Tag: ভারতীয় নৌবাহিনী

  • Project 75I: ভারতের সঙ্গে সাবমেরিন চুক্তি সই করতে প্রস্তুত, বড় দাবি জার্মানির, ৮০ হাজার কোটি টাকার অঙ্কই নেপথ্য কারণ!

    Project 75I: ভারতের সঙ্গে সাবমেরিন চুক্তি সই করতে প্রস্তুত, বড় দাবি জার্মানির, ৮০ হাজার কোটি টাকার অঙ্কই নেপথ্য কারণ!

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারত-জার্মানি প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় বড়সড় অগ্রগতির ইঙ্গিত। প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৮০ হাজার কোটি) মূল্যের ছয়টি অত্যাধুনিক প্রচলিত শক্তিচালিত সাবমেরিন তৈরির চুক্তিতে সই করতে প্রস্তুত বার্লিন। জার্মান রাষ্ট্রদূত জ্যাসপার ভিক জানিয়েছেন, চুক্তির নথিপত্র জার্মানির তরফে চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে। এখন ভারতের অভ্যন্তরীণ অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষা।

    প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি ভারতের প্রজেক্ট-৭৫(আই)-এর আওতায়। জার্মানির থাইসেনক্রুপ মেরিন সিস্টেমস (TKMS) এবং ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত মাজাগাঁও ডক শিপবিল্ডার্স লিমিটেড (MDL) যৌথভাবে ভারতে ছয়টি সাবমেরিন তৈরি করবে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এটি শুধু বিদেশ থেকে তৈরি সাবমেরিন কেনার চুক্তি নয়। ভারতে উৎপাদন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরই এই অংশীদারিত্বের অন্যতম মূল লক্ষ্য।

    সইয়ের জন্য প্রস্তুত জার্মানি, অপেক্ষা ভারতের অনুমোদনের

    ২৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জার্মান রাষ্ট্রদূত জ্যাসপার ভিক জানান, জার্মানির দিক থেকে চুক্তির নথি চূড়ান্ত। ভারতের তরফে প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া শেষ হলেই চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব। তিনি জানান, জার্মানি “যে কোনও মুহূর্তে” চুক্তিতে সই করতে প্রস্তুত।

    অর্থাৎ, এই মুহূর্তে মূল বিষয় চুক্তির জার্মান অংশের প্রস্তুতি নয়, বরং ভারতের প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পূর্ণ করা। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকল্পটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার, যদিও চূড়ান্ত চুক্তিমূল্য ভারতের অনুমোদন ও চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পরই নিশ্চিত হবে।

    ছয় সাবমেরিন তৈরি হবে ভারতেই

    প্রজেক্ট-৭৫(আই)-এর আওতায় ছয়টি পরবর্তী প্রজন্মের প্রচলিত সাবমেরিন তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলিতে থাকবে এয়ার ইন্ডিপেন্ডেন্ট প্রপালশন (AIP) প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির সাহায্যে প্রচলিত ডিজেল-ইলেকট্রিক সাবমেরিনের তুলনায় দীর্ঘ সময় জলের নীচে অবস্থান করা সম্ভব হয়, কারণ বারবার বায়ুমণ্ডলীয় অক্সিজেনের জন্য ভেসে ওঠার প্রয়োজন কমে যায়।

    প্রকল্পটির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, সাবমেরিনগুলির নির্মাণ ভারতে করার পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে দেশের নিজস্ব সাবমেরিন উৎপাদন পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করা। ২০২৫ সালেই থাইসেনক্রুপ এবং মাঝগাঁও এই প্রকল্প নিয়ে আনুষ্ঠানিক চুক্তি আলোচনায় প্রবেশ করেছিল।

    শুধু সাবমেরিন নয়, প্রযুক্তি হস্তান্তরই বড় বিষয়

    জার্মান রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে ‘রিয়েল পার্টনারশিপ’ বা প্রকৃত অংশীদারিত্বের কথা। অর্থাৎ, থাইসেনক্রুপ শুধু তৈরি সাবমেরিন ভারতে সরবরাহ করবে না; ভারতীয় শিল্প সংস্থার সঙ্গে মিলে দেশেই উৎপাদন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে।

    এর প্রভাব একটি নির্দিষ্ট প্রকল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা নেই। সাবমেরিন নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারিং, যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, সেন্সর, যুদ্ধব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সাপ্লাই চেনের একাধিক ভারতীয় সংস্থা এই সহযোগিতার মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। থাইসেনক্রুপও জানিয়েছে, মাঝগাঁও-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব ভারতের দেশীয় সাবমেরিন নির্মাণ সক্ষমতা বাড়ানোর বৃহত্তর প্রচেষ্টার সঙ্গে যুক্ত।

    জার্মানির প্রতিরক্ষা রফতানি নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

