মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাজ্যে দাঙ্গা, সরকারি ও বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর এবং আইন অমান্যের প্রবণতা রুখতে বিধানসভায় সোমবার দুটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী বিল পেশ করল নতুন সরকার। বিলের প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিগত তৃণমূল সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি এবং প্রশাসনিক ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। বিরোধীদের হইচইয়ের মধ্যেই তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন— দাঙ্গা বা ভাঙচুরে জড়িতদের বিরুদ্ধে শুধু ফৌজদারি ব্যবস্থাই নয়, প্রয়োজনে তাদের সম্পত্তি বিক্রি করেও ক্ষতিপূরণ আদায় করবে সরকার।
গ্যালারিতে উপস্থিত হরগোবিন্দ দাসের পরিবার
বক্তব্যের শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভার দর্শক গ্যালারির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, রাজনৈতিক হিংসার একাধিক নিহত ও আক্রান্ত পরিবারের সদস্যরা এ দিন হাউসে উপস্থিত রয়েছেন। ডায়মন্ড হারবারে নিহত রাজু সামন্ত, মুর্শিদাবাদের হরগোবিন্দ দাস ও চন্দন দাস এবং নন্দীগ্রামের আক্রান্ত দেবব্রত মাইতির পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, অতীতে প্রশাসন সময়মতো কঠোর পদক্ষেপ নিলে এই পরিস্থিতি তৈরি হত না।
তৃণমূল সরকারকে তুলোধনা শুভেন্দুর
বিগত সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়ে শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, সাধারণ অপরাধ ও ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির মধ্যে সীমারেখা বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছিল তৎকালীন সরকার। তাঁর কথায়, সেই কারণেই আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছিল এবং সাধারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত ভোটের মাধ্যমে সেই সরকারের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন। নিজেদের নির্বাচনী সাফল্যের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, রাজ্যের একাধিক কেন্দ্রে বিজেপি বিপুল ভোটে জয় পেয়েছে। পাশাপাশি ভবানীপুর কেন্দ্রের ফলাফল নিয়েও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে কটাক্ষ করেন তিনি।
শুভেন্দুর ভাষণে ‘হার্মাদ রাজনীতি’র উল্লেখ
বর্তমান বিরোধী শিবিরের অবস্থান নিয়েও কটাক্ষ শোনা যায় মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। তাঁর দাবি, বিধানসভায় এখন কার্যকর বিরোধী শক্তির অভাব রয়েছে। কেউ ওয়াকআউট করছেন, কেউ আবার নিজেদের মধ্যেই দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ছেন। একই সঙ্গে বাম আমলের ‘হার্মাদ রাজনীতি’র প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক সন্ত্রাসের সংস্কৃতির সূচনা হয়েছিল সেই সময়েই।
এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গে শুভেন্দু
২০১৯ সালের সিএএ ও এনআরসি বিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, আন্দোলনের নামে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছিল। তাঁর দাবি, সামশিতে রেললাইন উপড়ে ফেলা, রেজিনগর স্টেশনে অগ্নিসংযোগ এবং সাঁতরাগাছিতে একাধিক বাসে আগুন লাগানোর মতো ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। সেই সময় তিনি পরিবহণমন্ত্রী হিসেবে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বলেও দাবি করেন।
শুভেন্দুর বক্তব্যে মোথাবাড়ি, ধুলিয়ান
পরবর্তীকালে নুপূর শর্মার মন্তব্যকে কেন্দ্র করে হাওড়ায় অশান্তির ঘটনাও তুলে ধরেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘ সময় জাতীয় সড়ক অবরুদ্ধ থাকায় সাধারণ মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছিলেন এবং প্রশাসন পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। মোথাবাড়ি, ধুলিয়ান-সহ একাধিক এলাকার সাম্প্রতিক অশান্তির প্রসঙ্গও এ দিন তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে। শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, ওয়াকফ্ সংশোধনী বিলের বিরোধিতার নামে বিভিন্ন এলাকায় ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছিল। ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির কারণেই তৎকালীন সরকার যথাসময়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
‘‘যাঁরা সম্পত্তি ধ্বংস করবেন…’’! চরম হুঁশিয়ারি শুভেন্দুর
নতুন আইনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, এই আইন রাজনৈতিক প্রতিহিংসার জন্য নয়, বরং দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি নষ্টের মতো অপরাধ রোধ করতেই আনা হচ্ছে। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা সম্পত্তি ধ্বংস করবেন, তাঁদের থেকেই ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে। প্রয়োজন হলে তাঁদের ভিটেমাটি বিক্রি করেও সেই টাকা উদ্ধার করবে সরকার। আগের আইনে ফাঁক ফোকর ছিল। বর্তমান আইনে ফাঁক-ফোকড় রাখা হল না। এই আইন গুণ্ডা দের জন্য প্রযোজ্য।’’ তিনি আরও জানান, অতীতে আসানসোলে দাঙ্গার ঘটনায় ক্ষতিপূরণ আদায়ের নজির তৈরি হয়েছে। ভবিষ্যতেও একই নীতি অনুসরণ করা হবে। পুলিশের উপর হামলা বা আইনশৃঙ্খলা ভাঙার চেষ্টা করলে কোনওভাবেই রেয়াত করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ভাঙড় নিয়ে নওশাদকে কটাক্ষ শুভেন্দুর
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ভাঙড়ের নির্বাচন প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, এবারের নির্বাচনে সেখানে কোনও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। পাশাপাশি বিরোধী বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকিকে উদ্দেশ্য করে রাজনৈতিক মন্তব্যও করেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, ‘‘ভাঙড়ে তো কোনও মৃত্যু নেই। বিজেপির ওইখানে ৭০ হাজার ভোট আছে। আমরা ভাঙড়টাকে ছেড়ে দিতে পারতাম। ছেড়ে দিলে যিনি জেলে ছিলেন তিনি এখানে আসতেন। আর বিলের যিনি বিরোধিতা করেছেন তিনি এখানে আসতে পারতেন না।’’ মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য চলাকালীন বিরোধী সদস্যরা একাধিকবার প্রতিবাদ ও স্লোগান তোলেন। হইচইয়ের মধ্যেই সরকার সংশোধনী বিল দুটির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে কঠোর আইন প্রয়োগের বার্তা দেয়।
