Tag: কথামৃত

  • Ramakrishna 543: “শুধু জলে দুধ রাখলে দুধ নষ্ট হয়ে যায়, মাখন তুলে জলের উপর রাখলে আর কোন গোল থাকে না”

    Ramakrishna 543: “শুধু জলে দুধ রাখলে দুধ নষ্ট হয়ে যায়, মাখন তুলে জলের উপর রাখলে আর কোন গোল থাকে না”

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট
    দক্ষিণেশ্বরে রাখাল, মাস্টার, মহিমাচরণ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
    দ্বিজ, দ্বিজের পিতা ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ—মাতৃঋণ ও পিতৃঋণ 

    “অমি (Ramakrishna) বলি, অনাসক্ত হয়ে সংসার কর। হাতে তেল মেখে কাঁঠাল ভাঙ্গ—তাহলে হাতে আঠা লাগবে না। “কাঁচা মনকে সংসারে রাখতে গেলে মন মলিন হয়ে যায়। জ্ঞানলাভ কর তবে সংসারে থাকতে হয়। “শুধু জলে দুধ রাখলে দুধ নষ্ট হয়ে যায়। মাখন তুলে জলের উপর রাখলে আর কোন গোল থাকে না।”

    দ্বিজর পিতা (Kathamrita) আজ্ঞা, হাঁ।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) সহাস্যে—আপনি যে এদের বকেন-টকেন, তার মানে বুঝেছি। অপনি ভয় দেখান। ব্রহ্মচারী সাপকে বললে, ‘তুই তো বড় বোকা! তোকে কামড়াতেই আমি বারণ করেছিলাম। তোকে ফোঁস করতে বারণ করি নাই! তুই যদি ফোঁস করতিস তাহলে তোর শত্রুরা তোকে মারতে পারত না।’ আপনি ছেলেদের বকেন-ঝকেন,—সে কেবল ফোঁস করেন।

    দ্বিজর পিতা হাসিতেছেন।

    “ভাল ছেলে হওয়া পিতার পুণ্যের চিহ্ন। যদি পুষ্করিণীতে ভাল জল হয়—সেটি পুষ্করিণীর মালিকের পুণ্যের চিহ্ন।

    “ছেলেকে আত্মজ বলে। তুমি আর তোমার ছেলে কিছু তফাত নয়। তুমি একরূপে ছেলে হয়েছ। একরূপে তুমি বিষয়ী, আফিসের কাজ করছ, সংসারে ভোগ করছ; — আর একরূপে তুমিই ভক্ত হয়েছ—তোমার সন্তানরূপে। শুনেছিলাম, আপনি খুব ঘোর বিষয়ী। তা তো নয়! (সহাস্যে) এ-সব তো আপনি জানেন। তবে আপনি নাকি আটপিটে, এতেও হুঁ দিয়ে যাচ্ছেন।

    দ্বিজর পিতা ঈষৎ হাসিতেছেন।

    “এখানে এলে, আপনি কি বস্তু তা এরা জানতে পারবে। বাপ কত বড় বস্তু! বাপ-মাকে ফাঁকি দিয়ে যে ধর্ম করবে, তার ছাই হবে!”

    পূর্বকথা—বৃন্দাবনে শ্রীরামকৃষ্ণের মার জন্য চিন্তা

    “মানুষের অনেকগুলি ঋণ আছে। পিতৃঋণ, দেবঋণ, ঋষিঋণ। এছাড়া আবার মাতৃঋণ আছে। আবার পরিবারের সম্বন্ধেও ঋণ আছে—প্রতিপালন করতে হবে। সতী হলে, মরবার পরও তার জন্য কিছু সংস্থান করে যেতে হয়।

    “আমি মার জন্য বৃন্দাবনে থাকতে পারলাম না। যাই মনে পড়ল মা (Kathamrita) দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়িতে আছেন, অমনি আর বৃন্দাবনেও মন টিকল না।

  • Ramakrishna 542: “আমি বলি, চৈতন্যলাভের পর সংসারে গিয়ে থাক, অনেক পরিশ্রম করে যদি কেউ সোনা পায়”

    Ramakrishna 542: “আমি বলি, চৈতন্যলাভের পর সংসারে গিয়ে থাক, অনেক পরিশ্রম করে যদি কেউ সোনা পায়”

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট
    দক্ষিণেশ্বরে রাখাল, মাস্টার, মহিমাচরণ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
    দ্বিজ, দ্বিজের পিতা ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ — মাতৃঋণ ও পিতৃঋণ 

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে সেই পূর্বপরিচিত ঘরে রাখাল, মাস্টার প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে বসিয়া আছেন। বেলা তিনটা-চারিটা।

    ঠাকুরের গলার অসুখের সূত্রপাত হইয়াছে। তথাপি সমস্ত দিন কেবল ভক্তদের মঙ্গলচিন্তা করিতেছেন—কিসে তাহারা সংসারে বদ্ধ না হয়,—কিসে তাহাদের জ্ঞান-ভক্তিলাভ হয়;—ঈশ্বরলাভ হয় (Kathamrita)।

    দশ-বারো দিন হইল, ২৮শে জুলাই মঙ্গলবার, তিনি কলিকাতায় শ্রীযুক্ত নন্দলাল বসুর বাটীতে ঠাকুরদের ছবি দেখিতে আসিয়া বলরাম প্রভৃতি অন্যানা ভক্তদের বাড়ি শুভাগমন করিয়াছিলেন।

