মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমায় পালিত হয় রাখি বন্ধন। হিন্দু ধর্মে ভাই-বোনের পবিত্র সম্পর্ক ও ভালবাসার প্রতীক হল রাখি বন্ধন উৎসব। যদিও শুধুমাত্র ভাই-বোন নয়, ভারতবর্ষে প্রতিটি মানুষের মধ্যে সমস্ত রকম ভেদাভেদ ভুলে একে অপরের হাতে রাখি পরিয়ে সূচনা হয় এক শক্তপোক্ত সম্পর্কের বুনিয়াদ। প্রতিবছর রাখি বন্ধনের সময় বহু মানুষ একে অপরের অপরের হাতে রাখি পরিয়ে দিয়ে ভ্রাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হন। অপরদিকে বোনেরা অপেক্ষা করেন তাদের ভাই কিংবা দাদাদের হাতে রাখি পরিয়ে দেবেন।
রাখি নিয়ে প্রচলিত পৌরাণিক কাহিনী
মহাভারত অনুসারে, শ্রীকৃষ্ণের নিজের বোন ছিলেন সুভদ্রা। কিন্তু তিনি দ্রৌপদীকেও নিজের বোনের মতো স্নেহ করতেন। একবার শ্রীকৃষ্ণের হাত কেটে যায় এবং সেখান থেকে রক্তপাত শুরু হয়। তখন সেখানে সুভদ্রা এবং দ্রৌপদী দুজনেই উপস্থিত ছিলেন। সুভদ্রা তখন সেই রক্ত বন্ধ করবার জন্য কাপড় খুঁজছিলেন। কিন্তু দ্রৌপদী একটুও দেরী না করে নিজের পরিহিত মূল্যবান রেশমী শাড়ি ছিঁড়ে শ্রীকৃষ্ণের সেই কেটে যাওয়া স্থানটি বেঁধে দেন তাড়াতাড়ি রক্তপাত বন্ধ করার জন্য। এবং শ্রীকৃষ্ণ তখন দ্রৌপদীকে বলেন, তার বেঁধে দেওয়া কাপড়ের প্রতিটি সুতোর প্রতিদান দেবেন তিনি। এরপর শ্রীকৃষ্ণ দ্রৌপদীকে রাজসভায় বস্ত্রহরণের চরম কলঙ্কের হাত থেকে রক্ষা করেন। এই রাখি বন্ধন উৎসবের ৫ দিন আগে ঝুলনযাত্রা এবং ৭ দিন পরে জন্মাষ্টমী পালিত হয়।
আরও পড়ুন: পুজোয় মঙ্গল ঘট কেন স্থাপন করা হয়, জানেন?
রাখিবন্ধনের ঐতিহাসিক ঘটনা
বর্তমান যুগে রাখি বন্ধন উৎসবের সূচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে গোটা বাংলায় জ্বলছে আগুন। ব্রিটিশদের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদের জন্য হিন্দু-মুসলিমদের ঐক্য বা একতার প্রতীক হিসেবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রাখিবন্ধন উৎসব পালন করেন। তিনি ঢাকা ও সিলেট থেকে মুসলিম ভাই-বোনদের কলকাতায় আহ্বান করেন এবং রাখি বন্ধন উৎসব পালন করেন। ভারতের ইতিহাসে চরম ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার সময় এই রাখি বন্ধন হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে একতা ও ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে যা আজও স্মরণীয় হয়ে আছে।
রাখি বন্ধনের তাৎপর্য ও মাহাত্ম্য
এই রাখি মূলত কোন সুতো বা কাগজের জিনিস নয়, এটি এক ধরনের রক্ষাকবচ যা ভাইদের সমস্ত রকমের বিপদের হাত থেকে রক্ষা করে। অপরদিকে এই দিন দাদারা প্রতিজ্ঞা করেন জীবনের সব কঠিন পরিস্থিতিতে বোনের পাশে দাঁড়ানোর। প্রত্যেক বোনের কাছে এই রাখি বন্ধন অত্যন্ত বিশেষ একটি দিন, যাকে ঘিরে বহু প্রচলিত নিয়ম রয়েছে। যেগুলি অনেকেই মনে-প্রাণে মেনে চলেন।
আরও পড়ুন: প্রদীপের মুখ কোনদিকে থাকা উচিত? নিয়মগুলি না জানলে হতে পারে অমঙ্গল!
এবছর রাখি পূর্ণিমা কবে ও কখন?
হিন্দু ক্যালেন্ডার অনুসারে, এবছর শ্রাবণী পূর্ণিমা তিথি ১১ অগাস্ট সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে শুরু হচ্ছে এবং ১২ অগাস্ট সকাল ৭টা ০৫ মিনিটে শেষ হবে। ফলত, আগামী ১১ অগাস্ট পালিত হবে রাখি বন্ধন উৎসব। বোনেরা ওইদিন ভাইয়ের হাতে রাখি বাঁধতে পারেন। তবে, ১১ তারিখ সকাল ১০.৩৮ থেকে রাত ৮.২৪ পর্যন্ত ভদ্রা তিথি থাকবে। শাস্ত্র অনুযায়ী, ভদ্রা তিথিতে কোনও শুভ কাজ করা যায় না। আবার সূর্যাস্তের পরও রাখি বাঁধার নিয়ম নেই। তাই ভদ্রা তিথি পড়ার আগেই রাখি বন্ধনের কাজ সম্পন্ন করতে হবে। নয়তো, ১২ তারিখ ভোরে পূর্ণিমা তিথি থাকাকালীন করতে হবে।
রাখি বন্ধনে কী করবেন ও কী করবেন না—
•রাখির উপহারের তালিকায় তোয়ালে কিংবা রুমাল রাখবেন না।
•ভাইয়ের হাতে রাখি পরিয়ে দেওয়ার সময় কালো রঙের পোশাককে অনেকে এড়িয়ে যাওয়া শুভ বলে মনে করেন।
•বোনকে উপহার দেওয়ার সময় ভাইদের খেয়াল রাখতে হবে সেই তালিকায় যেন কোনও ধারালো জিনিস না থাকে।
•বহু জায়গা প্রচলিত রয়েছে, যতক্ষণ না ভাইদের হাতে রাখি পরানো হয় ততক্ষণ বোনেরা নুন জাতীয় কোনও খাবার খান না।
•রাখির মঙ্গল থালায় জ্বলন্ত প্রদীপ, কুমকুম এবং চন্দন রেখে তারপরেই রাখি পরাবেন।
•রাখি বন্ধন শেষে কোনওভাবেই ভাইদের কালো রঙের কোনও উপহার দেবেন না।
•রাখি পরানোর সময় নোনতা খাবারের পরিবর্তে যতটা সম্ভব মিষ্টি জাতীয় খাবার দেবেন।
•ভাইদের উদ্দেশ্যে আনা রাখি, হাতে বাঁধার আগে অবশ্যই কিছুক্ষণ বাড়ির ইষ্ট দেবতার চরণে রেখে দেবেন।
•আসনে ভাইদের পূর্ব বা উত্তর দিকে মুখ করে বসাবেন। তারপর হাতে রাখি বেঁধে দেবেন। দক্ষিণ দিকে বসিয়ে রাখি বাঁধাকে অশুভ বলে মনে করা হয়।
Leave a Reply