Tag: ভূত চতুর্দশী

  • Bhoot Chaturdashi: ভূত চতুর্দশীর রাতে সত্যিই মর্ত্যে নেমে আসেন প্রেতাত্মারা! কী বলে প্রচলিত বিশ্বাস?

    Bhoot Chaturdashi: ভূত চতুর্দশীর রাতে সত্যিই মর্ত্যে নেমে আসেন প্রেতাত্মারা! কী বলে প্রচলিত বিশ্বাস?

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে পালিত হয় ভূত চতুর্দশী। এই তিথি আবার নরক চতুর্দশী নামেও পরিচিত। কালীপুজোর একদিন আগে এবং ধনতেরসের একদিন পর পালিত হয় এই বিশেষ দিনটি। ছোট দীপাবলি, রূপ চতুর্দশী বা নরকাসুর চতুর্দশী নামেও পরিচিত এই তিথি। তবে ভূত চতুর্দশী বলতেই বাঙালির মনে প্রথমে আসে অশরীরী আত্মা, প্রেতাত্মা এবং চোদ্দ পুরুষের স্মৃতির কথা। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই বিশেষ রাতে বিদেহী আত্মারা মর্ত্যে নেমে আসেন। তাঁদের যাতায়াতের পথ আলোকিত রাখতেই বাড়িতে আলো জ্বালানোর প্রথা প্রচলিত হয়েছে। এই তিথিকে ঘিরে রয়েছে নানা পৌরাণিক কাহিনী ও ধর্মীয় বিশ্বাস।

    ভূত চতুর্দশীর রাতে কেন মর্ত্যে আসেন প্রেতাত্মারা?

    প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ভূত চতুর্দশীর রাতে অশরীরী আত্মা ও প্রেতাত্মারা মর্ত্যলোকে ঘুরে বেড়ান। মনে করা হয়, চোদ্দ পুরুষের আত্মারাও এদিন তাঁদের বংশধরদের বাড়িতে আসেন। তাই এই রাতকে ঘিরে বাঙালি সমাজে রয়েছে নানা আচার ও প্রথা।

    আর একটি পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী, ভূত চতুর্দশীর রাতে রাজা বলি মর্ত্যে আসেন পুজো নিতে। তাঁর সঙ্গে আসেন অনুচররাও। এই কারণে প্রাচীনকাল থেকেই অমাবস্যার আগের এই রাতকে ঘিরে নানা সতর্কতামূলক লোকাচার প্রচলিত রয়েছে। অন্ধকারে যাতে অশুভ শক্তির প্রবেশ না ঘটে, সেই বিশ্বাস থেকেই বাড়িতে প্রদীপ জ্বালানোর রীতি গড়ে উঠেছে বলে মনে করা হয়।

    ভূত চতুর্দশীকে কেন নরক চতুর্দশী বলা হয়?

    ভূত চতুর্দশীর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নরকাসুর বধের কাহিনীও। বিষ্ণু পুরাণ ও শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের কাহিনী অনুযায়ী, নরকাসুর নামে এক অসুর নিজের ক্ষমতা ও শক্তির দাপটে দেবতা এবং সাধারণ মানুষকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। ১৬ হাজার নারী ও সাধুকে বন্দি করে রেখেছিল সে। নরকাসুরের অত্যাচার থেকে মুক্তি পেতে মুনি-ঋষিরা ভগবান কৃষ্ণের দ্বারস্থ হন।

    কিন্তু নরকাসুরের মৃত্যুর পিছনে ছিল একটি বিশেষ শর্ত। কেবল কোনও নারীর হাতেই তার মৃত্যু হবে, এমন অভিশাপ পেয়েছিল সে। সেই কারণে কৃষ্ণ নিজের স্ত্রী সত্যভামাকে সঙ্গে নেন। সত্যভামার সাহায্যেই নরকাসুরকে বধ করেন তিনি। যে দিন এই অসুরের বিনাশ হয়েছিল, সেটি ছিল কার্তিক মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথি। সেই থেকেই এই তিথির নাম হয় নরক চতুর্দশী।

    ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এদিন সূর্যোদয়ের আগে স্নান করলে নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অকালমৃত্যুর ভয় থেকে রক্ষা পেতে এবং যমের আশীর্বাদ লাভের আশায় এই দিনে মৃত্যুর দেবতা যমের পুজো করার প্রথাও রয়েছে।

    কেন জ্বালানো হয় ১৪টি প্রদীপ?