    শ্রীযুক্ত রাখাল বৃন্দাবন হইতে আসিয়া কিছুদিন বাড়িতে ছিলেন। আজকাল তিনি, লাটু, হরিশ ও রামলাল ঠাকুরের (Ramakrishna) কাছে আছেন।

    শ্রীশ্রীমা কয়েকমাস হইল, ঠাকুরের সেবার্থ দেশ হইতে শুভাগমন করিয়াছেন। তিনি নবতে আছেন। ‘শোকাতুরা ব্রাহ্মণী’ আসিয়া কয়েকদিন তাঁহার কাছে আছেন।

    ঠাকুরের কাছে দ্বিজ, দ্বিজর পিতা ও ভাইরা, মাস্টার প্রভৃতি বসিয়া আছেন। আজ ৯ই অগস্ট, ১৮৮৫ খ্রী: (২৫শে শ্রাবণ, ১২৯২, রবিবার, কৃষ্ণা চতুর্দশী)।

    দ্বিজর বয়স ষোল বছর হইবে। তাঁহার মাতার পরলোকপ্রাপ্তির পর পিতা দ্বিতীয় সংসার করিয়াছেন। দ্বিজ—মাস্টারের সহিত প্রায় ঠাকুরের কাছে আসেন,—কিন্তু তাঁহার পিতা তাহাতে বড় অসন্তুষ্ট।

    দ্বিজর পিতা অনেকদিন ধরিয়া ঠাকুরকে দর্শন করিতে আসিবেন বলিয়াছিলেন। তাই আজ আসিয়াছেন (Kathamrita)। কলিকাতায় সওদাগরী অফিসের তিনি একজন কর্মচারী—ম্যানেজার। হিন্দু কলেজে ডি. এল. রিচার্ডসনের কাছে পড়িয়াছিলেন ও হাইকোর্টের ওকালতি পাস করিয়াছিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) (দ্বিজর পিতার প্রতি)—আপনার ছেলেরা এখানে আসে, তাতে কিছু মনে করবে না।

    “আমি বলি, চৈতন্যলাভের পর সংসারে গিয়ে থাক। অনেক পরিশ্রম করে যদি কেউ সোনা পায়, সে মাটির ভিতর রাখতে পারে—বাক্সের ভিতরও রাখতে পারে, জলের ভিতরও রাখতে পারে—সোনার কিছু হয় না।

  • Ramakrishna 541: “তারে কেউ চিনলি না রে! ও সে পাগলের বেশে ফিরছে জীবের ঘরে ঘরে!”

    Ramakrishna 541: “তারে কেউ চিনলি না রে! ও সে পাগলের বেশে ফিরছে জীবের ঘরে ঘরে!”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    গুহ্যকথা—“তিনজনই এক”

    “তখন যীশু বললেন, তোমার দিদিই ধন্য, কেন না মানুষ জীবনের যা প্রয়োজন (অর্থাৎ ঈশ্বরকে ভালবাসা—প্রেম) তা ওঁর হয়েছে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আচ্ছা তোমার এ-সব দেখে কি বোধ হয়?

    মণি—আমার বোধ হয়, তিনজনেই এক বস্তু!—যীশুখ্রীষ্ট, চৈতন্যদেব আর আপনি—একব্যক্তি!

    শ্রীরামকৃষ্ণ—এক এক! এক বইকি। তিনি (ঈশ্বর),—দেখছ (Kathamrita) না,—যেন এর উপর এমন করে রয়েছে!

    এই বলিয়া ঠাকুর নিজের শরীরের উপর অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন যেন বলছেন, ঈশ্বর তাঁরই শরীরধারণ করে অবতীর্ণ হয়েই রয়েছেন।

    মণি—সেদিন আপনি এই অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারটি বেশ বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—কি বল দেখি।

    মণি—যেন দিগ্‌দিগন্তব্যাপী মাঠ পড়ে রয়েছে! ধু-ধু করছে! সম্মুখে পাঁচিল রয়েছে বলে আমি দেখতে পাচ্ছি না;—সেই পাঁচিলে কেবল একটি ফাঁক!—সেই ফাঁক দিয়ে অনন্ত মাঠের খানিকটা দেখা যায়!

    শ্রীরামকৃষ্ণ — বল দেখি সে ফাঁকটি কি?

    মণি—সে ফাঁকটি আপনি! আপনার ভিতর দিয়ে সব দেখা যায় (Kathamrita);—সেই দিগ্‌দিগন্তব্যাপী মাঠ দেখা যায়!

    শ্রীরামকৃষ্ণ অতিশয় সন্তুষ্ট, মণির গা চাপড়াতে লাগলেন। আর বললেন, “তুমি যে ওইটে বুঝে ফেলেছ।—বেশ হয়েছে।”

    মণি—ওইটি শক্ত কি না; পূর্ণব্রহ্ম হয়ে ওইটুকুর ভিতর কেমন করে থাকেন, ওইটা বুঝা যায় না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—‘তারে কেউ চিনলি না রে! ও সে পাগলের বেশে (দীনহীন কাঙালের বেশে) ফিরছে জীবের ঘরে ঘরে!’

    মণি—আর আপনি বলেছিলেন যীশুর কথা।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) কি, কি?

