Tag: Atal Bihari Vajpayee

Atal Bihari Vajpayee

  • LK Advani: গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই থেকে রামমন্দির আন্দোলন, ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র অধ্যায় লালকৃষ্ণ আডবাণী

    LK Advani: গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই থেকে রামমন্দির আন্দোলন, ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে এক স্বতন্ত্র অধ্যায় লালকৃষ্ণ আডবাণী

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতীয় রাজনীতির ইতিহাসে লালকৃষ্ণ আডবাণীর অবদান ও ভূমিকা অনস্বীকার্য। গণতন্ত্র রক্ষা, সংবিধানের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, জনসংঘের ভিত মজবুত করা থেকে শুরু করে বিজেপির উত্থান এবং (LK Advani) রামমন্দির আন্দোলন—দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাঁর নাম। রবিবার, ৮ নভেম্বর, জীবনের শততম বর্ষে পদার্পণ করলেন প্রবীণ এই রাজনীতিক। ঘটনাচক্রে, এ বছর তাঁর জন্মদিন পড়েছে দীপাবলির সময়েই (PM Modi)। ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছর, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মজয়ন্তী এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের শতবর্ষ উদ্‌যাপনের আবহে আডবাণীর জীবনের এই বিশেষ মুহূর্তের তাৎপর্য আরও বেড়েছে।

    ১৯২৭ সালের ৮ নভেম্বর দেব দীপাবলির দিন অধুনা পাকিস্তানের করাচিতে জন্ম আডবাণীর। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় কিশোর বয়সেই সিন্ধের পরিচিত পরিবেশ ছেড়ে ভারতে চলে আসতে হয়েছিল তাঁকে। নতুন করে জীবন শুরু করার সেই কঠিন অভিজ্ঞতা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শূন্য থেকে সংগঠন গড়ে তোলার যে মানসিকতা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল, পরবর্তী রাজনৈতিক জীবনেও তার প্রতিফলন দেখা গিয়েছে। জনসংঘকে শক্তিশালী করা থেকে শুরু করে বিজেপিকে জাতীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।

    বিজেপির রাজনৈতিক উত্থান (LK Advani)

    আডবাণীর নেতৃত্বে বিজেপির রাজনৈতিক উত্থানও ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁর দলীয় সভাপতিত্বের সময়ে ১৯৮৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের আসনসংখ্যা ৪০০-র গণ্ডি থেকে নেমে ২০০-র নীচে চলে আসে। অন্যদিকে, ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের জন্য লোকসভায় একক বৃহত্তম দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে বিজেপি। একাধিক প্রজন্মের দলীয় কর্মীকে তৈরি করার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদকে অগ্রাধিকার দেওয়ার রাজনৈতিক দর্শনের উপর দলের ভিত গড়ে তুলেছিলেন তিনি।

    নেতা হিসেবে আডবাণীর দু’টি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, তাঁর আদর্শগত স্বচ্ছতা এবং রাজনৈতিক ও বৌদ্ধিক বিশ্লেষণক্ষমতা। বক্তৃতা, লেখালেখি এবং সংসদীয় বক্তব্যে বারবার তার পরিচয় পাওয়া গিয়েছে। জনসংঘ ও বিজেপির হয়ে তাঁর তৈরি করা একাধিক রাজনৈতিক প্রস্তাব আজও প্রাসঙ্গিক। দ্বিতীয়ত, ভারতীয় রাজনীতির একটি বড় অংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছদ্মধর্মনিরপেক্ষতার প্রবণতাকে প্রকাশ্যে তুলে ধরার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা।

    আরএসএসের প্রচারক আডবাণী

    আরএসএসের প্রচারক হিসেবে রাজস্থানের বিভিন্ন এলাকায় কাজের মধ্যে দিয়ে আডবাণীর সাংগঠনিক জীবনের সূচনা। পরে তিনি দিল্লিতে আসেন এবং অটলবিহারী বাজপেয়ীর সঙ্গে কাজ শুরু করেন। কয়েক দশক ধরে দুই শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও আস্থার যে সম্পর্ক বজায় ছিল, ভারতীয় রাজনীতিতে তা বিরল দৃষ্টান্ত। প্রতিযোগিতার পরিবর্তে সহযোগিতার মাধ্যমে তাঁরা একসঙ্গে দেশের রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন (LK Advani) এনেছিলেন।

    দেশভাগের ক্ষত তখনও দিল্লির সমাজজীবনে গভীরভাবে রয়ে গিয়েছিল। সেই সময় জনসংঘের সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে নিজেকে নিয়োজিত করেন আডবাণী। ১৯৬৭ সালে তিনি দিল্লি মহানগর পরিষদের চেয়ারম্যান হন। সেই দায়িত্বে প্রয়াত বিজয়কুমার মালহোত্রার সঙ্গে কাজ করেছিলেন তিনি।

    ১৯৭০ সালে রাজ্যসভার সদস্য হওয়ার মধ্যে দিয়ে তাঁর সংসদীয় জীবনের সূচনা। সংসদে তাঁর বক্তব্য ও ভূমিকা দলমত নির্বিশেষে প্রশংসা পেয়েছে। পরবর্তী সময়ে লোকসভা ও রাজ্যসভা—উভয় কক্ষেই বিরোধী দলনেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শাসকপক্ষের আসনে থেকেও নিজের সংসদীয় দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। সংসদের কাজের ব্যস্ততার মধ্যেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে গিয়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতেন তিনি।

    স্মরণীয় অধ্যায়

    ১৯৯১ সালের লোকসভা নির্বাচন আডবাণীর রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায়। সেই নির্বাচনে গান্ধীনগর-সহ দু’টি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। গুজরাটের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। দেশভাগের পর তাঁর বাবা কচ্ছ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই গুজরাট থেকেই রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আডবাণী। ফলে গান্ধীনগর থেকে নির্বাচনে লড়া ছিল অনেকটা নিজের ঘরে ফিরে আসার মতোই।

    সেই সময় বিজেপির সাংগঠনিক কাজে যুক্ত থাকার সুবাদে তাঁর নির্বাচনী মনোনয়নপত্র তৈরি এবং প্রচারের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করার সুযোগ পেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি। গান্ধীনগরের মানুষ বারবার তাঁকে সংসদে পাঠিয়েছেন। ওই কেন্দ্রের ভোটার হিসেবে একাধিকবার আডবাণীকে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেছেন মোদি। নিজের নির্বাচনী এলাকার মানুষের প্রতি আডবাণীর যত্ন ও দায়িত্ববোধকে রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে শিক্ষণীয় বলে মনে করেন তিনি।

    আ টেল অব টু ইমার্জেন্সিস’

    আডবাণীর জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় ছিল ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা। গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার আন্দোলনে তিনি সামনের সারিতে ছিলেন। জরুরি অবস্থার সময়কার অভিজ্ঞতা নিয়ে তাঁর লেখা বই ‘আ প্রিজনার্স স্ক্র্যাপ-বুক’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ওই বইয়ের ‘আ টেল অব টু ইমার্জেন্সিস’ শীর্ষক অংশে ১৯৭৫ সালের জুন মাস থেকে ভারতে শুরু হওয়া জরুরি অবস্থার সঙ্গে ১৯৩৩ সালে নাৎসি জার্মানিতে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাবলির তুলনা তুলে ধরেছিলেন (PM Modi) তিনি।

    আডবাণী যেমন ছিলেন তেজস্বী বিরোধী নেতা, তেমনই প্রশাসক হিসেবেও তাঁর দক্ষতা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৭ সালে জনতা সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রকের দায়িত্ব পান। ওই মন্ত্রকে তাঁর কাজ প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে করা হয়। পরবর্তী সময়ে উপপ্রধানমন্ত্রী এবং দীর্ঘদিনের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন তিনি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের কাজের পরিবেশ ও সুযোগ-সুবিধার উন্নতিতেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থানের ফলেই দেশে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন প্রণয়নের পথ প্রশস্ত হয়েছিল।

    তবে আডবাণীর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির মধ্যে অন্যতম ১৯৯০ সালের সোমনাথ থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত রথযাত্রা। এই যাত্রা ভারতীয় রাজনীতি ও সমাজজীবনে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। রথযাত্রার পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন—প্রতিটি পর্যায়ে যুক্ত থাকার সুযোগকে বিশেষ সৌভাগ্যের বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। সোমনাথে যাত্রার সূচনাপর্বে উপস্থিত থাকার অভিজ্ঞতাও তাঁর কাছে বিশেষ স্মরণীয়।

    দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, প্রতিদিনের ব্যস্ত কর্মসূচি, শারীরিক ধকল এবং ক্লান্তির মধ্যেও লক্ষ্য স্থির রাখার জন্য অসাধারণ সহনশীলতার প্রয়োজন হয়। রথযাত্রার সময় আডবাণী সেই ধৈর্য ও মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন।

    বিহারে আডবাণীর গ্রেফতারি

    বিহারে আডবাণীর গ্রেফতারির ঘটনাও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। ওই ঘটনার পর গুজরাটে চিমনভাই পটেল সরকারের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় বিজেপি। এর মাধ্যমে দলের আদর্শ এবং রামমন্দিরের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের বার্তা দেওয়া হয়েছিল। দলের প্রবীণ নেতা থেকে সাধারণ কর্মী—অনেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতি এলেও অযোধ্যায় রামমন্দির নির্মাণের শপথ নিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষার পর দেশবাসীর আশীর্বাদে অযোধ্যায় ভগবান শ্রীরামের মন্দির নির্মাণ বাস্তবায়িত হয়েছে।

    রাজনৈতিক জীবনের বাইরেও আডবাণীর ব্যক্তিত্বের নানা দিক রয়েছে। তাঁর সরল জীবনযাপন, অধ্যয়ন এবং ইতিহাসের প্রতি গভীর আগ্রহ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নবনির্মাণ আন্দোলনের পর তিনি জুনাগড়ে গিয়ে প্রায় এক মাস সাধারণ দলীয় কর্মীর মতো থেকেছিলেন। সেই সময় বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতিতে সংগঠনের কাজে যুক্ত ছিলেন তিনি। ওই নির্বাচনে কংগ্রেস পরাজিত হয়েছিল।

    জনজীবনে স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে আডবাণী বরাবরই নিজের অবস্থানে অনড় থেকেছেন। তিনি নিয়মিত সংবাদপত্র পড়েন এবং বিভিন্ন বিষয় গভীরভাবে খুঁটিয়ে দেখেন। চলচ্চিত্র ও নাটকের প্রতিও তাঁর বিশেষ আগ্রহ রয়েছে (LK Advani)। চলচ্চিত্র সমালোচক হিসেবেও তাঁর পরিচিতি ছিল। ইতিহাস ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাঁর চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে ‘মাই কান্ট্রি মাই লাইফ’ বইয়ে।

    সিন্ধু দর্শন পূজার প্রচার

    সিন্ধি সংস্কৃতির সঙ্গেও বরাবর যোগাযোগ বজায় রেখেছেন আডবাণী। লেহর কাছে সিন্ধু দর্শন পূজার প্রচার ও প্রসারেও উদ্যোগী হয়েছিলেন তিনি। এই অনুষ্ঠানে আডবাণীর সঙ্গে জর্জ ফার্নান্ডেজের উপস্থিতির স্মৃতিও ভাগ করে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

    আডবাণীর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের আলোচনা করতে গেলে তাঁর স্ত্রী কমলা আডবাণীর অবদানের কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয়। প্রকাশ্য জীবনের দীর্ঘ পথচলায় তিনি ছিলেন আডবাণীর নিরন্তর শক্তি ও ভরসার জায়গা।

    করাচিতে বেড়ে ওঠা কিশোর লালকৃষ্ণ আডবাণী জীবনের পরবর্তী সময়ে কোন পথে এগোবেন, তা হয়তো তখন কল্পনাও করতে পারেননি। দেশভাগের যন্ত্রণা থেকে শুরু করে জাতীয় রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছনো—তাঁর জীবনযাত্রা একাধিক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী। দেশের প্রতি তাঁর দীর্ঘ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালে তাঁকে ভারতরত্ন সম্মানে ভূষিত করা হয়।

    জীবনের শততম বর্ষে পদার্পণের এই বিশেষ দিনে আডবাণীর সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী (PM Modi)। একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে তাঁর অভিজ্ঞতা এবং আদর্শ আগামী প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি (LK Advani)।

     

  • 1984 Sikh Genocide: ১৯৮৪ সালের শিখ নিধন যজ্ঞ, অসহায় পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়েছিল আরএসএস, দাবি

    1984 Sikh Genocide: ১৯৮৪ সালের শিখ নিধন যজ্ঞ, অসহায় পরিবারগুলির পাশে দাঁড়িয়েছিল আরএসএস, দাবি

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। নিজের দেহরক্ষী বিয়ন্ত সিং ও সতবন্ত সিংয়ের গুলিতে নিহত হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর হত্যার পরবর্তী পাঁচ দিন ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে (1984 Sikh Genocide)। দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে শিখ সম্প্রদায়ের মানুষের উপর নেমে এসেছিল সংগঠিত হিংসার ভয়াবহতা। অভিযোগ, হাজার হাজার নিরপরাধ শিখকে খুন করা হয়, জীবন্ত পুড়িয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁদের বাড়িঘর ও দোকানপাটে হামলা চালানো হয়। সেই সময় প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়েও উঠেছিল গুরুতর প্রশ্ন (RSS)।

    এই পরিস্থিতিতে আরএসএস এবং তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা শিখ পরিবারগুলিকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিতে এগিয়ে এসেছিলেন বলে দাবি করা হয়। হিংসার পরিবেশে বহু শিখ পরিবারকে রক্ষা করতে সঙ্ঘের সদস্যরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন মহলে উল্লেখ করা হয়েছে।

    পরিকল্পিত হিংসার অভিযোগ (1984 Sikh Genocide)

    ইন্দিরা হত্যার পর দিল্লিতে শিখবিরোধী হিংসা কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল, তা নিয়ে একাধিক তদন্ত, প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ এবং রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। অভিযোগ, তৎকালীন শাসকদল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতাদের একাংশ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে শিখ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। এমন কথাও বলা হয় যে, শিখদের এমন শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, যা তাঁরা কোনও দিন ভুলতে পারবেন না।

    অভিযোগ, দলীয় কর্মীদের সংগঠিত করা হয়েছিল এবং বস্তি ও পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলির সমাজবিরোধীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। শিখদের বাড়ি ও দোকান চিহ্নিত করা হয়। হামলার জন্য ট্রাক জোগাড় করা হয়েছিল। লোহার রড, কেরোসিন ও পেট্রল সংগ্রহেরও অভিযোগ ওঠে।

    ১ নভেম্বর ভোর থেকেই দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় হামলা শুরু হয়। লোহার রড এবং কেরোসিন ও পেট্রলভর্তি পাত্র নিয়ে দুষ্কৃতীরা দলবদ্ধভাবে ঘুরে গুরুদ্বার-সহ শিখদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে অভিযোগ।

    রকাবগঞ্জ সাহিব গুরুদ্বারে হামলার চেষ্টার ঘটনাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। অভিযোগ অনুযায়ী, উত্তেজিত জনতা গুরুদ্বারের ভিতরে ঢোকার চেষ্টা করলে ভিতরে থাকা লাইসেন্সপ্রাপ্ত আগ্নেয়াস্ত্রের মালিক এক ব্যক্তি হামলাকারীদের ভয় দেখাতে শূন্যে গুলি চালান। পরবর্তী সময়ে জনতার সংখ্যা আরও বাড়ে। ওই এলাকায় কংগ্রেস নেতা কমলনাথ ও বসন্ত সাঠেকেও দেখা গিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

    কমলনাথের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

    রকাবগঞ্জ সাহিব গুরুদ্বারে হিংসার ঘটনায় কমলনাথের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর দেওয়া হলফনামায় উল্লেখ ছিল, ১ নভেম্বর দুপুরে গুরুদ্বার ও তার আশপাশে হিংসার খবর পেয়ে তিনি কংগ্রেসের একজন দায়িত্বশীল নেতা হিসেবে সেখানে গিয়েছিলেন। তবে ঠিক কখন তিনি পৌঁছেছিলেন এবং কতক্ষণ সেখানে ছিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ।