    ভূত চতুর্দশীর অন্যতম পরিচিত রীতি হল সন্ধ্যায় বাড়িতে ১৪টি প্রদীপ বা বাতি জ্বালানো। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, চোদ্দ পুরুষের আত্মারা যাতে তাঁদের যাতায়াতের পথে অন্ধকারে বাধা না পান, সেই জন্যই এই প্রদীপ জ্বালানো হয়। আবার অশুভ আত্মার প্রভাব থেকে বাড়িকে রক্ষা করার বিশ্বাসও এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।

    এদিন অনেক বাঙালি পরিবারে চোদ্দ শাক খাওয়ার প্রথাও রয়েছে। তবে ভূত চতুর্দশীর মূল লোকাচার ও বিশ্বাসের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত হয়ে রয়েছে প্রেতাত্মা এবং পূর্বপুরুষদের স্মরণ করার বিষয়টি।

    হ্যালোউইনের সঙ্গে ভূত চতুর্দশীর মিল কোথায়?

    ভারতে যেমন কালীপুজোর আগের দিন পালিত হয় ভূত চতুর্দশী, পশ্চিমী দুনিয়ায় তেমনই অক্টোবরের ৩১ তারিখে পালিত হয় হ্যালোউইন। মৃত আত্মাদের স্মরণ এবং বিভিন্ন লোকাচারকে কেন্দ্র করে এই উৎসবের প্রচলন। গত কয়েক বছরে ভারতেও হ্যালোউইন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

    স্কটিশ শব্দ ‘অল হ্যালোজ ইভ’ থেকে হ্যালোউইন শব্দটির উৎপত্তি। শব্দটির অর্থ পবিত্র সন্ধ্যা। হ্যালোউইনের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে কুমড়ো কেটে তৈরি করা ভৌতিক মুখের ছবি। কুমড়োর মধ্যে চোখ, নাক ও মুখের আকৃতি তৈরি করে তার ভিতরে মোমবাতি জ্বালিয়ে দেওয়ার রীতি রয়েছে। অন্ধকারে সেই আলো জ্বলতে থাকলে কুমড়োর মুখটি আরও ভৌতিক দেখায়। পাশাপাশি নানা ধরনের ভৌতিক পোশাক পরে অন্যকে ভয় দেখিয়ে মজা করেন অনেকে।

    ভূত চতুর্দশী ও হ্যালোউইনের মধ্যে কিছুটা মিল থাকলেও, দুটির ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট আলাদা। তবে অশরীরী আত্মা, পূর্বপুরুষের স্মরণ এবং অন্ধকারের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা নানা লোকবিশ্বাস দুই উৎসবকেই এক বিশেষ মাত্রা দিয়েছে।

  • Bhoot Chaturdashi 14 Diya: আজ ভূত চতুর্দশী! কেন সন্ধ্যায় জ্বালানো হয় ১৪ বাতি? জানুন ধর্মীয় তাৎপর্য

    Bhoot Chaturdashi 14 Diya: আজ ভূত চতুর্দশী! কেন সন্ধ্যায় জ্বালানো হয় ১৪ বাতি? জানুন ধর্মীয় তাৎপর্য