    মণি—যদু মল্লিকের বাগানে যীশুর ছবি দেখে ভাবসমাধি হয়েছিল। আপনি দেখেছিলেন যে যীশুর মূর্তি ছবি থেকে এসে আপনার ভিতর মিশে গেল।

    ঠাকুর কিয়ৎকাল চুপ করিয়া আছেন। তারপর আবার মণিকে বলিতেছেন, “এই যে গলায় এইটে হয়েছে, ওর হয়তো মানে আছে—সব লোকের কাছে পাছে হালকামি করি।—না হলে যেখানে সেখানে নাচা-গাওয়া তো হয়ে যেত।”

    ঠাকুর দ্বিজর কথা কহিতেছেন। বলিতেছেন(Kathamrita), “দ্বিজ এল না?”

    মণি—বলেছিলাম আসতে। আজ আসবার কথা ছিল; কিন্তু কেন এল না, বলতে পারি না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—তার খুব অনুরাগ। আচ্ছা, ও এখানকার একটা কেউ হবে (অর্থাৎ সাঙ্গোপাঙ্গের মধ্যে একজন হবে), না?

    মণি—আজ্ঞা হাঁ, তাই হবে, তা না হলে এত অনুরাগ।

    মণি মশারির ভিতর গিয়া ঠাকুরকে বাতাস করিতেছেন।

  • Ramakrishna 540: “ডুবলো নয়ন ফিরে না এলো, গৌর রূপসাগরে সাঁতার ভুলে, তলিয়ে গেল আমার মন”

    Ramakrishna 540: “ডুবলো নয়ন ফিরে না এলো, গৌর রূপসাগরে সাঁতার ভুলে, তলিয়ে গেল আমার মন”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    গুহ্যকথা—“তিনজনই এক”

    বলরামের বাড়ির বৈঠকখানার পশ্চিমপার্শ্বের ঘরে ঠাকুর বিশ্রাম করিতেছেন, নিদ্রা জাইবেন। গণুর মার বাড়ি হইতে ফিরিতে অনেক রাত হইয়া গিয়াছে। রাত পৌনে এগারটা হইবে।

    ঠাকুর (Ramakrishna) বলিতেছেন, “যোগীন একটু পায়ে হাতটা বুলিয়ে দাও তো।”

    কাছে মণি বসিয়া আছেন।

    যোগীন পায়ে হাত বুলাইয়া দিতেছেন (Kathamrita); এমন সময় ঠাকুর বলিতেছেন, আমার ক্ষিদে পেয়েছে, একটু সুজি খাব।

    ব্রাহ্মণী সঙ্গ সঙ্গে এখানেও আসিয়াছেন। ব্রাহ্মণীর ভাইটি বেশ বাঁয়া তবলা বাজাইতে পারেন। ঠাকুর ব্রাহ্মণিকে আবার দেখিয়া বলিতেছেন, “এবার নরেন্দ্র এলে, কি আর কোনও গাইয়ে লোক এলে ওঁর ভাইকে ডেকে আনলেই হবে।”

    ঠাকুর একটু সুজি খাইলেন। ক্রমে যোগীন ইত্যাদি ভক্তেরা ঘর হইতে চলিয়া গেলেন। মণি ঠাকুরের পায়ে হাত বুলাইতেছেন, ঠাকুর তাঁহার সহিত কথা কহিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আহা, এদের (ব্রাহ্মণীদের) কি আহ্লাদ!

    মণি—কি আশ্চর্য, যীশুকৃষ্টের সময় ঠিক এইরকম হয়েছিল! তারাও দুটি মেয়েমানুষ ভক্ত, দুই ভগ্নী। মার্থা আর মেরী।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (উৎসুক হইয়া)—তাদের গল্প কি বল তো (Kathamrita)।

    মণি—যীশুকৃষ্ট তাঁদের বাড়িতে ভক্তসঙ্গে ঠিক এইরকম করে গিয়েছিলেন। একজন ভগ্নী তাঁকে দেখে ভাবোল্লাসে পরিপূর্ণ হয়েছিল। যেমন গৌরের গানে আছে,—

              ‘ডুবলো নয়ন ফিরে না এলো।
    গৌর রূপসাগরে সাঁতার ভুলে, তলিয়ে গেল আমার মন।’

    “আর-একটি বোন একলা খাবর-দাবার উদ্যোগ করছিল। সে ব্যতিব্যস্ত হয়ে যীশুর কাছে নালিশ করলে, প্রভু, দেখুন দেখি—দিদির কি অন্যায়! উনি এখানে একলা চুপ করে বসে আছেন, আর আমি (Ramakrishna) একলা এই সব উদ্যোগ করছি?

    “তখন যীশু বললেন, তোমার দিদিই ধন্য, কেন না মানুষ জীবনের যা প্রয়োজন (অর্থাৎ ঈশ্বরকে ভালবাসা—প্রেম) তা ওঁর হয়েছে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ—আচ্ছা তোমার এ-সব দেখে কি বোধ হয়?

    মণি—আমার বোধ হয়, তিনজনেই এক বস্তু!—যীশুখ্রীষ্ট, চৈতন্যদেব আর আপনি—একব্যক্তি!

    শ্রীরামকৃষ্ণ—এক এক! এক বইকি। তিনি (ঈশ্বর),—দেখছ না,—যেন এর উপর এমন করে রয়েছে!