    বিভিন্ন সাক্ষ্যপ্রমাণ অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত গুরুদ্বার চত্বরের পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল। অভিযোগ, দুপুর প্রায় ২টো নাগাদ কমলনাথকে উত্তেজিত জনতার মধ্যে দেখা গিয়েছিল। অন্যদিকে, পুলিশ কমিশনার সেখানে পৌঁছন বিকেল সাড়ে ৩টেয়। এই সময়ের ব্যবধানকে কেন্দ্র করে তাঁর উপস্থিতির উদ্দেশ্য ও ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে (1984 Sikh Genocide)।

    শিখদের রক্ষায় আরএসএসের ভূমিকা

    ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার সময় শিখ পরিবারগুলিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন বিশিষ্ট শিখ বুদ্ধিজীবী তথা লেখক খুশবন্ত সিং। বিখ্যাত গ্রন্থ ‘এ হিস্ট্রি অব দ্য শিখস’-এর লেখক খুশবন্তের বক্তব্য অনুযায়ী, হিংসার সময় কংগ্রেসের সদস্যদের একাংশ যখন শিখদের নিশানা করছিলেন, তখন আরএসএসের সদস্যরা তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ঢাল হয়ে।

    খুশবন্ত সিংয়ের বক্তব্য ছিল, ইন্দিরা হত্যার আগে ও পরে দিল্লি-সহ বিভিন্ন জায়গায় হিন্দু-শিখ ঐক্য বজায় রাখতে আরএসএস সম্মানজনক ভূমিকা পালন করেছিল। তাঁর অভিযোগ, ১৯৮৪ সালে কংগ্রেসের নেতাদের একাংশ জনতাকে উসকে দিয়েছিলেন, যার পরিণতিতে তিন হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

    তিনি আরও বলেছিলেন, “সেই কঠিন সময়ে অসহায় শিখদের রক্ষা করতে সাহস দেখানোর জন্য আরএসএস এবং বিজেপিকে যথাযথ কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো ব্যক্তিও কয়েকটি জায়গায় নিজে হস্তক্ষেপ করে অসহায় ট্যাক্সিচালকদের সাহায্য করেছিলেন।”

    সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও ১৯৮৪ সালের সেই ভয়াবহ সময়ে দিল্লি-সহ বিভিন্ন শহরে শিখ পরিবারগুলিকে রক্ষা করতে আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের এই উদ্যোগ হিন্দু-শিখ ভ্রাতৃত্বের এক উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে (RSS)।

    রাজীব গান্ধীর বিতর্কিত মন্তব্য

    ইন্দিরার মৃত্যুর পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর একটি মন্তব্যও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। ১৯৮৪ সালের ১৯ নভেম্বর এক ভাষণে তিনি বলেছিলেন, “ইন্দিরাজির হত্যার পর দেশে কিছু দাঙ্গা হয়েছিল। মানুষ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল এবং কয়েক দিন ধরে মনে হয়েছিল যেন গোটা ভারত কেঁপে উঠেছে। যখন একটি বিশাল গাছ পড়ে যায়, তখন তার আশপাশের মাটি কিছুটা কেঁপে ওঠা স্বাভাবিক।”

    এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা হয়েছিল। সমালোচকদের বক্তব্য, শিখদের উপর সংগঠিত হামলা ও হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করার পরিবর্তে রাজীবের বক্তব্যে সেই হিংসাকে একপ্রকার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল। হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর প্রেক্ষিতে এই মন্তব্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে (1984 Sikh Genocide)।

    কংগ্রেস নেতাদের বৈঠক ও অস্ত্র বিলির অভিযোগ

    ১ নভেম্বর সকালে দিল্লির একাধিক এলাকায় কংগ্রেস সাংসদ সজ্জন কুমারকে দেখা গিয়েছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণে উঠে এসেছে। পালাম কলোনিতে সকাল সাড়ে ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে, কিরণ গার্ডেনে সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে এবং সুলতানপুরীতে সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে তাঁর উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

    পালাম কলোনির বাসিন্দা রাজকুমার নামে এক হিন্দু প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান অনুযায়ী, পালাম রেলওয়ে প্রধান সড়কে পৌঁছে তিনি একটি জিপে সজ্জন কুমারকে দেখতে পান। জিপটির পিছনে স্কুটার ও মোটরসাইকেলে চড়ে একদল উত্তেজিত মানুষ যাচ্ছিলেন।

    অভিযোগ, সজ্জন কুমারের বক্তব্যে উজ্জীবিত হয়ে ওই জনতা শিখবিরোধী স্লোগান দিচ্ছিল। তাদের মুখে শোনা যাচ্ছিল, “শিখদের মেরে ফেলো!” এবং “ইন্দিরা গান্ধী আমাদের মা, আর এরাই তাঁকে হত্যা করেছে!” এই প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণকে কেন্দ্র করে হিংসা ছড়ানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

    জগদীশ টাইটলারের ভূমিকা

    ১৯৮৪ সালের ৫ নভেম্বরের একটি ঘটনা তুলে ধরেছিলেন সাংবাদিক সুদীপ মজুমদার। তাঁর বিবরণ অনুযায়ী, ওই দিন বিকেল ৫টা নাগাদ দিল্লির পুলিশ কমিশনার এস সি ট্যান্ডন সাংবাদিকদের সঙ্গে শহরের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন।

    সেই সময় এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, শিখবিরোধী হিংসার ঘটনায় গ্রেফতার হওয়া দুষ্কৃতীদের মুক্তি দিতে কংগ্রেস সাংসদ এবং দলের শীর্ষ নেতারা পুলিশকে চাপ দিচ্ছেন কি না। পুলিশ কমিশনার এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, কংগ্রেস বা অন্য কোনও রাজনৈতিক দলের তরফে পুলিশকে কোনও চাপ দেওয়া হচ্ছে না।

    কিন্তু তাঁর বক্তব্য শেষ হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে হাজির হন দিল্লির সদর কেন্দ্রের কংগ্রেস সাংসদ জগদীশ টাইটলার। তাঁর সঙ্গে আরও তিনজন ছিলেন।

    সাংবাদিকের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘরে ঢুকেই টাইটলার পুলিশ কমিশনারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “ট্যান্ডন সাহেব, কী হচ্ছে? আমি যে কাজের কথা বলেছিলাম, তা এখনও করেননি কেন?”

    এই ঘটনায় পুলিশ কমিশনার অস্বস্তিতে পড়েন। উপস্থিত সাংবাদিকদের মধ্যেও হাসির প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। টাইটলার এরপরও কমিশনারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। এক সাংবাদিক তাঁকে সংবাদ সম্মেলনে বিঘ্ন না ঘটানোর অনুরোধ জানালে তিনি পাল্টা বলেন, “এটা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”

    এরপর সাংবাদিকরা টাইটলারকে সংবাদ সম্মেলনে যোগ দিয়ে হিংসার ঘটনায় তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আহ্বান জানান। টাইটলার সেখানে বসে পুলিশ কমিশনারকে বলেন, “আমার লোকজনকে হেফাজতে রেখে আপনারা ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে বাধা সৃষ্টি করছেন।”

    সুদীপ মজুমদারের দাবি, এই ঘটনার পর কংগ্রেসের ভূমিকা নিয়ে পুলিশ কমিশনারকে আর কোনও প্রশ্ন করা সম্ভব হয়নি। ঘটনাটি সেই সময়ের প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করে (1984 Sikh Genocide)।

    দীর্ঘদিন পর বিচারপ্রক্রিয়ায় গতি

    নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমলে ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার একাধিক পুরনো মামলা নতুন করে সক্রিয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কংগ্রেস নেতা সজ্জন কুমার এবং জগদীশ টাইটলারের বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলিও ফের বিচারপ্রক্রিয়ার আওতায় আসে।

    ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি দিল্লির একটি আদালত সরস্বতী বিহার এলাকায় বাবা ও ছেলেকে হত্যার মামলায় অভিযুক্ত কংগ্রেস নেতা সজ্জন কুমারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা শোনায়। ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হিংসার সঙ্গে যুক্ত এই মামলার রায় দীর্ঘদিন ধরে বিচারপ্রত্যাশী পরিবারগুলির কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়।

    অন্যদিকে, ২০২৩ সালে সিবিআই জগদীশ টাইটলারের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করে। কয়েক দশক ধরে অভিযুক্তদের রাজনৈতিক সুরক্ষা পাওয়ার অভিযোগের পর এই পদক্ষেপগুলি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির মধ্যে নতুন করে বিচারের আশা জাগায়।

    সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তথা শিখ অধিকারকর্মী এইচ এস ফুলকা অতীতে ১৯৮৪ সালের ঘটনাকে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন শিখবিরোধী হত্যাকাণ্ড বলে অভিহিত করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কংগ্রেসের কিছু মুসলিম সমর্থকও হিংসায় জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছিল। অন্যদিকে, বহু সাধারণ হিন্দু নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শিখদের রক্ষা করেছিলেন (RSS)।

    ইতিহাসের অন্ধকার অধ্যায়

    ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী হত্যাকাণ্ড ভারতের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কজনক অধ্যায়। শুধু ব্যাপক প্রাণহানি ও নৃশংসতাই নয়, এই হিংসার পিছনে রাজনৈতিক মদত এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও ঘটনাটিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে।

    সেই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আরএসএসের স্বেচ্ছাসেবকরা শিখ পরিবারগুলিকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছিলেন বলে যে দাবি উঠে এসেছে, তা হিন্দু-শিখ সম্প্রীতি এবং বিপদের সময়ে মানবিক দায়িত্ব পালনের দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়।

    তবে ১৯৮৪ সালের ঘটনাবলির পূর্ণাঙ্গ বিচার এবং রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায় নির্ধারণের প্রশ্ন আজও ভারতের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। নিহতদের পরিবারগুলির ন্যায়বিচার, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্যের মূল্যায়ন এবং ঐতিহাসিক সত্যের পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধানই এই অধ্যায়ের প্রকৃত নিষ্পত্তির জন্য অপরিহার্য (1984 Sikh Genocide)।

     

  • Atal Bihari Vajpayee: অটলবিহারী বাজপেয়ী, রাজনীতিতে এক বিরল যুগের উপখ্যান

    Atal Bihari Vajpayee: অটলবিহারী বাজপেয়ী, রাজনীতিতে এক বিরল যুগের উপখ্যান

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee) ছিলেন একাধারে কৃতী সাংবাদিক, কবি, অসাধারণ বক্তা, নিষ্ঠাবান দলীয় কর্মী এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ স্বয়ংসেবক। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, স্নেহশীল ও (Death Anniversary) আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁর সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই কোনও না কোনওভাবে সমৃদ্ধ হয়ে ফিরেছেন। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তিনি হাজার নয়, লাখ লাখ মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় রাজনীতির এমন একটি অধ্যায়ের অবসান হয়েছে, যেখানে প্রতিযোগিতা বা সংঘাতের পরিবর্তে সমঝোতা, সৌহার্দ্য এবং ক্ষমতার প্রতি আসক্তির পরিবর্তে দেশ ও মানুষের প্রতি ভালোবাসা গুরুত্ব পেত।

    বহুরূপে বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee)

    ভগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, যে জন্মগ্রহণ করে তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু অটলবিহারী বাজপেয়ীর মতো রাষ্ট্রনায়কের প্রয়াণে পৃথিবী ও মানবসমাজ আরও দরিদ্র হয়ে পড়ে। কেউ তাঁকে পিতৃসম ব্যক্তিত্ব বলেছেন, কেউ রাষ্ট্রনায়ক, কেউ প্রকৃত গণতন্ত্রী। কারও কাছে তিনি ছিলেন অসাধারণ বক্তা, আবার কারও কাছে স্নেহের ‘বাবজি’। প্রখ্যাত গায়িকা লতা মঙ্গেশকর তাঁকে ‘দাদা’ বলে সম্বোধন করতেন। মার্কিন নাগরিকদের কাছে অটলবিহারী বাজপেয়ী স্মরণীয় ভারত-মার্কিন সম্পর্ককে ‘স্বাভাবিক মিত্রতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার জন্য। চিনে তাঁকে স্মরণ করা হয় এমন একমাত্র ভারতীয় নেতা হিসেবে, যিনি মাও সে তুং থেকে দেং শিয়াওপিং এবং হু চিনতাও—চিনের নেতৃত্বের পরপর তিন প্রজন্মের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদানের জন্য স্মরণীয়। অনেকেই হয়তো জানেন না, তাঁকে দেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা’। কাশ্মীরের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারাও তাঁকে এমন এক নেতা হিসেবে স্মরণ করেন, যিনি আন্তরিকভাবে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে চেয়েছিলেন। সমকালীন ভারতের কাছে অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রয়াণ তাই এক অপূরণীয় ক্ষতি।

    ক্ষমতার রাজনীতি নয়, দেশের প্রতি ভালোবাসা

    অটলবিহারী বাজপেয়ী এমন এক ধরনের রাজনীতির চর্চা করতেন, যা আজকের দিনে বিরল। তাঁর কাছে ক্ষমতার প্রতি ভালোবাসার চেয়ে দেশের প্রতি ভালোবাসা ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর রাজনীতিতে আবেগ, অনুভূতি ও মানবিকতার জায়গা ছিল—যেখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক রাজনীতির মধ্যেও সহমর্মিতা বজায় থাকত। তিনি প্রতিপক্ষকে অসম্মান করতেন না, অন্যের মতকে অগ্রাহ্য করতেন না এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ বা কটূক্তির রাজনীতিতেও বিশ্বাসী ছিলেন না। তাঁর জীবন ছিল খোলা বইয়ের মতো স্বচ্ছ। ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক জীবনের মধ্যে তাঁর কোনও দ্বিচারিতা ছিল না। মহাত্মা গান্ধীর মতোই তাঁর জীবন ছিল সবার সামনে উন্মুক্ত (Atal Bihari Vajpayee)। সবাই তাঁকে ভালোবাসতেন, তাঁর প্রতি যত্নশীল ছিলেন এবং নিজের বিশ্বাসের প্রতি তাঁর দৃঢ়তার প্রশংসা করতেন। কিন্তু এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে কখনও দলের ঊর্ধ্বে ভাবেননি। একজন প্রকৃত স্বয়ংসেবক হিসেবে দলের সিদ্ধান্ত মেনে চলতেন। কোনও সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত মতের অমিল থাকলেও, একজন শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মী হিসেবে তিনি তা মেনে নিতেন। বিশিষ্ট রাজনৈতিক চিন্তাবিদ ওয়াল্টার অ্যান্ডারসন একবার বলেছিলেন, রাজনীতি ও শৃঙ্খলা সাধারণত পাশাপাশি চলে না, অটলবিহারী বাজপেয়ী ছিলেন তার একমাত্র ব্যতিক্রম।

    রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে সৌহার্দ্যের রাজনীতি

    সামাজিক জীবনে অস্পৃশ্যতার প্রথা আমরা অনেকটাই দূর করতে পেরেছি। কিন্তু তার পরিবর্তে রাজনীতিতে এক নতুন ধরনের অস্পৃশ্যতা তৈরি হয়েছে। দুই ভিন্ন দলের মানুষ যেন পরস্পরের মতের সঙ্গে একমত হওয়া তো দূরের কথা, একে অপরের সঙ্গে চোখে চোখ রেখেও কথা বলতে পারেন না।

    অটলবিহারী বাজপেয়ী এর সম্পূর্ণ বিপরীত রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদাহরণ সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর প্রতিপক্ষের প্রতিও ছিল সৌহার্দ্য। এমনকি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর মতো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর প্রতিও তিনি প্রশংসাসূচক মন্তব্য করতে দ্বিধা করতেন না।

    নেহরু একসময় বলেছিলেন, অটলবিহারী বাজপেয়ী একদিন তাঁর জায়গায় অধিষ্ঠিত হবেন। নেহরুর মৃত্যুর পর বাজপেয়ী তাঁর প্রতি যে আন্তরিক ও উজ্জ্বল শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করেছিলেন, তাতেও তাঁর রাজনৈতিক উদারতার পরিচয় পাওয়া যায়। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই গুণ ধরে রেখেছিলেন।

    কর্মীদের প্রতি ছিল গভীর মমতা

    দলীয় কর্মীদের প্রতি অটলবিহারী বাজপেয়ীর ছিল বিশেষ মমত্ববোধ। তিনি যে পদেই থাকুন না কেন, কখনও অহংকার প্রকাশ করতেন না (Atal Bihari Vajpayee)।

