তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
বাতাসে এখন পুজোর গন্ধ! ফুটে ওঠা পদ্ম আর মাঠের কাশফুল জানান দিচ্ছে মা আসছেন! আর মাত্র কয়েক দিন। শহর থেকে গ্রাম, উৎসবের আনন্দে সেজে উঠেছে। কিন্তু সব আনন্দের মাঝেও উদ্বেগ রয়েছে! বিশেষত বাড়িতে বয়স্ক বাবা-মায়ের স্বাস্থ্য নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। পুজোর মরশুমে এলাকার পরিচিত চিকিৎসক, এমনকি নানান হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্য কর্মীদের অনেকেই ছুটিতে থাকেন। ফলে, সহজেই স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এমনকি পুজোর সময় বিশেষ দিনে ওষুধের দোকান ও বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু স্বাস্থ্য সঙ্কট তো যেকোনো সময় হতে পারে! তখন? এই প্রশ্ন ভাবিয়ে তোলে!
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, আগাম কিছু পরিকল্পনা করে রাখলে এবং কয়েকটি ব্যাপারে বাড়তি নজরদারি ও সচেতনতা বজায় রাখলে, পুজোর দিনগুলোতে বড় বিপদ আটকানো যেতে পারে। পরিবারের বয়স্ক সদস্যেরাও যাতে নির্বিঘ্নে পুজোর দিনগুলোতে আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, তার জন্য প্রয়োজন বাড়তি একটু সচেতনতা।
পুজোর আগে কী পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা?
চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা!
অধিকাংশ পরিবারের বয়স্ক সদস্যকে কোনো একজন নির্দিষ্ট চিকিৎসক দেখেন। তাঁর পরামর্শ মেনেই তিনি নিয়মিত ওষুধ খান। তাঁর সঙ্গে আগাম আলোচনা জরুরি। রোগীর শারীরিক অবস্থা কেমন, কোন ধরনের বিপদ ঘটতে পারে, কোন দিকে বাড়তি নজর রাখতে হবে, সেগুলো চিকিৎসক সবচেয়ে ভালো পরামর্শ দিতে পারবেন। রোগীর শারীরিক পরিস্থিতির নিরিখে, সেগুলো বুঝতে পারলে বড় সঙ্কট এড়ানো সহজ হয়।
ওষুধের তালিকা স্পষ্ট থাকা জরুরি!
বহু পরিবারেই বয়স্কেরা উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ কিংবা কিডনির অসুখে ভুগছেন। তাঁদের নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। এই ওষুধ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। কোন ওষুধ কতটা পরিমাণে কখন খেতে হবে, সে ব্যাপারে চিকিৎসকের কাছে পরিষ্কার জেনে নেওয়া দরকার। ওষুধের তালিকা স্পষ্ট থাকা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়িতে রাখা দরকার। কারণ, পুজোর সময়ে অনেকক্ষেত্রে ওষুধের দোকান বন্ধ রাখা হয়। ফলে, হঠাৎ যাতে সমস্যা না হয়, সেটা দেখা জরুরি।
জরুরি পরিস্থিতিতে কী করবেন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা!
রোগীর কোন ধরনের সমস্যা রয়েছে, কিডনি হোক বা হৃদরোগ, কখন বাড়তি সতর্কতা নিতে হবে, কোন পরিস্থিতিতে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা জরুরি। কারণ, সেই অসচেতনতা অনেক সময় বড় বিপদ ঘটায়। তাই চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। তাহলে বাড়তি উদ্বেগ কমবে আবার বিপদ ঘটলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হবে।
প্রয়োজনীয় শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে!
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, কিডনি, হার্টের সমস্যা বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে পুজোর আগে চিকিৎসকের পরামর্শ মতো শারীরিক পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া জরুরি। কারণ, শারীরিক পরীক্ষা করালে বিপদ সম্পর্কে আন্দাজ পাওয়া সহজ হয়। ফলে পরিকল্পনা সেই মতো করা যায়। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কিনা, উচ্চ রক্তচাপ বাড়তি বিপদ তৈরি করছে কিনা কিংবা কিডনির সমস্যা থাকলে কতখানি সঙ্কট হতে পারে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। তাই আগাম আন্দাজ পেতে কিছু শারীরিক পরীক্ষা বাড়তি সাহায্য করবে।
হাসপাতাল এবং অ্যাম্বুলেন্সের যোগাযোগ নম্বর এবং বিকল্প চিকিৎসকের খোঁজ রাখা জরুরি!
