Tag: রামকৃষ্ণ কথা

  • Ramakrishna 552: “সাপ এঁকে বেঁকে চললেও সাপ; আবার চুপ করে কুণ্ডলি পাকিয়ে থাকলেও সাপ”

    Ramakrishna 552: “সাপ এঁকে বেঁকে চললেও সাপ; আবার চুপ করে কুণ্ডলি পাকিয়ে থাকলেও সাপ”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১৬ই অগস্ট

     শ্রীরামকৃষ্ণ, গিরিশ, শশধর পণ্ডিত প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে

    ঠাকুরের অসুখ সংবাদ কলিকাতার ভক্তেরা জানিতে পারিলেন। আলজিভে অসুখ হইয়াছে সকলে বলিতেছেন।

    রবিবার, ১৬ই অগস্ট, ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দ; (১লা ভাদ্র, ১২৯২)। শুক্লা ষষ্ঠী। অনেক ভক্ত তাঁহাকে দর্শন করিতে আসিয়াছেন—গিরিশ, রাম, নিত্যগোপাল, মহিমা চক্রবর্তী, কিশোরী (গুপ্ত), পণ্ডিত শশধর তর্কচুড়ামণি প্রভৃতি।

    ঠাকুর পূর্বের ন্যায় আনন্দময়, ভক্তদের সঙ্গে কথা কহিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—রোগের কথা মাকে বলতে পারি না। বলতে লজ্জা হয়।

    গিরিশ—আমার নারায়ণ ভাল করবেন।

    রাম—ভাল হয়ে যাবে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—(সহাস্যে)—হাঁ, ওই আশীর্বাদ কর। (সকলের হাস্য)

    গিরিশ নূতন নূতন আসিতেছেন, ঠাকুর তাঁহাকে বলিতেছেন, “তোমার অনেক গোলের ভিতর থাকতে হয়, অনেক কাজ; তুমি আর তিনবার এসো।” এইবার শশধরের সঙ্গে কথা কহিতেছেন।

    শশধর পণ্ডিতকে উপোদেশ — ব্রহ্ম ও আদ্যাশক্তি অভেদ 

    শ্রীরামকৃষ্ণ (শশধরের প্রতি) — তুমি আদ্যাশক্তির কথা কিছু বল।

    শশধর (Kathamrita)— আমি কি জানি।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (সহাস্যে) — একজনকে একটি লোক খুব ভক্তি করে। সেই ভক্তকে তামাক সাজার আগুন আনতে বললে; তা সে বললে, আমি কি আপনার আগুন আনবার যোগ্য? আর আগুন আনলেও না! (সকলের হাস্য)

    শশধর—আজ্ঞা, তিনিই নিমিত্ত কারণ, তিনিই উপাদান কারণ। তিনিই জীব জগৎ সৃষ্টি করেছেন, আবার তিনিই জীবজগৎ হয়ে রয়েছেন; যেমন মাকড়সা, নিজে জাল তৈয়ার করলে (নিমিত্ত কারণ); আর সেই জাল নিজের ভিতর থেকে বার করলে (উপাদান কারণ)।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—আর আছে যিনিই পুরুষ তিনিই প্রকৃতি, যিনিই ব্রহ্ম তিনিই শক্তি। যখন নিষ্ক্রিয়, সৃষ্টি স্থিতি প্রলয় করছেন না, তখন তাঁকে ব্রহ্ম বলি, পুরুষ বলি; আর যখন ওই সব কাজ করেন তখন তাঁকে শক্তি বলি, প্রকৃতি বলি। কিন্তু যিনিই ব্রহ্ম তিনিই শক্তি, যিনিই পুরুষ তিনিই প্রকৃতি হয়ে রয়েছেন। জল স্থির থাকলেও জল, আর হেললে দুললেও জল। সাপ এঁকে বেঁকে চললেও সাপ; আবার চুপ করে কুণ্ডলি পাকিয়ে থাকলেও সাপ।

    শ্রীরামকৃষ্ণ ব্রহ্মজ্ঞানের কথায় সমাধি — ভোগ ও কর্ম 

    “ব্রহ্ম কি তা মুখে বলা যায় না, মুখ বন্ধ হয়ে যায়। নিতাই আমার মাতা হাতি! নিতাই আমার মাতা হাতি! এই কথা বলতে বলতে শেষে আর কিছুই বলতে পারে না; কেবল বলে হাতি! আবার হাতি হাতি বলতে বলতে ‘হা’। শেষে তাও বলতে পারে না! বাহ্যশূন্য।”

    এই কথা বলিতে (Kathamrita) বলিতে ঠাকুর সমাধিস্থ! দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সমাধিস্থ।

    সমাধিভঙ্গের পর কিয়ৎকাল পরে বলিতেছেন, ‘ক্ষর’ ‘অক্ষরের’ পারে কি আছে মুখে বলা যায় না। সকলে চুপ করিয়া আছেন, ঠাকুর আবার বলিতেছেন, “যতক্ষণ কিছু ভোগ বাকি থাকে কি কর্ম বাকি থাকে, ততক্ষণ সমাধি হয় না।

    (শশধরের প্রতি)—“এখন ঈশ্বর (Ramakrishna) তোমায় কর্ম করাচ্ছেন, লেকচার দেওয়া ইত্যাদি; এখন তোমায় ওই সব করতে হবে।

    “কর্মটুকু শেষ হয় গেলে আর না। গৃহিণী বাড়ির কাজকর্ম সব সেরে নাইতে গেলে ডাকাডাকি করলেও আর ফেরে না।”

  • Ramakrishna 551: “শীঘ্র তিনি ইহলোক পরিত্যাগ করিবেন? জগন্মাতার ক্রোড়ে আবার গিয়া বসিবেন? তাই কি মৌনাবলম্বন করিয়া রহিয়াছেন?”