    অযোধ্যার তথাকথিত ‘বিতর্কিত’ কাঠামো ভেঙে পড়ার কয়েক মাস পরে বাজপেয়ীর সাক্ষাৎকার নিতে গিয়েছিলেন এক সাংবাদিক। তিনি প্রায় ১৫ মিনিট ধরে ওই সাংবাদিকের সমস্ত তিক্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিলেন ঠান্ডা মাথায়, তাঁর আচরণ কিংবা অভিব্যক্তিতে রাগের লেশ মাত্র ছিল না (Death Anniversary)।

    সংবিধান নিয়ে সচেতনতার প্রয়োজন

    অটলবিহারী বাজপেয়ীর সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল ২০০০ সালে সংবিধানের কার্যকারিতা পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি গঠন করা। সংবাদমাধ্যমের একাংশ সেই কমিটিকে সংবিধান পুনর্বিবেচনার কমিটি হিসেবে নেতিবাচকভাবে তুলে ধরেছিল। অথচ এর উদ্দেশ্য ছিল সংবিধান কীভাবে আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারে, তা খতিয়ে দেখা।

    বিআর আম্বেদকর সংবিধান প্রণয়নের সময় সতর্ক করে বলেছিলেন, সংবিধান যতই ভালো হোক, তা যদি খারাপ মানুষের হাতে পড়ে, তাহলে তার উদ্দেশ্য সফল হবে না। প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী হলেন দেশের মানুষ।

    প্রাক্তন ব্রিটিশ কূটনীতিক কার্নে রস তাঁর ‘নেতৃত্বহীন বিপ্লব’ গ্রন্থে লিখেছেন, গণতন্ত্র ভোটদাতা অর্থাৎ জনগণ এবং নির্বাচিত প্রতিনিধি অর্থাৎ সরকারের মধ্যে একটি চুক্তির ব্যবস্থা করে। গণতন্ত্র আসলে ভোটদাতা ও নির্বাচিতের মধ্যে একটি প্রত্যক্ষ সমঝোতা।

    সাধারণ মানুষ সাধারণত সংবিধানের সেই অংশটুকুই জানেন, যা তাঁদের দৈনন্দিন জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ১৯৫০ সালে সংবিধান কার্যকর হওয়ার পরেও সাধারণ মানুষকে সংবিধান সম্পর্কে শিক্ষিত করার জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

    সংবিধান সচেতনতা

    প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উদ্যোগে ২০১৫ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতি বছর ২৬ নভেম্বর সংবিধান দিবস পালন করা হবে। এর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে সংবিধানের মূল্য ও তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন করা।

    সমাজের বৃহৎ অংশের মধ্যে সংবিধান সম্পর্কে এই অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে দেশের ভিতরে ও বাইরে থাকা কিছু সংগঠন নানা ধরনের অপব্যবহার করছে। আম্বেদকর এই ধরনের অপব্যবহার সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। ভারতের স্বাধীনতা হারানোর পেছনে নিজেদের কিছু মানুষের বিশ্বাসঘাতকতাও ছিল। ভবিষ্যতে যদি নিজেদের মানুষই আবার বিশ্বাসঘাতকতা করে, তাহলে স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে এবং দেশকে ফের পরাধীনতার দিকে (Atal Bihari Vajpayee) ঠেলে দিতে পারে। তাই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি থেকে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

    সংবিধান পরিচালনার সামনে চার বড় চ্যালেঞ্জ

    সংবিধাননির্ভর শাসনব্যবস্থার সামনে চারটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ বিচারব্যবস্থা। সংবিধানের তিনটি প্রধান অঙ্গের মধ্যে বিচারব্যবস্থা বর্তমানে এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমরা জানি, বিচার পেতে দেরি হওয়া মানেই বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া। আবার কেউ কেউ মনে করেন, অতিদ্রুত বিচার করাও কখনও কখনও ন্যায়বিচারকে ব্যাহত করতে পারে।

    রাম জন্মভূমি মামলায় এলাহাবাদ হাইকোর্ট বিতর্কিত জমি তিন ভাগে ভাগ করার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই রায় বৈধ কি না, তা নির্ধারণের জন্য মামলাটি সুপ্রিম কোর্টে যায়। কিন্তু বিরোধী পক্ষ মসজিদ ইসলাম ধর্মের অবিচ্ছেদ্য অংশ কি না, সেই প্রশ্ন তুলে রায় বিলম্বিত করার চেষ্টা করে।

    বিষয়টি যখন শুনানির জন্য ওঠে, তখন প্রধান বিচারপতি মাত্র কয়েক মিনিট সময় দিয়ে জানান, এটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় নয়। এর ফলে মন্দিরপন্থীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি হয় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বড় আকারের বিক্ষোভ দেখা দেয়। লাখ লাখ মানুষ সেই বিক্ষোভে অংশ নিয়ে দেখিয়ে দেন যে তাঁদের কাছে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

    দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ আসে আমলাতন্ত্র থেকে। এখানে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয়, গোটা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার কথাই বলা হচ্ছে। এই ব্যবস্থা অনেক সময় উন্নয়নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়ও এই বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন। একটি ব্যবস্থা হিসেবে আমলাতন্ত্রের জবাবদিহির অভাব সাংবিধানিক শাসনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে (Death Anniversary)।

    আম্বেদকরের সতর্কবার্তা

    আম্বেদকর এই বলে সতর্ক করেছিলেন যে, রাজনৈতিক দলগুলি যদি দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের মতাদর্শ বা দলীয় স্বার্থকে ওপরে স্থান দেয়, তাহলে দ্বিতীয়বারও দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হতে পারে।

    অটলবিহারী বাজপেয়ীর কাছে দেশ ছিল মন্দিরের মতো। তিনি মনে করতেন, আমরা সেই মন্দিরের পুরোহিত এবং রাষ্ট্রপুরুষের সেবায় আমাদের জীবন উৎসর্গ করতে হবে। এটাই ছিল তাঁর রাজনীতির মূল দর্শন।

    ১৯৯৭ সালে ক্ষমতায় মাত্র ১৩ দিন থাকার পর পরাজিত হয়ে সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, “দল আসবে, দল যাবে, সরকার আসবে, সরকার যাবে, কিন্তু দেশকে থাকতে হবে এবং গণতন্ত্রকে চিরকাল থাকতে হবে (Atal Bihari Vajpayee)।”

    আজ পরিস্থিতি বদলেছে। জাতীয় রাজনীতিতে একটি দলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে এবং অধিকাংশ দলই আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এর অন্যতম কারণ পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির বিস্তার। জাত, ভাষা, অঞ্চল ইত্যাদির ভিত্তিতে তৈরি পরিচয় আজ রাজনীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। এটি শুধু ভারতের নয়, বিশ্বেরও একটি বড় রাজনৈতিক প্রবণতা। সংবিধানের পক্ষে এই বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

    বাইরের চাপও বড় চ্যালেঞ্জ

    তৃতীয় চ্যালেঞ্জ আসে বাইরে থেকে। এমন এক শ্রেণির উদারপন্থী বুদ্ধিজীবী ও সংগঠন রয়েছে, যারা ব্যবস্থার ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলির কার্যকারিতাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। তাঁদের কাজকর্ম জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে সংবিধানের মাধ্যমে তৈরি হওয়া মৌলিক সমঝোতার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

    বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের মধ্যে যেমন সত্যিই জনকল্যাণে কাজ করা সংগঠন রয়েছে, তেমনই কিছু সংগঠন ব্যবস্থার অপব্যবহারও করে।

    শবরীমালা মামলার কথাই ধরা যাক। শবরীমালা মন্দিরে ঋতুমতী নারীদের প্রবেশাধিকার নিয়ে এমন ব্যক্তিরাও আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, যাঁরা নিজেরাই সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাসের অনুসারী নন। কেরলের মতো একটি মাতৃতান্ত্রিক সমাজকে বাইরে থেকে লিঙ্গসমতার শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের রায়ও এই বিতর্ককে আরও জটিল করে তোলে বলে অভিযোগ।

    সংবিধানের ২৫ থেকে ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলিকে, যার মধ্যে হিন্দু ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, নিজেদের ঐতিহ্য অনুযায়ী পরিচালনার অধিকার দেয় (Atal Bihari Vajpayee)।