    এই বলিয়া ঠাকুর নিজের শরীরের উপর অঙ্গুলি নির্দেশ করিলেন যেন বলছেন, ঈশ্বর তাঁরই শরীরধারণ করে অবতীর্ণ হয়েই রয়েছেন।

  • Ramakrishna 539: “নয়ন-বাঁকা, বাঁকা-শিখিপাখা, রাধিকা-হৃদিরঞ্জন; গোবর্ধনধারণ, বনকুসুমভূষণ, দামোদর কংসদর্পহারী, শ্যাম রাসরসবিহারী”

    Ramakrishna 539: “নয়ন-বাঁকা, বাঁকা-শিখিপাখা, রাধিকা-হৃদিরঞ্জন; গোবর্ধনধারণ, বনকুসুমভূষণ, দামোদর কংসদর্পহারী, শ্যাম রাসরসবিহারী”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই

    গণুর মার বাড়িতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    ঠাকুর (Ramakrishna) বলিতেছেন, “এর উপরেই বস না। আই আমি লিচ্ছি।” এই বলিয়া আসন গুটাইয়া লইলেন। ছোকরারা গান গাহিতেছে:

    কেশব কুরু করুণাদীনে কুঞ্জকাননচারী
    মাধব মনোমোহন মোহন মুরলীধারী।
    (হরিবোল, হরিবোল, হরিবোল, মন আমার) ॥
    ব্রজকিশোর, কালীয়হর কাতরভয়ভঞ্জন,
    নয়ন-বাঁকা, বাঁকা-শিখিপাখা, রাধিকা-হৃদিরঞ্জন;
    গোবর্ধনধারণ, বনকুসুমভূষণ, দামোদর কংসদর্পহারী।
    শ্যাম রাসরসবিহারী।
    (হরিবোল, হরিবোল, হরিবোল, মন আমার) ॥

    গান—এস মা জীবন উমা—ইত্যাদি।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Kathamrita)—আহা কি গান!—কেমন বেহালা!—কেমন বাজনা!

    একটি ছোকরা ফ্লুট বাজাইতেছিলেন। তাঁহার দিকে ও অপর আর আকটি ছোকরার দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করিয়া বলিতেছেন। “ইনি ওঁর যেন জোড়।”

    এইবার কেবল কনসার্ট বাজনা হইতে লাগিল। বাজনার পর ঠাকুর আনন্দিত হইয়া বলিতেছেন, “বা! কি চমৎকার!”

    একটি ছোকরাকে নির্দেশ করিয়া বলিতেছেন, “এঁর সব (সবরকম বাজনা) জানা আছে।”

    মাস্টারকে বলিতেছেন,—এঁরা সব বেশ লোক।”

    ছোকরাদের (Ramakrishna) গান-বাজনার পর তাহারা ভক্তদের বলিতেছে—“আপনারা কিছু গান!” ব্রাহ্মণী দাঁড়াইয়া আছেন। তিনি দ্বারের কাছ থেকে বলিলেন, গান এরা কেউ জানে না, এক মহিমবাবু বুঝি জানেন, তা ওঁর সামনে উনি গাইবেন না।

    একজন ছোকরা — কেন? আমি বাবা সুমুখে গাইতে পারি।

    ছোট নরেন (উচ্চহাস্য করিয়া) — অতদূর উনি এগোননি!

    সকলে হাসিতেছেন। কিয়ৎক্ষণ পরে ব্রাহ্মণী আসিয়া বলিতেছেন,—“আপনি ভিতরে আসুন।” শ্রীরামকৃষ্ণ বলিতেছেন (Kathamrita), “কেন গো!”

    ব্রাহ্মণী—সেখানে জলখাবার দেওয়া হয়েছে; যাবেন?

    শ্রীরামকৃষ্ণ—এইখানেই এনে দাও না।

    ব্রাহ্মণী—গণুর মা বলেছে, ঘরটায় একবার পায়ের ধুলা দিন, তাহলে ঘর কাশী হয়ে থাকবে, — ঘরে মরে গেলে আর কোন গোল থাকবে না।

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna), ব্রাহ্মণী ও বাড়ির ছেলেদের সঙ্গে অন্তঃপুরে গমন করিলেন। ভক্তেরা চাঁদের আলোতে বেড়াইতে লাগিলেন। মাস্টার ও বিনোদ বাড়ির দক্ষিণদিকে সদর রাস্তার উপর গল্প করিতে করিতে পাদচারণ করিতেছেন!

  • Ramakrishna 538: “পাড়ার ছেলে-বুড়ো সকলেই ঠাকুরের আগমন সংবাদ শুনিয়া ব্যস্ত”

    Ramakrishna 538: “পাড়ার ছেলে-বুড়ো সকলেই ঠাকুরের আগমন সংবাদ শুনিয়া ব্যস্ত”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই

    গণুর মার বাড়িতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    গণুর মার বাড়ির বৈঠকখানায় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) বসিয়া আছেন। ঘরটি একতলায়, ঠিক রাস্তার উপর। ঘরের ভিতর ঐকতান বাদ্যের (Concert) আখড়া আছে। ছোকরারা বাদ্যযন্ত্র লইয়া ঠাকুরের প্রীত্যর্থে মাঝে মাঝে বাজাইতেছিল।

    রাত সাড়ে আটটা। আজ আষাঢ় মাসের কৃষ্ণা প্রতিপদ। চাঁদের আলোতে আকাশ, গৃহ, রাজপথ সব যেন প্লাবিত হইয়াছে। ঠাকুরের সঙ্গে সঙ্গে ভক্তেরা আসিয়া ওই ঘরে বসিয়াছেন।