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কালীপুজোর (Kali Puja) ঠিক আগের দিন পালিত হয় ভূত চতুর্দশী (Bhoot Chaturdashi) বা নরক চতুর্দশী (Naraka Chaturdashi)। বাঙালির ঘরে ঘরে এই বিশেষ দিনে দুপুরে ১৪ শাক খাওয়ার এবং সন্ধ্যায় ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর রীতি প্রচলিত রয়েছে। কিন্তু কেন এই প্রথা? এর পিছনে রয়েছে একাধিক পৌরাণিক কাহিনি, ধর্মীয় বিশ্বাস ও লোকাচার।

    দুপুরে ১৪ শাক, সন্ধ্যায় ১৪ বাতি

    ভূত চতুর্দশীর দিনে যে ১৪টি শাক খাওয়ার রীতি রয়েছে, সেগুলি হল— জয়ন্তী, শাঞ্চে, হিলঞ্চ, ওল, পুঁই, বেতো, সর্ষে, কালকাসুন্দে, নিম, পলতা, শুলকা, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা ও শুষণী। এই শাক খাওয়ার পাশাপাশি সন্ধ্যায় ১৪টি প্রদীপ জ্বালিয়ে অশুভ শক্তি ও অন্ধকার দূর করার প্রথাও প্রচলিত রয়েছে।

    শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মানুষের শরীর পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। এই পঞ্চভূত হল মাটি, জল, বায়ু, অগ্নি ও আকাশ। প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুসারে, মাটি থেকে তুলে আনা ১৪ রকমের শাক খেলে অতৃপ্ত আত্মারা শান্তি পায়। যে জল দিয়ে এই শাক ধোয়া হয়, সেই জল অনেকে বাড়িতেও ছিটিয়ে দেন। তাঁদের বিশ্বাস, এর ফলে অশুভ শক্তির প্রভাব দূর হয় এবং জীবনের বাধা-বিঘ্ন কেটে যায়।

    ১৪ ভুবনের উদ্দেশ্যে ১৪ প্রদীপ!

    দুপুরে ১৪ শাক খাওয়ার পর ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যায় জ্বালানো হয় ১৪টি প্রদীপ। পুরাণে ১৪টি ভুবন বা লোকের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে সাতটি ঊর্ধ্বলোক এবং সাতটি অধোলোক।

    ঊর্ধ্বলোকগুলি হল— ভূঃ, ভুবঃ, স্বঃ, মহঃ, জনঃ, তপঃ ও সত্য। অন্যদিকে অধোলোকগুলি হল— অতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতল ও পাতাল। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই ১৪ লোকের অধিবাসীদের স্মরণ ও সম্মান জানাতেই ভূত চতুর্দশীতে ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো হয়।

    আরও একটি লোকবিশ্বাস রয়েছে। মনে করা হয়, ভূত চতুর্দশীর রাতে কিছু সময়ের জন্য স্বর্গ ও নরকের দ্বার উন্মুক্ত হয় এবং অতৃপ্ত আত্মারা মর্ত্যে নেমে আসে। রাজা বলি ও তাঁর অনুচরেরাও এই সময়ে মর্ত্যে আসেন বলে প্রচলিত ধারণা। এই রাতে অশুভ শক্তির প্রভাব বৃদ্ধি পায় বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। সেই অশুভ শক্তিকে বাড়ি থেকে দূরে রাখতেই সন্ধ্যায় ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে।

    ১৪ পূর্বপুরুষের উদ্দেশ্যে জ্বালানো হয় প্রদীপ

    ভূত চতুর্দশীতে ১৪ প্রদীপ জ্বালানোর পিছনে আরও একটি প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে। অনেকে মনে করেন, পরিবারের ১৪ পুরুষ বা পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যেই এই প্রদীপ জ্বালানো হয়। এই তালিকায় রয়েছেন পিতা, পিতামহ, প্রপিতামহ, বৃদ্ধপ্রপিতামহ, পিতামহী, প্রপিতামহী, বৃদ্ধপ্রপিতামহী, মাতা, মাতামহ, প্রমাতামহ, বৃদ্ধপ্রমাতামহ, মাতামহী, প্রমাতামহী ও বৃদ্ধপ্রমাতামহী।

