Tag: মহাকাশ অর্থনীতি

  • ISRO Transformation: বড় রদবদল ইসরোর কাজে, রকেট-স্যাটেলাইট তৈরির দায়িত্ব যাচ্ছে বেসরকারি সংস্থার হাতে!

    ISRO Transformation: বড় রদবদল ইসরোর কাজে, রকেট-স্যাটেলাইট তৈরির দায়িত্ব যাচ্ছে বেসরকারি সংস্থার হাতে!

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে কেন্দ্র। ভবিষ্যতে রকেট ও নিয়মিত ব্যবহারের উপগ্রহ তৈরির মতো রুটিন উৎপাদনমূলক কাজ থেকে ধীরে ধীরে সরে এসে গবেষণা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, বৈজ্ঞানিক অভিযান এবং বিশেষ পরিকাঠামো তৈরিতে আরও বেশি মন দিতে চলেছে ইসরো (ISRO)। সেই সঙ্গে রকেট ও উপগ্রহের উৎপাদন এবং বাণিজ্যিক পরিচালনার বড় অংশ তুলে দেওয়া হবে বেসরকারি সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট শিল্পক্ষেত্রের হাতে। একটি সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ইন-স্পেস-এর চেয়ারম্যান ড. পবন গোয়েঙ্কা এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই রূপান্তর ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে এবং আগামী দিনে ভারতের মহাকাশ শিল্পে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থার ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

    রকেট তৈরির দায়িত্ব আর নেবে না ইসরো

    পবন গোয়েঙ্কার কথায়, ভবিষ্যতে ইসরো নিজে আর কোনও লঞ্চ ভেহিকল তৈরি করবে না। তাঁর বক্তব্য, রকেট নির্মাণের কাজ বেসরকারি সংস্থা অথবা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার হাতে চলে যাবে। এর ফলে কয়েক দশক ধরে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে যে মডেল কার্যকর ছিল, তাতে বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। এতদিন গবেষণা থেকে শুরু করে রকেটের নকশা, উৎপাদন এবং উৎক্ষেপণ—প্রায় প্রতিটি স্তরেই ইসরোর কেন্দ্রীয় ভূমিকা ছিল। নতুন ব্যবস্থায় ইসরো মূলত প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও গবেষণার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।

    এসএসএলভি দিয়ে শুরু হয়েছে পরিবর্তন

    এই প্রক্রিয়ার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে উঠে এসেছে স্মল স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যল বা এসএসএলভি (SSLV)। ইতিমধ্যেই এসএসএলভি-র প্রযুক্তি ও উৎপাদনের অধিকার নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (HAL)-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এটি ভারতের মহাকাশ ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। ভবিষ্যতে আরও বড় রকেটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মডেল কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।

    এবার পিএসএলভি ও এলভিএম ৩-র পালা?

    পরবর্তী ধাপে ভারতের দুই গুরুত্বপূর্ণ লঞ্চ ভেহিকল—পোলার স্যাটেলাইট লঞ্চ ভেহিক্যল বা পিএসএলভি (PSLV) এবং লঞ্চ ভেহিক্যল মার্ক-৩ বা সংক্ষেপে এলভিএম-৩ (LVM3) —বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগোতে পারে। এলভিএম-৩ বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী কার্যকরী রকেট। ভারী উপগ্রহ উৎক্ষেপণের পাশাপাশি ভারতের ভবিষ্যৎ মানব মহাকাশ অভিযানেও এই পরিবারের রকেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে এসএসএলভি-এর মতো এবার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিকে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন গোয়েঙ্কা। অর্থাৎ, এই পর্বে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলিই মূলত উৎপাদনের দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ পাবে।

    গবেষণায় আরও বেশি মন দেবে ইসরো

    এই পরিবর্তনের ফলে ইসরোর চরিত্রও ধীরে ধীরে বদলাবে। শুধু রকেট ও উপগ্রহ তৈরির দায়িত্ব পালনকারী সংস্থা হিসেবে নয়, বরং একটি গবেষণা ও উন্নয়ন বা গবেষণা-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসরোকে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। নতুন প্রযুক্তি তৈরি, বৈজ্ঞানিক মহাকাশ অভিযান, বিশেষায়িত উপগ্রহ এবং এমন উন্নত পরিকাঠামো নির্মাণে ইসরো গুরুত্ব দেবে, যেগুলি বেসরকারি সংস্থার পক্ষে একা তৈরি করা কঠিন। কোনও প্রযুক্তি পরীক্ষিত ও পরিণত হয়ে গেলে তা বেসরকারি সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া হবে। সেই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেসরকারি শিল্প বাণিজ্যিক পরিষেবা চালাতে পারবে। গোয়েঙ্কা জানান, ইতিমধ্যেই ইসরো ১২০টি প্রযুক্তি বেসরকারি ক্ষেত্রের হাতে হস্তান্তর করেছে।

    নতুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রও বেসরকারি হাতে যেতে পারে

    শুধু রকেট উৎপাদন নয়, ভারতের একটি নতুন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বও বেসরকারি শিল্পের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। গোয়েঙ্কার বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী চার-পাঁচ মাসের মধ্যে এই উৎক্ষেপণ কেন্দ্রের অপারেটর চূড়ান্ত হতে পারে। এর ফলে ভারতের মহাকাশ পরিকাঠামোতেও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের পরিমাণ বাড়বে।

    ২০৩৩ সালের মধ্যে ৪৪ বিলিয়ন ডলারের মহাকাশ অর্থনীতি

    ভারতের এই নীতির পিছনে রয়েছে আরও বড় অর্থনৈতিক লক্ষ্য। বর্তমানে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতির আকার প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার। সরকারের লক্ষ্য, ২০৩৩ সালের মধ্যে সেটিকে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়া। এই লক্ষ্য পূরণে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন গোয়েঙ্কা। প্রথমত, মহাকাশ পরিষেবায় সরকারের চাহিদা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রচলিত মহাকাশ শিল্পের বাইরের ক্ষেত্রগুলিতে মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মহাকাশ পরিষেবা ও প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারকে একজন ‘অ্যাঙ্কর কাস্টমার’ বা প্রধান ক্রেতা হিসেবে কাজ করতে হবে বলেও মত দিয়েছেন তিনি।

    প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বাড়ছে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার ভূমিকা

    প্রতিরক্ষা ক্ষেত্র ইতিমধ্যেই এই পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক বেসরকারি সংস্থাগুলির কাছ থেকে ৩১টি উপগ্রহের অর্ডার দিয়েছে। একই বৃহত্তর কর্মসূচির আওতায় আরও ২১টি উপগ্রহ তৈরি করার কথা ইসরোর। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে নিরাপত্তা, নজরদারি, যোগাযোগ এবং অন্যান্য প্রতিরক্ষা প্রয়োজনেও বেসরকারি মহাকাশ সংস্থার তৈরি উপগ্রহের ব্যবহার বাড়তে পারে।

    বদলাচ্ছে মহাকাশ ব্যবসার মডেল

    ভারত শুধু বেসরকারি সংস্থাকে রকেট বা উপগ্রহ তৈরির সুযোগ দিতে চাইছে না, বরং মহাকাশ সম্পদের মালিকানা এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নতুন মডেলের দিকে এগোচ্ছে। এই মডেলে বেসরকারি সংস্থাগুলি নিজেরাই উপগ্রহের মালিক হবে। সেই উপগ্রহ থেকে সংগৃহীত তথ্য, ডেটা ও পরিষেবা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করে তারা আয় করতে পারবে। ফলে আগামী দিনে ভারতের মহাকাশ অর্থনীতিতে শুধু উৎক্ষেপণ পরিষেবা নয়, স্যাটেলাইট ডেটা, স্পেস-ভিত্তিক পরিষেবা, যোগাযোগ, নজরদারি এবং বিভিন্ন শিল্পে মহাকাশ প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

    ভারতের মহাকাশ কর্মসূচিতে নতুন যুগের সূচনা?

    স্বাধীনতার পর থেকে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির বিকাশে ইসরোর ভূমিকা ছিল কেন্দ্রীয়। সীমিত সম্পদ ও পরিকাঠামোর মধ্যে নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করে ভারত আজ বিশ্বে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এবার সেই মডেলেই বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে। রুটিন উৎপাদন ও বাণিজ্যিক কাজের বড় অংশ শিল্পক্ষেত্রের হাতে তুলে দিয়ে ইসরো যদি গবেষণা ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির দিকে আরও বেশি মন দিতে পারে, তাহলে চাঁদ, মঙ্গল, মানব মহাকাশ অভিযান, গভীর মহাকাশ গবেষণা এবং নতুন প্রজন্মের উৎক্ষেপণ প্রযুক্তিতে ভারতের সক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। অর্থাৎ, রকেট তৈরি থেকে প্রযুক্তি তৈরি—ইসরোর ভূমিকার এই পরিবর্তনই ভারতের পরবর্তী মহাকাশ অভিযানের অন্যতম বড় ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

LinkedIn
Share