    এই সাবমেরিন চুক্তির তাৎপর্য শুধু ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য নতুন প্ল্যাটফর্ম পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জার্মানির ভারতের প্রতি প্রতিরক্ষা রফতানি নীতির পরিবর্তনও।

    জ্যাসপার ভিক জানিয়েছেন, ভারতকে ঘিরে জার্মানির প্রতিরক্ষা রফতানি নীতিতে কার্যত “১৮০ ডিগ্রি পরিবর্তন” এসেছে। ভারতের জন্য লাইসেন্স দেওয়া এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বার্লিন এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি প্রস্তুত বলে তিনি জানিয়েছেন। জার্মানির দৃষ্টিতে ভারত একটি বিশ্বাসযোগ্য অংশীদার বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

    ইউক্রেন যুদ্ধ, দ্রুত বদলে যাওয়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং যুদ্ধে ড্রোন ও অন্যান্য মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব—এই পরিবর্তনের পটভূমিতে রয়েছে বলে জার্মান পক্ষের বক্তব্য।

    কেন ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তি?

    ভারতের জন্য এই প্রকল্পের গুরুত্ব কয়েকটি স্তরে দেখা যায়।

    • প্রথমত, সাবমেরিন বহর আধুনিকীকরণ। ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য প্রচলিত সাবমেরিনের সংখ্যা ও সক্ষমতা বাড়ানো দীর্ঘদিনের প্রয়োজন। প্রজেক্ট-৭৫(আই) সেই বৃহত্তর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
    • দ্বিতীয়ত, দেশে সাবমেরিন তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি। বিদেশি প্রযুক্তি ও ভারতীয় উৎপাদন পরিকাঠামোর সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্পের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
    • তৃতীয়ত, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বৈচিত্র্য। রাশিয়া ভারতের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলিতে নয়াদিল্লি একাধিক দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়িয়েছে। জার্মানির সঙ্গে গভীরতর অংশীদারিত্ব সেই বৈচিত্র্যকেই আরও বিস্তৃত করবে।
    • চতুর্থত, ইউরোপীয় প্রযুক্তির সঙ্গে বৃহত্তর সংযোগ। জার্মানির সঙ্গে সাবমেরিন প্রকল্প সফলভাবে এগোলে ভবিষ্যতে নৌবাহিনীর বাইরেও অন্যান্য উচ্চপ্রযুক্তির প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে যৌথ কাজের সুযোগ বাড়তে পারে।

    সাবমেরিনের বাইরে ড্রোন, সাইবার, ক্ষেপণাস্ত্রেও সহযোগিতা?

    জার্মান রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ ভারত-জার্মানি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র শুধু সাবমেরিনে সীমাবদ্ধ নয়। মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থা, সাইবার সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এবং সেন্সর—এই ক্ষেত্রগুলিতেও দুই দেশ সহযোগিতা বাড়াতে পারে।

    এর ফলে সাবমেরিন চুক্তিকে একটি পৃথক প্রতিরক্ষা ক্রয়চুক্তি হিসেবে না দেখে ভারত-জার্মানি প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা যায়। ভারতীয় সংস্থাগুলির সঙ্গে জার্মান সংস্থাগুলির যৌথ কাজ বাড়লে ভবিষ্যতে সহ-উৎপাদন ও প্রযুক্তি সহযোগিতার আরও ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।

    ইন্দো-প্যাসিফিকেও বাড়ছে ভারত-জার্মানি যোগাযোগ

    সামরিক ক্ষেত্রেও ভারত ও জার্মানির যোগাযোগ বাড়ছে। দুই দেশের বাহিনী বিভিন্ন আকাশ ও সামুদ্রিক মহড়ায় অংশ নিয়েছে। পাশাপাশি জার্মানি নয়াদিল্লির ইন্দো-প্যাসিফিক ইনফরমেশন ফিউশন সেন্টারে একজন লিয়াজোঁ অফিসার মোতায়েন করেছে। এর লক্ষ্য ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য আদানপ্রদান ও মেরিটাইম ডোমেন অ্যাওয়ারনেস বাড়ানো।

    এছাড়া চলতি বছর দুই দেশ প্রতিরক্ষা শিল্প সহযোগিতা আরও গভীর করার লক্ষ্যে একটি ডিফেন্স ইন্ডাস্ট্রিয়াল রোডম্যাপের মাধ্যমে সহযোগিতার কাঠামো এগিয়ে নিয়েছে। ফলে প্রজেক্ট-৭৫(আই)-কে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের বৃহত্তর শিল্পভিত্তিক পরিবর্তনের একটি অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

