মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গি-যোগ এবং দেশবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগে তদন্তে বড়সড় অগ্রগতি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্সের (STF)। ধৃত পাকিস্তানি নাগরিক রানা রউফ ওরফে ওয়াহাব আলমকে নেপালের কাঠমান্ডু থেকে কলকাতায় নিয়ে আসা এবং তার জন্য ভুয়ো ভারতীয় নথি তৈরিতে সাহায্য করার অভিযোগে তপসিয়া থেকে আরও এক যুবককে গ্রেফতার করেছে এসটিএফ। ধৃতের নাম ইমরান হোসেন। এর আগে রানার সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগে তপসিয়া থেকেই মহম্মদ ইজাজ নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। ফলে রানা-কাণ্ডে কলকাতা থেকে গ্রেফতারের সংখ্যা আরও বাড়ল।
কাঠমান্ডু থেকে রানাকে কলকাতায় আনার অভিযোগ
গত ১২ অগাস্ট উত্তর ২৪ পরগনার হাবড়া থেকে রানা রউফকে গ্রেফতার করে এসটিএফ। তদন্তকারীদের অভিযোগ, পাকিস্তানের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে কলকাতায় বসবাস করছিল সে। নেপালের কাঠমান্ডু হয়ে ভারতে ঢুকে কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিল রানা। তদন্তে উঠে এসেছে, ইমরান হোসেনই কাঠমান্ডু থেকে রানাকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিল। শুধু তাই নয়, রানার জন্য ভুয়ো ভারতীয় নথি তৈরিতেও ইমরান সাহায্য করেছিল বলে অভিযোগ। সোমবার তাকে বারাসত আদালতে পেশ করা হবে। তাকে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইছেন তদন্তকারীরা। এসটিএফের ধারণা, ইমরানকে জেরা করলে রানা-যোগে আরও কয়েকজনের নাম সামনে আসতে পারে বলে মনে করছে এসটিএফ।
আইএসআই-যোগের অভিযোগ, তৈরি হচ্ছিল ‘সেল’?
রানাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর হয়ে কাজ করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভারতে একটি ‘সেল’ তৈরি করার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছিল বলে প্রাথমিক ভাবে মনে করছে পুলিশ।অভিযোগ, সেনা ও বিএসএফের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করেছিল রানা। কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের ছবি, ভিডিও এবং মানচিত্র সংগ্রহেরও চেষ্টা করেছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। পুলিশের হাতে রানার পাকিস্তানি পাসপোর্টের নম্বর আসার পর তার আসল পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, বাংলাদেশে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিল সে। পেট্রাপোল সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে যাওয়ার ছক ছিল বলে অভিযোগ। বাংলাদেশ সীমান্তে রানার জন্য পাভেল নামে এক সহযোগী অপেক্ষা করছিল বলেও তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন। তবে এখনও তার সন্ধান মেলেনি। বাংলাদেশেও কোনও মডিউল তৈরির পরিকল্পনা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে এসটিএফ।
রানার ডায়েরিতে একাধিক দেশের নম্বর
রানা নিজের মোবাইল নষ্ট করে দিয়েছিল বলে তদন্তকারীদের দাবি। তবে তার কাছ থেকে একটি ডায়েরি উদ্ধার করা হয়েছে। সেই ডায়েরিতে নেপাল, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ ছাড়াও শ্রীলঙ্কার বেশ কিছু ফোন নম্বর পাওয়া গিয়েছে বলে সূত্রের খবর। এই নম্বরগুলির সঙ্গে রানার কী ধরনের যোগাযোগ ছিল, তা খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা। ফলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিষয়টিও তদন্তের আওতায় এসেছে।
আল কায়দার মতাদর্শে জেহাদি মডিউল তৈরির অভিযোগ, ধৃত ২
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে আল কায়দার মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জেহাদি মডিউল তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগে আরও দু’জনকে গ্রেফতার করেছে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় এবং বিড়লাপুরে অভিযান চালিয়ে জানাদুল বেগ ও সফিক শেখকে গ্রেফতার করা হয়। ধৃত দু’জনকে সোমবার আলিপুর আদালতে পেশ করা হবে। তদন্তকারীদের সূত্রে খবর, সমাজমাধ্যমে দেশবিরোধী ও সরকারবিরোধী প্রচার চালানোর অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে নোদাখালি থানায় মামলা হয়েছিল। সেই মামলার তদন্তে নেমে এসটিএফ তাদের সঙ্গে জেহাদি কার্যকলাপের যোগসূত্রের সন্ধান পায়।
‘মুঘলেজম’ ও ‘জেহাদ কি সবিবিল্লা’ নামে পেজ
তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্তেরা ‘মুঘলেজম’ এবং ‘জেহাদ কি সবিবিল্লা’ নামে দুটি সমাজমাধ্যমের পেজ খুলেছিল। ওই পেজগুলির মাধ্যমে উস্কানিমূলক ও দেশবিরোধী প্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে। শুধু প্রচার নয়, সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে নিজেদের সংগঠনও বিস্তারের চেষ্টা চলছিল বলে অভিযোগ। তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁদের সংগঠনে যুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, জেহাদি মডিউল তৈরির পাশাপাশি অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টাও চলছিল। তবে এই অভিযোগগুলির বিস্তারিত প্রমাণ এবং মডিউলের পরিধি জানতে ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে এসটিএফ।
হামিম মণ্ডল-কাণ্ডের পর ফের বড় অভিযান
এর আগে, বর্ধমানে অভিযান চালিয়ে হামিম মণ্ডল নামে এক যুবককে গ্রেফতার করেছিল রাজ্য এসটিএফ। তার সঙ্গে পাকিস্তানি গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই এবং পাকিস্তানি গ্যাংস্টার শাহজাদ ভাট্টি গোষ্ঠীর যোগাযোগ থাকার অভিযোগ উঠেছিল। তারপরই হাবড়া থেকে পাকিস্তানি নাগরিক রানা রউফ ওরফে ওয়াহাব আলমকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তপসিয়া থেকে মহম্মদ ইজাজকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এবার একই ঘটনায় ইমরান হোসেনের গ্রেফতারি তদন্তকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিল। একই সময়ে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জেহাদি মডিউল তৈরির অভিযোগে জানাদুল বেগ ও সফিক শেখের গ্রেফতারি নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, পশ্চিমবঙ্গে কোনও সংগঠিত নেটওয়ার্ক তৈরির চেষ্টা চলছিল কি না। রানা-যোগ এবং জেহাদি মডিউল— দুই মামলার তদন্তেই এখন নজর রয়েছে এসটিএফের। তবে দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনও যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