    রাফাল চুক্তির ক্ষেত্রেও আদালতে যাওয়া পক্ষগুলির মূল উদ্দেশ্য ছিল সরকারকে অভিযুক্ত করা। আদালত অভিযোগগুলি খারিজ করে জানিয়েছিল যে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। তবে কিছু বুদ্ধিজীবী ও বেসরকারি সংগঠন নিজেদের স্বার্থে ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে বলেও অভিযোগ।

    কবিতায় আশ্রয় খুঁজতেন অটলজি

    অটলবিহারী বাজপেয়ী শুধু রাজনীতিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন কবিও। রাজনীতির কোলাহল ও সংঘাতের মধ্যে তিনি কবিতার কাছে আশ্রয় নিতেন। তাঁর নিজের কথায়, তাঁর কবিসত্তা তাঁকে রাজনৈতিক সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার শক্তি দিত, বিশেষ করে যেসব সমস্যা তাঁর বিবেককে স্পর্শ করত।

    তিনি ছিলেন গভীর আবেগপ্রবণ এবং বিনয় তাঁর চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। রাজনীতিতে এমন বিনয়ী মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। নিজের কবিতায় তিনি ঈশ্বরের কাছে এমন উচ্চতায় না পৌঁছনোর প্রার্থনা করেছিলেন, যেখানে পৌঁছে তিনি নিজের মানুষের কাছ থেকেই দূরে সরে যাবেন।

    সাফল্য ও ব্যর্থতাকে কীভাবে সমানভাবে গ্রহণ করতে হয়, অটলজি নিজের জীবন দিয়ে তা দেখিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, জয় ও পরাজয়কে সমভাবে গ্রহণ করতে পারাই একজন প্রকৃত নেতার লক্ষণ।

    ‘অজাতশত্রু’

    আজকের কঠিন রাজনৈতিক পরিবেশে সত্য কথা বলা সহজ নয়। কিন্তু অটলবিহারী বাজপেয়ী সততা, সহনশীলতা ও সমঝোতার রাজনীতি চর্চা করেছিলেন। রাজনীতিক হিসেবে তিনি এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন যে তাঁর ব্যক্তিগত শত্রু প্রায় ছিল না। তাই তাঁকে বলা হত ‘অজাতশত্রু’।

    তিনি নিজের কাছে সৎ ছিলেন এবং দেশের মানুষের কাছেও ছিলেন সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। তিনি কখনও মনে করতেন না যে তিনিই সবসময় সঠিক। কারণ, কেউ যদি মনে করেন তিনিই সর্বদা ঠিক, সেখান থেকেই বিদ্বেষের সূচনা হয়।

    অটলবিহারী বাজপেয়ী তাঁর জীবন ও রাজনীতির মাধ্যমে আমাদের সামনে একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত রেখে গিয়েছেন। তাঁর প্রয়াণের সঙ্গে একটি যুগের অবসান ঘটেছে। সত্যিই তাঁর মতো আর একজন অটলবিহারী বাজপেয়ীকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু (Death Anniversary) তিনি যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করেছিলেন—ইতিবাচকতার রাজনীতি, সহমর্মিতা ও মর্যাদার রাজনীতি এবং বিনয়ের রাজনীতি—তা আগামী দিনেও আমাদের পথ দেখাবে (Atal Bihari Vajpayee)।

     

  • PM Modi: “দমন-পীড়ন সয়েও দলকে শক্তিশালী করেছেন বিজেপির নেতা-কর্মীরা”, বললেন প্রধানমন্ত্রী

    PM Modi: “দমন-পীড়ন সয়েও দলকে শক্তিশালী করেছেন বিজেপির নেতা-কর্মীরা”, বললেন প্রধানমন্ত্রী

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: “জরুরি অবস্থা থেকে শুরু করে কংগ্রেস আমলের দমন-পীড়ন এবং বাংলার মতো রাজ্যে রাজনৈতিক হিংসা—সব কিছু সহ্য করেও তাঁরা দলকে শক্তিশালী করেছেন এবং দেশের সেবা করেছেন।” সোমবার বিজেপির প্রতিষ্ঠা দিবসে (BJPs Foundation Day) কথাগুলি বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (PM Modi)। বিজেপির কর্মীদের নিষ্ঠা ও ত্যাগের প্রশংসা করতে গিয়েই এমন মন্তব্য করেন তিনি।

    প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য (PM Modi)

    দলের প্রতিষ্ঠা দিবসে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিজেপি কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “জনগণের সঙ্গে যুক্ত বিষয়গুলি তুলে ধরতে বিজেপি কর্মীরা কখনও পিছপা হন না। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে তাঁদের কঠোর পরিশ্রম ভারতের ভবিষ্যৎকে উন্নত করবে। তাই কর্মীরা সব ধরনের কষ্ট সহ্য করেছেন—তা জরুরি অবস্থার সময় হোক বা কংগ্রেস আমলের অত্যাচার। অনেক কর্মী নিজেদের জীবনও উৎসর্গ করেছেন। আমরা বাংলার মতো রাজ্যে দেখেছি, যেখানে হিংসা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।”

    জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা

    রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রাথমিক সময়ের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমরা সেই সময় ভুলতে পারি না, যখন ১৯৮৪ সালে কংগ্রেস রেকর্ড সংখ্যক আসন জিতেছিল, কিন্তু একই সঙ্গে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতাও করেছিল। এর ফলে মানুষের বিজেপির প্রতি আস্থা বাড়ে এবং ধীরে ধীরে আমরা আসন জিততে শুরু করি।” ভারতের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আদর্শগত পার্থক্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “সেই সময় দুটি মতাদর্শ সামনে আসে—একটি ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং অন্যটি সেবাভিত্তিক রাজনীতি (PM Modi)।”

    আরএসএস থেকে প্রেরণা

    তিনি জানান, বিজেপি আরএসএস থেকে প্রেরণা পেয়েছে (BJPs Foundation Day)। প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আরএসএসের বিশাল ও পবিত্র বটবৃক্ষের ছায়ায় আমরা নিঃস্বার্থ উদ্দেশ্য ও সততার সঙ্গে রাজনীতিতে প্রবেশের প্রেরণা পেয়েছি। প্রথম কয়েক দশকে আমরা সংগঠনের নীতিনির্ধারণে নিজেদের শক্তি নিয়োজিত করেছি। পরে সময় আসে, যখন বিজেপি নিজেকে একটি শক্তিশালী কর্মীভিত্তিক দল হিসেবে গড়ে তুলতে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করে।” তিনি বলেন, “আমরা এমন এক বিশাল কর্মীবাহিনী গড়ে তুলেছি যারা সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করে, দলের আদর্শকে নিজেদের জীবনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং কোনও পরিস্থিতিতেই নিজেদের মূল্যবোধের সঙ্গে আপস করেনি (PM Modi)।”

    আমরা দলকে মায়ের মতো মনে করি

    বিজেপির প্রতিষ্ঠা দিবসের আবেগঘন তাৎপর্যের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিজেপি একমাত্র রাজনৈতিক দল, যেখানে আমরা দলকে মায়ের মতো মনে করি। তাই এই দিনটি শুধু রাজনৈতিক অনুষ্ঠান নয়, প্রতিটি কর্মীর জন্য আবেগের দিন। এই দিনটি আমাদের দেশসেবার সুযোগ দেওয়ার জন্য দলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ দেয় (BJPs Foundation Day)।” বিজেপির সভাপতি নীতিন নবীনকে ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “এই অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আমি বিশেষভাবে আমাদের সভাপতি শ্রী নবীনজিকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি সভাপতি হওয়ার পর এটি দলের প্রথম প্রতিষ্ঠা দিবস। বর্তমানে পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন চলছে, সেখানে আমরা দলের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা দেখতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে নবীনজি দলে নতুনত্ব ও সতেজ শক্তি এনেছেন।”