    অতীতেও জার্মান প্রযুক্তির সাবমেরিন ভারতে এসেছে

    ভারত-জার্মানি সাবমেরিন সহযোগিতা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। ভারতের মাজাগন ডক ১৯৮০-র দশকে জার্মান ডিজাইনের টাইপ-২০৯ শ্রেণির সাবমেরিন নির্মাণ করেছিল। সেই অভিজ্ঞতা ভারতের সাবমেরিন নির্মাণ পরিকাঠামোর ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

    তবে প্রজেক্ট-৭৫(আই)-এর পরিসর অনেক বড়। এবার লক্ষ্য শুধু সাবমেরিন তৈরি নয়, উন্নত প্রযুক্তি, দেশীয় উৎপাদন এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্প সক্ষমতাকে একই কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।

    বদলাচ্ছে ভারত-জার্মানি প্রতিরক্ষা সমীকরণ

    সব মিলিয়ে, প্রজেক্ট-৭৫(আই) ভারতের জন্য ছয়টি নতুন সাবমেরিন পাওয়ার প্রকল্পের চেয়েও বেশি কিছু। একদিকে এটি ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রচলিত সাবমেরিন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত, অন্যদিকে দেশীয় প্রতিরক্ষা উৎপাদনে উন্নত প্রযুক্তি আনার সুযোগ তৈরি করছে।

    জার্মানির দিক থেকেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে ভারতকে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা অংশীদার হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। আর ভারতের জন্য জার্মানি হয়ে উঠছে উন্নত ইউরোপীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সহযোগিতার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

    তবে এখনই চুক্তি সম্পূর্ণ হয়েছে বলা যাচ্ছে না। জার্মানি সইয়ের জন্য প্রস্তুত হলেও ভারতের প্রয়োজনীয় অভ্যন্তরীণ অনুমোদন এখনও বাকি। সেই প্রক্রিয়া শেষ হলেই প্রজেক্ট-৭৫(আই) আনুষ্ঠানিক চুক্তির পর্যায়ে প্রবেশ করবে।

  • Owned By India: ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পেরিয়ে ‘ওন্ড বাই ইন্ডিয়া’! বদলাচ্ছে ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশল

    Owned By India: ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ পেরিয়ে ‘ওন্ড বাই ইন্ডিয়া’! বদলাচ্ছে ভারতের প্রতিরক্ষা কৌশল

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পরিবর্তিত ও অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ভারতের প্রতিরক্ষা নীতিতে আত্মনির্ভরতা এখন আর শুধুমাত্র ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। লক্ষ্য ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত—প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ভারতে তৈরি করা থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, উৎপাদন, সরবরাহশৃঙ্খল এবং যুদ্ধক্ষমতার নিয়ন্ত্রণও ভারতের হাতে রাখা। গত এক বছরে নীতি সংস্কার, দেশীয় বরাত, বেসরকারি শিল্পের অংশগ্রহণ, স্টার্টআপ এবং তিন বাহিনীর আধুনিকীকরণে একাধিক পদক্ষেপ সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।

    প্রতিরক্ষা কেনাকাটা নীতিতে বড় বদল

    প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে আধুনিকীকরণ বাজেটের ৭৫ শতাংশ দেশীয় শিল্প থেকে কেনাকাটার জন্য নির্দিষ্ট করা হয়েছিল। এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বেসরকারি ভারতীয় শিল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। অর্থাৎ, অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের বাজারে ভারতীয় সংস্থাগুলিকে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার নিশ্চয়তা দেওয়ার পাশাপাশি সরকারি সংস্থার বাইরে বেসরকারি শিল্পকেও প্রতিরক্ষা উৎপাদনের মূল পরিকাঠামোর অংশ করে তোলার চেষ্টা হয়েছে।

    ২০২০ সালের ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন প্রসিডিওর বা ডিএপি-র পর্যালোচনাও শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত ডিএপি ২০২৬-এ দ্রুত বদলে যাওয়া প্রযুক্তির ক্ষেত্রে ‘স্পাইরাল অ্যাকুইজিশন’-এর মাধ্যমে ধাপে ধাপে প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম কেনার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। একইসঙ্গে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আরও নিচের স্তরে দেওয়া, অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমানো এবং অটোমেশনের মাধ্যমে কেনাকাটার সময় কমানোর উপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

    নতুন ‘বাই গ্লোবাল, ম্যানুফ্যাকচার ইন ইন্ডিয়া’ ব্যবস্থার লক্ষ্য বিদেশি অরিজিনাল ইকুইপমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার বা ওইএম-কে ভারতে উৎপাদন পরিকাঠামো তৈরিতে উৎসাহিত করা। ফলে শুধু মূল অস্ত্র নয়, যন্ত্রাংশ ও গুরুত্বপূর্ণ স্পেয়ারও ধীরে ধীরে দেশেই তৈরি করার সুযোগ তৈরি হবে।