    অশুভ আত্মার ভয় দূর করতে ভূত চতুর্দশীর দিনে একটি মন্ত্র পাঠের প্রথাও রয়েছে। মন্ত্রটি হল—

    ‘শীতলঞ্চ সমাযুক্ত সকণ্টক দলান্বিত। হরপাপ সপামার্গে ভ্রাম্যমাণঃ পুনঃ পুনঃ।’

    প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই মন্ত্র পাঠ করলে অশুভ আত্মার ভয় ও অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

    রাজা বলির মর্ত্যে আগমনের বিশ্বাসও রয়েছে

    হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ভূত চতুর্দশীর রাতে শিবভক্ত রাজা বলি ও তাঁর অনুচরেরা পুজো নিতে মর্ত্যে আসেন। চতুর্দশী তিথির অমাবস্যার ঘন অন্ধকারে রাজা বলির অনুচরেরা যাতে পথ ভুল করে মানুষের বাড়িতে প্রবেশ না করেন, সেই উদ্দেশ্যেও প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা রয়েছে বলে মনে করা হয়।

    অন্য একটি প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, পিতৃপক্ষের সময়ে পিতৃপুরুষেরা মর্ত্যে আসেন এবং ভূত চতুর্দশীর তিথিতেই তাঁদের ফিরে যাওয়ার সময় হয়। সেই অন্ধকার পথে তাঁদের যাত্রা সুগম করতেই ১৪টি প্রদীপ জ্বালানো হয়।

    ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যায় কোথায় কোথায় জ্বালবেন ১৪ প্রদীপ?

    ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালানোর ক্ষেত্রে বাড়ির কয়েকটি বিশেষ জায়গাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী—

    • ● ঠাকুরঘর: বাড়ির ঠাকুরঘরে অবশ্যই একটি প্রদীপ জ্বালানো হয়।
    • ● তুলসীমঞ্চ: বাড়িতে তুলসীমঞ্চ থাকলে সেখানেও একটি প্রদীপ দিতে হয়।
    • ● সদর দরজা: বাড়ির প্রধান দরজার দু’পাশে দুটি প্রদীপ জ্বালানোর রীতি রয়েছে। অনেকে প্রতিটি প্রদীপে একটি করে লবঙ্গও রাখেন।
    • ● কলতলা বা জলের জায়গা: বাড়িতে যেখানে জল ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে, অর্থাৎ কলতলায় একটি প্রদীপ দেওয়া হয়।
    • ● বাড়ির দক্ষিণ দিক: দক্ষিণ দিকে একটি প্রদীপ জ্বালানোর প্রথা রয়েছে।
    • ● মাটির উনুন: বাড়িতে মাটির উনুন থাকলে সেখানেও একটি প্রদীপ জ্বালানো হয়।

    প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এই প্রদীপগুলি পূর্বপুরুষদের স্মরণে জ্বালানো হয়। তাই ভূত চতুর্দশীর সন্ধ্যায় ১৪টি প্রদীপ জ্বালানোর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন অশুভ শক্তিকে দূরে রাখার প্রার্থনা করা হয়, অন্যদিকে তেমনই শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় পরিবারের প্রয়াত পূর্বপুরুষদের।

  • Bhoot Chaturdashi 14 Saag: ভূত চতুর্দশীতে কেন খাওয়া হয় চোদ্দ শাক? জানুন ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত রীতি

    Bhoot Chaturdashi 14 Saag: ভূত চতুর্দশীতে কেন খাওয়া হয় চোদ্দ শাক? জানুন ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রচলিত রীতি

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: আজ ভূত চতুর্দশী। কালীপুজোর ঠিক আগের দিন পালিত হয় এই বিশেষ তিথি। বাংলার ঘরে ঘরে ভূত চতুর্দশী মানেই কয়েকটি চিরাচরিত আচার। দুপুরে চোদ্দ রকমের শাক খাওয়া এবং সন্ধ্যায় বাড়িতে চোদ্দটি প্রদীপ জ্বালানো—এই দুই প্রথা বহু বছর ধরে বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই রাতে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মারা মর্ত্যলোকে ফিরে আসেন। তাঁদের স্মরণ এবং অশুভ শক্তির বিনাশ কামনায় পালিত হয় নানা রীতি। পরদিন অমাবস্যা তিথিতে উদযাপিত হয় দীপান্বিতা কালীপুজো।

    কেন ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দ শাক খাওয়ার রীতি?