    Ramakrishna 551: “শীঘ্র তিনি ইহলোক পরিত্যাগ করিবেন? জগন্মাতার ক্রোড়ে আবার গিয়া বসিবেন? তাই কি মৌনাবলম্বন করিয়া রহিয়াছেন?”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    পঞ্চম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ১১ই অগস্ট
    মৌনাবলম্বী শ্রীরামকৃষ্ণ ও মায়াদর্শন

    শ্রীরামকৃষ্ণ — স্বপন কি কম!

    ঠাকুরের (Ramakrishna) চক্ষে হল। গদগদ স্বর!

    একজন ভক্তের জাগরণ অবস্থায় দর্শন-কথা শুনিয়া বলিতেছেন — “তা আশ্চর্য কি! আজকাল নরেন্দ্রও ঈশ্বরীয় রূপ দেখে!”

    মহিমাচরণ প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া, ঠাকুরবাড়ির প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকের শিবের মন্দিরে গিয়া, নির্জনে বেদমন্তর উচ্চারণ করিতেছেন।

    বেলা আটটা হইয়াছে। মণি গঙ্গাস্নান করিয়া ঠাকুরের কাছে আসিলেন। শোকাতুরা ব্রাহ্মণীও দর্শন করিতে আসিয়াছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (ব্রাহ্মণীর প্রতি) — এঁকে কিছু প্রসাদ খেতে দাও তো গা, লুচি-টুচি। তাকের উপর আছে।

    ব্রাহ্মণী—আপনি আগে খান। তারপর উনি প্রসাদ পাবেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—তুমি আগে জগন্নাথের আটকে দাও, তারপর প্রসাদ।

    প্রসাদ পাইয়া মণি শিবমন্দিরে শিবদর্শন করিয়া ঠাকুরের কাছে আবার আসিলেন ও প্রণাম করিয়া বিদায় গ্রহণ করিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) সস্নেহে— তুমি এসো। আবার কাজে যেতে হবে।

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) দক্ষিণেশ্বর—মন্দিরে সকাল ৮টা হইতে বেলা ৩টা পর্যন্ত মৌন অবলম্বন করিয়া রহিয়াছেন। আজ মঙ্গলবার ১১ই অগস্ট, ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দ; (২৭শে শ্রাবণ, ১২৯২, শুক্লা প্রতিপদ)। গতকল্য সোমবার অমাবস্যা গিয়াছে।

    শ্রীরামকৃষ্ণের (Ramakrishna) অসুখের সঞ্চার হইয়াছে। তিনি কি জানিতে পারিয়াছেন যে, শীঘ্র তিনি ইহলোক পরিত্যাগ করিবেন? জগন্মাতার ক্রোড়ে আবার গিয়া বসিবেন? তাই কি মৌনাবলম্বন করিয়া রহিয়াছেন? তিনি কথা কহিতেছেন না দেখিয়া শ্রীশ্রীমা কাঁদিতেছিলেন। রাখাল ও লাটু কাঁদিতেছেন। বাগবাজারের ব্রাহ্মণীও এই সময় আসিয়াছিলেন, তিনিও কাঁদিতেছেন। ভক্তেরা মাঝে মাঝে জিজ্ঞাসা করিতেছেন (Kathamrita), আপনি কি বরাবর চুপ করিয়া থাকিবেন?

    শ্রীরামকৃষ্ণ ইঙ্গিত করিয়া বলিতেছেন, ‘না’।

    নারাণ আসিয়াছিলেন, বেলা ৩টার সময়, ঠাকুর নারায়ণকে বলিতেছেন, “মা তোর ভাল করবে।”

    নারাণ আনন্দে ভক্তদের সংবাদ দিলেন, ‘ঠাকুর এইবার কথা কহিয়াছেন।’ রাখালাদি ভক্তদের বুক থেকে যেন একখানি পাথর নামিয়া গেল। তাঁহারা সকলে ঠাকুরের কাছে আসিয়া বসিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) রাখালাদি ভক্তদের প্রতি—‘মা’ দেখিয়ে দিচ্ছিলেন যে, সবই মায়া! তিনি সত্য, আর যা কিছু সব মায়ার ঐশ্বর্য।

    “আর একটি দেখলুম, ভক্তদের কার কতটা হয়েছে।”

    নারাণাদি ভক্ত—আচ্ছা কার কতদূর হয়েছে?

    শ্রীরামকৃষ্ণ—এদের সব দেখলাম (Kathamrita)—নিত্যগোপাল, রাখাল, নারাণ, পূর্ণ, মহিমা চক্রবর্তী প্রভৃতি।

  • Ramakrishna 550: “প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া, ঠাকুরবাড়ির প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকের শিবের মন্দিরে গিয়া, নির্জনে বেদমন্তর উচ্চারণ করিতেছেন”

    Ramakrishna 550: “প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া, ঠাকুরবাড়ির প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকের শিবের মন্দিরে গিয়া, নির্জনে বেদমন্তর উচ্চারণ করিতেছেন”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    চতুর্থ পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই ও ১০ই অগস্ট
    মহিমাচরণের ব্রহ্মচক্র—পূর্বকথা—তোতাপুরীর উপদেশ
    ‘স্বপ্নে দর্শন কি কম?’ নরেন্দ্রের ঈশ্বরীয় রূপ দর্শন 