    ব্রাহ্মণীও সঙ্গে সঙ্গে আসিয়াছেন। তিনি একবার বাড়ির ভিতর যাইতেছেন, একবার বাহিরে আসিয়া বৈঠকখানার দরজার কাছে আসিয়া দাঁড়াইতেছেন। পাড়ার কতকগুলি ছোকরা বৈঠকখানার জানলার উপর উঠিয়া ঠাকুরকে দেখিতেছে। পাড়ার ছেলে-বুড়ো সকলেই ঠাকুরের আগমন সংবাদ শুনিয়া ব্যস্ত হইয়া মহাপুরুষ(Ramakrishna) দর্শন করিতে আসিয়াছেন।

    জানলার উপর ছেলেরা উঠিয়াছে দেখিয়া ছোট নরেন বলিতেছেন, “ওরে তোরা ওখানে কেন? যা, যা বাড়ি যা।” ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সস্নেহে বলিতেছেন (Kathamrita), “না, থাক না, থাক না।”

    ঠাকুর মাঝে মাঝে বলিতেছেন, “হরি ওঁ! হরি ওঁ!”

    শতরঞ্জির উপর একখানি আসন দেওয়া হইয়াছে, তাহার উপর শ্রীরামকৃষ্ণ বসিয়াছেন। ঐকতান বাদ্যের ছোকরাদের গান গাহিতে (Kathamrita) বলা হইল। তাহাদের বসিবার সুবিধা হইতেছে না, ঠাকুর তাঁহার নিকটে শতরঞ্জিতে বসিবার জন্য তাহাদের আহ্বান করিলেন।

  • Ramakrishna 537: “সকলকে বলি, আয়রে আমার সুখ দেখে যা!—যাই,—যোগীনকে বলিগে, আমার ভাগ্যি দেখে যা!”

    Ramakrishna 537: “সকলকে বলি, আয়রে আমার সুখ দেখে যা!—যাই,—যোগীনকে বলিগে, আমার ভাগ্যি দেখে যা!”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    শোকাতুরা ব্রাহ্মণীর বাটীতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    ব্রাহ্মণী (Ramakrishna) অধীর হইয়া বলিতেছেন, “ওগো, আমি যে আহ্লাদে আর বাঁচি না, গো! তোমরা সব বল গো আমি কেমন করে বাঁচি! ওগো, আমার চণ্ডী যখন এসেছিল, — সেপাই শান্ত্রী, সঙ্গে করে— আর রাস্তায় তারা পাহারা দিচ্ছিল—তখন যে এত আহ্লাদ হয়নি গো!—ওগো চণ্ডীর শোক এখন একটুও আমার নাই! মনে করেছিলাম, তিনি যেকালে এলেন না, যা আয়োজন করলুম, সব গঙ্গার জলে ফেলে দেব;—আর ওঁর (ঠাকুরের) সঙ্গে আলাপ করব না, যেখানে আসবেন একবার যাব, অন্তর থেকে দেখব,—দেখে চলে আসব।

    “যাই— সকলকে বলি, আয়রে আমার সুখ দেখে যা!—যাই,— যোগীনকে বলিগে, আমার ভাগ্যি দেখে যা!”

    ব্রাহ্মণী (Ramakrishna) আবার আনন্দে অধীর হইয়া বলিতেছেন, “ওগো খেলাতে (লটারী-তে) একটা টাকা দিয়ে মুটে এক লাখ টাকা পেয়েছিল,—সে যেই শুনলে এক লাখ টাকা পেয়েছি, অমনি আহ্লাদে মরে গিছল—সত্য সত্য মরে গিছল!—ওগো আমার যে তাই হল গো! তোমরা সকলে আশীর্বাদ কর, না হলে আমি সত্য সত্য মরে যাব।”

    মণি ব্রাহ্মণীর আর্তি ও ভাবের অবস্থা দেখিয়া মোহিত হইয়া গিয়াছেন। তিনি তাঁহার পায়ের ধুলা লইতে গেলেন। ব্রাহ্মণী বলিতেছেন, ‘সে কি গো!’—তিনি মণিকে প্রতিপ্রণাম করিলেন।

    ব্রাহ্মণী, ভক্তেরা আসিয়াছেন দেখিয়া আনন্দিত হইয়াছেন আর বলিতেছেন, “তোমরা সব এসেছ,—ছোট নরেনকে এনেছি,—বলি তা না হলে হাসবে কে!” ব্রাহ্মণী এইরূপ কথাবার্তা কহিতেছেন, উহার ভগ্নী আসিয়া ব্যস্ত হইয়া বলিতেছেন, “দিদি এসো না! তুমি এখানে দাঁড়ায়ে থাকলে কি হয়? নিচে এসো! আমরা কি একলা পারি।”

    ব্রাহ্মণী আনন্দে বিভোর! ঠাকুর ও ভক্তদের দেখিতেছেন। তাঁদের ছেড়ে যেতে আর পারেন না।

    এইরূপ কথাবার্তার পর ব্রাহ্মণী অতিশয় ভক্তিসহকারে ঠাকুরকে অন্য ঘরে লইয়া গিয়া মিশটান্নাদি নিবেদন করিলেন। ভক্তেরাও ছাদে বসিয়া সকলে মিষ্টমুখ করিলেন।