    ভূত চতুর্দশীতে বাঙালি পরিবারগুলিতে মূলত দুটি বিশেষ প্রথা প্রচলিত—চোদ্দ রকমের শাক খাওয়া এবং চোদ্দটি প্রদীপ জ্বালানো। লোকাচার ও ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, চোদ্দ ভুবনের সঙ্গে এই চোদ্দ শাক ও চোদ্দ প্রদীপের একটি প্রতীকী সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে এই প্রথার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরও নানা ব্যাখ্যা ও বিশ্বাস।

    বাঙালির সংস্কৃতিতে বিভিন্ন তিথি ও পার্বণকে কেন্দ্র করে বিশেষ খাবার খাওয়ার রীতি রয়েছে। যেমন, সরস্বতী পুজোর পরদিন গোটা সেদ্ধ খাওয়ার প্রচলন রয়েছে বহু পরিবারে। তেমনই ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দ রকমের শাক খাওয়ার প্রথাও দীর্ঘদিনের। আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে, অর্থাৎ কালীপুজোর আগের দিন, এই বিশেষ খাবার খাওয়ার রীতি পালন করেন অনেকে। কিন্তু কেন এই চোদ্দ শাক? এর পিছনে কোন ধর্মীয় বিশ্বাস কাজ করে?

    পূর্বপুরুষদের আগমন ঘটে মর্ত্যলোকে, কী বলে লোকবিশ্বাস?

    প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর মানুষের দেহ পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যায়। আকাশ, জল, বায়ু, অগ্নি ও মাটি—প্রকৃতির এই পাঁচ উপাদানের সঙ্গে মানুষের অস্তিত্ব জড়িয়ে রয়েছে। লোককথা অনুসারে, ভূত চতুর্দশীর রাতে প্রয়াত পূর্বপুরুষদের আত্মারা মর্ত্যলোকে ফিরে আসেন। তাঁদের স্মরণ করতেই এই তিথিতে চোদ্দ শাক খাওয়ার রীতি চালু হয়েছে বলে মনে করা হয়।

    আরও একটি প্রচলিত ধারণা হল, চোদ্দ রকমের শাক জলে ধুয়ে সেই জল বাড়ির চারপাশে ছিটিয়ে দিলে অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে পরিবার সুরক্ষিত থাকে। পূর্বপুরুষদের স্মরণে তাঁদের উদ্দেশে এই আচার পালন করা হয়। কথিত আছে, পূর্ববর্তী সাত পুরুষ এবং পরবর্তী সাত পুরুষের সঙ্গে সম্পর্কিত বিশ্বাস থেকেই মোট চোদ্দ রকমের শাক খাওয়ার প্রথার প্রচলন।

    ভূত চতুর্দশীতে কোন কোন শাক খাওয়া হয়?

    ভূত চতুর্দশীর চোদ্দ শাকের তালিকায় রয়েছে—

    • ১. জয়ন্তী
    • ২. শাঞ্চে
    • ৩. হিলঞ্চ
    • ৪. ওল
    • ৫. পুঁই
    • ৬. বেতো
    • ৭. সর্ষে
    • ৮. কালকাসুন্দে
    • ৯. নিম
    • ১০. পলতা
    • ১১. শুলকা
    • ১২. গুলঞ্চ
    • ১৩. ভাঁটপাতা
    • ১৪. শুষণী

    অবশ্য অঞ্চল ও পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী এই তালিকায় কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। কোথাও কোথাও কয়েকটি শাকের নাম বা বিকল্প শাকের ব্যবহারও আলাদা হতে পারে।

    কোন শাকে কী কী ভেষজ গুণ রয়েছে?

