Tag: ভারতের বিদেশ মন্ত্রক

  • India at UN: রাষ্ট্রসংঘে ভারতের কড়া বার্তা! ‘যাচাইহীন অভিযোগে কলঙ্কিত করা যাবে না বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রকে’

    India at UN: রাষ্ট্রসংঘে ভারতের কড়া বার্তা! ‘যাচাইহীন অভিযোগে কলঙ্কিত করা যাবে না বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রকে’

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে ভারতের বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে কড়া অবস্থান নিল নয়াদিল্লি। যাচাই না করা অভিযোগ, অসম্পূর্ণ পরিসংখ্যান এবং নির্দিষ্ট দেশ সম্পর্কে পর্যবেক্ষণহীন রিপোর্টের ভিত্তিতে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা বরদাস্ত করা হবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিল ভারত। একইসঙ্গে ভারতের বক্তব্য, মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আলোচনা ও সহযোগিতায় নয়াদিল্লি প্রস্তুত। তবে সেই প্রক্রিয়া হতে হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ এবং তথ্যনির্ভর। মানবাধিকারকে কোনও দেশের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি বা বেছে বেছে নিশানা করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

    রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদের তৃতীয় কমিটিতে এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স বা জোরপূর্বক গুম সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের আলোচনা চলাকালীন ভারতের এই অবস্থান সামনে আসে। সেখানে বিদেশ মন্ত্রকের ডেপুটি সেক্রেটারি বরখা তামরাকার ভারতের বক্তব্য তুলে ধরেন। তাঁর দাবি, যাচাই না করা অভিযোগকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরা এবং মানবিক উদ্বেগের ভিত্তিতে পাঠানো যোগাযোগকে দেশের বিরুদ্ধে রায়ের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।

    ‘যাচাইহীন অভিযোগ দিয়ে ভারতকে কলঙ্কিত করা যাবে না’

    রাষ্ট্রসংঘে ভারতের প্রতিনিধি বরখা তামরাকার বলেন, “যাচাই না করা অভিযোগ, অসম্পূর্ণ পরিসংখ্যান কিংবা ভারত সম্পর্কে কোনও দেশ-নির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ নেই এমন রিপোর্টকে ব্যবহার করে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের নেতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরির যে কোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করে ভারত।”

    একইসঙ্গে তিনি জানান, নির্দিষ্ট এবং যথাযথ নথিপত্র-সহ উপস্থাপিত ঘটনার বিষয়ে প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাখ্যা দিতে ভারত প্রস্তুত। অর্থাৎ, মানবাধিকার সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে আলোচনার দরজা বন্ধ করতে চাইছে না নয়াদিল্লি। বরং ভারতের আপত্তি, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই সেগুলিকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য বা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতায়।

    ভারতের বক্তব্য, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলির সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই সহযোগিতার ভিত্তি হতে হবে আলোচনা, পরামর্শ, পারস্পরিক সহযোগিতা, নিরপেক্ষতা এবং স্বচ্ছতা। কোনও নির্দিষ্ট দেশকে রাজনৈতিকভাবে চাপে ফেলার উদ্দেশ্যে মানবাধিকার সংক্রান্ত বিষয়কে ব্যবহার করা হলে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

    রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্ট নিয়ে ভারতের আপত্তি কোথায়?

    জোরপূর্বক গুম সংক্রান্ত ওয়ার্কিং গ্রুপের আলোচনা ঘিরে ভারতের মূল আপত্তি রিপোর্ট ও অভিযোগের তথ্যগত ভিত্তি নিয়ে। ভারতের বক্তব্য, রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও বিশেষ প্রতিবেদক তাঁদের রিপোর্ট তৈরির ক্ষেত্রে কখনও কখনও অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তি বা পক্ষের জমা দেওয়া তথ্যের উপর নির্ভর করেন। সেই তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা না হলে তাকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

    তামরাকার রাষ্ট্রসংঘের সদস্য দেশগুলির প্রতিনিধিদের রিপোর্টের বক্তব্য যথাযথভাবে উদ্ধৃত করার আহ্বান জানান। তাঁর কথায়, কোনও মানবিক উদ্বেগের ভিত্তিতে পাঠানো যোগাযোগকে অতিরঞ্জিত করে একটি দেশের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত রায়ের মতো তুলে ধরা উচিত নয়।

    এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে ভারত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার বিরোধিতা করার পরিবর্তে তার পদ্ধতি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। নয়াদিল্লির অবস্থান, মানবাধিকার সংক্রান্ত অভিযোগের গুরুত্ব থাকলেও প্রতিটি অভিযোগের মূল্যায়ন হওয়া উচিত প্রামাণ্য তথ্য, নির্দিষ্ট ঘটনা এবং যাচাইযোগ্য নথির ভিত্তিতে।

    সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ ও বিচারব্যবস্থার কথা তুলে ধরল ভারত

    ভারতের প্রতিনিধি আন্তর্জাতিক মঞ্চে দেশের সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষাকবচগুলির কথাও তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য, ভারত একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্র, যেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত এবং নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার সাংবিধানিকভাবে সুরক্ষিত।

    ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। কোনও ব্যক্তির বেআইনি আটক বা নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে বিচারবিভাগের হস্তক্ষেপ চাওয়ার সুযোগও রয়েছে। বিশেষত, হেবিয়াস কর্পাস বা বন্দি-উপস্থাপন সংক্রান্ত রিটের মাধ্যমে আদালত কোনও ব্যক্তিকে আটক রাখার বৈধতা খতিয়ে দেখতে পারে এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারে।

    ভারতের বক্তব্য, এই স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নাগরিকের অধিকার রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে কোনও নির্দিষ্ট ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে তার প্রকৃত মূল্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট তথ্য ও নথি পরীক্ষা করা জরুরি বলেও ভারতের অবস্থান থেকে স্পষ্ট।

    তথ্যের অধিকার থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, কী কী যুক্তি ভারতের?