    রাত নয়টা হইল। ঠাকুর ছোট খাটটিতে বসিয়া আছেন। মহিমাচরণের সাধ—ঘরে ঠাকুর থাকিবেন—ব্রহ্মচক্র রচনা করিবেন। তিনি রাখাল, মাস্টার, কিশোরী ও আর দু-একটি ভক্তকে লইয়া মেঝেতে চক্র করিলেন। সকলকে ধ্যান করিতে বলিলেন। রাখালের ভাবাবস্থা হয়েছে। ঠাকুর নামিয়া আসিয়া তাঁহার বুকে হাত দিয়া মার নাম করিতে লাগিলেন। রাখালের ভাব সম্বরণ হইল।

    রাত একটা হইবে। আজ কৃষ্ণপক্ষের (Ramakrishna) চতুর্দশী তিথি, চতুর্দিকে নিবিড় অন্ধকার। দু-একটি ভক্ত গঙ্গার পোস্তার উপর একাকী বেড়াইতেছেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ একবার উঠিয়াছেন। তিনিও বাহিরে আসিলেন ও ভক্তদের বলিতেছেন, ন্যাংটা বলত, ‘এই সময়ে—এই গভীর রাত্রে—অনাহত শব্দ শোনা যায়।’

    শেষরাত্রে মহিমাচরণ ও মাস্টার ঠাকুরের ঘরেই মেঝেতে শুইয়া আছেন। রাখালও ক্যাম্প খাটে শুইয়াছেন।

    ঠাকুর পাঁচ বছরের ছেলের ন্যায় দিগম্বর হইয়া মাঝে মাঝে ঘরের মধ্যে পাদচারণ করিতেছেন।

    প্রত্যূষ (১০ই অগস্ট) হইল। ঠাকুর মার নাম করিতেছেন। পশ্চিমের বারান্দায় গিয়া গঙ্গাদর্শন করিলেন। ঘরের মধ্যস্থিত দেবদেবীর যত পট ছিল, কাছে গিয়া নমস্কার করিলেন। ভক্তেরা শয্যা হইতে উঠিয়া প্রণামাদি করিয়া প্রাতঃকৃত্য করিতে গেলেন।

    ঠাকুর পঞ্চবটীতে একটি ভক্তসঙ্গে কথা কহিতেছেন। তিনি স্বপ্নে চৈতন্যদেবকে দর্শন করিয়াছিলেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (ভাবাবিষ্ট হইয়া) — আহা! আহা!

    ভক্ত—আজ্ঞা, ও স্বপনে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — স্বপন কি কম!

    ঠাকুরের (Ramakrishna) চক্ষে হল। গদগদ স্বর!

    একজন ভক্তের জাগরণ অবস্থায় দর্শন-কথা শুনিয়া বলিতেছেন — “তা আশ্চর্য কি! আজকাল নরেন্দ্রও ঈশ্বরীয় রূপ দেখে!”

    মহিমাচরণ প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া, ঠাকুরবাড়ির প্রাঙ্গণের পশ্চিম দিকের শিবের মন্দিরে গিয়া, নির্জনে বেদমন্তর উচ্চারণ করিতেছেন।

    বেলা আটটা হইয়াছে। মণি গঙ্গাস্নান করিয়া ঠাকুরের কাছে আসিলেন। শোকাতুরা ব্রাহ্মণীও দর্শন করিতে আসিয়াছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (ব্রাহ্মণীর প্রতি) — এঁকে কিছু প্রসাদ খেতে দাও তো গা, লুচি-টুচি। তাকের উপর আছে।

    ব্রাহ্মণী—আপনি আগে খান। তারপর উনি প্রসাদ পাবেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—তুমি আগে জগন্নাথের আটকে দাও, তারপর প্রসাদ।

    প্রসাদ পাইয়া মণি শিবমন্দিরে শিবদর্শন করিয়া ঠাকুরের কাছে আবার আসিলেন ও প্রণাম করিয়া বিদায় গ্রহণ করিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) সস্নেহে— তুমি এসো। আবার কাজে যেতে হবে।

  • Ramakrishna 549: “যাই দেখি গৌরাঙ্গরূপ সামনে এসেছেন, যদি শাক্ত আসে, তাহলে শক্তিরূপ,—কালীরূপ—দর্শন হয়”

    Ramakrishna 549: “যাই দেখি গৌরাঙ্গরূপ সামনে এসেছেন, যদি শাক্ত আসে, তাহলে শক্তিরূপ,—কালীরূপ—দর্শন হয়”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট
    পূর্বকথা—ঠাকুর মুক্তকণ্ঠ—ঠাকুর সিদ্ধপুরুষ না অবতার?

    “ন্যাংটা বেদান্তের উপদেশ দিলে। তিনদিনেই সমাধি। মাধবীতলায় ওই সমাধি অবস্থা দেখে সে হতবুদ্ধি হয়ে বলছে, ‘আরে এ কেয়া রে!’ পরে সে বুঝতে পারলে—এর ভিতরে কে আছে। তখন আমায় বলে, ‘তুমি (Ramakrishna) আমায় ছেড়ে দাও!’ ও-কথা শুনে আমার ভাবাবস্থা হয়ে গেল; — আমি সেই অবস্থায় বললাম, ‘বেদান্ত বোধ না হলে তোমার যাবার জো নাই।’

    “তখন রাতদিন তার কাছে! কেবল বেদান্ত! বামনী বলত, ‘বাবা, বেদান্ত শুনো না! — ওতে ভক্তির হানি হবে।’

    “মাকে যাই বললাম, ‘মা, এ-দেহ রক্ষা কেমন করে হবে, আর সাধুভক্ত লয়ে কেমন করে থাকব!—একটা বড় মানুষ জুটিয়ে দাও!’ তাই সেজোবাবু চৌদ্দ বৎসর ধরে সেবা করলে!