    আমদানি কমাতে স্থানীয় উৎপাদন, এমএসএমই-তে জোর

    দেশে আগে তৈরি হয়নি, কিন্তু স্থানীয়ভাবে উৎপাদন সম্ভব—এমন গুরুত্বপূর্ণ কম্পোনেন্ট ও সাব-সিস্টেমকে আমদানির বিকল্প হিসেবে তৈরি করতে চালু হয়েছে মেক-৩ ক্যাটেগরি। এদিকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত মূলধনী প্রতিরক্ষা প্রকল্পে এমএসএমই-দের জন্য বিশেষ সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্তত দু’টি যোগ্য এমএসএমই অংশ নিলে এই সীমা ১৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। ফলে ছোট ও মাঝারি ভারতীয় সংস্থাগুলিও বড় প্রতিরক্ষা সরবরাহশৃঙ্খলে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছে।

    শুধু গবেষণাগারে প্রযুক্তি তৈরিই নয়, সেটিকে দ্রুত সেনাবাহিনীর হাতে পৌঁছে দেওয়ার উপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। আইডেক্স এবং টেকনোলজি ডেভেলপমেন্ট ফান্ড-এর মাধ্যমে তৈরি সফল স্টার্টআপ প্রোটোটাইপকে দ্রুত অ্যাকসেপ্ট্যান্স অব নেসেসিটি বা এওএন-এর পথে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রযুক্তি পরীক্ষায় সফল হলে সংশ্লিষ্ট স্টার্টআপকে পাঁচ বছর পর্যন্ত নিশ্চিত বরাত দেওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।

    মেক-১ ব্যবস্থায় দেশীয় প্রোটোটাইপ তৈরির খরচের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত সরকার বহন করছে। একইসঙ্গে আগে সীমিত থাকা সামরিক পরীক্ষাকেন্দ্রগুলিও বেসরকারি শিল্পের জন্য খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে প্রতিরক্ষা গবেষণায় বেসরকারি সংস্থার আর্থিক ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা হচ্ছে।

    ৬.৭৩ লক্ষ কোটি টাকার ৫৫টি বড় অনুমোদন

    ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ডিফেন্স অ্যাকুইজিশন কাউন্সিল বা ডিএসি প্রায় ৬.৭৩ লক্ষ কোটি টাকার ৫৫টি মূলধনী প্রতিরক্ষা প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে। এই অনুমোদনের তালিকায় ছিল দেশীয় কিউআরএসএএম এয়ার-ডিফেন্স সিস্টেম, উন্নত ইন্টিগ্রেটেড ড্রোন ডিটেকশন অ্যান্ড ইন্টারডিকশন সিস্টেম এবং নেট্রা-র উন্নত এইডব্লিউঅ্যান্ডসি এমকে-১এ সংস্করণ।

    তিন বাহিনীর জন্য মিডিয়াম অল্টিটিউড লং এন্ডিউরেন্স বা মেল ড্রোন, আরও ৯৭টি তেজস এমকে-১এ যুদ্ধবিমান এবং নৌবাহিনীর জন্য রাফাল মেরিন-এর মতো বড় প্রকল্পও রয়েছে। অর্থাৎ, আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য শুধু ছোট অস্ত্র বা যন্ত্রাংশে সীমাবদ্ধ থাকছে না; যুদ্ধবিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি বিমান এবং ড্রোনের মতো উচ্চপ্রযুক্তির ক্ষেত্রেও দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

    ‘রুদ্র’, ‘ভৈরব’, ‘অশ্নি’—বদলাচ্ছে সেনাবাহিনীর কাঠামো

    যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে ভারতীয় সেনাবাহিনীও কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোনোমাস সিস্টেম, হাইপারসনিক অস্ত্র, ড্রোন এবং ডিরেক্টেড এনার্জি ওয়েপনকে ভবিষ্যতের যুদ্ধের সম্ভাব্য বড় পরিবর্তনকারী প্রযুক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

    ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মার্ড ব্রিগেড এবং মাউন্টেন ব্রিগেডকে পুনর্গঠন করে রুদ্র অল-আর্মস ব্রিগেড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য হল বিভিন্ন যুদ্ধশাখার ক্ষমতাকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে দ্রুত ও সমন্বিত অভিযান চালানো।

    এর পাশাপাশি প্রায় ২৬৪ জন সদস্যের ভৈরব লাইট কমান্ডো ব্যাটালিয়ন, শক্তিবাণ আর্টিলারি রেজিমেন্ট এবং দিব্যাস্ত্র ব্যাটারি গঠনের কাজ এগিয়েছে। প্রতিটি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নে অশ্নি ড্রোন প্লাতুন তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে ব্যাটালিয়ন স্তরেই ড্রোন-নির্ভর নজরদারি শক্তিশালী করা যায়।

