সুশান্ত দাস
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ভারত ও বেলজিয়ামের মধ্যে সহযোগিতা আরও গভীর হতে চলেছে। বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ওয়েভারের ভারত সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের প্রতিরক্ষা শিল্পের মধ্যে প্রায় ১০টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন বেলজিয়ামের ১৫টি প্রতিরক্ষা সংস্থার প্রতিনিধিরা। অস্ত্র, গোলাবারুদ, ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা, রাডার, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, মাইন প্রতিরোধ প্রযুক্তি এবং উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি—একাধিক ক্ষেত্রে এই অংশীদারিত্ব গড়ে উঠছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ভারত শুধুমাত্র বিদেশ থেকে তৈরি অস্ত্র কেনার পথে হাঁটছে না। বরং যৌথভাবে প্রযুক্তি তৈরি, ভারতে উৎপাদন এবং ভবিষ্যতে রফতানির সুযোগ তৈরি করার দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভারত-বেলজিয়াম প্রতিরক্ষা সহযোগিতা দেশের ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং ‘আত্মনির্ভর ভারত’ উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
জোর জোরাওয়ার ট্যাঙ্কে বেলজিয়ামের ৩১০৫ টারেট
ভারতীয় সেনার হালকা ট্যাঙ্ক জোরাওয়ার প্রকল্পে ইতিমধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বেলজিয়াম-ভিত্তিক জন ককেরিল ডিফেন্স-এর ৩১০৫ টারেটের। এই টারেটে রয়েছে ১০৫ মিলিমিটার কামান। জোরাওয়ারের প্রাথমিক প্রোটোটাইপেও এই টারেট ব্যবহার করা হয়েছে।
উচ্চ পার্বত্য ও দুর্গম এলাকায় যুদ্ধের কথা মাথায় রেখেই জোরাওয়ার ট্যাঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে ভারত-চিন সীমান্তের মতো উচ্চ উচ্চতার অঞ্চলে দ্রুত মোতায়েনের জন্য এই হালকা ট্যাঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
এই প্রকল্পে বেলজিয়ামের সংস্থাগুলির অংশগ্রহণ ভারতের স্থলযুদ্ধের সক্ষমতা আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। ওআইপি সেন্সর সিস্টেম ভারতীয় অংশীদারদের সঙ্গে সাঁজোয়া যানের জন্য উন্নত ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে।
অন্যদিকে, জন ককেরিল ডিফেন্স উচ্চ পার্বত্য এলাকায় ব্যবহারের উপযোগী উন্নত ট্যাঙ্ক টারেট প্রযুক্তি সরবরাহ করছে। টারেটের পরীক্ষা ও সংযুক্তিকরণের কাজ এগোচ্ছে। ভবিষ্যতে ভারতে উৎপাদনের লক্ষ্যে জন ককেরিল ভারতীয় সংস্থা ইলেক্ট্রো নিউম্যাটিক্স অ্যান্ড হাইড্রলিক্স-এর সঙ্গে অংশীদারিত্ব করেছে।
ভারতে তৈরি হবে ৭০ মিলিমিটার রকেট
ভারত-বেলজিয়াম প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আরেকটি বড় ক্ষেত্র হল ৭০ মিলিমিটার রকেট। বেলজিয়ামের থ্যালেস এবং ভারতের কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস লিমিটেড এই বিষয়ে চুক্তি করেছে।
এই অংশীদারিত্বের আওতায় আনগাইডেড এবং লেজার-গাইডেড—দুই ধরনের রকেট তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। থ্যালেস প্রযুক্তিগত জ্ঞান সরবরাহ করবে এবং ভারতে উৎপাদন, পরীক্ষা ও সিস্টেম সংযুক্তিকরণের দায়িত্ব নেবে কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস। লক্ষ্য হল ২০২৭ সালের গোড়ার দিকে প্রথম সম্পূর্ণ ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি রকেট প্রস্তুত করা।
থ্যালেসের প্রযুক্তি অনুযায়ী, এই ধরনের রকেট আকাশ, স্থল এবং সমুদ্র—তিন ধরনের অভিযানে ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এর ব্যবহারযোগ্যতা রয়েছে। দেশেই উৎপাদন বাড়লে আমদানির উপর নির্ভরতা কমার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রফতানির সুযোগও তৈরি হতে পারে।
সমুদ্রের মাইন শনাক্ত করবে রোবোটিক ব্যবস্থা
ভারত-বেলজিয়াম প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় সামুদ্রিক নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে। লার্সেন অ্যান্ড টুব্রো এবং বেলজিয়ামের এক্সাইল রোবোটিক্স জলের নিচে থাকা মাইন শনাক্ত, চিহ্নিত এবং নিষ্ক্রিয় করার প্রযুক্তি নিয়ে একসঙ্গে কাজ করবে।
আধুনিক নৌযুদ্ধে সামুদ্রিক মাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হুমকি। তুলনামূলক কম খরচে সমুদ্রপথ, বন্দর এবং নৌঘাঁটির প্রবেশপথ বিপজ্জনক করে তুলতে পারে এই ধরনের মাইন। তাই সেগুলি শনাক্ত ও সরিয়ে ফেলার ক্ষমতা একটি আধুনিক নৌবাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির গুরুত্ব আরও বেশি। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তার গুরুত্ব ক্রমশ বাড়ছে। তাই আন্ডারওয়াটার রোবোটিক্স, স্বয়ংক্রিয় সামুদ্রিক ব্যবস্থা, বন্দর সুরক্ষা, জলের নিচের পরিকাঠামোর নিরাপত্তা এবং মেরিন ডিজেল ইঞ্জিন—বিভিন্ন ক্ষেত্রেও দুই দেশ সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।
বছরে ১০ কোটি রাউন্ড গোলাবারুদ তৈরির পরিকল্পনা
