণা করে। ১৯০০ সালে চক্রধরপুরে বনের মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থায় নিরস্ত্র বিরসাকে বন্দি করা হয়। অবশ্য এর পিছনে ছিল নিজেদের অন্তর্ঘাত। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলানোর আদেশ দেয়। কিন্তু, বন্দি অবস্থায় জেলে বিষ প্রয়োগ করায়, কারও কারও মতে, কলেরা হয়ে বিরসা মুন্ডা মাত্র ২৫ বছর বয়সে শহিদের মৃত্যুবরণ করেন। 

    কর্নাটকে মহীশূর ও কোদাও জেলার আদিবাসীরা আজও ধুমধাম করে বিরসার বিরসার (Birsa Munda) জন্মবার্ষিকী উদযাপন করে থাকেন। এছাড়া বিরসা মুন্ডা বিমানবন্দর, বিরসা ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি, বিরসা মুন্ডা সেন্টার ফর ট্রাইবাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগ চালু হয়েছে আদিবাসী জীবন নিয়ে গবেষণার জন্য। ২০০৪ সালে বিরসার জীবন নিয়ে ‘উলগুলান এক ক্রান্তি’ নামে একটি হিন্দি সিনেমা প্রদর্শিত হয়। আবার এই মহান জনজাতিকে নিয়ে মহাশ্বেতা দেবী একটি উপন্যাস লিখেছেন, যার নাম ‘অরণ্যের অধিকার’। এই উপন্যাসের জন্য তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ভারতীয় পার্লামেন্ট মিউজিয়ামে একমাত্র আদিবাসী নেতা হিসাবে বিরসার ছবি সযত্নে রাখা আছে। ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা স্মরণ রেকেই ২০০০ সালে বিরসার জন্মদিনে অর্থাৎ ১৫ নভেম্বর ঝাড়খণ্ড রাজ্য গঠন করা হয়। ভারতের জনজাতি সমাজের অগ্রদূত স্বাধীনতা সংগ্রামী বিরসা মুন্ডার জন্মবার্ষিকীতে তাঁকে সশ্রদ্ধ অভিবাদন জানাই। 

  • Mohan Bhagwat: মোহন ভাগবতের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের আলোচনা কতটা তাৎপর্যের?

    Mohan Bhagwat: মোহন ভাগবতের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের আলোচনা কতটা তাৎপর্যের?

    শাহাবুদ্দিন ইয়াকুব কুরেশি: যেই না মুসলিম সম্প্রদায়ের পাঁচজন সদস্য আরএসএস (RSS) প্রধান মোহন ভাগবতের (Mohan Bhagwat) সঙ্গে ২২ অগাস্ট সাক্ষাৎ করেছেন, তার পর থেকে নানা ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। যে পাঁচজন ভাগবতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন তাঁরা হলেন দিল্লির প্রাক্তন লেফটেনেন্ট গভর্নর নাজীব জং, সাংবাদিক শাহিদ সিদ্দিকি, হোটেলিয়ার সঈদ শেরভানি, লেফটেনেন্ট জেনারেল জামিরউদ্দিন শাহ এবং এই লেখক। 

    আমাদের এই পাঁচজনের এহেন উদ্যোগের ব্যাখ্যা আমি দেব। আমরা এই পাঁচজন— আমাদের মধ্যে একটা উদ্বেগ রয়েছে। আর সেই উদ্বেগের কারণ মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা। একইসঙ্গে এই বিশ্বাস যে আলোচনার মাধ্যমেই একমাত্র সমস্যার সমাধান সম্ভব। যেই না ভাগবতের সঙ্গে বৈঠকের খবরটি ছড়িয়ে পড়েছে, আমরা অসংখ্য মেসেজ পেয়েছি। এঁদের মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন অ-মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও। 

    আমরা অনেক সমালোচনা মূলক মন্তব্যও পেয়েছি। যেমন, প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার কে আমাদের দিয়েছে। কেউ কেউ আবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্য একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছি ভেবে। এতে আমাদের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত হতে পারে। কেউ কেউ আবার ফাঁদে পড়ে যাচ্ছি ভেবে সতর্ক করে দিয়েছেন। তবে, কথপোকথনই যে একমাত্র পথ, তা নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেননি। এঁদের প্রত্যেকের কণ্ঠেই শোনা গিয়েছে একই সুর। তা হল, কথপোকথনই একমাত্র এগিয়ে চলার পথ।