    অপারেশন সিঁদুরের পর ড্রোনে আরও জোর

    ২০২৫ সালের অপারেশন সিঁদুর-এর অভিজ্ঞতা বিশেষ করে আনম্যান্ড এরিয়াল সার্ভেল্যান্স বা ইউএএস, কাউন্টার-ইউএএস এবং লয়টারিং মিউনিশনের ক্ষেত্রে দেশীয় সক্ষমতার প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। সেই অনুযায়ী সেনাবাহিনীতে ইউএএস ও কাউন্টার-ইউএএস ব্যবস্থার জন্য একটি বিশেষ কোর কমিটি তৈরি হয়েছে।

    দ্রুত গবেষণা ও উৎপাদনের জন্য বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন স্পেশাল পারপাস ভেহিকল তৈরির পরিকল্পনা এবং অদিতি ও আইডেক্স-এর অধীনে নয়টি ফাস্ট ট্র্যাক ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য—যেসব প্রযুক্তির ঘাটতি যুদ্ধক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়েছে, সেগুলি দ্রুত দেশীয়ভাবে তৈরি করা।

    নৌবাহিনীতেও একের পর এক দেশীয় যুদ্ধজাহাজ

    আত্মনির্ভরতার সবচেয়ে দৃশ্যমান ছবি পাওয়া যাচ্ছে ভারতীয় নৌবাহিনীতে। ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে একের পর এক দেশীয় যুদ্ধজাহাজ কমিশন হয়েছে—আইএনএস অর্নালা, আইএনএস নিস্তার, আইএনএস উদয়গিরি, আইএনএস হিমগিরি, আইএনএস অন্ধ্রোথ, আইএনএস ইক্ষক এবং আইএনএস মাহে।

    ২০২৬ সালে সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আইএনএস অঞ্জদীপ। এরপর একসঙ্গে আইএনএস অরিধমন ও আইএনএস তারাগিরি নৌবহরে যুক্ত হয়। আইএনএস অরিধমন ভারতের পারমাণবিক শক্তিচালিত ব্যালিস্টিক মিসাইল সাবমেরিন বহরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

    এরপর কলকাতায় একদিনে আইএনএস দুনাগিরি, আইএনএস সংশোধক এবং আইএনএস অগ্রয় কমিশন করা হয়। সর্বশেষ তালিকায় যুক্ত হয়েছে আইএনএস নিপুণ। অর্থাৎ, যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে দেশীয় শিপইয়ার্ডের সক্ষমতা এবং উৎপাদনের গতি—দুই ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

    অপারেশন সিঁদুরে তিন বাহিনীর সক্ষমতার পরীক্ষা

    ২০২৫ সালের অপারেশন সিঁদুর ভারতের প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণের বাস্তব পরীক্ষাও হয়ে ওঠে। নৌবাহিনী উত্তর আরব সাগরে ক্যারিয়ার ব্যাটল গ্রুপ ও সাবমেরিন-সহ গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম মোতায়েন করে। সারফেস, এয়ার, স্পেস এবং শোর-বেসড সেন্সরের সমন্বয়ে মেরিটাইম ডোমেন অ্যাওয়ারনেস বজায় রাখা হয়।

    বিমানবাহিনীর ক্ষেত্রেও অপারেশন সিঁদুর ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দূরপাল্লার প্রিসিশন-গাইডেড ওয়েপন ব্যবহার করে পাকিস্তানের সামরিক ও সন্ত্রাসবাদী পরিকাঠামোয় হামলা চালানো হয়। পাল্টা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সময়ে ইন্টিগ্রেটেড এয়ার কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল সিস্টেম বা আইএসিসিএস-এর মাধ্যমে বহুস্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা পরিচালিত হয়।

    প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ২০২৫-২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, অপারেশন সিঁদুরের সময়ে একটি ভারতীয় এস-৪০০ ইউনিট ৩১৪ কিলোমিটার দূর থেকে পাকিস্তানের একটি স্পেশাল-মিশন এয়ারক্র্যাফ্ট ধ্বংস করে। রিপোর্টে এটিকে ‘লংগেস্ট সারফেস-টু-এয়ার কিল’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

    লক্ষ্য শুধু অস্ত্র তৈরি নয়, গোটা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশীয় করা

    গত এক বছরের নীতি ও সামরিক পরিবর্তনকে একসঙ্গে দেখলে একটি বিষয় স্পষ্ট—ভারতের আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা নীতি এখন শুধু বিদেশি অস্ত্রের পরিবর্তে ভারতীয় অস্ত্র কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

    কাঁচামাল, কম্পোনেন্ট, ডিজাইন, গবেষণা ও উন্নয়ন, প্রোটোটাইপ, পরীক্ষা, উৎপাদন, সরবরাহশৃঙ্খল, রক্ষণাবেক্ষণ এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার—পুরো ব্যবস্থাটিকেই দেশীয় করার দিকে এগোচ্ছে ভারত।