    “এর ভিতর যিনি আছে, আগে থাকতে জানিয়ে (Kathamrita) দেয়, কোন্‌ থাকের ভক্ত আসবে। যাই দেখি গৌরাঙ্গরূপ সামনে এসেছেন, অমনি বুঝতে পারি গৌরভক্ত আসছে। যদি শাক্ত আসে, তাহলে শক্তিরূপ,—কালীরূপ—দর্শন হয়।

    “কুঠির উপর থেকে আরতির সময় চেঁচাতাম, “ওরে, তোরা কে কোথায় আছিস আয়।’ দেখো, এখন সব ক্রমে ক্রমে এসে জুটেছে!

    “এর ভিতর তিনি নিজে রয়েছেন-যেন নিজে থেকে এই সব ভক্ত লয়ে কাজ করছেন।

    “এক-একজনের ভক্তের অবস্থা কি আশ্চর্য! ছোট নরেন—এর কুম্ভক আপনি হয়। আবার সমাধি! এক-একবার কখন কখন আড়াই ঘন্টা! কখনও বেশি! কি আশ্চর্য!

    “সবরকম সাধন এখানে হয় গেছে জ্ঞানযোগ, ভক্তিযোগ, কর্মযোগ। হঠযোগ পর্যন্ত—আয়ু বাড়াবার জন্য! এর ভিতর একজন আছে। তা না হলে সমাধির পর ভক্তি-ভক্ত লয়ে কেমন করে আছি। কোয়ার সিং বলত, ‘সমাধির পর ফিরে আসা লোক দেখি নাই।—তুমিই নানক’।”

    পূর্বকথা—কেশব, প্রতাপ ও কুক্‌ সঙ্গে জাহাজে ১৮৮১

    “চারিদিকে ঐহিক লোক—চারদিকে কামিনী-কাঞ্চন—এতোর ভিতর থেকে এমন অবস্থা! — সমাধি, ভাব, লেগেই রয়েছে। তাই প্রতাপ (ব্রাহ্মসমাজের শ্রীপ্রতাপচন্দ্র মজুমদার) — কুক্‌ সাহেব যখন এসেছিল, জাহাজে আমার অবস্থা (সমাধি-অবস্থা) দেখে বললে, ‘বাবা! যেন ভূতে পেয়ে রয়েছে’।”

    রাখাল, মাস্টার প্রভৃতি অবাক্‌ হইয়া ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের শ্রীমুখ হইতে এই সকল আশ্চর্য কথা শুনিতেছেন।

    মহিমাচরণ কি ঠাকুরের (Ramakrishna) ইঙ্গিত বুঝিলেন? এই সমস্ত কথা শুনিয়াও তিনি বলিতেছেন, “আজ্ঞা, আপনার প্রারব্ধবশতঃ এরূপ সব হয়েছে।” তাঁহার মনের ভাব, — ঠাকুর একটি সাধু বা ভক্ত। ঠাকুর তাঁহার কথায় সায় দিয়া বলিতেছেন (Kathamrita), “হাঁ, প্রাক্তন! যেন বাবুর অনেক বাড়ি আছে — এখানে একটা বৈঠকখানা। ভক্ত তাঁর বৈঠকখানা।”

  • Ramakrishna 548: “বেড়ার আর-একধারে টকটকে লাল সুরকির কাঁড়ির মতো জ্যোতিঃ, তারমধ্যে বসে নরেন্দ্র—সমাধিস্থ!

    Ramakrishna 548: “বেড়ার আর-একধারে টকটকে লাল সুরকির কাঁড়ির মতো জ্যোতিঃ, তারমধ্যে বসে নরেন্দ্র—সমাধিস্থ!

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট
    পূর্বকথা—ঠাকুর মুক্তকণ্ঠ—ঠাকুর সিদ্ধপুরুষ না অবতার?
    শ্রীরামকৃষ্ণ, কেশব সেন ও তাঁহার সমাজে হরিণাম ও মায়ের নাম প্রবেশ 

    “কেশব সেনের (Ramakrishna) সঙ্গে দেখা হবার আগে, তাকে দেখলাম! সমাধি অবস্থায় দেখলাম, কেশব সেন আর তার দল। একঘর লোক আমার সামনে বসে রয়েছে! কেশবকে দেখাচ্ছে, যেন একটি ময়ূর তার পাখা বিস্তার করে বসে রয়েছে! পাখা অর্থাৎ দল বল। কেশবের মাথায় দেখলাম লালমণি। ওটি রজোগুণের চিহ্ন। কেশব শিষ্যদের বলছে—‘ইনি কি বলছেন, তোমরা সব শোনো’। মাকে বললাম (Kathamrita), মা এদের ইংরাজী মত,—এদের বলা কেন। তারপর মা বুঝিয়ে দিলে যে, কলিতে এরকম হবে। তখন এখান থেকে হরিণাম আর মায়ের নাম ওরা নিয়ে গেল। তাই মা কেশবের দল থেকে বিজয়কে নিলে। কিন্তু আদি সমাজে গেল না।

    নিজেকে দেখাইয়া “এর (আমার) ভিতর একটা কিছু আছে। গোপাল সেন বলে একটি ছেলে আসত—অনেকদিন হল। এর ভিতর যিনি আছেন গোপালের বুকে পা দিলে। সে ভাবে বলতে লাগল, তোমার এখন দেরি আছে। আমি ঐহিকদের সঙ্গে থাকতে পারছি না,—তারপর ‘জাই’ বলে বাড়ি চলে গেল। তারপর শুনলাম দেহত্যাগ করেছে। সেই বোধ হয় নিত্যগোপাল।

    “আশ্চর্য দর্শন সব হয়েছে। অখণ্ড সচ্চিদানন্দদর্শন। তার ভিতর দেখছি, মাঝে বেড়া দেওয়া দুই তাক। একধারে কেদার চুনি, আর আর অনেক সাকারবাদী ভক্ত। বেড়ার আর-একধারে টকটকে লাল সুরকির কাঁড়ির মতো জ্যোতিঃ। তারমধ্যে বসে নরেন্দ্র।—সমাধিস্থ!

