তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
জীবনভর দায়িত্ব পালনের পরে, নিশ্চিন্তে অবসর যাপন! কিন্তু প্রৌঢ়কালে সেই নিশ্চিন্ত আরামের অবসরে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে স্মৃতিশক্তি! বয়স বাড়লেই বাড়ছে স্মৃতিহ্রাসের সমস্যা। পরিস্থিতি এমন হচ্ছে, নিজের নাম ঠিকানা মনে পড়ছে না। এমনকি সন্তানের মুখও অপরিচিত হয়ে উঠছে। বেঁচে থাকলেও, এক অর্থহীন যাপন হয়ে উঠছে। স্বাভাবিক ছন্দে আর জীবন কাটছে না।
ভারতে অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে অ্যালজাইমার। ২১ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড অ্যালজাইমার ডে! বিশ্ব জুড়ে এই রোগের দাপট বাড়ছে। বাদ নেই ভারত। ডিমেনশিয়া, অ্যালজাইমারের মতো স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সমস্যায় আক্রান্ত বহু ভারতীয়। চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বয়স চল্লিশের চৌকাঠ পেরোলেই আগাম সতর্ক থাকা জরুরি। জীবন যাপনের ধরণে এমন কিছু অভ্যাস আয়ত্ত করতে হবে, যাতে অ্যালজাইমারের মতো স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি কমে।
ভারতে এই সমস্যা কতখানি প্রবল?
গ্লোবাল বার্ডেন অফ ডিজিজ-র তথ্য অনুযায়ী, ভারতে প্রায় ৪২ লাখ মানুষ অ্যালজাইমারের মতো রোগে আক্রান্ত। গোটা বিশ্বে এই রোগে আক্রান্তের একটা বড় অংশ ভারতীয়। ১৯৯০ সালের তুলনায় প্রায় আড়াই গুণের বেশি আক্রান্ত। এই সংখ্যা ক্রমশ উর্ধ্বমুখী। ভারতে প্রতি বছর কয়েক লাখ মানুষ নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। চিকিৎসকদের পরামর্শ, এই পরিসংখ্যান জানান দিচ্ছে, ভারতে এই রোগের দাপট ক্রমশ বাড়ছে। চল্লিশের পরেই এই রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই মধ্য বয়স থেকেই শরীর ও মনের যথেষ্ট যত্ন নেওয়া জরুরি। তবেই এই রোগের মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
কেন ভারতে অ্যালজাইমারের প্রকোপ বাড়ছে?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, ভারতীয়দের গড় আয়ু বেড়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য এক কমবেশি সকলেই গড়ে ৮০ বছরের বেশি বেঁচে থাকেন। দীর্ঘ জীবনের জন্য স্বাস্থ্য সঙ্কট ও নানান রকম তৈরি হয়। তবে, অ্যালজাইমার অনেক সময়েই ৬০ বছরের শুরুতেই দেখা দেয়। দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের জন্য এই সমস্যা দ্রুত হয়। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, অস্বাস্থ্যকর জীবন বলতে শারীরিক অভ্যাসের পাশপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিও বলা হয়েছে।
ভারতীয়দের মধ্যে ডায়াবেটিস, রক্তচাপ, স্ট্রোকের মতো রোগের প্রকোপ মারাত্মক। এই রোগ একদিকে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়। স্নায়ুর নানান জটিল রোগের কারণ হয়ে ওঠে। স্মৃতিশক্তি ভালো রাখার জন্য মস্তিষ্ক এবং স্নায়ুর সক্রিয় থাকা জরুরি। তাই স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, ভারতীয়দের অ্যালজাইমারের অন্যতম কারণ মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি। বহু ভারতীয় একাকিত্বে ভোগেন। তাঁদের সামাজিক যোগাযোগ কম হয়। দীর্ঘদিন একাকিত্বে ভুগলে স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সমস্যা দেখা দেয়। নিয়মিত বন্ধু ও পরিবারের মধ্যে যোগাযোগ না থাকলে, মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমতে থাকে। তাছাড়া ভারতীয়দের ধূমপান এবং মদ্যপানের অভ্যাস অ্যালজাইমারের মতো রোগের নেপথ্যে থাকে বলেও জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, এই দুই অভ্যাস স্নায়ুর উপরে গভীর প্রভাব ফেলে। এরফলে মস্তিষ্কের সক্রিয়তা কমে যায়।
চল্লিশের পরে কোন পাঁচ কাজে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ?
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বয়স চল্লিশের চৌকাঠ পেরিয়ে গেলেই কয়েকটি অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। জীবন যাপনের ধরনে বাড়তি সচেতনতা এবং যত্ন জরুরি। তাঁরা জানাচ্ছেন, স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সমস্যা রাতারাতি তৈরি হয় না। বরং দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে তৈরি হয়। তারপরে হঠাৎ সেটা সমক্ষে আসে। তাই আগাম, সতর্কতা জরুরি। কয়েকটি অভ্যাস পরিবর্তন করলে বড় বিপদ কমানো সহজ হবে।
মস্তিষ্কের নতুন কাজ প্রয়োজন!