    এই প্রক্রিয়ায় সরকারি প্রতিরক্ষা সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি শিল্প, এমএসএমই এবং স্টার্টআপকে আরও বেশি করে যুক্ত করা হচ্ছে। দেশীয় শিল্প থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনার জন্য মূলধনী বাজেটের ৭৫ শতাংশ নির্দিষ্ট রাখার নীতি এই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

    ফলে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ এখন ধীরে ধীরে আরও বিস্তৃত ‘ওন্ড বাই ইন্ডিয়া’ ধারণার দিকে এগোচ্ছে—যেখানে শুধু অস্ত্রের গায়ে ভারতের নাম থাকাই নয়, সেই অস্ত্রের প্রযুক্তি, উৎপাদন ক্ষমতা, সরবরাহশৃঙ্খল এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণও দেশের হাতে রাখাই হয়ে উঠছে মূল লক্ষ্য।

  • India Pakistan Navy Ship Collision: আরব সাগরে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজকে ধাক্কা পাকিস্তানের নৌযানের! পাক কূটনীতিককে ডেকে কড়া প্রতিবাদ দিল্লির

    India Pakistan Navy Ship Collision: আরব সাগরে ভারতীয় যুদ্ধজাহাজকে ধাক্কা পাকিস্তানের নৌযানের! পাক কূটনীতিককে ডেকে কড়া প্রতিবাদ দিল্লির

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আরব সাগরে ভারত ও পাকিস্তানের নৌবাহিনীর দুই জাহাজের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে ফের কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হল। মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় উত্তর আরব সাগরে আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটনাটি ঘটে। বুধবার নয়াদিল্লিতে পাকিস্তানের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ভারত।

    ভারতীয় সরকারি সূত্রের দাবি, ওই সময় ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ নিয়মিত নজরদারি মিশনে ছিল। সেই সময় পাকিস্তানি নৌবাহিনীর একটি জাহাজ দ্রুত গতিতে ভারতীয় জাহাজটির কাছে চলে আসে এবং ‘অপেশাদার ও অনিরাপদ’ পদ্ধতিতে গতিপথ পরিবর্তন করে। এর জেরেই দুই জাহাজের মধ্যে সংঘর্ষ হয় বলে ভারতীয় সূত্রের দাবি। তবে ঘটনায় কোনও প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর নেই।

    পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিককে তলব

    ঘটনার পর বুধবার পাকিস্তান হাইকমিশনের চার্জ দ্যা’ফেয়ার্সকে বিদেশ মন্ত্রকে তলব করে ভারত। পাকিস্তানি নৌ-ইউনিটের আচরণকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও অপেশাদার’ বলে উল্লেখ করে শক্ত প্রতিবাদ জানানো হয়। একইসঙ্গে ইসলামাবাদে নিযুক্ত ভারতের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সকেও পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের কাছে একই বিষয় উত্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

    ১৯৯১ সালের চুক্তির প্রসঙ্গ কেন?

    ঘটনাটিকে শুধু নৌ-দুর্ঘটনা হিসেবে দেখছে না নয়াদিল্লি। ভারতের বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তানি নৌ-জাহাজের আচরণ ১৯৯১ সালের ভারত-পাকিস্তান ‘অ্যাডভান্স নোটিশ অন মিলিটারি এক্সারসাইজেস, ম্যানুভার্স অ্যান্ড ট্রুপস মুভমেন্টস’ চুক্তির ১০ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে বিপজ্জনক পরিস্থিতি এড়ানো এবং আস্থা তৈরির ব্যবস্থার অংশ হিসেবেই ওই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখযোগ্যভাবে, এর আগে ২০১১ সালেও পাকিস্তানি নৌজাহাজের ঝুঁকিপূর্ণ গতিবিধি নিয়ে ভারত একই ১৯৯১ সালের চুক্তির ১০ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

    আন্তর্জাতিক জলসীমায় সংঘর্ষ, তদন্তের অপেক্ষা

    এবারের ঘটনাটি কোনও দেশের territorial waters-এ নয়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটেছে। এখনও পর্যন্ত দুই নৌযানের নাম বা সংঘর্ষের ঠিক আগের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত সরকারি তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি। পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও বুধবার পর্যন্ত ঘটনার কোনও বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে সংঘর্ষের প্রকৃত কারণ এবং দুই পক্ষের গতিবিধি নিয়ে আরও তথ্য ও তদন্তের অপেক্ষা রয়েছে।

    প্রাণহানি বা বড় ক্ষয়ক্ষতি না হলেও ভারত-পাকিস্তানের মতো সংবেদনশীল সামরিক সম্পর্কে আন্তর্জাতিক জলসীমায় দুই দেশের যুদ্ধজাহাজের এমন সংঘর্ষকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সমুদ্রে সামরিক ইউনিটগুলির নিরাপদ দূরত্ব, যোগাযোগ এবং নির্ধারিত প্রোটোকল মেনে চলার বিষয়টি ফের সামনে এসেছে।