    আমাদের একাধিকবার প্রশ্ন করা হয়েছে, যে এই কথোপকথন চালিয়ে কী হাসিল করলাম। এই বৈঠক করতে কে উৎসাহ জুগিয়েছিল? ইদানিং যেসব চলছে, তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নানা ঘটনার জেরে বিশেষত উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদীদের হাতে নিরীহদের গণধোলাইয়ের শিকার হওয়া, এবং সমাজের প্রতিক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়ের মানুষজনে প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হওয়া। 

    বৈঠকটি কেমন সম্পন্ন হয়েছিল? প্রথমত, আরএসএস প্রধানের সারল্য ও বিনয়ীভাব দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম। তারপর তাঁর সময়ানুবর্তিতা। তিনি ঘড়ি ধরে ১০টার সময় বৈঠকে এসেছিলেন। তাঁর ধৈর্যও ছিল। গভীর মনযোগ দিয়ে ঘণ্টাখানেক ধরে তিনি আমাদের সমস্ত কথা শুনেছেন। এই সময় তিনি আমাদের একবারের জন্যও থামাননি। ভাগবতের সঙ্গে ছিলেন তাঁর সহযোগী কৃষ্ণণ গোপাল। অবশ্যই আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে ভাগবত একটি কর্তৃত্বের জায়গা থেকে কথা বলছিলেন। 

    ভাগবতের আচার আচরণ খারাপ লাগেনি। তাঁর আচরণে এমন কিছু ছিল না, যা অস্বস্তিকর বলে মনে হয়। তাঁর মন্তব্যে তিনি তিনটি জিনিসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। হিন্দুত্ব একটি পূর্ণতার ধারণা, যাতে সব সম্প্রদায়ের জন্য সমান জায়গা রয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, দেশ এগোতে পারে কেবলমাত্র তখন, যখন বিভিন্ন সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হয়। একটি তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারতীয় সংবিধান পবিত্র এবং গোটা দেশকে তা মেনে চলতে হবে। আরএসএস সংবিধান পরিত্যাগ করতে চাইছে এবং মুসলমানদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে, এই ভয় দূর করতে চেয়েছিলেন তিনি। 

    তারপর ভাগবত বলেছিলেন, হিন্দুরা দুটি বিষয়ে খুবই সংবেদনশীল। প্রথমটি হল, গরু। আমরা বলেছিলাম মুসলিমরা এটা ভাল মতোই বোঝেন। ভারতের অধিকাংশ জায়গায় গোহত্যা বন্ধ হয়েছে। আইনভঙ্গকারীদের ইতিমধ্যেই আইন মেনে শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। যে সব রাজ্যে গোহত্যা নিষিদ্ধ হয়নি, সেখানে মুসলমানদের স্বেচ্ছায় গোমাংস পরিত্যাগ করা উচিত। এটা যদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তবে এটা করা উচিত। 

    আর একটি সংবেদনশীল বিষয়ের উল্লেখ করেন তিনি। সেটা হল হিন্দুদের (Hindu) ‘কাফের’ বলা হয়। আমরা বলেছিলাম আরবি শব্দ কাফের-এর আক্ষরিক অর্থ হল অ-বিশ্বাসী। যদি এটা অপমানজনক হয়, তবে মুসলমানদের এটা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া উচিত। খুব সহজ। খুব সম্ভব। কোরানে বলা হয়েছে, আল্লাহ হলেন রাব্বুল আলামিন, রাব্বুল মুসলিমীন নন। বিশ্বজগতের ঈশ্বর, কেবল মুসলমানদের নন। কোরান বলে, তোমার কাছে তোমার ধর্ম, আমার কাছে আমার।