    রাত প্রায় ৮টা হইল, ঠাকুর বিদায় গ্রহণ করিতেছেন। নিচের তলায় ঘরের কোলে বারান্দা, বারান্দা দিয়ে পশ্চিমাস্য হইয়া উঠানে আসিতে হয়। তাহার পর গোয়ালঘর ডান দিকে রাখিয়া সদর দরজায় আসিতে হয়। ঠাকুর যখন বারান্দা দিয়া ভক্তসঙ্গে সদর দরজার দিকে আসিতেছেন, তখন ব্রাহ্মণী (Kathamrita) উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতেছেন, “ও বউ, শীঘ্র পায়ের ধুলা নিবি আয়!” বউ ঠাকুরানী প্রণাম করিলেন। ব্রাহ্মণীর একটি ভাইও আসিয়া প্রণাম করিলেন।

    ব্রাহ্মণী ঠাকুরকে বলিতেছেন, “এই আর একটি ভাই; মুখ্যু।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—না, না, সব ভাল মানুষ।

    একজন সঙ্গে সঙ্গে প্রদীপ ধরিয়া আসিতেছেন, আসিতে আসিতে এক যায়গায় তেমন আলো হইল না।

    ছোট নরেন উচ্চৈঃস্বরে বলিতেছেন, “পিদ্দিম ধর, পিদ্দিম ধর! মনে করো না যে, পিদ্দিম ধরা ফুরিয়ে গেল!” (সকলের হাস্য)

    এইবার গোয়ালঘর। ব্রাহ্মণী ঠাকুরকে বলিতেছেন, এই আমার গোয়ালঘর। গোয়ালঘরের সামনে একবার দাঁড়াইলেন, চতুর্দিকে ভক্তগণ। মণি ভূমিষ্ঠ হইয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিতেছেন ও পায়ের ধুলা লইতেছেন।

    এইবার ঠাকুর গণুর মার বাড়ি যাইবেন।

  • Ramakrishna 536: “দিদি এই গেলেন নন্দ বোসের বাড়ি খবর নিতে, কেন এত দেরি হচ্ছে— এতক্ষণে ফিরবেন”

    Ramakrishna 536: “দিদি এই গেলেন নন্দ বোসের বাড়ি খবর নিতে, কেন এত দেরি হচ্ছে— এতক্ষণে ফিরবেন”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    শোকাতুরা ব্রাহ্মণীর বাটীতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ

    ঠাকুর (Ramakrishna) বাগবাজারের একটি শোকাতুরা ব্রাহ্মণীর বাড়ি আসিয়াছেন। বাড়িটি পুরাতন ইষ্টকনির্মিত। বাড়ি প্রবেশ করিয়াই বাম দিকে গোয়ালঘর। ছাদের উপর বসিবার স্থান হইয়াছে। ছাদে লোক কাতার দিয়া, কেহ দাঁড়াইয়া কেহ বসিয়া আছেন। সকলেই উৎসুক — কখন ঠাকুরকে দেখিবেন।

    ব্রাহ্মণীরা দুই ভগ্নী, দুই জনেই বিধবা। বাড়িতে এঁদের ভায়েরাও সপরিবারে থাকেন। ব্রাহ্মণীর একমাত্র কন্যা দেহত্যাগ করাতে তিনি যারপরনাই শোকাতুরা। আজ ঠাকুর গৃহে পদার্পণ করিবেন বলিয়া সমস্ত দিন উদ্যোগ করিতেছেন। যতক্ষণ ঠাকুর শ্রীযুক্ত নন্দ বসুর বাড়িতে ছিলেন, ততক্ষণ ব্রাহ্মণী ঘর-বাহির করিতেছিলেন, — কখন তিনি আসেন। ঠাকুর বলিয়া দিয়াছিলেন যে, নন্দ বসুর বাড়ি হইতে আসিয়া তাঁহার বাড়িতে আসিবেন। বিলম্ব হওয়াতে তিনি ভাবিতেছিলেন, তবে বুঝি ঠাকুর আসিবেন না।

    ঠাকুর (Ramakrishna) ভক্তসঙ্গে আসিয়া ছাদের উপর বসিবার স্থানে আসন গ্রহণ করিলেন। কাছে মাদুরের উপর মাস্টার, নারাণ, যোগীন সেন, দেবেন্দ্র, যোগীন। কিয়ৎক্ষণ পরে ছোট নরেন প্রভৃতি অনেক ভক্তেরা আসিয়া জুটিলেন। ব্রাহ্মণীর ভগ্নী ছাদের উপর আসিয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া বলিতেছেন—“দিদি এই গেলেন নন্দ বোসের বাড়ি খবর নিতে, কেন এত দেরি হচ্ছে;—এতক্ষণে ফিরবেন।”

    নিচে একটি শব্দ হওয়াতে তিনি আবার বলিতেছেন (Kathamrita)—“ওই দিদি আসছেন।” এই বলিয়া তিনি দেখিতে লাগিলেন। কিন্তু তিনি এখনও আসিয়া পৌঁছেন নাই।

    ঠাকুর সহাস্যবদন, ভক্তপরিবৃত হইয়া বসিয়া আছেন।

    মাস্টার (দেবেন্দ্রের প্রতি)—কি চমৎকার দৃশ্য। ছেলে-বুড়ো, পুরুষ-মেয়ে কাতার দিয়ে দাঁড়িয়া রয়েছে! সকলে কত উৎসুক—এঁকে দেখবার জন্য! আর এঁর কথা শোনবার জন্য!

    দেবেন্দ্র (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি)—মাস্টার মশাই বলছেন যে, এ জায়গাটি নন্দ বোসের চেয়ে ভাল জায়গা; — এদের কি ভক্তি!