    “ধ্যানস্থ দেখে বললুম, ‘ও নরেনদ্র!’ একটু চোখ চাইলে — বুঝলুম ওই একরূপে সিমলেতে কায়েতের ছেলে হয়ে আছে।-তখন বললাম, ‘মা। ওকে মায়ায় বদ্ধ কর।—তা না হলে সমাধিস্থ হয়ে দেহত্যাগ করবে।’—কেদার সাকারবাদী, উঁকি মেরে দেখে শিউরে উঠে পালাল।

    “তাই ভাবি এর (নিজের) ভিতর মা স্বয়ং ভক্ত হয়ে লীলা করছেন (Kathamrita)। যখন প্রথম এই অবস্থা হল, তখন জ্যোতিঃতে দেহ জ্বল জ্বল করত। বুক লাল হয়ে যেত! তখন বললুম, ‘মা, বাইরে প্রকাশ হয়ো না, ঢুকে যাও!’ তাই এখন এই হীন দেহ।

    “তা না হলে লোকে জ্বালাতন করত। লোকের ভিড় লেগে যেত — সেরূপ জ্যোতির্ময় দেহ থাকলে। এখন বাহিরে প্রকাশ নাই। এতে আগাছা পালায়—যারা শুদ্ধভক্ত তারাই কেবল থাকবে। এই ব্যারাম হয়েছে কেন?—এর মানে ওই। যাদের সকাম ভক্তি, তারা ব্যারাম অবস্থা দেখলে চলে যাবে।

    “সাধ ছিল (Kathamrita)—মাকে বলেছিলাম, মা, ভক্তের রাজা হব!

    “আবার মনে উঠল, ‘যে আন্তরিক ঈশ্বরকে ডাকবে তার এখানে আসতেই হবে! আসতেই হবে! দেখো, তাই হচ্ছে — সেই সম লোকই আসছে।

    “এর ভিতরে কে আছেন, আমার বাপেরা জানত। বাপ গয়াতে স্বপ্নে দেখেছিলেন,—রঘুবীর বলছেন, ‘আমি তোমার ছেলে হব।’

    “এর ভিতরে তিনিই আছেন। কামিনী-কাঞ্চনত্যাগ! একি আমার কর্ম। স্ত্রীসম্ভোগ স্বপনেও হলো না।

  • Ramakrishna 547: “মহামায়ার মায়া যে কি… ঘরের ভিতর ছোট জ্যোতিঃ ক্রমে ক্রমে বাড়তে লাগল! আর জগৎকে ঢেকে ফেলতে লাগল”

    Ramakrishna 547: “মহামায়ার মায়া যে কি… ঘরের ভিতর ছোট জ্যোতিঃ ক্রমে ক্রমে বাড়তে লাগল! আর জগৎকে ঢেকে ফেলতে লাগল”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    তৃতীয় পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট

    পূর্বকথা—ঠাকুর মুক্তকণ্ঠ—ঠাকুর সিদ্ধপুরুষ না অবতার?

    ঈশ্বরের সঙ্গে কথা—মায়াদর্শন—ভক্ত আসিবার অগ্রে তাদের দর্শন—কেশব সেনকে ভাবাবেশে দর্শন—অখণ্ড সচ্চিদানন্দদর্শন ও নরেন্দ্র—ও কেদার—প্রথম উন্মাদে জ্যোতির্ময় দেহ—বাবার স্বপ্ন —ন্যাংটা ও তিনদিনে সমাধি—মথুরের ১৪ বৎসর সেবা ১৮৫৮-৭১—কুঠির উপর ভক্তদের জন্য ব্যাকুলতা—অবিরত সমাধি। সবরকম সাধন।

    ঠাকুর (Ramakrishna) এই কথা বলিতে বলিতে নামিয়া আসিয়া মেঝেতে মহিমাচরণের নিকট বসিলেন। কাছে মাস্টার ও আরও দু-একটি ভক্ত। ঘরে রাখালও আছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (মহিমার প্রতি)—আপনাকে অনেকদিন বলবার ইচ্ছা ছিল পারি নাই—আজ বলতে ইচ্ছা হচ্ছে।

    “আমার যা অবস্থা—আপনি বলেন, সাধন করলেই ওরকম হয়, তা নয়। এতে (আমাতে) কিছু বিশেষ আছে।”

    মাস্টার, রাখাল প্রভৃতি ভক্তেরা অবাক্‌ হইয়া ঠাকুর কি বলিবেন উৎসুক হইয়া শুনিতেছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—কথা কয়েছে!—শুধু দর্শন নয়—কথা কয়েছে। বটতলায় দেখলাম, গঙ্গার ভিতর থেকে উঠে এসে—তারপর কত হাসি! খেলার ছলে আঙ্গুল মটকান হল। তারপর কথা (Kathamrita)।—কথা কয়েছে!

    “তিনদিন করে কেঁদেছি, আর বেদ পুরাণ তন্ত্র—এ-সব শাস্ত্রে কি আছে—(তিনি) সব দেখিয়ে দিয়েছেন।

    “মহামায়ার মায়া যে কি, তা একদিন দেখালে। ঘরের ভিতর ছোট জ্যোতিঃ ক্রমে ক্রমে বাড়তে লাগল! আর জগৎকে ঢেকে ফেলতে লাগল!