    আমরা তাঁকে বলেছিলাম, একই ভাবে প্রতিটি মুসলমানের কাছে জেহাদি এবং পাকিস্তানি শব্দদুটিও অপমানজনক। এগুলি এখনই বন্ধ হওয়া উচিত বলে তিনি সম্মত হয়েছিলেন। আমরা তাঁকে আরও আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন বলে জানিয়েছিলাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর কোনও সহযোগীর নাম বলুন যাঁর সঙ্গে আমরা আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি। তিনি চারজনের নাম বলেছিলেন। প্রয়োজনে তাঁকেও জানাতে বলেছিলেন। আমি আমার সহকর্মীদের সম্মতিতে ভাগবতকে আমার বই ‘দ্য পপুলেশন মিথ: ইসলাম, ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যান্ড পলিটিক্স অফ ইন্ডিয়া’ উপহার দিই। 

    বৈঠকে আমি চারটি বিষয়ের উল্লেখ করেছি। এক, মুসলিমদের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সব চেয়ে বেশি বলে যা বলা হচ্ছে, তা অতিরঞ্জিত। তিরিশ বছর আগে হিন্দু এবং মুসলমানের জন্মহারের অনুপাত ছিল ১:১। এখন তা নেমে হয়েছে ০.৩, যেহেতু মুসলমানরা এখন হিন্দুদের চেয়েও দ্রুত ফ্যামিলি প্ল্যানিং করছে। দুই, সাধারণ ধারণার বিপরীতে গিয়ে বলি, মুসলিমদের মধ্যে বহু বিবাহের ঘটনা খুবই কম অন্তত ভারত সরকারের রিপোর্ট এবং সেনসাস অনুযায়ী। তিন, বহুল প্রচলিত বহুবিবাহ ভারতে সম্ভবও নয়। নারী-পুরুষের অনুপাতের কারণেই তা সম্ভব নয়। প্রতি হাজার পুরুষে মহিলার সংখ্যা ৯৪০ জন। যার অর্থ ৬০ জন পুরুষ বউই পাবেন না। এটা শুনে ভাগবত প্রাণখোলা হাসি হেসেছেন। চার, অঙ্কের মডেলেই দেখা যাচ্ছে গত হাজার বছরে মুসলিমরা হিন্দুদের ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। আমার অনুরোধে এই মডেল তৈরি করেছিলেন অঙ্কের অধ্যাপক দীনেশ সিং এবং অজয় কুমার। 

    এই বৈঠক নিয়ে মিডিয়া অক্সিজেন পেয়েছে। তাই খবর করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। প্রতিক্রিয়া? দারুণভাবে পজিটিভ। সংরক্ষণ? আরএসএস বদলাবে না। হতে পারে, নাও হতে পারে। সমালোচনা: আমরা তাদের বৈধতা দিচ্ছি। যদিও, বৈধতাদানের প্রয়োজন ওদের নেই। তারা ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে বৃহত্তম ও সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন হয়ে উঠেছে। আর আমরা? এক ঝাঁক অবসরপ্রাপ্ত লোক যাঁরা কর্মজীবনে সফল ছিলাম এবং এখন সমাজ এবং দেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। 

    আমরা কি গোটা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছি? আমাদের কেউই নির্বাচিত কিংবা মনোনীত নন। কিন্তু আমরাও এই সম্প্রাদায়ের অংশ। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পর্যবেক্ষণের জায়গা রয়েছে। এটা আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ। আমরা কি এলিটিস্ট? সম্ভবত। কিন্তু আমাদের অভিযোগকারী যাঁরা, তাঁরা রাজপ্রাসাদে বসবাস করেন, যাঁদের বাড়িঘর আমাদের বাড়িঘরের চেয়ে ১০-১৫ গুণ বড়। 
    আমরা অশিক্ষিত নই। আমরা বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন: গণধোলাই, গণহত্যা, ধর্ষণ, অর্থনৈতিক বয়কট, ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন, বাড়িঘর এবং চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য। আমাদের দ্বন্দ্ব: আমরা মিডিয়ার কাছে কতটা এক্সপোজ করব? আমরা প্রথমে তাদের কাছে যেতে চাইনি। কিন্তু যখন তারা অ্যাপ্রোচ করেছিল, তখন আর আমরা তাদের কাছ থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখিনি। 

