Tag: রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া

  • IMF India GDP Forecast: বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় দ্বিগুণ গতিতে ছুটবে ভারত! ২০২৭ সালে জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭%

    IMF India GDP Forecast: বিশ্ব অর্থনীতির প্রায় দ্বিগুণ গতিতে ছুটবে ভারত! ২০২৭ সালে জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭%

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বিশ্ব অর্থনীতির অনিশ্চয়তার মধ্যেও ভারতের আর্থিক বৃদ্ধির গতি নিয়ে আশাবাদী আন্তর্জাতিক অর্থ ভাণ্ডার (IMF)। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ভারতের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (GDP) বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৬.৪ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭ শতাংশ করল সংস্থাটি। শুধু চলতি অর্থবর্ষ নয়, ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষেও ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদার স্থিতিশীলতা, পরিষেবা ক্ষেত্রে শক্তিশালী কার্যকলাপ এবং অর্থনীতির ধারাবাহিক গতি এই আশাবাদের মূল কারণ।

    উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, মাত্র এক সপ্তাহ আগেই ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস ৭.১ শতাংশে উন্নীত করেছিল ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাঙ্ক (RBI)। এবার আইএমএফ-এর পূর্বাভাস বৃদ্ধি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলের ইতিবাচক মনোভাবকেই তুলে ধরল।

    কেন ভারতের বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়াল আইএমএফ?

    আইএমএফ-এর ওয়ার্ল্ড ইকোনমি আউটলুক (World Economic Outlook) রিপোর্টের সাম্প্রতিক আপডেটে বলা হয়েছে, প্রত্যাশার তুলনায় ভারতের অর্থনৈতিক গতিশীলতা বেশি শক্তিশালী। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের ধারাবাহিক বৃদ্ধি অর্থনীতিকে গতি জুগিয়েছে।

    সংস্থাটির মতে, ভারতের বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—

    • ● বৃহৎ অভ্যন্তরীণ বাজার: দেশের বিপুল জনসংখ্যা ও ক্রমবর্ধমান বাজার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারে সহায়তা করছে।
    • ● পরিষেবা ক্ষেত্রের শক্তি: পরিষেবা ক্ষেত্রে স্থিতিশীল কার্যকলাপ জিডিপি বৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি।
    • ● অনুকূল জনসংখ্যাগত পরিস্থিতি: কর্মক্ষম জনসংখ্যার সম্ভাবনা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির বৃদ্ধিকে সমর্থন করতে পারে।
    • ● কাঠামোগত সংস্কার: ধারাবাহিক অর্থনৈতিক সংস্কার দেশের উৎপাদনশীলতা ও বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে শক্তিশালী করছে।

    আইএমএফ-এর মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই সমস্ত উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবে ভারত এমন একটি অর্থনীতি হিসেবে উঠে আসছে, যার বৃদ্ধির গতি আন্তর্জাতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী।

    বিশ্ব অর্থনীতির তুলনায় কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত?

    ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস বৃদ্ধির তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয় বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে। ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধির পূর্বাভাস আইএমএফ সামান্য বাড়িয়ে ৩.১ শতাংশ করেছে। জুলাইয়ের পূর্বাভাস ছিল ৩ শতাংশ। ২০২৭ সালের জন্য বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধির হার ৩.৪ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

    অর্থাৎ, বিশ্ব অর্থনীতির সম্ভাব্য বৃদ্ধির হার যেখানে ৩ শতাংশের আশপাশে, সেখানে ভারতের ক্ষেত্রে ৭ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেশটির তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানকে তুলে ধরছে। এই কারণেই বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধিতে ভারতের ভূমিকা আগামী দিনেও গুরুত্বপূর্ণ থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে।

    পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও বৃদ্ধির আশা

    বিশ্বজুড়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ানো হয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। জ্বালানি আমদানির উপর নির্ভরশীল ভারতের মতো দেশের ক্ষেত্রে এর প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

    আইএমএফ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের শক্তির উপর ভর করে ভারতের অর্থনীতি স্থিতিশীল থেকেছে।