    “আবার দেখালে,—যেন মস্ত দীঘি, পানায় ঢাকা! হাওয়াতে পানা একটু সরে গেল,—অমনি জল দেখা গেল। কিন্তু দেখতে দেখতে চার দিককার পানা নাচতে নাচতে এসে, আবার ঢেকে ফেললে! দেখালে, ওই জল, যেন সচ্চিদানন্দ, আর পানা যেন মায়া। মায়ার দরুন সচ্চিদানন্দকে দেখা যায় না,—যদিও এক-একবার চকিতের ন্যায় দেখা যায়, তো আবার মায়াতে ঢেকে ফেলে (Kathamrita)।

    “কিরূপ লোক (ভক্ত) এখানে আসবে, আসবার আগে দেখিয়ে দেয়। বটতলা থেকে বকুলতলা পর্যন্ত চৈতন্যদেবের সংকীর্তনের দল দেখালে। তাতে বলরামকে দেখলাম—না হলে মিছরি এ-সব দেবে কে! আর এঁকে (Ramakrishna) দেখেছিলাম।”

  • Ramakrishna 546: “শুধু পুঁথি পড়লে চৈতন্য হয় না—তাঁকে ডাকতে হয়। ব্যাকুল হলে তবে কুলকুণ্ডলিনী জাগেন”

    Ramakrishna 546: “শুধু পুঁথি পড়লে চৈতন্য হয় না—তাঁকে ডাকতে হয়। ব্যাকুল হলে তবে কুলকুণ্ডলিনী জাগেন”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট
    ঠাকুর মুক্তকণ্ঠ—শ্রীরামকৃষ্ণ কি সিদ্ধপুরুষ না অবতার?

    “আবার কখনও পাখির মতো এ-ডাল থেকে ও-ডাল, ও-ডাল থেকে এ-ডাল,—মহাবায়ু উঠতে থাকে! সে ডালে বসে, সে স্থান আগুনের মতো বোধ হয়। হয়তো মূলাধার থেকে স্বাধিষ্ঠান, স্বাধিষ্ঠান (Ramakrishna) থেকে হৃদয়, এইরূপ ক্রমে মাথায় উঠে (Kathamrita)।

    “কখনও বা মহাবায়ু তির্যক গতিতে চলে—এঁকে বেঁকে! ওইরূপ চলে চলে শেষে মাথায় এলে সমাধি হয়।”

    পূর্বকথা — ২২/২৩ বছরে প্রথম উন্মাদ ১৮৫৮ খ্রী: — ষট্‌চক্র ভেদ 

    “কুলকুণ্ডলিনী না জাগলে চৈতন্য হয় না।

    “মূলাধারে কুলকুণ্ডলিনী। চৈতন্য হলে তিনি সুষুম্না নাড়ীর মধ্য দিয়ে স্বাধিষ্ঠান, মণিপুর এই সব চক্র ভেদ করে, শেষে শিরিমধ্যে গিয়ে পড়েন। এরই নাম মহাবায়ুর গতি — তবেই শেষে সমাধি হয়।

    “শুধু পুঁথি পড়লে চৈতন্য হয় না—তাঁকে ডাকতে হয়। ব্যাকুল হলে তবে কুলকুণ্ডলিনী জাগেন। শুনে, বই পড়ে জ্ঞানের কথা!—তাতে কি হবে!

    “এই অবস্থা যখন হল, তার ঠিক আগে আমায় দেখিয়ে দিলে—কিরূপ কুলকুণ্ডলিনীশক্তি (Ramakrishna) জাগরণ হয়ে, ক্রমে ক্রমে সব পদ্মগুলি ফুটে যেতে লাগল, আর সমাধি হল। এ অতি গুহ্যকথা। দেখলাম, ঠিক আমার মতন বাইশ-তেইশ বছরের ছোকরা, সুষুম্না নাড়ির ভিতর দিয়ে যোনিরূপ পদ্মের সঙ্গে রমণ করছে! প্রথমে গুহ্য, লিঙ্গ, নাভি। চতুর্দল, ষড়দল, দশদল পদ্ম সব অধোমুখ হয়েছিল — ঊর্ধ্বমুখ হল।

    “হৃদয়ে যখন এল—বেশ মনে পড়ছে—জিহ্বা দিয়ে রমণ করবার পর দ্বাদশদল অধোমুখ পদ্ম ঊর্ধ্বমুখ হল, — আর প্রস্ফুটিত হল! তারপর কণ্ঠে ষোড়শদল, আর কপালে দ্বিদল। শেষে সহস্রদল পদ্ম প্রস্ফুটিত হল! সেই অবধি আমার এই অবস্থা।”

    ঠাকুর একটু পাশ ফেরার পর আবার কথা (Kathamrita) কহিতেছেন। মানুষের ভিতর তিনি অবতীর্ণ হইয়া লীলা করেন, এই কথা হইতেছে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—তোমার ওই ঘর। আমার আগে রূপদর্শন হত না, এমন অবস্থা গিয়েছে। এখনও দেখছ না, আবার রূপ কম পড়ছে।

    মণি—লীলার মধ্যে নরলীলা বেশ ভাল লাগে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ—তাহলেই হল;—আর আমাকে দেখছো!

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ কি বলিতেছেন যে, আমার ভিতর ঈশ্বর নররূপে অবতির্ণ হইয়া লীলা করিতেছেন?