মস্তিষ্কের সক্রিয়তা ধরে রাখতে মস্তিষ্ককে নতুন কাজ দেওয়া জরুরি। এমনটাই জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, একটা বয়সের পরে মস্তিষ্ক নতুন কাজ কিছু পায় না। কারণ, অধিকাংশ মানুষ একঘেয়ে জীবন কাটিয়ে যান। নতুন কিছু শেখেন না। ফলে, মস্তিষ্কের স্নায়ুর মধ্যেও সক্রিয়তা কমে যায়। ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমে।
চিকিৎসকদের একাংশের পরামর্শ, বয়স চল্লিশ হলে নতুন কিছু শেখার সুযোগ কমে। ফলে, মস্তিষ্কের স্নায়ুর সক্রিয়তাও কমে। এটা করলে চলবে না। বরং চল্লিশের পরে নতুন কিছু শেখা জরুরি। নতুন ভাষা, নতুন ধরনের রান্না কিংবা বাদ্যযন্ত্র, ছবি আঁকা কিংবা দাবার মতো খেলা, এমন কিছু শেখা জরুরি, যাতে মস্তিষ্ককে নতুন কিছু মনে রাখতে হয়, মস্তিষ্ক নতুন কাজ পায়। তাহলে স্নায়ু সতেজ ও সক্রিয় থাকবে।
সামাজিক সক্রিয়তা বজায় রাখা!
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বহু ভারতীয়ের জীবন যাপনের অন্যতম বড় সঙ্কট হলো, পেশাগত জীবনে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়ায়, সামাজিক যোগাযোগ কমে যায়। পরিবার ও বন্ধু বৃত্ত ক্রমশ ছোটো হয়ে যায়। অনেক সময়েই সেটা একাকিত্বের কারণ হয়ে ওঠে। তাই তাঁদের পরামর্শ, সামাজিক সক্রিয়তার উপরে বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করার জন্য প্রত্যেক সপ্তাহে কিছুটা সময় বরাদ্দ করতে হবে। এতে নিজের মনের ভাব সহজে প্রকাশ করা যাবে। মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষন্নতা কমবে। এর ফলে, মস্তিষ্কের উপরেও বাড়তি চাপ পড়বে না। আবার পরিবারের অন্যদের কথা শুনলে, কিংবা বন্ধুদের সমস্যা বা অভিজ্ঞতার কথা শুনলে, মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বাড়বে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, কথা বলা, কথা শোনা, মতামত দেওয়া মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখে। ফলে, স্মৃতিশক্তি হ্রাসের সমস্যায় ঝুঁকি কমে।
পর্যাপ্ত ঘুমের সময় জরুরি!
পেশাগত চাপ ও একাধিক কারণে মধ্য বয়সীদের ঘুমের অভাব, অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সমস্যা। এমনটাই জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা জানাচ্ছেন, অনেকেই নিয়মিত ৮ ঘণ্টাও ঘুমোনোর সুযোগ পান না। দীর্ঘমেয়াদি এই সমস্যা মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতে গভীর প্রভাব ফেলে। মস্তিষ্ক দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কার্যশক্তি কমতে থাকে। ফলে, স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়। নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। চল্লিশের পরে সেদিকে বাড়তি খেয়াল রাখা প্রয়োজন। চিকিৎসকদের একাংশের পরামর্শ, রাতে অন্তত ৮-৯ ঘণ্টা ঘুম জরুরি। ঘুমের অভাব যাতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখেই নিয়মিত কাজের তালিকা তৈরি করা দরকার।
ব্রেন হেলথ রুটিন তৈরি জরুরি!
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বয়স চল্লিশ পেরোলেই ব্রেইন হেলথ রুটিন তৈরি জরুরি। অর্থাৎ, এমন একটা জীবন যাপন, যেখানে শরীর মন মস্তিষ্কের যথাযথ যত্ন হবে। অর্থাৎ, নিয়মিত ৩০ মিনিট হাঁটা বা যোগাভ্যাসের জন্য বরাদ্দ থাকবে। যাতে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হরমোনের ভারসাম্যের সমস্যা নিয়ন্ত্রণে থাকে। দিনে অন্তত ২০ মিনিট পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য বরাদ্দ করতে হবে। পরিবারের সকলের সঙ্গে বসে গল্প করা বা খাওয়া দাওয়া করা যেতে পারে। তাহলে সামাজিক যোগাযোগ নিবিড় হবে। অন্তত ৩০ মিনিট গল্পের বই পড়া বা নতুন কিছু শেখার রেওয়াজ করতে হবে। অর্থাৎ দিনের তিরিশ মিনিট নতুন গল্পের বই পড়া বা বাদ্যযন্ত্র বাজানো বা ছবি আঁকার জন্য বরাদ্দ করতে হবে। সপ্তাহে অন্তত একদিন সামাজিক যোগাযোগ বাড়ানোর জন্য এলাকার যেকোনো কাজে অংশগ্রহণ করতে হবে। এর ফলে বিভিন্ন নতুন মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ হবে। মস্তিষ্কের সক্রিয়তা বাড়বে।
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে, স্মৃতিশক্তি ধরে রাখতেও একটা নিয়ম জরুরি। ব্রেইন হেলথ রুটিন মেনে চললে, সেই কাজ সহজ হবে।
স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন!
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বয়স বাড়লে নিজের শরীরের বাড়তি যত্ন নিতে হবে। ডায়াবেটিস, রক্তচাপের মতো সমস্যা থাকলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কমবে। স্নায়ুর জটিলতা দেখা দেবে। তাই এমন কিছু খাবার খাওয়া প্রয়োজন যাতে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে। আবার, ধূমপান, মদ্যপানের মতো অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি সুস্থ জীবন যাপনের জন্য প্রথম থেকেই স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