    তবে তেলের দাম বৃদ্ধি ভারতের জন্য ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। অপরিশোধিত তেলের আমদানি ব্যয় বাড়লে বাণিজ্য ঘাটতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং পরিবহণ ও উৎপাদন খরচের উপর চাপ পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ইতিবাচক পূর্বাভাসের পাশাপাশি জ্বালানির দামের গতিপ্রকৃতিও নজরে রাখতে হবে।

    ২০২৬ সালে ব্যারেলপ্রতি ৯৫.৭৪ ডলার হতে পারে অপরিশোধিত তেলের দাম

    আইএমএফ-এর অনুমান অনুযায়ী, ব্রেন্ট, দুবাই ফতেহ এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI)—এই তিন ধরনের অপরিশোধিত তেলের গড় দাম ২০২৬ সালে ব্যারেলপ্রতি ৯৫.৭৪ ডলার হতে পারে। ২০২৫ সালের তুলনায় তা প্রায় ৪১ শতাংশ বেশি।

    ২০২৭ সালে অবশ্য তেলের গড় দাম প্রায় ৯ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৮৭.৩৯ ডলারে নেমে আসতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছে।

    ভারতের অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চস্তরে থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে দেশের মূল্যবৃদ্ধি, চলতি খাতের ভারসাম্য ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে।

    জার্মানি ও ব্রিটেনের বৃদ্ধির পূর্বাভাসও বাড়াল আইএমএফ

    শুধু ভারত নয়, কয়েকটি উন্নত অর্থনীতির ক্ষেত্রেও বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে আইএমএফ। ২০২৬ সালে জার্মানির অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস জুলাইয়ের ০.৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১.৩ শতাংশ করা হয়েছে। ব্রিটেনের ক্ষেত্রে পূর্বাভাস ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ১.৩ শতাংশ হয়েছে।

    সামগ্রিকভাবে, ২০২৬ সালে উন্নত অর্থনীতিগুলির বৃদ্ধির পূর্বাভাস ১.৭ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২.১ শতাংশ করা হয়েছে।

    অন্যদিকে, উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলির সামগ্রিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস কিছুটা কমানো হয়েছে। জুলাইয়ে এই গোষ্ঠীর জন্য ৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধির অনুমান করা হলেও, বর্তমানে তা কমিয়ে ৩.৭ শতাংশ করা হয়েছে।

    চিন, রাশিয়া ও ব্রাজিলের বৃদ্ধির গতি নিয়ে সংশয়

    উদীয়মান অর্থনীতিগুলির সামগ্রিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস কমার অন্যতম কারণ চিন, রাশিয়া ও ব্রাজিলের মতো দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে সংশয়। মধ্যপ্রাচ্যের একাধিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ধীরগতির বৃদ্ধি, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সংকোচনের আশঙ্কা রয়েছে। ভারতের বৃদ্ধির পূর্বাভাস উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও অন্যান্য বড় উদীয়মান অর্থনীতির দুর্বল সম্ভাবনা সামগ্রিক গোষ্ঠীর বৃদ্ধির উপর চাপ তৈরি করছে।

    অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার পূর্বাভাসেও ভারতের অর্থনীতি নিয়ে আশাবাদ

    আইএমএফ-এর আগেও এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্ক (ADB), অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (OECD) এবং দুই আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা  এসঅ্যান্ডপি  (S&P) ও ফিচ্ (Fitch) ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির পূর্বাভাস প্রায় ৭ শতাংশের আশপাশে রেখেছে বা বাড়িয়েছে। জুনে শেষ হওয়া ত্রৈমাসিকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শক্তিশালী গতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার স্থিতিশীলতাকে এই মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখা হয়েছে।

    ভারতের অর্থনীতির সামনে কী বার্তা?

