তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
কেউ চোদ্দ বছর বয়সি আবার কেউ সতেরো! ইতিমধ্যেই তাঁরা মা! কেউ দুই সন্তানের আবার কেউ তিন সন্তানের জন্ম দিয়েছেন! রাজ্য জুড়ে নাবালিকা মায়ের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে! তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রসবকালে মায়ের মৃত্যু! এই জোড়া বিপদে কপালে ভাঁজ স্বাস্থ্য মহলে! স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারোদ্বত মুখোপাধ্যায় অবশ্য জানিয়েছেন, দ্রুত পরিস্থিতি সামলানোর জন্য প্রশাসন সব রকমভাবে তৎপর হবে। নাবালিকা বিয়ে রুখতে হবে। নাবালিকা মায়ের সংখ্যা কমবে। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই মা হওয়ার জেরেই স্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে, প্রসূতি মৃত্যুর মতো ঘটনাও বাড়ছে। একাধিক সন্তানের জন্ম দেওয়ার জেরে মায়ের প্রাণ সংশয় বাড়ছে। নাবালিকা বিয়ে রুখতে প্রশাসন সব রকম ভাবেই তৎপর থাকবে।
কী বলছে পরিসংখ্যান? কেন বাড়ছে উদ্বেগ?
সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্য জুড়ে মারাত্মক হারে বেড়েছে নাবালিকা মায়ের সংখ্যা। দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে পশ্চিমবঙ্গ। ঝাড়খণ্ডের পরেই নাবালিকা মায়ের নিরিখে রাজ্যের স্থান দ্বিতীয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, রাজ্যের একাধিক জেলায় সমীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, প্রতি চারজন মায়ের মধ্যে একজন মা নাবালিকা। বিশেষত, কোচবিহার, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ জেলায় নাবালিকা মায়ের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেশি। কোচবিহারে নাবালিকা মায়ের সংখ্যা রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ২৭.৩ শতাংশ নাবালিকা মা এই জেলায়! বীরভূম ও পশ্চিম মেদিনীপুরে ২৫ শতাংশ এবং মুর্শিদাবাদে ২০ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান দেখে উদ্বিগ্ন রাজ্য প্রশাসন।
স্বাস্থ্য কর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, রাজ্যে প্রসূতি মৃত্যুর ঘটনায় যথেষ্ট উদ্বিগ্ন প্রশাসন। একাধিক জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকেই প্রসূতি মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। কেন প্রসূতি মৃত্যু এই তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়েই জানা যাচ্ছে, প্রসূতি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নাবালিকা। তাই মায়ের মৃত্যুর ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে। মা প্রাপ্ত বয়স্ক না হলে, মায়ের শারীরিক গঠন ঠিক মতো হয় না। এর ফলে সন্তান ধারণ করলে একাধিক সমস্যা তৈরি হয়। প্রসবকালে অতিরিক্ত রক্তপাতের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে যায়। স্নায়ুর জটিলতা তৈরি হয়। সবমিলিয়ে মায়ের প্রাণ সংশয় তৈরি হয়। আবার স্বাস্থ্য কর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সমস্যা হয়ে উঠেছে, একাধিক প্রসব। তাঁরা জানাচ্ছেন, একদিকে নাবালিকা মা, আরেক দিকে আট থেকে দশটি সন্তান প্রসবের চাপ, সব মিলিয়ে মায়ের স্বাস্থ্য চূড়ান্ত অবহেলিত হচ্ছে। এর ফলেই প্রসূতি মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
কেন রাজ্যের এই পরিস্থিতি?
প্রশাসনের একাংশ জানাচ্ছেন, সব মহলের তৎপরতার অভাবের জেরেই রাজ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৯ সাল থেকেই পরিস্থিতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক ছিলো। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিলো, নাবালিকা মায়ের নিরিখে দেশে দ্বিতীয় স্থানে পশ্চিমবঙ্গ। ১৬ শতাংশ নাবালিকা মা এই রাজ্যে। ২০২৪ সালের আরেকটি পরিসংখ্যানেও একই রকম পরিস্থিতি জানান দেয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের তরফেও একাধিকবার রাজ্যকে এই নিয়ে সতর্ক করা হয়। কিন্তু সব মহলের তৎপরতার অভাব যে স্পষ্ট সেটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। গত এক দশকে এই রাজ্যে নাবালিকা বিয়ে রুখতে রাজ্য প্রশাসন ব্যর্থ ছিলো। তাই রাজ্য জুড়ে নাবালিকা মায়ের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।
নয়া কোন পদক্ষেপ নেবে প্রশাসন?
স্বাস্থ্য কর্তাদের একাংশ জানাচ্ছেন, রাজ্য জুড়ে প্রচার কর্মসূচি চালানো হবে। প্রাপ্ত বয়স্ক মা দুটি সন্তানের জন্ম দিলে কী ধরনের সরকারি সাহায্য পেতে পারেন, সেই সম্পর্কে লাগাতার প্রচার কর্মসূচি নেওয়া হবে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে আশা কর্মীরা প্রসূতির স্বাস্থ্যের খবর রাখবেন। যাতে প্রসূতি মৃত্যু আটকানো সহজ হয়। তাছাড়া নাবালিকা বিয়ে রুখতে সচেতনতার পাশপাশি আইন মাফিক কড়া পদক্ষেপ যাতে নেওয়া হয়, সেটাও প্রশাসনের সব মহল দেখবেন। পুলিশের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হবে। স্কুল স্তর থেকেই নাবালিকা বিয়ে এবং নাবালিকা মা হওয়ার বিপদ সম্পর্কে একাধিক কর্মশালার আয়োজন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, প্রশাসনের সব মহলের সমান তৎপরতা থাকলে নাবালিকা বিয়ে আটকানো সম্ভব হবে। তবেই নাবালিকা মায়ের সংখ্যা কমবে। রাতারাতি পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে না। কারণ, এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদি। নাবালিকা বিয়ে ও কিশোরী মায়ের সংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যা শুধু স্বাস্থ্য সঙ্কট নয়। বরং এটা জটিল সামাজিক সমস্যা। তাই এই সমস্যা সমাধানে সব মহলের সমান সমন্বয় এবং তৎপরতা জরুরি। তবেই রাজ্যের পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব।
