মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আজ ১১ সেপ্টেম্বর। স্বামী বিবেকানন্দের (Swami Vivekananda) ঐতিহাসিক শিকাগো ভাষণের ১৩৩তম বর্ষপূর্তি। ১৮৯৩ সালের এই দিনেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে বিশ্বধর্ম সম্মেলনে হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণের শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর সেই ঐতিহাসিক ভাষণ শুধু বিশ্বধর্ম সম্মেলনেই আলোড়ন তৈরি করেনি, বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় সভ্যতা, সনাতন সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার এক শক্তিশালী পরিচয়ও তুলে ধরেছিল।
নিজের ভাষণের শুরুতেই স্বামীজি বলেছিলেন, ‘‘সিস্টার্স অ্যান্ড ব্রাদার্স অফ আমেরিকা…’’। যার অর্থ, ‘আমেরিকাবাসী ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ’। তাঁর এই সম্বোধনের পরেই প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে করতালি চলেছিল বলে জানা যায়। কারণ, বিশ্বধর্ম সম্মেলনের মঞ্চে তার আগে বক্তারা সাধারণত ‘লেডিস অ্যান্ড জেন্টলম্যান’ বলেই শ্রোতাদের সম্বোধন করেছিলেন। সেখানে স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকাবাসীকে ‘ভাই ও বোন’ বলে সম্বোধন করেন।
তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছিল ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’-এর ভাবনা, ভারতের সুপ্রাচীন সভ্যতা, সনাতন সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও পরম্পরা। একই সঙ্গে তিনি তুলে ধরেছিলেন ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ভারতীয় আদর্শ। তাঁর বক্তব্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল—ভারতবর্ষ কখনও অন্য ধর্মের ওপর আঘাত হানার পথ অনুসরণ করেনি; বরং বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষকে আশ্রয় দিয়েছে।
বিশ্বমঞ্চে স্বামীজির সেই ভাষণ সেদিন ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করেছিল। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারতীয় সভ্যতা ও সনাতন ধর্মের উদারতার একটি শক্তিশালী পরিচয় বিশ্বের সামনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাঁর ঐতিহাসিক শিকাগো ভাষণের নির্বাচিত কিছু অংশ ও তার তাৎপর্য দেখে নেওয়া যাক।
পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন সন্ন্যাসী-সমাজের পক্ষ হইতে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জানাইতেছি
‘‘হে আমার আমেরিকাবাসী ভগিনী ও ভ্রাতৃবৃন্দ, আজ আপনারা আমাদিগকে যে আন্তরিক ও সাদর অভ্যর্থনা করিয়াছেন, তাহার উত্তর দিবার জন্য উঠিতে গিয়া আমার হৃদয় অনির্বচনীয় আনন্দে পরিপূর্ণ হইয়া গিয়াছে। পৃথিবীর মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন সন্ন্যাসী-সমাজের পক্ষ হইতে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জানাইতেছি। সর্বধর্মের যিনি প্রসূতি-স্বরূপ, তাঁহার নামে আমি আপনাদিগকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করিতেছি। সকল জাতি ও সম্প্রদায়ের অন্তর্গত কোটি কোটি হিন্দু নরনারীর হইয়া আমি (Swami Vivekananda) আপনাদিগকে ধন্যবাদ দিতেছি।’’
আমরা শুধু সকল ধর্মকেই সহ্য করি না, সকল ধর্মকেই আমরা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি
‘‘এই সভামঞ্চে সেই কয়েকজন বক্তাকেও আমি ধন্যবাদ জানাই, যাঁহারা প্রাচ্যদেশীয় প্রতিনিধিদের সম্বন্ধে এরূপ মন্তব্য প্রকাশ করিলেন যে, অতি দূরদেশবাসী জাতিসমূহের মধ্য হইতে যাঁহারা এখানে সমাগত হইয়াছেন, তাঁহারাও বিভিন্ন দেশে পরধর্মসহিষ্ণুতার ভাব প্রচারের গৌরব দাবি করিতে পারেন। যে ধর্ম জগৎকে চিরকাল পরমতসহিষ্ণুতা ও সর্বাধিক মত স্বীকার করার শিক্ষা দিয়া আসিতেছে, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি। আমরা শুধু সকল ধর্মকেই সহ্য করি না, সকল ধর্মকেই আমরা সত্য বলিয়া বিশ্বাস করি। যে ধর্মের পবিত্র সংস্কৃত ভাষায় ইংরেজি ‘এক্সক্লুশন’ (ভাবার্থঃ বহিষ্কার, পরিবর্জন) শব্দটি অনুবাদ করা যায় না, আমি সেই ধর্মভুক্ত বলিয়া গর্ব অনুভব করি। যে জাতি পৃথিবীর সকল ধর্মের ও সকল জাতির নিপীড়িত ও আশ্রয়প্রার্থী জনগণকে চিরকাল আশ্রয় দিয়া আসিয়াছে, আমি (Swami Vivekananda) সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত বলিয়া নিজেকে গৌরবান্বিত মনে করি।’’
