মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: বাংলাদেশে একই দিনে দু’জায়গায় হিন্দু নিধনের (Bangladesh Hindu Murder) অভিযোগ। নৈরাজ্যের বাংলাদেশ ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিসরে। সোমবার একদিকে যশোরের কপালিয়া বাজারে গলা কেটে খুন করা হয় ব্যবসায়ী তথা সাংবাদিক রাণাপ্রতাপ বৈরাগীকে। এই ঘটনার ক্ষণিকের ব্যবধানেই আরও এক সংখ্য়ালঘু হিন্দুকে খুন করার অভিযোগ ওঠে। যা ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়াল এলাকায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নিহতের নাম শরৎ চক্রবর্তী মণি। তিনি ঢাকার নরসিংদীর বাসিন্দা। পেশায় ব্যবসায়ী। গত ১৮ দিনে এই নিয়ে বাংলাদেশে এটা ষষ্ঠতম হিন্দু নিধনের অভিযোগ। বাংলাদেশে এক হিন্দুর রক্ত শুকনোর আগেই আর এক হিন্দুকে খুন করা হচ্ছে। রাণার মৃত্যুর রেশ কাটার আগেই শরৎকে খুন করা হস। বাংলাদেশে বসবাসকারী হিন্দুদের আশঙ্কা, এভাবে চললে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দুদের অস্তিত্বই থাকবে না।
নরসিংদীতে খুন হিন্দু ব্যবসায়ী
নরসিংদীর পলাশ উপজেলার চরসিন্দুর বাজারে নিজের মুদি দোকানে খুন হন শরৎ চক্রবর্তী মণি, বয়স আনুমানিক ৪০ বছর। বাজারে তাঁর ভালই পরিচিত ছিল। শান্ত স্বভাবের মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিল মণি। কারওর সঙ্গে কোনও বিবাদের খবর পাওয়া যায়নি। তা হলে সেই ব্যক্তির পরিণতি কী ভাবে? ধর্মের দোহাই দিয়েই মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হল না তো? প্রশ্ন তুলছেন একাংশ। সোমবার রাতে প্রতিদিনের মতোই নিজের দোকানপাট নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন মণি। তখন বাজারে ঠাসা ভিড়। রাত হলেও মানুষের আনাগোনা কমেনি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এমন সময়ই কয়েকজন অজ্ঞাত পরিচয়ের ব্যক্তি মণির উপর চড়াও হয়। অতর্কিতেই হামলা চালায় তাঁর উপর। গুরুতর ভাবে আহত হন মণি। বাজারের অন্য ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু ততক্ষণে অনেকটাই সময় পেরিয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করে।
সাংবাদিক রানা খুন
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে লাগাতার হিংসা চলছেই। যশোরে এক হিন্দু ব্যবসায়ীকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। নিহত ব্যক্তি রানা প্রতাপ (৪৫)। তিনি একটি আইস ফ্যাক্টরির মালিক ছিলেন এবং একই সঙ্গে একটি দৈনিক পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্থানীয় সূত্রের খবর, সোমবার সন্ধ্যা প্রায় ৬টার দিকে যশোরের মনিরামপুর উপজেলার কোপালিয়া বাজার এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কয়েকজন যুবক মোটরসাইকেলে করে এসে রানা প্রতাপকে তার আইস ফ্যাক্টরি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরে একটি গলিতে নিয়ে গিয়ে তাকে মাথায় গুলি করে এবং গলা কেটে হত্যা করে পালিয়ে যায়। রানা নড়াইল জেলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক বিডি খবর পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকও ছিলেন।
১৮ দিন ষষ্ঠতম হত্যা
- ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫: ময়মনসিংহে (ধর্ম অবমাননার অভিযোগে) দীপু চন্দ্র দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করে জনতা।
- ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫: রাজবাড়িতে জনতা অমৃত মণ্ডলকে পিটিয়ে হত্যা করে।
- ২৯-৩০ ডিসেম্বর ২০২৫: বজেন্দ্র বিশ্বাসকে (পোশাক কারখানায় কর্তব্যরত অবস্থায়) গুলি করে হত্যা করা হয়।
- ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫: শরীয়তপুরে খোকন চন্দ্র দাসকে ছুরিকাঘাত করা হয় এবং তারপর পেট্রোল ঢেলে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হয়। ৩ জানুয়ারি তিনি হাসপাতালে মারা যান।
- ৫ জানুয়ারি ২০২৬: যশোরে রানা প্রতাপ বৈরাগীকে গুলি করে হত্যা করা হয়।
- ৫ জানুয়ারি ২০২৬: নরসিংদীতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুন করা হয় শরৎ চক্রবর্তী মণিকে।