  • INS Nipun: সাবমেরিন বিপদে পড়লে এবার দ্রুত উদ্ধার! ভারতীয় নৌসেনার হাতে এল দেশীয় শক্তির ‘আইএনএস নিপুণ’

    INS Nipun: সাবমেরিন বিপদে পড়লে এবার দ্রুত উদ্ধার! ভারতীয় নৌসেনার হাতে এল দেশীয় শক্তির ‘আইএনএস নিপুণ’

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং গভীর সমুদ্রে সাবমেরিন উদ্ধার অভিযানে নতুন মাত্রা যোগ করল ভারতীয় নৌবাহিনী। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ডাইভিং সাপোর্ট ভেসেল (ডিএসভি) আইএনএস নিপুণ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় নৌবাহিনীতে কমিশনড হয়েছে। মুম্বইয়ের নেভাল ডকইয়ার্ডে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে জাহাজটিকে নৌবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

    বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ডুবুরি অভিযানেই নয়, গভীর সমুদ্রে বিপদে পড়া সাবমেরিনের দ্রুত উদ্ধার, জটিল আন্ডারওয়াটার অপারেশন এবং দুর্যোগ মোকাবিলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে আইএনএস নিপুণ। দেশের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগের আওতায় প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে দেশীয় জাহাজ নির্মাণের সক্ষমতারও বড় উদাহরণ এই যুদ্ধজাহাজ।

    কী এই আইএনএস নিপুণ?

    আইএনএস নিপুণ হল ভারতীয় নৌবাহিনীর নিস্তার শ্রেণির ডাইভিং সাপোর্ট ভেসেল। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা হিন্দুস্তান শিপইয়ার্ড লিমিটেড (এইচএসএল), বিশাখাপত্তনমে জাহাজটি নির্মাণ করেছে। ‘নিপুণ’ একটি সংস্কৃত শব্দ। যার অর্থ হল কোনও কঠিন কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সম্পন্ন করতে সক্ষম। জাহাজটির অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও অভিযানের ক্ষমতার সঙ্গে নামটিরও রয়েছে যথেষ্ট সামঞ্জস্য। জাহাজটি ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই ভারতীয় নৌবাহিনীতে কমিশনড হওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। এরপর বিভিন্ন পরীক্ষা এবং নৌবাহিনীতে পূর্ণাঙ্গ অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় চূড়ান্ত প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়।

    ৩০০ মিটার গভীরেও চলবে ডাইভিং অপারেশন

    আইএনএস নিপুণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে এর গভীর সমুদ্রে ডাইভিং এবং আন্ডারওয়াটার ইন্টারভেনশন ক্ষমতা। জাহাজটি সমুদ্রের প্রায় ৩০০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত ডাইভিং অপারেশনকে সহায়তা করতে পারে। অর্থাৎ, সাধারণ উদ্ধারকারী জাহাজের তুলনায় অনেক বেশি গভীরতায় গিয়ে জটিল ডুবুরি অভিযান পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দীর্ঘ সময় ধরে সহায়তা করার ক্ষমতা রয়েছে নিপুণের। জাহাজে রয়েছে আধুনিক ডাইভিং সিস্টেম, পানির তলায় হস্তক্ষেপ বা মেরামতির জন্য বিশেষ সরঞ্জাম এবং ডুবুরিদের চিকিৎসা সহায়তার ব্যবস্থা। ফলে সমুদ্রের তলায় কোনও গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটির পরিদর্শন বা প্রয়োজনীয় কাজেও জাহাজটি ব্যবহার করা যাবে।

    সাবমেরিন বিপর্যয়ে ‘নিপুণ’ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

    ভারতের কাছে সাবমেরিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ। কিন্তু গভীর সমুদ্রে কোনও সাবমেরিন দুর্ঘটনার মুখে পড়লে দ্রুত উদ্ধার অভিযান চালানো অত্যন্ত কঠিন। এই জায়গাতেই আইএনএস নিপুণের গুরুত্ব অনেক বেশি। জাহাজটি সাবমেরিন রেসকিউ অপারেশনে দ্রুত সহায়তা দেওয়ার জন্য তৈরি। প্রয়োজন অনুযায়ী গভীর সমুদ্রে গিয়ে উদ্ধারকারী দল, ডুবুরি এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামকে অপারেশন এলাকায় নিয়ে যেতে পারবে এটি। একই সঙ্গে জাহাজটির উন্নত স্টেশন কিপিং ক্ষমতা রয়েছে। অর্থাৎ সমুদ্রের প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নির্দিষ্ট জায়গায় নিজের অবস্থান ধরে রেখে আন্ডারওয়াটার অপারেশনে সহায়তা করতে পারবে। এর ফলে কোনও সাবমেরিন দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে উদ্ধারকারী দলের কাজ আরও দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