    ঠাকুর হাসিতেছেন।

    এইবার ব্রাহ্মণীর ভগ্নী বলিতেছেন, “ওই দিদি আসছেন।”

    ব্রাহ্মণী আসিয়া ঠাকুরকে প্রণাম করিয়া কি বলিবেন (Kathamrita), কি করিবেন কিছুই ঠিক করিতে পারিতেছেন না।

  • Ramakrishna 535: “কল্পতরুর কাছে গিয়ে প্রার্থনা করতে হয়, তবে ফল পাওয়া যায়,—তবে ফল তরুর মূলে পড়ে”

    Ramakrishna 535: “কল্পতরুর কাছে গিয়ে প্রার্থনা করতে হয়, তবে ফল পাওয়া যায়,—তবে ফল তরুর মূলে পড়ে”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    শ্রীরামকৃষ্ণ ও গৃহস্থের মঙ্গলকামনা—রজোগুণের চিহ্ন

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) বিরক্ত হইয়া—ওই এক তোমাদের কথা;—সকল লোকের শক্তি কি সমান হতে পারে? বিভুরূপে তিনি সর্বভূতে এক হয়ে আছেন বটে, কিন্তু শক্তিবিশেষ!

    “বিদ্যাসাগরও ওই কথা বলছিল,—‘তিনি কি কারুকে বেশি শক্তি কারুকে কম শক্তি দিয়েছেন?’ তখন আমি বললাম—যদি শক্তি ভিন্ন না হয়, তাহলে তোমাকে আমরা কেন দেখতে এসেছি? তোমার মাথায় কি দুটো শিং বেরিয়েছে?”

    ঠাকুর গাত্রোত্থান করিলেন। ভক্তেরাও সঙ্গে সঙ্গে উঠিলেন। পশুপতি সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুদগমন করিয়া দ্বারদেশে পৌঁছাইয়া দিলেন।

    পাপ ও পরলোক—মৃত্যুকালে ঈশ্বরচিন্তা—ভরত রাজা 

    “আমাদের কি বিকার যাবে!’—‘আমাদের আর কি হবে’–‘আমরা পাপী’—এ-সব বুদ্ধি ত্যাগ করো। (নন্দ বসুর প্রতি) আর এই চাই—একবার রাম বলেছি, আমার আবার পাপ!”

    নন্দ বসু—পরলোকে কি আছে? পাপের শাস্তি?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—তুমি আম খাও না! তোমার ও-সব হিসাবে দরকার কি? পরলোক আছে কি না — তাতে কি হয় — এ-সব খবর!

    “আম খাও। ‘আম’ প্রয়োজন,—তাঁতে ভক্তি—”

    নন্দ বসু—আমগাছ কোথা? আম পাই কোথা?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Kathamrita)—গাছ? তিনি অনাদি অনন্ত ব্রহ্ম! তিনি আছেনই, তিনি নিত্য! তবে একটি কথা আছে—তিনি ‘কল্পতরু—’

    “কালী কল্পতরু মূলে রে মন, চারি ফল কুড়ায়ে পাবি!

    “কল্পতরুর কাছে গিয়ে প্রার্থনা করতে হয়, তবে ফল পাওয়া যায়,—তবে ফল তরুর মূলে পড়ে,—তখন কুড়িয়ে লওয়া যায়। চারি ফল,—ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ।

    “জ্ঞানীরা মুক্তি (মোক্ষফল) চায়, ভক্তেরা ভক্তি চায়,—অহেতুকী ভক্তি। তারা ধর্ম, অর্থ, কাম চায় না।

    “পরলোকের কথা বলছ? গীতার মত,—মৃত্যুকালে যা ভাববে তাই হবে। ভরত রাজা ‘হরিণ’ ‘হরিণ’ করে শোকে প্রাণত্যাগ করেছিল। তাই তার হরিণ হয়ে জন্মাতে হল। তাই জপ, ধ্যান, পূজা এ-সব রাতদিন অভ্যাস করতে হয়, তাহলে মৃত্যুকালে ঈশ্বরচিন্তা আসে—অভ্যাসের গুণে। এরূপে মৃত্যু হলে ঈশ্বরের স্বরূপ পায়।

    “কেশব সেনও পরলোকের কথা জিজ্ঞাসা করেছিল। আমি কেশবকেও বললুম, ‘এ-সব হিসাবে তোমার কি দরকার?’ তারপর আবার বললুম, যতক্ষণ না ঈশ্বরলাভ (Kathamrita) হয়, ততক্ষণ পুনঃ পুনঃ সংসারে যাতায়াত করতে হবে। কুমোরেরা হাঁড়ি-সরা রৌদ্র শুকুতে দেয়; ছাগল-গরুতে মাড়িয়ে যদি ভেঙে দেয় তাহলে তৈরি লাল হাঁড়িগুলো ফেলে দেয়। কাঁচাগুলো কিন্তু আবার নিয়ে কাদামাটির সঙ্গে মিশিয়ে ফেলে ও আবার চাকে দেয়!”