শুরু হয়েছিল দীপু দাসকে দিয়ে। ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ তুলে প্রথমে গণপিটুনি। তারপর গাছে বেঁধে দীপুর গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল উগ্রপন্থীরা। সেই পৈশাচিক দৃশ্য ছিল ভয়াবহ, হিমস্রোত বইয়ে দেওয়ার মতো। তারপর থেকে বাংলাদেশের নানা উপজেলা থেকে উঠে এসেছে হিন্দু নিধনের অভিযোগ। অমৃত মণ্ডল থেকে শুরু করে বজেন্দ্র বিশ্বাস, খোকন চন্দ্র দাস— উঠে এসেছে একের পর এক নাম। এবার সেই নিহতদের তালিকায় যোগ হল শরৎ চক্রবর্তী, রানা প্রতাপ বৈরাগীর নামও। কিন্তু বিচার? তা এখনও অধরা। দেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে মহম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বাংলাদেশের সরকারের তরফে এখনও পর্যন্ত এ নিয়ে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। ভারত এই ঘটনাগুলিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে অব্যাহত বৈরিতাকে গুরুতর বিষয় হিসাবে বর্ণনা করেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলিও বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং সংখ্যালঘুদের উপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছে।
আমার জন্মভূমি মৃত্যু উপত্যকা
জানা গিয়েছ, ৫ ডিসেম্বর স্থানীয় সম রাত ১০টা নাগাদ এই হামলা হয়েছিল শরৎ চক্রবর্তী মণির ওপর। নিহত মণি শিবপুর উপজেলার সাধারচর ইউনিয়নের বাসিন্দা ছিলেন। শরতের স্ত্রী অন্তরা মুখোপাধ্যায় গৃহবধূ। তাঁদের ছেলে অভীক চক্রবর্তীর বয়স ১২ বছর। আগে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত ছিলেন শরৎ। কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে ফিরেছিলেন। জানা গিয়েছে, গত ১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ফেসবুকে নিজের উদ্বেগ ব্যক্ত করে একটি পোস্ট করেছিলেন শরৎ। লিখেছিলেন, ‘‘চারিদিকে এত আগুন, এত হিংসা। আমার জন্মভূমি মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।’’ আর সেই উদ্বেগ প্রকাশের একমাস যেতে না যেতেই তাঁকে খুন হতে হল।
হিন্দু হওয়াই অপরাধ
পাড়া-প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, শরৎ অত্যন্ত শান্ত স্বভাবের ছিলেন, অত্যন্ত মানবিক ছিলেন, সামাজিক ভাবে দায়বদ্ধ ছিলেন। কোনও শত্রু ছিল না তাঁর। হিন্দু বলেই শরৎকে খুন করা হল কি না, সেই প্রশ্ন তুলছেন প্রতিবেশীরাই। বাংলাদেশের সমাজকর্মী বাপ্পাদিত্য বসু এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন। তাঁর কথায়, রাষ্ট্রের মদতেই সংখ্যালঘু হিন্দুদের হত্যা করা হচ্ছে। তিনি দাবি করেছেন, দুষ্কৃতীরা শরতের থেকে মোটা টাকা ‘জিজিয়া’ দাবি করছিল। পুলিশের কাছে গেলে স্ত্রীকে অপহরণ করার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাঁকে খুন করা হল তাঁরই দোকানে। এই আবহে ইউনুস সরকারকে তোপ দেগে বাপ্পাদিত্য ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘‘যে দেশে সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনায় হিন্দুদের জাতিগত নিধন বা এথনিক ক্লেনজিং চলে, সেই দেশে হিন্দু হওয়াটাই তো খুন হয়ে যাবার পক্ষে বড় কারণ।’’
মোদি এলেও আটকতে পারবে না
বাংলাদেশে হিন্দু হলেই মেরে ফেলা হতে পারে, এমনই দাবি বাপ্পাদিত্যের। শরৎকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনতেন বাপ্পাদিত্য। তিনি জানিয়েছেন, দুষ্কৃতীরা শরতের থেকে মোটা টাকা দাবি করছিল। বাংলাদেশে থাকতে হলে টাকা দিতে হবে বলে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল তাঁকে। ‘জিজিয়া’ দিতে বলা হয় শরৎকে। পুলিশের কাছে গেলে স্ত্রীকে অপহরণ করার হুমকিও দেওয়া হয়। বাপাদিত্য বলেন, ‘‘দুষ্কৃতীরা শরৎকে বলে, ‘চুপচাপ টাকা দিয়ে দে। বেশি চিৎকার করিস না। তোর ভারত বা তোর বাবা নরেন্দ্র মোদি এলেও জিজিয়া আদায় করা আটকাতে পারবে না’।’’ ইসলামি রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিমদের কাছ থেকে যে কর আদায় করার চল রয়েছে, তাকেই বলা হত ‘জিজিয়া’। অমুসলিমদের জীবন, সম্পত্তি রক্ষা এবং ধর্মাচারণের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে ওই কর নেওয়ার চল ছিল। বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের মুখপাত্র কাজল দেবনাথ বলেন, ‘‘শুধুমাত্র ডিসেম্বর মাসেই হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর সাতটি হামলা এবং পাঁচটি হত্যার খবর পাওয়া গেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন যে, মৌলবাদী গোষ্ঠীগুলি সংখ্যালঘুদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে।’’