    সর্বোপরি, আমরা এক মাস ধরে মিডিয়ার কাছে বিষয়টি লুকিয়ে রেখেছিলাম। যখন আমরা ডজন ডজন বন্ধুদের কাছে মুক্তভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলাম। এটা সেই নিন্দুকদের জবাব দেবে, যারা বলেছিল আমরা প্রচার পাওয়ার জন্য এটা করেছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এই কথোপকথন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আমাদের হারানোর কিছু নেই। কিন্তু লাভ করার জন্য সব কিছু আছে। আমরা আমাদের ফিলিংসের কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও বলেছি। আমরা আশা করি, তিনি আমাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলবেন।

    লেখক দেশের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। প্রবন্ধটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।

  • Mohan Bhagwat: মোহন ভাগবতের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের আলোচনা কতটা তাৎপর্যের?

    Mohan Bhagwat: মোহন ভাগবতের সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের আলোচনা কতটা তাৎপর্যের?

    শাহাবুদ্দিন ইয়াকুব কুরেশি: যেই না মুসলিম সম্প্রদায়ের পাঁচজন সদস্য আরএসএস (RSS) প্রধান মোহন ভাগবতের (Mohan Bhagwat) সঙ্গে ২২ অগাস্ট সাক্ষাৎ করেছেন, তার পর থেকে নানা ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। যে পাঁচজন ভাগবতের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন তাঁরা হলেন দিল্লির প্রাক্তন লেফটেনেন্ট গভর্নর নাজীব জং, সাংবাদিক শাহিদ সিদ্দিকি, হোটেলিয়ার সঈদ শেরভানি, লেফটেনেন্ট জেনারেল জামিরউদ্দিন শাহ এবং এই লেখক। 

    আমাদের এই পাঁচজনের এহেন উদ্যোগের ব্যাখ্যা আমি দেব। আমরা এই পাঁচজন— আমাদের মধ্যে একটা উদ্বেগ রয়েছে। আর সেই উদ্বেগের কারণ মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতা। একইসঙ্গে এই বিশ্বাস যে আলোচনার মাধ্যমেই একমাত্র সমস্যার সমাধান সম্ভব। যেই না ভাগবতের সঙ্গে বৈঠকের খবরটি ছড়িয়ে পড়েছে, আমরা অসংখ্য মেসেজ পেয়েছি। এঁদের মধ্যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ যেমন রয়েছেন, তেমনি রয়েছেন অ-মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষও। 

    আমরা অনেক সমালোচনা মূলক মন্তব্যও পেয়েছি। যেমন, প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করার অধিকার কে আমাদের দিয়েছে। কেউ কেউ আবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্য একটি সাম্প্রদায়িক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছি ভেবে। এতে আমাদের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত হতে পারে। কেউ কেউ আবার ফাঁদে পড়ে যাচ্ছি ভেবে সতর্ক করে দিয়েছেন। তবে, কথপোকথনই যে একমাত্র পথ, তা নিয়ে কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেননি। এঁদের প্রত্যেকের কণ্ঠেই শোনা গিয়েছে একই সুর। তা হল, কথপোকথনই একমাত্র এগিয়ে চলার পথ।

    আমাদের একাধিকবার প্রশ্ন করা হয়েছে, যে এই কথোপকথন চালিয়ে কী হাসিল করলাম। এই বৈঠক করতে কে উৎসাহ জুগিয়েছিল? ইদানিং যেসব চলছে, তা নিয়ে আমাদের উদ্বেগ, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজন যে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন নানা ঘটনার জেরে বিশেষত উন্মত্ত হিন্দুত্ববাদীদের হাতে নিরীহদের গণধোলাইয়ের শিকার হওয়া, এবং সমাজের প্রতিক্ষেত্রে এই সম্প্রদায়ের মানুষজনে প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হওয়া। 

    বৈঠকটি কেমন সম্পন্ন হয়েছিল? প্রথমত, আরএসএস প্রধানের সারল্য ও বিনয়ীভাব দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম। তারপর তাঁর সময়ানুবর্তিতা। তিনি ঘড়ি ধরে ১০টার সময় বৈঠকে এসেছিলেন। তাঁর ধৈর্যও ছিল। গভীর মনযোগ দিয়ে ঘণ্টাখানেক ধরে তিনি আমাদের সমস্ত কথা শুনেছেন। এই সময় তিনি আমাদের একবারের জন্যও থামাননি। ভাগবতের সঙ্গে ছিলেন তাঁর সহযোগী কৃষ্ণণ গোপাল। অবশ্যই আমরা উপলব্ধি করতে পারি যে ভাগবত একটি কর্তৃত্বের জায়গা থেকে কথা বলছিলেন। 