  • Ramakrishna 545: “সমাধি পাঁচপ্রকার—তা তোমার সবই হয় দেখছি, পিপীলিকাবৎ, মীনবৎ, কপিবৎ, পক্ষীবৎ, তির্যগ্‌বৎ”

    Ramakrishna 545: “সমাধি পাঁচপ্রকার—তা তোমার সবই হয় দেখছি, পিপীলিকাবৎ, মীনবৎ, কপিবৎ, পক্ষীবৎ, তির্যগ্‌বৎ”

    ৫১ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট
    ঠাকুর মুক্তকণ্ঠ—শ্রীরামকৃষ্ণ কি সিদ্ধপুরুষ না অবতার?

    রাত্রি আটটা হইয়াছে। ঠাকুর (Ramakrishna) মহিমাচরণের সহিত কথা কহিতেছেন। ঘরে রাখাল, মাস্টার, মহিমাচরনের দু-একটি সঙ্গী,—আছেন।

    মহিমাচরণ আজ রাত্রে থাকিবেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — আচ্ছা, কেদারকে কেমন দেখছো? — দুধ দেখেছে না খেয়েছে?

    মহিমা — হাঁ, আনন্দ ভোগ করছেন।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— নিত্যগোপাল?

    মহিমা — খুব! — বেশ অবস্থা।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — হাঁ। আচ্ছা, গিরিশ ঘোষ কেমন হয়েছে?

    মহিমা (Kathamrita)— বেশ হয়েছে। কিন্তু ওদের থাক আলাদা।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — নরেন্দ্র?

    মহিমা — আমি পনর বৎসর আগে যা ছিলুম এ তাই।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — ছোট নরেন? কেমন সরল?

    মহিমা — হাঁ, খুব সরল।

    শ্রীরামকৃষ্ণ — ঠিক বলেছ। (চিন্তা করতে করতে) আর কে আছে?

    “যে সব ছোকরা এখানে আসছে, তাদের—দুটি জিনিস জানলেই হল। তাহলে আর বেশি সাধন-ভজন করতে হবে না। প্রথম, আমি কে—তারপর, ওরা কে। ছোকরারা অনেকেই অন্তরঙ্গ।

    “যারা অন্তরঙ্গ, তাদের মুক্তি হবে না। বায়ুকোণে আর-একবার (আমার) দেহ হবে।

    “ছোকরাদের দেখে আমার প্রাণ শীতল হয়। আর যারা ছেলে করেছে, মামলা মোকদ্দমা করে বেড়াচ্ছে—কামিনী-কাঞ্চন নিয়ে রয়েছে—তাদের দেখলে কেমন করে আনন্দ হবে? শুদ্ধ-আত্মা না দেখলে কেমন করে থাকি!”

    মহিমাচরণ শাস্ত্র হইতে শ্লোক আবৃত্তি করিয়া শুনাইতেছেন — আর তন্ত্রোক্ত ভূচরী খেচরী শাম্ভবী প্রভৃতি নানা মুদ্রার কথা বলিতেছেন।

    ঠাকুরের পাঁচপ্রকার সমাধি-ষট্‌চক্রভেদ—যোগতত্ত্ব—কুণ্ডলিনী

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)— আচ্ছা, আমার আত্মা সমাধির পর মহাকাশে পাখির মতো উড়ে বেড়ায়, এইরকম কেউ কেউ বলে।

    “হৃষীকেশ সাধু এসেছিল। সে বললে যে, সমাধি পাঁচপ্রকার—তা তোমার সবই হয় দেখছি। পিপীলিকাবৎ, মীনবৎ, কপিবৎ, পক্ষীবৎ, তির্যগ্‌বৎ।

    “কখনও বায়ু উঠে পিঁপড়ের মতো শিড়শিড় করে কখনও সমাধি অবস্থায় ভাব-সমুদ্রের ভিতর আত্মা-মীন আনন্দে খেলা করে!

    “কখনও পাশ ফিরে রয়েছি, মহাবায়ু, বানরের ন্যায় আমায় ঠেলে—আমোদ করে। আমি চুপ করে থাকি। সেই বায়ু হঠাৎ বানরের ন্যায় লাখ দিয়ে সহস্রারে উঠে যায়! তাই তো তিড়িং করে লাফিয়ে উঠি (Kathamrita)।

  • Ramakrishna 544: “জোর করে আপনি কি বারণ করতে পারবেন? যার যা (সংস্কার) আছে তাই হবে”

    Ramakrishna 544: “জোর করে আপনি কি বারণ করতে পারবেন? যার যা (সংস্কার) আছে তাই হবে”

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট
    দক্ষিণেশ্বরে রাখাল, মাস্টার, মহিমাচরণ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
    দ্বিজ, দ্বিজের পিতা ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ—মাতৃঋণ ও পিতৃঋণ

    “আমি (Ramakrishna) এদের বলি, সংসারও কর, আবার ভগবানেতেও মন রাখ।—সংসার ছাড়তে বলি না;—এও কর, ও-ও কর।”

    পিতা—আমি বলি, পড়াশুনা তো চাই,—আপনার এখানে আসতে বারণ করি না। তবে ছেলেদের সঙ্গে ইয়ারকি দিয়ে সময় না কাটে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna)—এর (দ্বিজর) অবশ্য সংস্কার ছিল। এ দুই ভায়ের হল না কেন? আর এরই বা হল কেন?

