Tag: ভারত

  • RBI Gold Reserves: ডলার ছেড়ে সোনার পথে ভারত! ৬ বছরে সর্বনিম্ন মার্কিন ট্রেজারি, বড় কৌশলগত বদল আরবিআই-এর

    RBI Gold Reserves: ডলার ছেড়ে সোনার পথে ভারত! ৬ বছরে সর্বনিম্ন মার্কিন ট্রেজারি, বড় কৌশলগত বদল আরবিআই-এর

    সুশান্ত দাস

    ভারত কি ধীরে ধীরে মার্কিন ডলারের উপর নির্ভরতা কমাচ্ছে? কেন এক বছরে ২২.৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হল মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগ? আবার কেনই বা বিদেশে রাখা শত শত টন সোনা দেশে ফিরিয়ে আনছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)? প্রথম নজরে এই ঘটনাগুলি আলাদা মনে হলেও, অর্থনীতিবিদদের মতে এগুলি আসলে একই কৌশলের অংশ। বিশ্বের দ্রুত বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও নিরাপদ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং ঝুঁকিমুক্ত করে তোলাই এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অন্যতম অগ্রাধিকার।

    কী ঘটেছে?

    ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে ভারতের মার্কিন ট্রেজারি হোল্ডিংসের পরিমাণ ২৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২২.৫ শতাংশ কমেছে মার্কিন সরকারি বন্ডে ভারতের বিনিয়োগ। এটি গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে ভারতের সোনার রিজার্ভ ৬৫৮ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে প্রায় ৮৮১ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, ২০২৩ সাল থেকে ধাপে ধাপে ৩৮০ টনেরও বেশি সোনা বিদেশের ভল্ট থেকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।এই দুটি পদক্ষেপকে একসঙ্গে দেখলেই ভারতের নতুন রিজার্ভ কৌশল স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    কেন মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগ কমাচ্ছে ভারত?

    এই প্রশ্নের সহজ উত্তর— ঝুঁকি কমানো। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ট্রেজারি বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কারণ, মার্কিন অর্থনীতি এবং ডলারের উপর আন্তর্জাতিক আস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বদলেছে।রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা দেশগুলির অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ হওয়ার নজির এবং বড় শক্তিগুলির মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতা দেখিয়ে দিয়েছে, কোনও একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই কারণেই এখন অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক একই ঝুড়িতে সব ডিম না রেখে বিভিন্ন ধরনের সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতি নিচ্ছে।

    কেন সোনা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?

    সোনা এমন একটি সম্পদ, যার মূল্য কোনও একক দেশের সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নীতির উপর নির্ভরশীল নয়। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি কিংবা মুদ্রার অস্থিরতার সময়ও সোনা সাধারণত তার গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখে। তাই একে ‘সেফ হেভেন অ্যাসেট’ বলা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির কাছে সোনা শুধু একটি বিনিয়োগ নয়, বরং আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রয়োজনে এটি সহজেই নগদে রূপান্তর করা যায় এবং কোনও বিদেশি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের উপর এর অস্তিত্ব নির্ভর করে না।

    বিদেশে সোনা রেখে ঝুঁকি কোথায়?

    অনেক দেশ ঐতিহাসিক কারণে লন্ডন, নিউ ইয়র্ক বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রে তাদের সোনা সংরক্ষণ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাবলি দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক সংঘাত বা নিষেধাজ্ঞার পরিস্থিতিতে বিদেশে রাখা সম্পদের উপর প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে যেতে পারে। এই কারণেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ধীরে ধীরে দেশের ভল্টে সোনা ফিরিয়ে আনছে। এতে ভারতের সম্পদের উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তা ব্যবহারের স্বাধীনতাও নিশ্চিত হচ্ছে।

    শুধু ভারত নয়, বিশ্বও একই পথে…

    ভারতের পাশাপাশি, চিন গত এক বছরে তাদের মার্কিন ট্রেজারি হোল্ডিংস ৭৪৩.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে ৬৫১.১ বিলিয়ন ডলারে এনেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, বিশ্বের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক আগামী বছরেও সোনার রিজার্ভ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ এটি কোনও একক দেশের সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় একটি বড় প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

    তাহলে কি ডলারের যুগ শেষ?

    এর মানে একেবারেই নয় যে, ডলারের যুগ শেষ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, তেল লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও মার্কিন ডলারই রয়েছে। ভারতও এখনও ১৮১ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ট্রেজারি ধরে রেখেছে। অর্থাৎ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ডলার ছেড়ে দিচ্ছে না; বরং ডলারের পাশাপাশি সোনা ও অন্যান্য সম্পদের ভারসাম্য বাড়াচ্ছে। এটিকে ডি-রিস্কিং বলা যায়, ডি-ডলারাইজেশন নয়।

    ভারতের জন্য এর অর্থ কী?

    এই কৌশলের মাধ্যমে ভারত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেতে পারে—

    • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও বৈচিত্র্যময় হবে।
    • আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটের ঝুঁকি কিছুটা কমবে।
    • মূল্যস্ফীতির সময় রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বাড়বে।
    • বিদেশে রাখা সম্পদের উপর নির্ভরতা কমবে।
    • দীর্ঘমেয়াদে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা আরও নমনীয় হবে।

    আগামী দিনে কী নজরে রাখবেন?

    এখন নজর থাকবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরবর্তী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংক্রান্ত তথ্যের দিকে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য বড় অর্থনীতি—বিশেষ করে চিন, জাপান, ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এবং ব্রিকস (BRICS) দেশগুলিও একই পথে এগোয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি এই প্রবণতা আরও জোরদার হয়, তাহলে আগামী দশকে বিশ্বের বৈদেশিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। যদিও মার্কিন ডলারের আধিপত্য রাতারাতি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি এখন আর একটিমাত্র সম্পদের উপর নির্ভর করে থাকতে চাইছে না।

    রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কৌশল কী?

    রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে শুধু মার্কিন ট্রেজারি বিক্রি বা সোনা কেনার ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। এটি এমন এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, যার মূল লক্ষ্য ‘নিরাপত্তা, বৈচিত্র্য এবং সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ’। অর্থাৎ ভবিষ্যতের অনিশ্চিত বিশ্বে ভারতের বৈদেশিক রিজার্ভকে এমনভাবে সাজানো, যাতে কোনও একটি দেশের নীতি, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ভারতের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধাক্কা দিতে না পারে। এই কারণেই অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, ভারতের এই পদক্ষেপ কেবল রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন নয়, বরং আগামী দশকের বৈশ্বিক আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেওয়ার একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত প্রস্তুতি।

LinkedIn
Share