    ভাগবতের আচার আচরণ খারাপ লাগেনি। তাঁর আচরণে এমন কিছু ছিল না, যা অস্বস্তিকর বলে মনে হয়। তাঁর মন্তব্যে তিনি তিনটি জিনিসের ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। হিন্দুত্ব একটি পূর্ণতার ধারণা, যাতে সব সম্প্রদায়ের জন্য সমান জায়গা রয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, দেশ এগোতে পারে কেবলমাত্র তখন, যখন বিভিন্ন সম্প্রদায় ঐক্যবদ্ধ হয়। একটি তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভারতীয় সংবিধান পবিত্র এবং গোটা দেশকে তা মেনে চলতে হবে। আরএসএস সংবিধান পরিত্যাগ করতে চাইছে এবং মুসলমানদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চাইছে, এই ভয় দূর করতে চেয়েছিলেন তিনি। 

    তারপর ভাগবত বলেছিলেন, হিন্দুরা দুটি বিষয়ে খুবই সংবেদনশীল। প্রথমটি হল, গরু। আমরা বলেছিলাম মুসলিমরা এটা ভাল মতোই বোঝেন। ভারতের অধিকাংশ জায়গায় গোহত্যা বন্ধ হয়েছে। আইনভঙ্গকারীদের ইতিমধ্যেই আইন মেনে শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। যে সব রাজ্যে গোহত্যা নিষিদ্ধ হয়নি, সেখানে মুসলমানদের স্বেচ্ছায় গোমাংস পরিত্যাগ করা উচিত। এটা যদি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, তবে এটা করা উচিত। 

    আর একটি সংবেদনশীল বিষয়ের উল্লেখ করেন তিনি। সেটা হল হিন্দুদের (Hindu) ‘কাফের’ বলা হয়। আমরা বলেছিলাম আরবি শব্দ কাফের-এর আক্ষরিক অর্থ হল অ-বিশ্বাসী। যদি এটা অপমানজনক হয়, তবে মুসলমানদের এটা পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া উচিত। খুব সহজ। খুব সম্ভব। কোরানে বলা হয়েছে, আল্লাহ হলেন রাব্বুল আলামিন, রাব্বুল মুসলিমীন নন। বিশ্বজগতের ঈশ্বর, কেবল মুসলমানদের নন। কোরান বলে, তোমার কাছে তোমার ধর্ম, আমার কাছে আমার।

    আমরা তাঁকে বলেছিলাম, একই ভাবে প্রতিটি মুসলমানের কাছে জেহাদি এবং পাকিস্তানি শব্দদুটিও অপমানজনক। এগুলি এখনই বন্ধ হওয়া উচিত বলে তিনি সম্মত হয়েছিলেন। আমরা তাঁকে আরও আলাপ-আলোচনার প্রয়োজন বলে জানিয়েছিলাম। তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তাঁর কোনও সহযোগীর নাম বলুন যাঁর সঙ্গে আমরা আলাপ-আলোচনা চালিয়ে যেতে পারি। তিনি চারজনের নাম বলেছিলেন। প্রয়োজনে তাঁকেও জানাতে বলেছিলেন। আমি আমার সহকর্মীদের সম্মতিতে ভাগবতকে আমার বই ‘দ্য পপুলেশন মিথ: ইসলাম, ফ্যামিলি প্ল্যানিং অ্যান্ড পলিটিক্স অফ ইন্ডিয়া’ উপহার দিই। 