    আইএমএফ-এর পূর্বাভাস বৃদ্ধি ভারতের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা। অভ্যন্তরীণ বাজার, পরিষেবা ক্ষেত্র এবং কাঠামোগত সংস্কারের উপর নির্ভর করে বৃদ্ধির গতি ধরে রাখার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ব অর্থনীতির তুলনায় ভারতের সম্ভাব্য বৃদ্ধির হার যথেষ্ট বেশি। তবে এই পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ফলাফল হিসেবে দেখা উচিত নয়।

    আন্তর্জাতিক সংঘাত, অপরিশোধিত তেলের দাম, বিশ্ববাণিজ্যের পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার গতিপ্রকৃতি আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। সব মিলিয়ে, আইএমএফ-এর নতুন পূর্বাভাসে স্পষ্ট—বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলেও ভারত আপাতত তুলনামূলক দ্রুত বৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে। এখন নজর থাকবে, এই সম্ভাবনা বাস্তব অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে কতটা প্রতিফলিত হয়।

  • RBI Gold Reserves: ডলার ছেড়ে সোনার পথে ভারত! ৬ বছরে সর্বনিম্ন মার্কিন ট্রেজারি, বড় কৌশলগত বদল আরবিআই-এর

    RBI Gold Reserves: ডলার ছেড়ে সোনার পথে ভারত! ৬ বছরে সর্বনিম্ন মার্কিন ট্রেজারি, বড় কৌশলগত বদল আরবিআই-এর

    সুশান্ত দাস

    ভারত কি ধীরে ধীরে মার্কিন ডলারের উপর নির্ভরতা কমাচ্ছে? কেন এক বছরে ২২.৫ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হল মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগ? আবার কেনই বা বিদেশে রাখা শত শত টন সোনা দেশে ফিরিয়ে আনছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI)? প্রথম নজরে এই ঘটনাগুলি আলাদা মনে হলেও, অর্থনীতিবিদদের মতে এগুলি আসলে একই কৌশলের অংশ। বিশ্বের দ্রুত বদলে যাওয়া ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে আরও নিরাপদ, ভারসাম্যপূর্ণ এবং ঝুঁকিমুক্ত করে তোলাই এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অন্যতম অগ্রাধিকার।

    কী ঘটেছে?

    ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিলের মধ্যে ভারতের মার্কিন ট্রেজারি হোল্ডিংসের পরিমাণ ২৩২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ১৮১ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রায় ২২.৫ শতাংশ কমেছে মার্কিন সরকারি বন্ডে ভারতের বিনিয়োগ। এটি গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। একই সময়ে ভারতের সোনার রিজার্ভ ৬৫৮ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে প্রায় ৮৮১ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, ২০২৩ সাল থেকে ধাপে ধাপে ৩৮০ টনেরও বেশি সোনা বিদেশের ভল্ট থেকে দেশে ফিরিয়ে এনেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক।এই দুটি পদক্ষেপকে একসঙ্গে দেখলেই ভারতের নতুন রিজার্ভ কৌশল স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

    কেন মার্কিন ট্রেজারিতে বিনিয়োগ কমাচ্ছে ভারত?

    এই প্রশ্নের সহজ উত্তর— ঝুঁকি কমানো। দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন ট্রেজারি বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কারণ, মার্কিন অর্থনীতি এবং ডলারের উপর আন্তর্জাতিক আস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বদলেছে।রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, পশ্চিমা দেশগুলির অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ হওয়ার নজির এবং বড় শক্তিগুলির মধ্যে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রতিযোগিতা দেখিয়ে দিয়েছে, কোনও একটি দেশের আর্থিক ব্যবস্থার উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই কারণেই এখন অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক একই ঝুড়িতে সব ডিম না রেখে বিভিন্ন ধরনের সম্পদে বিনিয়োগ বাড়ানোর নীতি নিচ্ছে।

    কেন সোনা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে?

    সোনা এমন একটি সম্পদ, যার মূল্য কোনও একক দেশের সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের নীতির উপর নির্ভরশীল নয়। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক মন্দা, মূল্যস্ফীতি কিংবা মুদ্রার অস্থিরতার সময়ও সোনা সাধারণত তার গ্রহণযোগ্যতা ধরে রাখে। তাই একে ‘সেফ হেভেন অ্যাসেট’ বলা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির কাছে সোনা শুধু একটি বিনিয়োগ নয়, বরং আর্থিক নিরাপত্তার প্রতীক। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রয়োজনে এটি সহজেই নগদে রূপান্তর করা যায় এবং কোনও বিদেশি সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের উপর এর অস্তিত্ব নির্ভর করে না।

    বিদেশে সোনা রেখে ঝুঁকি কোথায়?