  • Ramakrishna 534: “নারদ বললে, রাম! তোমার কাছে আর কোনও বর চাই না, আমাকে শুদ্ধাভক্তি দাও”

    Ramakrishna 534: “নারদ বললে, রাম! তোমার কাছে আর কোনও বর চাই না, আমাকে শুদ্ধাভক্তি দাও”

    ৫০ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কলিকাতা নগরে ভক্তমন্দিরে

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ২৮শে জুলাই
    শ্রীরামকৃষ্ণ ও গৃহস্থের মঙ্গলকামনা—রজোগুণের চিহ্ন

    ঠাকুর (Ramakrishna) দক্ষিণে বারান্দার দিকে উঠিয়া গেলেন। মণিকে আজ্ঞা করিলেন, “আমার হাতে জল দাও।” মণি ভৃঙ্গার হইতে জল ঢালিয়া দিলেন। ঠাকুর নিজের কাপড়ে হাত পুঁছিয়া আবার বসিবার স্থানে ফিরিয়া আসিলেন। ভদ্রলোকদের জন্য রেকাবি করিয়া পান আনা হইয়াছিল। সেই রেকাবির পান ঠাকুরের কাছে লইয়া যাওয়া হইল, তিনি সে পান গ্রহণ করিলেন না।

    ইষ্টদেবতাকে নিবেদন—জ্ঞানভক্তি ও শুদ্ধাভক্তি

    নন্দ বসু (শ্রীরামকৃষ্ণের প্রতি)—একটা কথা বলব?

    শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে)—কি?

    নন্দ বসু—পান খেলেন না কেন? সব ঠিক হল, ওইটি অন্যায় হয়েছে!

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—ঈষ্টকে দিয়ে খাই;—ওই একটা ভাব আছে।

    নন্দ বসু—ও তো ইষ্টতেই পড়ত।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — জ্ঞানপথ একটা আছে; আর ভক্তিপথ একটা আছে। জ্ঞানীর মতে সব জিনিসই ব্রহ্মজ্ঞান করে লওয়া যায়! ভক্তিপথে একটু ভেদবুদ্ধি হয়।

    নন্দ—ওটা দোষ হয়েছে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে)—ও আমার একটা ভাব আছে। তুমি যা বলছ ও ঠিক বটে — ও-ও আছে।

    ঠাকুর গৃহস্বামীকে মোসাহেব হইতে সাবধান করিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—আর একটা সাবধান! মোসাহেবরা স্বার্থের জন্য বেড়ায়। (প্রসন্নের পিতাকে) আপনার কি এখানে থাকা হয়?

    প্রসন্নের পিতা—আজ্ঞে না, এই পাড়াতেই থাকা হয়। তামাক ইচ্ছা করুন।

    নন্দ বসুর বাড়িটি খুব বড় তাই ঠাকুর বলিতেছেন (Kathamrita)— যদুর বাড়ি এত বড় নয়; তাই তাকে সেদিন বললাম।

    নন্দ— হাঁ, তিনি জোড়াসাঁকোতে নূতন বাড়ি করেছেন।

    ঠাকুর নন্দ বসুকে উৎসাহ দিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (নন্দ বসুর প্রতি) — তুমি সংসারে থেকে ঈশ্বরের প্রতি মন রেখেছ, এ কি কম কথা? যে সংসারত্যাগী সে তো ঈশ্বরকে ডাকবেই। তাতে বাহাদুরি কি? সংসারে থেকে যে ডাকে, সেই ধন্য! সে ব্যক্তি বিশ মন পাথর সরিয়ে তবে দেখে।

    “একটা ভাব আশ্রয় করে তাঁকে ডাকতে হয়। হনুমানের জ্ঞানভক্তি, নারদের শুদ্ধাভক্তি।

    “রাম জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হনুমান! তুমি আমাকে কি ভাবে অর্চনা কর?’ হনুমান বললেন, ‘কখনও দেখি, তুমি পূর্ণ আমি অংশ; কখনও দেখি তুমি প্রভু আমি দাস; আর রাম যখন তত্ত্বজ্ঞান হয়, তখন দেখি, তুমিই আমি — আমিই তুমি।’ —

    “রাম নারদকে বললেন, ‘তুমি বর লও।’ নারদ বললেন, ‘রাম! এই বর দাও, যেন তোমার পাদপদ্মে শুদ্ধাভক্তি হয়, আর যেন তোমার ভুবনমোহিনী মায়ায় মুগ্ধ না হই!”

    এইবার ঠাকুর গাত্রোত্থান করিবেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (নন্দ বসুর প্রতি) — গীতার মত — অনেকে যাকে গণে মানে, তাতে ঈশ্বরের বিশেষ শক্তি অছে। তোমাতে ঈশ্বরের শক্তি আছে।

    নন্দ বসু — শক্তি সকল মানুষেরই সমান।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (বিরক্ত হইয়া)—ওই এক তোমাদের কথা;—সকল লোকের শক্তি কি সমান হতে পারে? বিভুরূপে তিনি সর্বভূতে এক হয়ে আছেন বটে, কিন্তু শক্তিবিশেষ!

    “বিদ্যাসাগরও (Kathamrita) ওই কথা বলছিল,—‘তিনি কি কারুকে বেশি শক্তি কারুকে কম শক্তি দিয়েছেন?’ তখন আমি বললাম—যদি শক্তি ভিন্ন না হয়, তাহলে তোমাকে আমরা কেন দেখতে এসেছি? তোমার মাথায় কি দুটো শিং বেরিয়েছে?”

    ঠাকুর গাত্রোত্থান করিলেন। ভক্তেরাও সঙ্গে সঙ্গে উঠিলেন। পশুপতি সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যুদগমন করিয়া দ্বারদেশে পৌঁছাইয়া দিলেন।

LinkedIn
Share