    চোদ্দ শাকের প্রতিটিরই কিছু না কিছু ভেষজ গুণ রয়েছে বলে লোকাচার ও প্রচলিত আয়ুর্বেদীয় ধারণায় উল্লেখ পাওয়া যায়। এক নজরে দেখে নেওয়া যাক—

    • ● জয়ন্তী: লোকজ চিকিৎসায় জ্বর ও পেটের সমস্যায় এর ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে।

    • ● শাঞ্চে: পুষ্টিগুণের জন্য পরিচিত।

    • ● হিলঞ্চ: প্রচলিত ধারণায় পিত্তের সমস্যা প্রশমনে ব্যবহৃত হয়।

    • ● ওল: আঁশসমৃদ্ধ এই সবজি হজমে সাহায্য করে।

    • ● পুঁই: খাদ্যআঁশ ও বিভিন্ন ভিটামিনের উৎস। হজমের জন্য উপকারী।

    • ● বেতো: লোকজ চিকিৎসায় কৃমিনাশক হিসেবে ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।

    • ● সর্ষে: ভিটামিন ও খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ। চোখ ও যকৃতের সুস্থতায় পুষ্টিগত ভূমিকা রয়েছে।

    • ● কালকাসুন্দে: লোকজ চিকিৎসায় কাশি ও ত্বকের কিছু সমস্যায় ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

    • ● নিম: ত্বকের পরিচর্যায় ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত হয়।

    • ● পলতা: শ্বাসযন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যায় লোকজ চিকিৎসায় ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে।

    • ● শুলকা: এর ভেষজ ব্যবহার সম্পর্কে স্থানীয় লোকাচারে নানা ধারণা প্রচলিত।

    • ● গুলঞ্চ: আয়ুর্বেদীয় চিকিৎসায় বিভিন্ন ভেষজ প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়।

    • ● ভাঁটপাতা: লোকজ চিকিৎসায় বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় এর ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে।

    • ● শুষণী: আয়ুর্বেদীয় ও লোকজ চিকিৎসায় স্মৃতিশক্তি এবং স্নায়ুর পরিচর্যায় ব্যবহারের কথা বলা হয়।

    তবে মনে রাখতে হবে, এই শাকগুলির কোনওটি খেলেই নির্দিষ্ট রোগ সেরে যায় কিংবা ক্যান্সার, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনও জটিল রোগ প্রতিরোধ করা যায়—এমন দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। শাকসবজি সুষম খাদ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও এগুলিকে কোনও রোগের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়।

    ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি রয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে যোগসূত্র

    ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দ শাক খাওয়ার প্রথার সঙ্গে বাংলার ঋতুচক্র ও প্রকৃতির সম্পর্কও লক্ষ করা যায়। শরৎ থেকে হেমন্তে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখার একটি স্বাভাবিক গুরুত্ব রয়েছে। মরশুমি শাক থেকে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেতে পারে।

    তাই এই প্রাচীন রীতির মধ্যে একদিকে যেমন পূর্বপুরুষদের স্মরণ ও ধর্মীয় বিশ্বাস জড়িয়ে রয়েছে, অন্যদিকে রয়েছে মরশুমি খাদ্যাভ্যাসের ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই প্রথা আজও বাঙালির উৎসব-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

    চোদ্দ শাকের স্বাদ, চোদ্দ প্রদীপের আলো আর পূর্বপুরুষদের স্মরণ—সব মিলিয়ে ভূত চতুর্দশী বাঙালির কাছে শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং ঐতিহ্য ও পারিবারিক সংস্কৃতির এক বিশেষ উদযাপন।

LinkedIn
Share