    বৈঠকে আমি চারটি বিষয়ের উল্লেখ করেছি। এক, মুসলিমদের মধ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার সব চেয়ে বেশি বলে যা বলা হচ্ছে, তা অতিরঞ্জিত। তিরিশ বছর আগে হিন্দু এবং মুসলমানের জন্মহারের অনুপাত ছিল ১:১। এখন তা নেমে হয়েছে ০.৩, যেহেতু মুসলমানরা এখন হিন্দুদের চেয়েও দ্রুত ফ্যামিলি প্ল্যানিং করছে। দুই, সাধারণ ধারণার বিপরীতে গিয়ে বলি, মুসলিমদের মধ্যে বহু বিবাহের ঘটনা খুবই কম অন্তত ভারত সরকারের রিপোর্ট এবং সেনসাস অনুযায়ী। তিন, বহুল প্রচলিত বহুবিবাহ ভারতে সম্ভবও নয়। নারী-পুরুষের অনুপাতের কারণেই তা সম্ভব নয়। প্রতি হাজার পুরুষে মহিলার সংখ্যা ৯৪০ জন। যার অর্থ ৬০ জন পুরুষ বউই পাবেন না। এটা শুনে ভাগবত প্রাণখোলা হাসি হেসেছেন। চার, অঙ্কের মডেলেই দেখা যাচ্ছে গত হাজার বছরে মুসলিমরা হিন্দুদের ছাড়িয়ে যেতে পারেননি। আমার অনুরোধে এই মডেল তৈরি করেছিলেন অঙ্কের অধ্যাপক দীনেশ সিং এবং অজয় কুমার। 

    এই বৈঠক নিয়ে মিডিয়া অক্সিজেন পেয়েছে। তাই খবর করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। প্রতিক্রিয়া? দারুণভাবে পজিটিভ। সংরক্ষণ? আরএসএস বদলাবে না। হতে পারে, নাও হতে পারে। সমালোচনা: আমরা তাদের বৈধতা দিচ্ছি। যদিও, বৈধতাদানের প্রয়োজন ওদের নেই। তারা ইতিমধ্যেই পৃথিবীতে বৃহত্তম ও সবচেয়ে শক্তিশালী সংগঠন হয়ে উঠেছে। আর আমরা? এক ঝাঁক অবসরপ্রাপ্ত লোক যাঁরা কর্মজীবনে সফল ছিলাম এবং এখন সমাজ এবং দেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন। 

    আমরা কি গোটা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করছি? আমাদের কেউই নির্বাচিত কিংবা মনোনীত নন। কিন্তু আমরাও এই সম্প্রাদায়ের অংশ। আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং পর্যবেক্ষণের জায়গা রয়েছে। এটা আমাদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ। আমরা কি এলিটিস্ট? সম্ভবত। কিন্তু আমাদের অভিযোগকারী যাঁরা, তাঁরা রাজপ্রাসাদে বসবাস করেন, যাঁদের বাড়িঘর আমাদের বাড়িঘরের চেয়ে ১০-১৫ গুণ বড়। 
    আমরা অশিক্ষিত নই। আমরা বাস্তব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন: গণধোলাই, গণহত্যা, ধর্ষণ, অর্থনৈতিক বয়কট, ভোটাধিকার নিয়ে প্রশ্ন, বাড়িঘর এবং চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য। আমাদের দ্বন্দ্ব: আমরা মিডিয়ার কাছে কতটা এক্সপোজ করব? আমরা প্রথমে তাদের কাছে যেতে চাইনি। কিন্তু যখন তারা অ্যাপ্রোচ করেছিল, তখন আর আমরা তাদের কাছ থেকে নিজেদের লুকিয়ে রাখিনি। 

    সর্বোপরি, আমরা এক মাস ধরে মিডিয়ার কাছে বিষয়টি লুকিয়ে রেখেছিলাম। যখন আমরা ডজন ডজন বন্ধুদের কাছে মুক্তভাবে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলাম। এটা সেই নিন্দুকদের জবাব দেবে, যারা বলেছিল আমরা প্রচার পাওয়ার জন্য এটা করেছি। আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, এই কথোপকথন এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। আমাদের হারানোর কিছু নেই। কিন্তু লাভ করার জন্য সব কিছু আছে। আমরা আমাদের ফিলিংসের কথা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকেও বলেছি। আমরা আশা করি, তিনি আমাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলবেন।

    লেখক দেশের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। প্রবন্ধটি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস থেকে অনুবাদ করা হয়েছে।

LinkedIn
Share