মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কলকাতা পুরসভার নির্বাচন কবে হবে, তার সরকারি দিনক্ষণ এখনও ঘোষণা হয়নি। তবে সম্ভাব্য নভেম্বরের পুরভোটকে সামনে রেখে আর অপেক্ষা করতে চাইছে না বঙ্গ বিজেপি। নির্বাচনী সূচি ঘোষণার আগেই সংগঠনকে মজবুত করা, ওয়ার্ডভিত্তিক সমীকরণ খতিয়ে দেখা, বুথস্তরের প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করে দিয়েছে পদ্ম শিবির। একইসঙ্গে কলকাতা ও হাওড়া পুরনিগমের জন্য পৃথক দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নামও ঘোষণা করেছে দল।
মঙ্গলবার সল্টলেকে রাজ্য বিজেপির দফতরে কলকাতার উত্তর ও দক্ষিণ অংশের বিধায়কদের নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। বৈঠকে কলকাতা পুরভোটের সম্ভাব্য পরিস্থিতি, সাংগঠনিক শক্তি এবং ভোটের রণকৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সূত্রের খবর, বিধায়কদের কাছ থেকে তাঁদের নিজ নিজ এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সংগঠনের অবস্থান সম্পর্কে বিস্তারিত রিপোর্ট এবং ফিডব্যাক নেওয়া হয়েছে।
কলকাতা পুরভোটে সুকান্ত, হাওড়ায় রাহুল
পুরনির্বাচনের প্রস্তুতিকে সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে মঙ্গলবারই দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের নাম ঘোষণা করেছে বিজেপি। কলকাতা পুরসভার নির্বাচনী প্রস্তুতির ইনচার্জ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা বিজেপি নেতা সুকান্ত মজুমদারকে। তাঁর সঙ্গে কো-ইনচার্জ হিসেবে থাকছেন রাজ্য বিজেপির সহ-সভাপতি অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায় (রাজু)। কলকাতা পুরভোটের কনভেনরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাপস রায়কে। কো-কনভেনর হয়েছেন কাশীপুর-বেলগাছিয়া বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক ঋতেশ তিওয়ারি। অন্যদিকে, হাওড়া পুরনিগমের নির্বাচনী প্রস্তুতির ইনচার্জ হয়েছেন রাজ্যসভার সাংসদ রাহুল সিনহা। বালির বিধায়ক সঞ্জয় কুমার সিংকে হাওড়ার কনভেনর করা হয়েছে। বিকেলে এ বিষয়ে দলের তরফে পূর্ণাঙ্গ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
কলকাতার জন্য পৃথক কমিটি
কলকাতা পুরভোটকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইতিমধ্যেই পৃথক কমিটি গঠন করেছে বিজেপি। এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন তাপস রায়। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সজল ঘোষ, ঋতেশ তিওয়ারি, স্বপন দাশগুপ্ত-সহ দলের একাধিক নেতা ও কর্মকর্তা। দলীয় সূত্রে খবর, কলকাতার বিভিন্ন ওয়ার্ডের রাজনৈতিক সমীকরণ, স্থানীয় সংগঠন এবং ভোটারদের মনোভাব সম্পর্কে যাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তাঁদেরই কমিটিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই কমিটির দায়িত্বও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পুরভোটের প্রচারের বিষয়বস্তু নির্ধারণ, জনসংযোগের কৌশল তৈরি, কোন ইস্যুকে সামনে রেখে প্রচার চালানো হবে তা ঠিক করা এবং বিজেপির সংকল্পপত্র তৈরির মতো বিষয়গুলি নিয়ে কাজ করবে কমিটি। পাশাপাশি, সম্ভাব্য প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রেও এই কমিটির মতামত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বিধায়কদের থেকে নেওয়া হল ওয়ার্ডভিত্তিক রিপোর্ট
সল্টলেকের দলীয় কার্যালয়ে হওয়া বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক তথা বাংলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সুনীল বনসল, কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার এবং রাজ্য সাধারণ সম্পাদক অমিতাভ চক্রবর্তী। বৈঠকে স্বপন দাশগুপ্ত, সজল ঘোষ, ঋতেশ তিওয়ারি, শারদ্বত মুখোপাধ্যায়-সহ একাধিক বিধায়ক ও শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকের মূল আলোচ্য ছিল কলকাতা পুরসভার সম্ভাব্য নির্বাচনী পরিস্থিতি। কোন ওয়ার্ডে সংগঠনের শক্তি কতটা, কোথায় সাংগঠনিক দুর্বলতা রয়েছে, বুথস্তরে প্রস্তুতি কতদূর এগিয়েছে এবং সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কারা গ্রহণযোগ্য—এই বিষয়গুলির উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিধায়কদের কাছ থেকে উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতার বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সংগঠনকে বুথস্তর পর্যন্ত আরও সক্রিয় ও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
নভেম্বরেই কি কলকাতা পুরভোট?