    মানবাধিকার রক্ষায় ভারতের বিভিন্ন সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উল্লেখ করেন বরখা তামরাকার। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

    • ● তথ্যের অধিকার আইন (RTI): সরকারি কাজকর্মে স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

    • ● জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (NHRC): মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ গ্রহণ এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পদক্ষেপের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক মঞ্চ রয়েছে।

    • ● রাজ্য মানবাধিকার কমিশন: রাজ্যস্তরেও মানবাধিকার সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

    • ● স্বাধীন বিচারব্যবস্থা: নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষায় আদালতের হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে।

    • ● স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ: প্রশাসনের কাজকর্মের উপর নজরদারি, অভিযোগ প্রকাশ্যে আনা এবং জনস্বার্থের বিষয়গুলি তুলে ধরার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সংগঠনগুলির ভূমিকা রয়েছে।

    ভারতের মতে, এই ব্যবস্থাগুলি সম্মিলিতভাবে নাগরিকের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কোনও মূল্যায়ন করতে হলে এই প্রতিষ্ঠানগুলির ভূমিকা এবং সংশ্লিষ্ট ঘটনার বাস্তব তথ্যও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

    দিল্লিতে যুব বিক্ষোভ ঘিরে রাষ্ট্রসংঘের বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ

    ভারতের এই কড়া অবস্থানের নেপথ্যে রয়েছে দিল্লিতে যুবকদের বিক্ষোভ ঘিরে মানবাধিকার সংক্রান্ত বিতর্কও। মঙ্গলবার জেনিভায় রাষ্ট্রসংঘের ২০ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞ দিল্লিতে যুবকদের কথিত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের উপর পুলিশের বারবার কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

    বিক্ষোভ চলাকালীন মানবাধিকার লঙ্ঘনের যে অভিযোগ উঠেছে, তার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানান তাঁরা। তাঁদের বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের আচরণ এবং অভিযোগগুলির যথাযথ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার প্রশ্ন।

    অন্যদিকে, ভারতের বক্তব্য, যাচাইহীন বা অসম্পূর্ণ তথ্যের ভিত্তিতে কোনও দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছনো উচিত নয়। তবে দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলির বিষয়ে ভারতের বক্তব্য এবং রাষ্ট্রসংঘের বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ—দুটি বিষয়কেই পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য নির্দিষ্ট ঘটনা, প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ খতিয়ে দেখা জরুরি।

    ককরোচ জনতা পার্টি বিতর্কেও রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টকে ‘শোনা কথা’ বলেছিল ভারত

    রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার সংক্রান্ত রিপোর্ট নিয়ে ভারতের আপত্তি এই প্রথম নয়। এর আগে ককরোচ জনতা পার্টি (CJP) নামে একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে রাষ্ট্রসংঘের এক বিশেষ প্রতিবেদকের রিপোর্টেরও বিরোধিতা করেছিল নয়াদিল্লি।

    সেই রিপোর্টে ভারতের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ‘শোনা কথা’ বা ‘হিয়ারসে’ বলে অভিহিত করেছিল ভারত। নয়াদিল্লির বক্তব্য ছিল, অজ্ঞাত পরিচয় সূত্রের উপর নির্ভর করে এবং যাচাই না করা তথ্যের ভিত্তিতে দেশের বিরুদ্ধে বিস্তৃত অভিযোগ তোলা কোনওভাবেই নির্ভরযোগ্য প্রমাণের বিকল্প হতে পারে না।

    ভারতের প্রতিনিধি সেই সময় বলেছিলেন, “অজ্ঞাত এবং যাচাই না করা দাবির উপর ভিত্তি করে বিশ্বের বৃহত্তম যুব জনসংখ্যার বিরুদ্ধে এমন বিস্তৃত অভিযোগ কোনও প্রমাণ নয়। এটি রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্টের মোড়কে সাজানো শোনা কথা।”

    এই অবস্থানের সঙ্গে বর্তমান বক্তব্যেরও মিল রয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই ভারতের মূল আপত্তি রিপোর্টের তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা, অভিযোগ যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মঞ্চের নিরপেক্ষতা নিয়ে।

    জোরপূর্বক গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশন প্রসঙ্গ

    আলোচনায় জোরপূর্বক গুম সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিষয়টিও উঠে এসেছে। ভারত জানিয়েছে, নয়াদিল্লি International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance-এর স্বাক্ষরকারী।

    এই কনভেনশন জোরপূর্বক গুমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার কাঠামো। তবে কোনও আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করা এবং সেটির অধীনে পূর্ণাঙ্গ আইনগত বাধ্যবাধকতা গ্রহণ করা এক বিষয় নয়। কোনও রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কনভেনশনের আইনগত বাধ্যবাধকতার পরিধি নির্ধারণে তার অনুমোদন বা অনুসমর্থনের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।

    তাই ভারতের স্বাক্ষরকারী হওয়ার বিষয়টি উল্লেখযোগ্য হলেও, একে কনভেনশনের সমস্ত বাধ্যবাধকতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রহণ করার সমতুল্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।

     

LinkedIn
Share