মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মুম্বইয়ের রাস্তায় সাধারণ ছেলেদের মতোই কলেজ যাওয়া-আসা করছিল ২১ বছরের আয়ান শেখ (Ayan Sheikh)। কেউ ভাবেনি যে এই ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্রের পিছনে লুকিয়ে আছে জঙ্গি সংগঠনের ছায়া। মহারাষ্ট্র অ্যান্টি-টেররিজম স্কোয়াড (এটিএস) কয়েকদিন আগে তাকে গ্রেফতার করেছে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন জইশ-ই-মহম্মদ (জেএম) এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে।
কীভাবে জঙ্গিদের জালে
এটিএস-এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গোয়েন্দা সূত্র থেকে খবর আসে যে মুম্বইয়ের কুর্লা, গোভান্ডি এবং শিবাজী নগর এলাকায় কয়েকজন যুবক অনলাইনে জইশ এবং ইসলামিক স্টেট-এর প্রচারমূলক উপাদান ছড়াচ্ছে। গত ২ মার্চ রাতে এই তিন জায়গায় সমন্বিত অভিযান চালানো হয়। অভিযানে আয়ান শেখের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে ল্যাপটপ, মোবাইল ফোনসহ একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা গিয়েছে, এই ডিভাইসগুলোয় জইশ প্রধান মাসুদ আজহারের অডিও এবং ভিডিও ক্লিপ রয়েছে। এছাড়া টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে জইশ এবং আইএসআইএস-এর প্রোপাগান্ডা শেয়ার করা হয়েছে।
“স্লিপার সেল”-এর সক্রিয় সদস্য
তদন্তে জানা গিয়েছে, গত ছয় মাস ধরে সে মুম্বইয়ে জইশ-ই-মহম্মদের একটি “স্লিপার সেল” হিসেবে সক্রিয় ছিল। তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল যুবসমাজকে উগ্রপন্থায় প্রভাবিত করা এবং জঙ্গি কার্যকলাপের জন্য নতুন সদস্য নিয়োগ করা। এটিএস সূত্রে জানা যায়, আয়ান তার দুই সহপাঠী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে উগ্রপন্থায় প্রভাবিত করেছিল। এমনকি তাদের ওপর এতটাই চাপ সৃষ্টি করেছিল যে তারা বিদেশে গিয়ে জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনাও করেছিল। ওই দুই ছাত্রের বয়ান ইতিমধ্যেই রেকর্ড করেছে এটিএস, যা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করছে। অভিযানের সময় আয়ান ও অন্য দুই ছাত্রের একাধিক ইলেকট্রনিক ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং সেগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। প্রাথমিক পরীক্ষায় পাকিস্তানভিত্তিক জইশ-সমর্থকদের সঙ্গে তার যোগাযোগের প্রমাণ এবং সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা মাসুদ আজহারের ভিডিও উদ্ধার হয়েছে।
পাকিস্তান ও সৌদি আরবে থাকা হ্যান্ডলারদের থেকে সাহায্য
এছাড়াও তদন্তে জানা গিয়েছে, পাকিস্তান ও সৌদি আরবে থাকা হ্যান্ডলারদের কাছ থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে আর্থিক সহায়তাও পেত আয়ান। এই অর্থ ব্যবহার করে জঙ্গি সংগঠনের প্রচার ও নিয়োগ কার্যক্রম চালানো হচ্ছিল বলে অভিযোগ। এটিএস-এর দাবি, আয়ান টেলিগ্রামের মতো এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জইশ ও আইএসআইএসের প্রচারমূলক কনটেন্ট ছড়াত এবং বন্ধুদের বিভিন্ন উগ্রপন্থী গ্রুপে যুক্ত করত। এসব গ্রুপে বিদেশি নাগরিক এবং সম্ভাব্য জঙ্গি হ্যান্ডলাররাও উপস্থিত ছিল বলে জানিয়েছেন তদন্তকারীরা। তদন্তে আরও জানা গেছে, জইশ-ই-মহম্মদ ভবিষ্যতে মুম্বইয়ে সম্ভাব্য জঙ্গি কার্যকলাপের জন্য আয়ানকে ব্যবহার করার পরিকল্পনা করেছিল। আয়ান শেখের বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (UAPA)-এর ধারা ৩৮ (জঙ্গি সংগঠনের সদস্যপদ) এবং ৩৯ (জঙ্গি সংগঠনকে সহায়তা) সহ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-এর ১৫২, ১৯৬ ও ১৯৭ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়া জঙ্গিদের প্রধান অস্ত্র
দুই যুবকের ভূমিকা এখনও তদন্তাধীন। এই ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে যে অনলাইন জগত কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। যুবকরা সহজেই জঙ্গি প্রোপাগান্ডার ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে। আয়ান একজন ইঞ্জিনিয়ারিং ছাত্র যার জীবনের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল। কিন্তু কোনও অজানা কারণে সে জঙ্গি আদর্শের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এটিএস জানিয়েছে, তাঁর ডিভাইসে মাসুদ আজহারের বক্তৃতা, জেএম-এর প্রশিক্ষণ ভিডিও এবং আইএসআইএস-এর ক্যালিফেটের প্রচার ছিল। এগুলো দেখে তিনি অন্যদেরও প্রভাবিত করতে চেয়েছিল। মুম্বইয়ের এই গ্রেফতারি দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। অনেকে বলছেন, শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে র্যাডিকালাইজেশনের প্রবণতা বাড়ছে। সোশ্যাল মিডিয়া এবং মেসেজিং অ্যাপগুলো এখন জঙ্গিদের প্রধান অস্ত্র। এটিএস-এর এই অভিযান সময়মতো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। যদি না ধরা পড়ত, তাহলে হয়তো আরও বড় কোনও ষড়যন্ত্র জন্ম নিত।