    শুধু সামরিক অভিযান নয়, দুর্যোগেও কাজে আসবে

    আইএনএস নিপুণের ব্যবহার কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সমুদ্র দুর্ঘটনা কিংবা মানবিক বিপর্যয়ের সময়ও জাহাজটিকে কাজে লাগানো যাবে। প্রয়োজনে এটি ডিজাস্টার রিলিফ এবং হিউম্যানিটারিয়ান অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যান্ড ডিজাস্টার রিলিফ (এইচএডিআর) অভিযানে অংশ নিতে পারবে।

    অত্যাধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্ম ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং নির্দিষ্ট অবস্থানে জাহাজকে ধরে রাখার প্রযুক্তি থাকায় প্রতিকূল সমুদ্র পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন ধরনের জটিল উদ্ধার অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে এটি কার্যকর হবে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বক্তব্য অনুযায়ী, ডাইভিং, আন্ডারওয়াটার ইন্টারভেনশন এবং মেডিক্যাল সাপোর্ট—এই সমস্ত ক্ষমতা একত্রিত করে আইএনএস নিপুণকে একটি ইন্টিগ্রেটেড আন্ডারওয়াটার অপারেশন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

    ৭৫ শতাংশ দেশীয় প্রযুক্তি

    আইএনএস নিপুণের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল এর দেশীয় নির্মাণ। জাহাজটির প্রায় ৭৫ শতাংশ উপাদান সম্পূর্ণ দেশীয়। ভারতীয় শিল্প সংস্থা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলির (এমএসএমই) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এর নির্মাণে। এর ফলে গভীর সমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধার এবং আন্ডারওয়াটার মিশনের ক্ষেত্রে বিদেশি প্রযুক্তি ও সরঞ্জামের উপর নির্ভরতা কমানোর পথ আরও প্রশস্ত হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য পূরণে এই ধরনের দেশীয়ভাবে নির্মিত প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। কারণ যুদ্ধ পরিস্থিতি বা আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনও বাধা তৈরি হলেও দেশীয়ভাবে তৈরি জাহাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়।

    পূর্ব ও পশ্চিম—দুই উপকূলেই বাড়ল উদ্ধার ক্ষমতা

    আইএনএস নিপুণকে বোঝার ক্ষেত্রে ভারতের প্রায় ৭,৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ উপকূলরেখার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই শ্রেণির প্রথম জাহাজ আইএনএস নিস্তার ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভারতীয় নৌবাহিনীতে কমিশনড হয়। সেটি ভারতের পূর্ব উপকূলে বিশাখাপত্তনমে মোতায়েন রয়েছে। এবার পশ্চিম উপকূলে মুম্বইয়ে আইএনএস নিপুণের মোতায়েনের ফলে ভারতের দুই প্রান্তেই ডাইভিং সাপোর্ট এবং সাবমেরিন উদ্ধার সক্ষমতা তৈরি হল। এর কৌশলগত গুরুত্ব যথেষ্ট। পূর্ব উপকূলের পাশাপাশি আরব সাগর ও পশ্চিম উপকূলেও দ্রুত কোনও গভীর সমুদ্র উদ্ধার অভিযানে সাড়া দেওয়া সম্ভব হবে। ফলে ভারতের বিস্তীর্ণ সামুদ্রিক এলাকায় দুই দিক থেকে দ্রুত রেসপন্স দেওয়ার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী হল।

    কেন গুরুত্বপূর্ণ আইএনএস নিপুণ?

    আইএনএস নিপুণকে শুধু আর একটি নৌবাহিনীর জাহাজ হিসেবে দেখলে এর কৌশলগত গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝা যাবে না। এর মাধ্যমে ভারত একই সঙ্গে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা বাড়াল—গভীর সমুদ্রে ডাইভিং, সাবমেরিন উদ্ধার এবং আন্ডারওয়াটার ইন্টারভেনশন। বিশেষ করে মুম্বইয়ে মোতায়েনের ফলে পশ্চিম উপকূলের গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাঁটি ও আরব সাগর এলাকায় এই সক্ষমতা আরও সহজলভ্য হবে। পূর্বে আইএনএস নিস্তার এবং পশ্চিমে আইএনএস নিপুণ—দুই জাহাজকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় নৌবাহিনী সাবমেরিন উদ্ধার ও গভীর সমুদ্র অভিযানে একটি বিস্তৃত সাপোর্ট নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারবে। সব মিলিয়ে, আত্মনির্ভর ভারতের প্রতিরক্ষা উৎপাদন, গভীর সমুদ্র অভিযান এবং সাবমেরিন নিরাপত্তা—এই তিন ক্ষেত্রেই আইএনএস নিপুণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

LinkedIn
Share