কলকাতা পুরসভার ভোটের সরকারি সূচি এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে বিজেপি-সহ রাজনৈতিক মহলে নভেম্বর মাসে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজ্য সরকারের তরফেও ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নতুন পুরবোর্ড গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে একাধিকবার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে বলে সূত্রের খবর। এই সম্ভাবনাকে মাথায় রেখেই আগেভাগে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে বিজেপি। কারণ অক্টোবর মাসে দুর্গাপুজো এবং পরবর্তী সময়ে দীপাবলির মতো উৎসব থাকায় নির্বাচনের ঠিক আগে হাতে সময় কমে যেতে পারে। ফলে এখন থেকেই বুথ, ওয়ার্ড এবং প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে কাজ শুরু করতে চাইছে দল।
বদলেছে কলকাতা-হাওড়ার ওয়ার্ডের সমীকরণও
আসন্ন পুরভোটের আগে কলকাতা ও হাওড়া পুরনিগমের ওয়ার্ড বিন্যাস নিয়েও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে। রাজ্য বিধানসভায় ইতিমধ্যেই দুটি বিল পাশ হয়েছে। তার মধ্যে হাওড়া পুরনিগমের ওয়ার্ড সংখ্যা ৫০ থেকে বাড়িয়ে ৬৮ করার প্রস্তাব রয়েছে। কলকাতা পুরসভার ক্ষেত্রেও ওয়ার্ড সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।কলকাতা পুরসভা সূত্রে খবর, আসন পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত খসড়া রিপোর্ট ইতিমধ্যেই জমা পড়েছে। ফলে দুই পুরনিগমের ক্ষেত্রেই নতুন আসন বিন্যাস অনুযায়ী সাংগঠনিক প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে রাজনৈতিক দলগুলিকে।
প্রার্থী বাছাইয়ে বিজেপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
কলকাতা ও হাওড়া—দুই পুরনিগমের ক্ষেত্রেই বিপুল সংখ্যক আসনে প্রার্থী দিতে হবে রাজনৈতিক দলগুলিকে। বিজেপি সূত্রের দাবি, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর দলীয় সংগঠনের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে। ফলে সম্ভাব্য আসনের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি টিকিটপ্রার্থী রয়েছে দলের অন্দরে। তাঁদের মধ্য থেকে গ্রহণযোগ্যতা, সাংগঠনিক দক্ষতা, স্থানীয় পরিচিতি এবং জয়ের সম্ভাবনা—একাধিক মাপকাঠিতে প্রার্থী বাছাই করতে চাইছে নেতৃত্ব। সেই কারণেই নির্বাচন ঘোষণার আগেই প্রাথমিক তালিকা তৈরির কাজ শুরু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, কলকাতা ও হাওড়া পুরভোটকে সামনে রেখে বঙ্গ বিজেপির প্রস্তুতি এখন আর শুধু বৈঠক বা সাংগঠনিক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা ঘোষণা, বিশেষ কমিটি গঠন, বিধায়কদের কাছ থেকে ওয়ার্ডভিত্তিক রিপোর্ট সংগ্রহ এবং বুথস্তরের প্রস্তুতি—সব মিলিয়ে পুরভোটের ময়দানে আগেভাগেই সংগঠনকে নামিয়ে দিতে চাইছে বিজেপি।