দুর্গাপুজোর সময় অনেকেই ছুটিতে থাকেন। আবার কেউ কেউ কর্মরত থাকেন। এলাকায় বিকল্প কোন চিকিৎসকদের পুজোর মরশুমে সহজে পাওয়া যেতে পারে, সেই যোগাযোগ নম্বর রাখা জরুরি। তাহলে বড় সমস্যা হলে সহজেই পরামর্শ নেওয়া যাবে। আবার স্থানীয় কয়েকটি হাসপাতাল এবং অ্যাম্বুলেন্সের নম্বর রাখা জরুরি। কারণ গভীর রাতে বা এমন কোনো সময় হঠাৎ সমস্যা হলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য এগুলো অত্যন্ত জরুরি। পুজোর দিনে সেগুলোর পরিষেবা পাওয়া যাবে কিনা, সেটা আগাম যাচাই করে রাখতে হবে।
প্রস্তুত রাখতে হবে চেক লিস্ট!
- বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বাড়িতে বয়স্কেরা থাকলে পুজোর সময় একটা চেক লিস্ট রাখা জরুরি। অর্থাৎ, হঠাৎ বড় বিপদ হলে যাতে সহজেই সামলে দেওয়া যায়, তাই আগাম কয়েকটি জিনিস তৈরি করে রাখতে হবে।
তাঁদের পরামর্শ,
● ১. প্রেসক্রিপশন ও ওষুধের তালিকা এমন জায়গায় রাখতে হবে, যাতে সহজেই পাওয়া যায়।
● ২. বয়স্ক সদস্য ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যায় আক্রান্ত হলে গ্লুকোমিটার, রক্তচাপ মাপার যন্ত্র বাড়িতে রাখতে হবে। যাতে আচমকা শর্করা বা রক্তচাপ ওঠানামা করছে কিনা সেটা যাচাই করতে হবে।
● ৩. পরিচয় পত্র ও স্বাস্থ্য বিমার কার্ড নির্দিষ্ট জায়গায় রাখতে হবে, যাতে বড় বিপদ হলেও পরিস্থিতি সামলানো সহজ হয়।
● ৪. হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাঙ্কের মতো জরুরি পরিষেবা পাওয়া যায়, এমন জায়গায় নম্বর ঠিকমতো জেনে রাখা দরকার। যাতে আপদকালীন সময়ে সাহায্য পাওয়া সহজ হয়।
উৎসবের দিনগুলোতেও জীবন যাপনে বাড়তি নজর!
উৎসবের দিনে অনিয়ম হয়ে যায়। কিন্তু বাড়ির বয়স্কদের সুস্থ রাখতে জীবন যাপনে নজরদারি প্রয়োজন। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, উৎসব বা আনন্দের দিনে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া, বিশেষত অনিয়মিতভাবে অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া যাতে না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। বয়স্কদের অতিরিক্ত তেল মশলা জাতীয় খাবার না দেওয়া বা মিষ্টি জাতীয় খাবার খাওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।
বয়স্কদের পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে কিনা সেদিকে নজর রাখতে হবে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, পর্যাপ্ত বিশ্রাম না হলে বয়স্কদের অনিয়মিতভাবে রক্তচাপ ওঠানামা করতে পারে। ফলে, নানান শারীরিক সমস্যা হতে পারে। তাই আনন্দ উদযাপনের মধ্যেও বয়স্কদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের দিকটি নজরে রাখতে হবে।
জল খাওয়ার দিকে নজর দিতে হবে। এমনটাই জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা তাঁরা জানাচ্ছেন, বহু অসুখ বেড়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত পরিমাণে জল না খাওয়া। তাই পরিবারের বয়স্কেরা ঠিকমতো জল পান করছেন কিনা সেটাও নজরে রাখা জরুরি।
পড়ে যাওয়া আটকাতে বাড়তি সতর্কতা!
চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, বয়স্কদের বিপদ বাড়িয়ে দেয় হঠাৎ পড়ে যাওয়া। তাই বাড়িতে বয়স্ক বাবা-মা থাকলে অ্যান্টি স্কিপ ম্যাট লাগিয়ে রাখা দরকার। তাছাড়া মাথা ঘোরা বা এমন ধরনের উপসর্গ দেখা দিলে কখনোই একা ছাড়া উচিত নয়। বিছানা থেকে শৌচালয় যাওয়ার পথে পর্যাপ্ত আলো রাখতে হবে। আবার বাথরুম যাতে শুকনো থাকে সেদিকেও নজর দিতে হবে। রাতের দিকে একা শৌচালয়ে যাওয়া চলবে না। বরং পরিবারের কেউ সঙ্গে থাকা দরকার। যাতে বড় বিপদ না হয়।
কখন বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে?
পরিবারের বয়স্ক সদস্য হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেলে কিংবা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে বাড়তি সতর্ক হতে হবে। বুকে ব্যথা, শ্বাসকষ্ট বা বারবার বমির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেয়ে হবে। অপেক্ষা করা উচিত নয়। বরং দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