    বিজেপির প্রাণপ্রতিষ্ঠা

    প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “আজ বিজেপি যে শিখরে দাঁড়িয়ে আছে, তা সকলেই দেখতে পাচ্ছেন। কিন্তু লাখ লাখ কর্মীর পরিশ্রম, তাঁদের ত্যাগ ও কঠোর সাধনা—এগুলি সত্যিকারভাবে কেবল সেই ব্যক্তি বুঝতে পারেন, যিনি নিজে এই যাত্রার অংশ ছিলেন।” বিজেপির (PM Modi) উৎপত্তি জনসংঘ থেকে, যা ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার পর কংগ্রেসকে পরাজিত করার লক্ষ্যে জনতা পার্টির সঙ্গে একীভূত হয়। পরে আরএসএস এবং জনসংঘের সদস্যদের দ্বৈত সদস্যপদ নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এর ফলে জনসংঘের সদস্যরা জনতা পার্টি ছেড়ে ৬ এপ্রিল ১৯৮০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপি প্রতিষ্ঠা করেন (BJPs Foundation Day)। গঠনের পর থেকে বিজেপি দুজন প্রধানমন্ত্রী দিয়েছে—অটল বিহারি বাজপেয়ী এবং নরেন্দ্র মোদি (PM Modi)।

     

  • Yogi Adityanath: “সোঁগালে সাধুসন্ত ও ভক্তদের বিশাল সমাবেশ যোগ দিতে পেরে আমি ধন্য”, বললেন যোগী

    Yogi Adityanath: “সোঁগালে সাধুসন্ত ও ভক্তদের বিশাল সমাবেশ যোগ দিতে পেরে আমি ধন্য”, বললেন যোগী

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: “বহু বছর পর হরিয়ানার কাইথল জেলার সোঁগাল গ্রামে সাধুসন্ত ও ভক্তদের বিশাল সমাবেশ হয়েছে। এটি এই জায়গার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরে।” শনিবার কথাগুলি বললেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ।

    কী বললেন যোগী? (Yogi Adityanath)

    সোঁগাল গ্রামে এক ধর্মসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই পবিত্র স্থানে সমবেত সাধুসন্ত ও ভক্তদের আশীর্বাদ গ্রহণ করতে পেরে আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করছি।” তিনি বলেন, “বহু বছর পর সোঁগালে এমন বিশাল সংখ্যক সাধুসন্ত ও ভক্ত উপস্থিত হয়েছেন। এই পবিত্র ভূমি, যা প্রতিটি যুগে নিজের প্রভাব দেখিয়েছে, সেখানে আজ এই পবিত্র ভাণ্ডারা ও ধর্মসভার মাধ্যমে আপনাদের দর্শন পাওয়ার এবং আপনাদের মাধ্যমে সেই মহান ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।”

    আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

    আদিত্যনাথ সোঁগালের ভূমিকে আধ্যাত্মিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করে বলেন, “এই জায়গাটি বহু বছর ধরে ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।” তাঁর মতে, সাধুসন্ত ও ভক্তদের এই ধরনের সমাবেশ দেশের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালী করে এবং মানুষকে ধর্মবিশ্বাস ও সেবার পথে চলতে প্রাণিত করে। তিনি এও বলেন, “এই ধরনের অনুষ্ঠান শুধু ধর্মীয় মূল্যবোধকে শক্তিশালী করে না, বরং বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষকে একত্রিত করে ভক্তদের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি করে।” তিনি ধর্মসভা ও ভাণ্ডারা আয়োজনের জন্য আয়োজক ও স্থানীয় ভক্তদের প্রশংসা করেন। এই ধর্মসভায় বিপুল সংখ্যক সাধু, আধ্যাত্মিক নেতা ও অনুসারীরা অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে ধর্মীয় বক্তৃতার পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছিল ভোজের। ভক্তরা একত্রিত হয়ে প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক আলোচনায় অংশ নেন।

    বাজপেয়ীর স্বপ্ন পূরণে কাজ

    মুখ্যমন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত সাধুসন্তদের শ্রদ্ধা জানান এবং ফের তুলে ধরেন ভারতের সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের গুরুত্বের কথা। এর আগে শুক্রবার, মুখ্যমন্ত্রী প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও লখনউয়ের সাংসদ রাজনাথ সিংয়ের সঙ্গে লখনউয়ে ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ গ্রিন করিডর প্রকল্পের দু’টি ধাপের উদ্বোধন করেন। এটি রাজ্যের রাজধানীতে নগর পরিবহণ উন্নত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের উদ্বোধনের পাশাপাশি আসন্ন আরও দু’টি ধাপের ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে রাজ্য সরকার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে কাজ করছে।

     

  • Atal Bihari Vajpayee: ‘অটল’ ছিল তাঁর চরিত্র, বিশ্বাস, আচরণ! জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি ভারতীয় রাজনীতির এক অবিচল নক্ষত্রকে

    Atal Bihari Vajpayee: ‘অটল’ ছিল তাঁর চরিত্র, বিশ্বাস, আচরণ! জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি ভারতীয় রাজনীতির এক অবিচল নক্ষত্রকে

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারতরত্ন অটল বিহারি বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee) ছিলেন ভারতীয় রাজনীতির এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর পরিচয় ক্ষমতা বা পদে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং আদর্শ, মানবিকতা ও দেশভক্তির দ্বারা গড়ে উঠেছিল। তাঁর নামের মতোই ‘অটল’ ছিল তাঁর চরিত্র—দৃঢ় বিশ্বাস, শালীন আচরণ এবং সহমর্মিতায় ভরপুর এক রাষ্ট্রনায়ক। রাজনৈতিক মতভেদ সত্ত্বেও বিরোধীরাও তাঁকে সম্মান করতেন। প্রথম বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। আস্থা ভোটের আগে লোকসভায় এক অবিস্মরণীয় ভাষণ দিলেন অটলজি। অথবা, তাঁর কাব্যচর্চাকে কটাক্ষ করে কংগ্রেসের তৎকালীন সভানেত্রী সনিয়া গান্ধী বললেন, শুধু কবিতা লিখলে দেশ চলে না। একটুও মেজাজ না হারিয়ে ততোধিক তীক্ষ্ণ শ্লেষে তিনি বললেন, ঠিকই, শুধু কবিতা লিখলে দেশ চলে না, লিখে রাখা ভাষণ জনসভায় গিয়ে পড়লে দেশ দৌড়য়। তাঁর সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের এমন নানা মুহূর্তের কথা দেশবাসীর মুখে মুখে আজও ঘোরে।

    জন্ম-বড় হওয়া, রাজনীতিতে যোগ

    ১৯২৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর গ্বালিয়রে জন্ম অটল বিহারী বাজপেয়ীর (Atal Bihari Vajpayee)৷ অটল বিহারীর পৈত্রিক গ্রাম যদিও ছিল উত্তর প্রদেশের আগ্রা জেলার বটেশ্বরে। সেখান থেকে মধ্য়প্রদেশে গিয়ে বসবাস শুরু করেন অটল বিহারীর ঠাকুরদা শ্যামলাল বাজপেয়ী। তাঁর মা কৃষ্ণা দেবী, বাবা কৃষ্ণবিহারী বাজপেয়ী৷ বাবা ছিলেন কবি, পেশায় স্কুলশিক্ষক৷ কবিতায় হাতেখড়ি বাবার কাছেই৷ গ্বালিয়রের ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে স্নাতক হন। পরে কানপুরের ডিএভি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তরে উত্তীর্ণ হন প্রথম শ্রেণিতে। ইংরেজি, হিন্দি, সংস্কৃত— বেশ তরুণ বয়সেই তিনটি ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন বাজপেয়ী। রাজনীতি বোধ হয় ছিল তাঁর মজ্জায়। ছাত্রাবস্থাতেই ‘আর্যসমাজ’-এর সঙ্গে যুক্ত হন। বাবাসাহেব আপ্তে-র অনুপ্রেরণায় ১৯৩৯ সালে যোগ দেন আরএসএসে। কয়েক বছরের মধ্যেই হয়ে ওঠেন সঙ্ঘের প্রচারক।

    স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ

    দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও যোগ দিয়েছিলেন অটল বিহারী ((Atal Bihari Vajpayee)৷ ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেফতার হয়েছিলেন৷ জেল খেটেছিলেন ২৩ দিন। ১৯৫১ সালে দীনদয়াল উপাধ্যায়ের অনুপ্রেরণায় অটল যোগ দেন ভারতীয় জনসঙ্ঘে৷ দলের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রিয়পাত্রও হয়ে ওঠেন শীঘ্রই৷ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অন্ধ ভক্ত ছিলেন অটলবিহারী। কাশ্মীরে যেতে বিশেষ অনুমতি পত্রকে বাধ্যতামূলক করার বিরোধিতায় ১৯৫৩ সালে আমরণ অনশনে বসেছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। একই সঙ্গে অনশনে বসেছিলেন অটল বিহারীও। এই আন্দোলন চলাকালীনই শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু হলে ভেঙে পড়েন অটল বিহারী। ১৯৫৭ সালে উত্তরপ্রদেশের বলরামপুর থেকে বাজপেয়ী প্রথম বার লোকসভায় নির্বাচিত হন৷ ১৯৬৮ সালে ভারতীয় জনসঙ্ঘের সর্বভারতীয় সভাপতি হন।

    রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে প্রথম হিন্দিতে ভাষণ

    হিন্দিতে তাঁর দক্ষতার জন্য সংসদে বার বার প্রশংসিত হয়েছে বাজপেয়ীর বক্তৃতা। এমনকী, অটল বিহারী একদিন প্রধানমন্ত্রী হবেন বলে ভবিষ্যদ্বাণীও করেছিলেন দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। প্রথম ব্যক্তি হিসাবে বাজপেয়ীই রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে হিন্দিতে ভাষণ দেন। হিন্দির প্রসারে সব সময় সক্রিয় ছিলেন তিনি। উত্তর প্রদেশের সঙ্গে আত্মার যোগাযোগ থাকলেও গোটা দেশে সমান জনপ্রিয় ছিলেন অটল বিহারী। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি গোটা জীবনে চারটি আলাদা রাজ্য থেকে ভোটে জিতে সাংসদ হয়েছেন। উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, মধ্যপ্রদেশ ও গুজরাট থেকে সাংসদ ছিলেন তিনি।

    বিজেপির প্রথম সভাপতি

    ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার অবসান। ইন্দিরা-বিরোধী ঐক্য জোরদার করতে চরণ সিং-এর নেতৃত্বাধীন ভারতীয় লোক দল এবং মোরারজি দেশাইদের কংগ্রেস (ও) এবং বাজপেয়ী-আডবাণীদের জনসঙ্ঘ মিশে যায়, তৈরি হয় জনতা পার্টি। নির্বাচনে ভরাডুবি হয় কংগ্রেসের। মোরারজি দেশাইয়ের প্রধানমন্ত্রিত্বে দেশে প্রথম অকংগ্রেসি মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। অটল বিহারী বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee) সে মন্ত্রিসভায় বিদেশমন্ত্রী হন। নানান মতাদর্শের ‘জগাখিচুড়ি’ জনতা পার্টি অবশ্য বেশি দিন ঐক্যবদ্ধ থাকেনি। ১৯৮০ সালে সাবেক জনসঙ্ঘীরা বেরিয়ে যান জনতা পার্টি থেকে। তৈরি হয় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি), যার প্রথম সভাপতি হন বাজপেয়ী।

    প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী

    ১৯৯৬ সালে লোকসভা নির্বাচনে একক বৃহত্তম দল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে বিজেপি। দেশের দশম প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন অটলবিহারী৷ কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল না দলের। ম্যাজিক ফিগার জোগাড়ও করতে পারেননি বাজপেয়ী। ১৩ দিনে পতন ঘটে বাজপেয়ী সরকারের। কিন্তু ইস্তফা দেওয়ার আগে যে ভাষণ অটল দিয়েছিলেন লোকসভায়, তা সংসদে প্রধানমন্ত্রীদের দেওয়া স্মরণীয় ভাষণগুলোর অন্যতম হয়ে রয়ে গিয়েছে। বাজপেয়ী সরকার টেকেনি ঠিকই। কিন্তু কংগ্রেস সমর্থন নিয়ে তৈরি হওয়া সংযুক্ত মোর্চা সরকারও বছর দু’য়েকের বেশি টিকতে পারেনি। ফলে ১৯৯৮ সালে ফের নির্বাচনের মুখোমুখি হয় দেশ। আরও বেশি আসন নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে বিজেপি। ফের সরকার গঠন করে এনডিএ। কিন্তু সে বারও পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকতে পারেননি বাজপেয়ী। তেরো মাসে সরকার পড়ে যায়। ১৯৯৯ সালের নির্বাচনের রায়ও ছিল বাজপেয়ীর নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের পক্ষেই। তৃতীয় বার সুযোগ পেয়ে প্রথম অকংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড গড়েন বাজপেয়ী। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তৃতীয় কার্যকালে অটলবিহারী বাজপেয়ী অনেকগুলি ক্ষেত্রে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। দেশের আর্থিক বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়েছিল। রাজকোষ দ্রুত ফুলে-ফেঁপে উঠেছিল। দেশ জুড়ে পরিকাঠামো উন্নয়ন গতি পেয়েছিল।

    তাঁর মুখচ্ছবি সহাস্য

    এক টালমাটাল সন্ধিক্ষণে দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন— এক দিকে জোট রাজনীতির উত্থান, অন্য দিকে দেশের অর্থনীতিতে বড়সড় বদল আনার প্রক্রিয়া। কিন্তু হাজার ঝড়ঝাপ্টা সামলেও অধিকাংশ অবকাশে তাঁর মুখচ্ছবি সহাস্য। আর সর্বোপরি ছিল তাঁর অসামান্য বাগ্মিতা এবং পাণ্ডিত্য। ২৪টি দল নিয়ে গঠিত এনডিএ সরকারের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি সমন্বয় ও সহাবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তাঁর সময়েই জাতীয় মহাসড়ক উন্নয়ন প্রকল্প ও গোল্ডেন কোয়াড্রিল্যাটারালের মাধ্যমে দেশের পরিকাঠামো উন্নয়নে নতুন গতি আসে।

    অসাধারণ কূটনীতিক

    রাজনীতির মতো, কূটনীতিতেও ভারসাম্যের পরিচয় দিতে চেয়েছিলেন অটল বিহারী বাজপেয়ী (Atal Bihari Vajpayee)। তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর লক্ষ্যে বড়সড় পদক্ষেপ করেছিল ভারত। তৎকালীন পাক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে সঙ্গে নিয়ে ভারত-পাক বাসযাত্রার সূচনা করেছিলেন বাজপেয়ী। বলেছিলেন, ‘‘বন্ধু বদলানো যায়৷ কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো যায় না।’’ কিন্তু কার্গিলে পাক অনুপ্রবেশ ও দখলদারির খবর পেয়েই সর্বাত্মক সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিতে দ্বিধা করেননি তিনি। অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে পোখরানে পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটায় ভারত। তাতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয় নয়াদিল্লিকে। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে ভারতের অভূতপূর্ব সুসম্পর্কের দরজাটাও খুলে দিয়ে যান অটলবিহারী বাজপেয়ী-ই। তাঁর আমলেই ভারত সফরে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টন। ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন যুগের সূচনা হয়ে যায় ক্লিন্টনের সেই ভারত সফরেই।

    ঐক্য ও দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল প্রতীক

    জনসংঘ ও পরবর্তীকালে ভারতীয় জনতা পার্টিকে আদর্শিক শক্তি জোগানো এই নেতা সংসদীয় গণতন্ত্রে শালীনতা ও যুক্তিবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সংসদে তাঁর বক্তৃতা ছিল যুক্তি, রসবোধ ও সৌজন্যের অনবদ্য মিশ্রণ। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বাজপেয়ী লোকসভায় ১০ বার এবং রাজ্যসভায় ২ বার নির্বাচিত হন। জাতীয় স্বার্থকে দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার এক উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি হয় যখন প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিংহ রাও বিরোধী দলের নেতা হয়েও অটল বিহারি বাজপেয়ীকে জাতিসংঘে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠান। কাশ্মীর ও মানবাধিকার ইস্যুতে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তাঁর সংযত অথচ দৃঢ় বক্তব্য ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করে। মতাদর্শগত দিক থেকে বাজপেয়ীর চেয়ে অনেকটা দূরত্বে অবস্থান করা মনমোহন সিং বলেছিলেন, ‘‘অটল বিহারী বাজপেয়ী হলেন ভারতীয় রাজনীতির ভীষ্ম।’’ দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০১৮ সালের ১৬ আগস্ট নয়াদিল্লির এইমসে তাঁর মৃত্যু হয়। ‘সদৈব অটল’ নামে তাঁর স্মৃতিসৌধ আজও তাঁর অবিচল আদর্শের প্রতীক।

     

     

     

     

LinkedIn
Share