আমরাই ইহুদিদের খাঁটি বংশধরগণের অবশিষ্ট অংশকে সাদরে হৃদয়ে ধারণ করিয়া রাখিয়াছি
‘‘আমি আপনাদের এ কথা বলিতে গর্ব অনুভব করিতেছি যে, আমরাই ইহুদিদের খাঁটি বংশধরগণের অবশিষ্ট অংশকে সাদরে হৃদয়ে ধারণ করিয়া রাখিয়াছি; যে বৎসর রোমানদের ভয়ঙ্কর উৎপীড়নে তাহাদের পবিত্র মন্দির বিধ্বস্ত হয়, সেই বৎসরই তাহারা দক্ষিণভারতে আমাদের মধ্যে আশ্রয়লাভের জন্য আসিয়াছিলেন। জরাথুষ্ট্রের অনুগামী মহান পারসিক জাতির অবশিষ্টাংশকে যে ধর্মাবলম্বীগণ আশ্রয় দান করিয়াছিল এবং আজ পর্যন্ত যাহারা তাঁহাদিগকে প্রতিপালন করিতেছেন, আমি তাঁহাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’’
‘যত মত তত পথ’-এর ভাবনা
স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ভাষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বিভিন্ন ধর্ম ও মতের প্রতি তাঁর উদার দৃষ্টিভঙ্গি। বিভিন্ন পথ অনুসরণ করেও মানুষ যে একই পরম লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে, সেই ভাবনাই তিনি তুলে ধরেছিলেন।
‘‘বিভিন্ন নদীর উৎস বিভিন্ন স্থানে, কিন্তু তাহারা সকলে যেমন এক সমুদ্রে তাহাদের জলরাশি ঢালিয়া মিলাইয়া দেয়, তেমনই হে ভগবান, নিজ নিজ রুচির বৈচিত্র্যবশতঃ সরল ও কুটিল নানা পথে যাহারা চলিয়াছে, তুমিই তাহাদের সকলের একমাত্র লক্ষ্য। পৃথিবীতে এযাবৎ অনুষ্ঠিত সম্মেলনগুলির মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাসম্মেলনে গীতা-প্রচারিত সেই অপূর্ব মতেরই সত্যতা প্রতিপন্ন করিতেছি, সেই বাণীই ঘোষণা করিতেছিঃ ‘যে যথা মাং প্রপদ্যন্তে তাংস্তথৈব ভজাম্যহম্। মম বর্ত্মানুবর্তন্তে মনুষ্যাঃ পার্থ সর্বশঃ।।’ (যে কোনও ব্যক্তি যে ভাব আশ্রয় করিয়া আসুক না কেন, আমি তাহাকে সেই ভাবেই অনুগ্রহ করিয়া থাকি। হে অর্জুন মনুষ্যগণ সর্বতোভাবে আমার পথেই চলিয়া থাকে)।’’
সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি ও ধর্মোন্মত্ততার বিরুদ্ধে স্বামীজির বার্তা
স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো ভাষণের শেষাংশে ছিল সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি ও ধর্মোন্মত্ততার বিরুদ্ধে স্পষ্ট বার্তা। মানবসভ্যতার অগ্রগতির পথে ধর্মের নামে হিংসা ও বিভাজন যে কতটা ভয়ঙ্কর, তা তিনি সেদিন বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছিলেন।
‘‘সাম্প্রদায়িকতা, গোঁড়ামি ও এগুলির ভয়াবহ ফলস্বরূপ ধর্মোন্মত্ততা এই সুন্দর পৃথিবীকে বহুকাল অধিকার করিয়া রাখিয়াছে। ইহারা পৃথিবীকে হিংসায় পূর্ণ করিয়াছে, বরাবর ইহাকে নরশোণিতে সিক্ত করিয়াছে, সভ্যতা ধ্বংস করিয়াছে এবং সমগ্র জাতিকে হতাশায় মগ্ন করিয়াছে। এই-সকল ভীষণ পিশাচগুলি যদি না থাকিত, তাহা হইলে মানবসমাজ আজ পূর্বাপেক্ষা অনেক উন্নত হইত। তবে ইহাদের মৃত্যুকাল উপস্থিত; এবং আমি সর্বতোভাবে আশা করি, এই ধর্ম-মহাসমিতির সম্মানার্থ আজ যে ঘণ্টাধ্বনি নিনাদিত হইয়াছে, তাহাই সর্ববিধ ধর্মোন্মত্ততা, তরবারি অথবা লিখনীমুখে অনুষ্ঠিত সর্বপ্রকার নির্যাতন এবং একই লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর ব্যক্তিগণের মধ্যে সর্ববিধ অসদ্ভাবের সম্পূর্ণ অবসানের বার্তা ঘোষণা করুক।’’
খেতড়ির রাজা অজিত সিংহের সাহায্যে স্বামীজি পৌঁছান আমেরিকা
তবে স্বামী বিবেকানন্দের আমেরিকা সফরের পথ মোটেই সহজ ছিল না। উত্তর-পূর্ব রাজস্থানের খেতড়ির রাজা অজিত সিংহ তাঁকে শিকাগো যাওয়ার জন্য ‘ওরিয়েন্ট’ জাহাজের ফার্স্ট ক্লাসের টিকিট কিনে দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। আমেরিকায় পৌঁছেও অবশ্য স্বামীজিকে নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এমনকী বর্ণবিদ্বেষেরও শিকার হয়েছিলেন তিনি।
তৎকালীন আমেরিকার একাংশের মানুষের কাছে ভারত ছিল অত্যন্ত পিছিয়ে থাকা একটি দেশ। সেই পরিস্থিতিতেই শিকাগো পৌঁছে স্বামী বিবেকানন্দ বিশ্বধর্ম সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন হেনরি রাইটের ব্যক্তিগত পরিচিতি ও সুপারিশের মাধ্যমে সম্মেলনে তাঁর বক্তৃতা দেওয়ার পথ খুলে যায়।
১৮৯৩ সালের সেই ভাষণ আজও ভারতীয় ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ধর্মীয় সহিষ্ণুতা, মানবিকতা, বহুত্ববাদ এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের যে বার্তা স্বামী বিবেকানন্দ সেদিন দিয়েছিলেন, ১৩৩ বছর পরেও তার প্রাসঙ্গিকতা অটুট।