    “জোর করে আপনি কি বারণ করতে পারবেন? যার যা (সংস্কার) আছে তাই হবে।”

    পিতা—হাঁ, তা বটে।

    ঠাকুর (Kathamrita) মেঝেতে দ্বিজর পিতার কাছে আসিয়া মাদুরের উপর বসিয়াছেন। কথা কহিতে কহিতে এক-একবার তাঁহার গায়ে হাত দিতেছেন।

    সন্ধ্যা আগতপ্রায়। ঠাকুর মাস্টার প্রভৃতিকে বলিতেছেন, “এদের সব ঠাকুর দেখিয়ে আনো—আমি ভাল থাকলে সঙ্গে যেতাম।”

    ছেলেদের সন্দেশ দিতে বলিলেন। দ্বিজর পিতাকে বলিলেন, “এরা একটু খাবে; মিষ্টমুখ করতে হয়।”

    দ্বিজর বাবা দেবালয় ও ঠাকুরদের দর্শন করিয়া বাগানে একটু বেড়াইতেছেন। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নিজের ঘরে দক্ষিণ-পূর্ব বারান্দায় ভূপেন, দ্বিজ, মাস্টার প্রভৃতির সহিত আনন্দে কথা কহিতেছেন। ক্রীড়াচ্ছলে ভূপেন ও মাস্টারের পিঠে চাপড় মারিলেন। দ্বিজকে সহাস্যে বলিতেছেন, “তোর বাপকে কেমন বললাম।”

    সন্ধ্যার পর দ্বিজর পিতা আবার ঠাকুরের ঘরে আসিলেন (Kathamrita)। কিয়ৎক্ষণ পরেই বিদায় লইবেন।

    দ্বিজের পিতার গরম বোধ হইয়াছে—ঠাকুর নিজে হাতে করিয়া পাখা দিতেছেন।

    পিতা বিদায় লইলেন—ঠাকুর (Ramakrishna) নিজে উঠিয়া দাঁড়াইলেন।

  • Ramakrishna 543: “শুধু জলে দুধ রাখলে দুধ নষ্ট হয়ে যায়, মাখন তুলে জলের উপর রাখলে আর কোন গোল থাকে না”

    Ramakrishna 543: “শুধু জলে দুধ রাখলে দুধ নষ্ট হয়ে যায়, মাখন তুলে জলের উপর রাখলে আর কোন গোল থাকে না”

    ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দক্ষিণেশ্বর-মন্দিরে ভক্তসঙ্গে

    প্রথম পরিচ্ছেদ

    ১৮৮৫, ৯ই অগস্ট
    দক্ষিণেশ্বরে রাখাল, মাস্টার, মহিমাচরণ প্রভৃতি ভক্তসঙ্গে
    দ্বিজ, দ্বিজের পিতা ও ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ—মাতৃঋণ ও পিতৃঋণ 

    “অমি (Ramakrishna) বলি, অনাসক্ত হয়ে সংসার কর। হাতে তেল মেখে কাঁঠাল ভাঙ্গ—তাহলে হাতে আঠা লাগবে না। “কাঁচা মনকে সংসারে রাখতে গেলে মন মলিন হয়ে যায়। জ্ঞানলাভ কর তবে সংসারে থাকতে হয়। “শুধু জলে দুধ রাখলে দুধ নষ্ট হয়ে যায়। মাখন তুলে জলের উপর রাখলে আর কোন গোল থাকে না।”

    দ্বিজর পিতা (Kathamrita) আজ্ঞা, হাঁ।

    শ্রীরামকৃষ্ণ (Ramakrishna) সহাস্যে—আপনি যে এদের বকেন-টকেন, তার মানে বুঝেছি। অপনি ভয় দেখান। ব্রহ্মচারী সাপকে বললে, ‘তুই তো বড় বোকা! তোকে কামড়াতেই আমি বারণ করেছিলাম। তোকে ফোঁস করতে বারণ করি নাই! তুই যদি ফোঁস করতিস তাহলে তোর শত্রুরা তোকে মারতে পারত না।’ আপনি ছেলেদের বকেন-ঝকেন,—সে কেবল ফোঁস করেন।

    দ্বিজর পিতা হাসিতেছেন।

    “ভাল ছেলে হওয়া পিতার পুণ্যের চিহ্ন। যদি পুষ্করিণীতে ভাল জল হয়—সেটি পুষ্করিণীর মালিকের পুণ্যের চিহ্ন।

    “ছেলেকে আত্মজ বলে। তুমি আর তোমার ছেলে কিছু তফাত নয়। তুমি একরূপে ছেলে হয়েছ। একরূপে তুমি বিষয়ী, আফিসের কাজ করছ, সংসারে ভোগ করছ; — আর একরূপে তুমিই ভক্ত হয়েছ—তোমার সন্তানরূপে। শুনেছিলাম, আপনি খুব ঘোর বিষয়ী। তা তো নয়! (সহাস্যে) এ-সব তো আপনি জানেন। তবে আপনি নাকি আটপিটে, এতেও হুঁ দিয়ে যাচ্ছেন।

    দ্বিজর পিতা ঈষৎ হাসিতেছেন।

    “এখানে এলে, আপনি কি বস্তু তা এরা জানতে পারবে। বাপ কত বড় বস্তু! বাপ-মাকে ফাঁকি দিয়ে যে ধর্ম করবে, তার ছাই হবে!”

    পূর্বকথা—বৃন্দাবনে শ্রীরামকৃষ্ণের মার জন্য চিন্তা

    “মানুষের অনেকগুলি ঋণ আছে। পিতৃঋণ, দেবঋণ, ঋষিঋণ। এছাড়া আবার মাতৃঋণ আছে। আবার পরিবারের সম্বন্ধেও ঋণ আছে—প্রতিপালন করতে হবে। সতী হলে, মরবার পরও তার জন্য কিছু সংস্থান করে যেতে হয়।

    “আমি মার জন্য বৃন্দাবনে থাকতে পারলাম না। যাই মনে পড়ল মা (Kathamrita) দক্ষিণেশ্বরে কালীবাড়িতে আছেন, অমনি আর বৃন্দাবনেও মন টিকল না।

LinkedIn
Share