প্রতিরক্ষা উৎপাদনে আরও বড় পদক্ষেপ হতে পারে বেলজিয়ামের লাক্রোয়া এবং ভারতের টেম্বো ক্লাসিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এর চুক্তি। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভারতে একটি নতুন উৎপাদন লাইন তৈরি করা হবে। সেখানে বছরে প্রায় ১০ কোটি রাউন্ড গোলাবারুদ তৈরির প্রস্তাব রয়েছে।
প্রকল্পটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫ কোটি ইউরো, অর্থাৎ প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত কারখানায় দুই ধরনের গোলাবারুদের জন্য সম্পূর্ণ উৎপাদন লাইন থাকবে। পাশাপাশি আরও দুই ধরনের ক্যালিবারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও টুলিংয়ের ব্যবস্থাও থাকবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ ও কারখানা স্থাপনের কাজ ২০২৮ ও ২০২৯ সালে করা হবে।
এই প্রকল্প সফল হলে ভারতে সামরিক গোলাবারুদের বৃহৎ পরিসরে উৎপাদন ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পে বিদেশি প্রযুক্তি ও ভারতীয় উৎপাদন পরিকাঠামোর সমন্বয়ের একটি বড় উদাহরণ তৈরি হবে।
ড্রোন ও কাউন্টার-ড্রোনেও নজর
আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে মধ্যপ্রাচ্য—বিভিন্ন সংঘাতে সস্তা ও ছোট ড্রোন থেকে শুরু করে উন্নত স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা যুদ্ধক্ষেত্রে বড় প্রভাব ফেলেছে। ফলে ভারতও ড্রোন এবং কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তিকে প্রতিরক্ষা আধুনিকীকরণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছে। এই ক্ষেত্রেও বেলজিয়ামের এফএন হার্স্টাল এবং কল্যাণী স্ট্র্যাটেজিক সিস্টেমস ভারতে যৌথ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় থাকতে পারে—
- ● নজরদারি ড্রোন
- ● কাউন্টার-ড্রোন প্রযুক্তি
- ● স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম
- ● উন্নত সেন্সর ও ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল ব্যবস্থা
অর্থাৎ, দুই দেশের সহযোগিতা শুধু প্রচলিত অস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং নতুন প্রজন্মের স্বয়ংক্রিয় ও মানবহীন যুদ্ধপ্রযুক্তির দিকেও বিস্তৃত হচ্ছে।
শুধু অস্ত্র কেনা নয়, প্রযুক্তি তৈরি ও উৎপাদনেও জোর
ভারত-বেলজিয়াম প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক সম্ভবত এখানেই। ভারত এখন বিদেশি সংস্থার কাছ থেকে শুধু প্রস্তুত অস্ত্র বা সরঞ্জাম কেনার পরিবর্তে প্রযুক্তি হস্তান্তর, যৌথ উন্নয়ন এবং দেশীয় উৎপাদনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
জোরাওয়ারের টারেট, ৭০ মিলিমিটার রকেট, গোলাবারুদ উৎপাদন, মাইন প্রতিরোধ প্রযুক্তি এবং ড্রোন-কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভারতীয় সংস্থাগুলিকে অংশীদার করা হচ্ছে।
এর ফলে একদিকে বিদেশি সংস্থার উন্নত প্রযুক্তি ভারতে আসবে, অন্যদিকে ভারতীয় সংস্থাগুলি উৎপাদন, পরীক্ষা, সংযুক্তিকরণ এবং ভবিষ্যতে প্রযুক্তির আরও উন্নয়নে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে।
সামরিক সহযোগিতার জন্য সরকারি কাঠামোও তৈরি
শুধু শিল্পক্ষেত্রেই নয়, দুই দেশের সরকারও প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে একটি লেটার অব ইনটেন্ট স্বাক্ষর করেছে।
এর আওতায় রয়েছে—
- ● সামরিক পর্যায়ে পারস্পরিক আদানপ্রদান
- ● আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ
- ● যৌথ সামরিক মহড়া
- ● প্রতিরক্ষা গবেষণায় সহযোগিতা
- ● সামুদ্রিক নিরাপত্তায় সমন্বয়
পাশাপাশি ভবিষ্যতে আরও বেশি শিল্প সংস্থাকে এই অংশীদারিত্বে যুক্ত করা এবং প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও দুই দেশ আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই ভারত-বেলজিয়াম প্রতিরক্ষা চুক্তি?
ভারতের জন্য এই সহযোগিতার গুরুত্ব তিনটি স্তরে দেখা যায়। প্রথমত, প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের দেশীয় উৎপাদন বাড়বে। দ্বিতীয়ত, বিদেশি প্রযুক্তির সঙ্গে ভারতীয় শিল্পের সংযোগ আরও শক্তিশালী হবে। তৃতীয়ত, দেশীয় উৎপাদন বাড়লে ভবিষ্যতে ভারতীয় প্রতিরক্ষা পণ্য বিদেশে রফতানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
বিশেষ করে ড্রোন, কাউন্টার-ড্রোন, আন্ডারওয়াটার রোবোটিক্স এবং উন্নত সেন্সরের মতো প্রযুক্তি ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সেই জায়গায় বেলজিয়ামের প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং ভারতের বৃহৎ উৎপাদন পরিকাঠামো একসঙ্গে কাজ করলে দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা শিল্প-ইকোসিস্টেম তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ, ভারত-বেলজিয়াম প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বার্তা শুধু নতুন অস্ত্র কেনা নয়—‘বিদেশি প্রযুক্তি + ভারতীয় উৎপাদন + যৌথ উন্নয়ন’-এর মাধ্যমে আগামী দিনের দেশীয় প্রতিরক্ষা শক্তি গড়ে তোলা।