    অনেক দেশ ঐতিহাসিক কারণে লন্ডন, নিউ ইয়র্ক বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক আর্থিক কেন্দ্রে তাদের সোনা সংরক্ষণ করে। কিন্তু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাবলি দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক সংঘাত বা নিষেধাজ্ঞার পরিস্থিতিতে বিদেশে রাখা সম্পদের উপর প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে যেতে পারে। এই কারণেই রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ধীরে ধীরে দেশের ভল্টে সোনা ফিরিয়ে আনছে। এতে ভারতের সম্পদের উপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ বাড়ছে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে তা ব্যবহারের স্বাধীনতাও নিশ্চিত হচ্ছে।

    শুধু ভারত নয়, বিশ্বও একই পথে…

    ভারতের পাশাপাশি, চিন গত এক বছরে তাদের মার্কিন ট্রেজারি হোল্ডিংস ৭৪৩.৬ বিলিয়ন ডলার থেকে কমিয়ে ৬৫১.১ বিলিয়ন ডলারে এনেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, বিশ্বের অধিকাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক আগামী বছরেও সোনার রিজার্ভ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। অর্থাৎ এটি কোনও একক দেশের সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিশ্বজুড়ে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলির রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় একটি বড় প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

    তাহলে কি ডলারের যুগ শেষ?

    এর মানে একেবারেই নয় যে, ডলারের যুগ শেষ। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, তেল লেনদেন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে এখনও মার্কিন ডলারই রয়েছে। ভারতও এখনও ১৮১ বিলিয়ন ডলারের মার্কিন ট্রেজারি ধরে রেখেছে। অর্থাৎ রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ডলার ছেড়ে দিচ্ছে না; বরং ডলারের পাশাপাশি সোনা ও অন্যান্য সম্পদের ভারসাম্য বাড়াচ্ছে। এটিকে ডি-রিস্কিং বলা যায়, ডি-ডলারাইজেশন নয়।

    ভারতের জন্য এর অর্থ কী?

    এই কৌশলের মাধ্যমে ভারত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা পেতে পারে—

    • বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আরও বৈচিত্র্যময় হবে।
    • আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক সংকটের ঝুঁকি কিছুটা কমবে।
    • মূল্যস্ফীতির সময় রিজার্ভের স্থিতিশীলতা বাড়বে।
    • বিদেশে রাখা সম্পদের উপর নির্ভরতা কমবে।
    • দীর্ঘমেয়াদে রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা আরও নমনীয় হবে।

    আগামী দিনে কী নজরে রাখবেন?

    এখন নজর থাকবে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের পরবর্তী বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংক্রান্ত তথ্যের দিকে। পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য বড় অর্থনীতি—বিশেষ করে চিন, জাপান, ইউরোপের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক এবং ব্রিকস (BRICS) দেশগুলিও একই পথে এগোয় কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে। যদি এই প্রবণতা আরও জোরদার হয়, তাহলে আগামী দশকে বিশ্বের বৈদেশিক রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। যদিও মার্কিন ডলারের আধিপত্য রাতারাতি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলি এখন আর একটিমাত্র সম্পদের উপর নির্ভর করে থাকতে চাইছে না।

    রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কৌশল কী?

    রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে শুধু মার্কিন ট্রেজারি বিক্রি বা সোনা কেনার ঘটনা হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। এটি এমন এক দীর্ঘমেয়াদি কৌশল, যার মূল লক্ষ্য ‘নিরাপত্তা, বৈচিত্র্য এবং সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ’। অর্থাৎ ভবিষ্যতের অনিশ্চিত বিশ্বে ভারতের বৈদেশিক রিজার্ভকে এমনভাবে সাজানো, যাতে কোনও একটি দেশের নীতি, নিষেধাজ্ঞা বা ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন ভারতের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধাক্কা দিতে না পারে। এই কারণেই অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, ভারতের এই পদক্ষেপ কেবল রিজার্ভ ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন নয়, বরং আগামী দশকের বৈশ্বিক আর্থিক বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নেওয়ার একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত প্রস্তুতি।

LinkedIn
Share