মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: সংসারের অভাব ঘোচানোর স্বপ্ন নিয়ে হাজার কিলোমিটার দূরে জম্মু ও কাশ্মীরে পাড়ি দিয়েছিলেন দুই যুবক। ভেবেছিলেন, কয়েক মাস কঠোর পরিশ্রম করলে পরিবারের মুখে দু’মুঠো অন্ন তুলে দিতে পারবেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ একটু নিরাপদ হবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হল না। দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগাম জেলার কেলাম এলাকায় একটি ইটভাটায় কর্মরত অবস্থায় শুক্রবার রাতে জঙ্গিদের গুলিতে (Kulgam Terror Attack) প্রাণ গেল ছত্তিশগড়ের (Chhattisgarh) দুই পরিযায়ী শ্রমিক দীপক রাত্রে (২৪) এবং ভূপেন্দ্র ভাইনা (২৮)-র। এই ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে দুই পরিবারের পাশাপাশি গোটা এলাকায়।
অকালে প্রাণ হারালেন দুই যুবক
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শুক্রবার রাতে কুলগামের কেলাম এলাকার একটি ইটভাটায় হঠাৎ জঙ্গিরা হামলা (Kulgam Terror Attack) চালায়। সেই সময় সেখানে কাজ করছিলেন দীপক ও ভূপেন্দ্র। জঙ্গিদের গুলিতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় দুই শ্রমিকের। তাঁরা দু’জনেই জীবিকার সন্ধানে কয়েক মাস আগে কাশ্মীরে গিয়েছিলেন। ঘটনার পর এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। হামলাকারীদের খোঁজে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।
কে ধরবে সংসারের হাল?
দীপকের বাড়ি ছত্তিশগড়ের (Chhattisgarh) সাকতি জেলার বুন্দেলি গ্রামে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিলেন তিনি। কয়েক মাস আগে কাশ্মীরে ইটভাটায় কাজ করতে গিয়েছিলেন। দীপকের বাবা আগেই মারা গিয়েছেন। বাড়িতে রয়েছেন বৃদ্ধ মা, শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী ছোট ভাই, দীপকের স্ত্রী এবং মাত্র চার মাসের এক শিশু পুত্র। সংসারের সমস্ত দায়িত্ব একাই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন দীপক। দীপকের কাকা হালধর জানান, পরিবারের আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত খারাপ ছিল। তাই বাধ্য হয়েই এত দূরে কাজের সন্ধানে যেতে হয়েছিল দীপককে। তাঁর মৃত্যুর পর পরিবার কার্যত অসহায় হয়ে পড়েছে। বৃদ্ধ মা ও ভাই বারবার ভেঙে পড়ছেন কান্নায়। এখন সংসার চালানোর মতো আর কেউ নেই।
‘সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়’
সারঙ্গড়-বিলাইগড় জেলার ছুইয়া গ্রামের বাসিন্দা ভূপেন্দ্রও প্রায় তিন মাস আগে স্ত্রীকে নিয়ে কাশ্মীরে গিয়েছিলেন ইটভাটায় কাজ করতে। নিজেদের চার বছরের ছেলেকে বাড়িতে দিদিমা ও নাবালিকা বোনের কাছে রেখে যেতে হয়েছিল তাঁদের। ভূপেন্দ্রের বাবা-মা এবং ভাই তখন হিমাচল প্রদেশে শ্রমিকের কাজ করছিলেন। পরিবারের অভাব এতটাই ছিল যে, জীবিকার সন্ধানে বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়তে হয়েছিল তাঁদের। শনিবার গভীর রাতে পুলিশ বাড়িতে পৌঁছে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে। তবে বৃদ্ধ দিদিমা এবং ছোট বোনকে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর খবর না জানিয়ে প্রথমে হিমাচল প্রদেশে থাকা তাঁর বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের বিষয়টি জানানো হয়। শনিবার সকাল পর্যন্ত ভূপেন্দ্রের ছোট বোন জানতেন না যে তাঁর ভাই আর বেঁচে নেই। সংবাদমাধ্যমের সামনে তিনি শুধু বলেছিলেন, সংসারে নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর পরিস্থিতি ছিল বলেই ভূপেন্দ্র কাশ্মীরে কাজ করতে গিয়েছিলেন।
মরদেহ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ প্রশাসনের
দুই শ্রমিকের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ছত্তিশগড় (Chhattisgarh) প্রশাসন তৎপর হয়ে ওঠে। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, জম্মু ও কাশ্মীর প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিহতদের মরদেহ দ্রুত তাঁদের গ্রামের বাড়িতে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলিকে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
শোকপ্রকাশ মুখ্যমন্ত্রীর
ছত্তিশগড়ের (Chhattisgarh) মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেও সাই গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “নিরীহ শ্রমিকদের ওপর এই কাপুরুষোচিত জঙ্গি হামলা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। নিহতদের পরিবারের পাশে রাজ্য সরকার সব সময় থাকবে এবং তাঁদের জন্য সম্ভাব্য সমস্ত সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।”
জীবিকার খোঁজে গিয়ে নিভে গেল দুটি জীবনের আলো
দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে গিয়েছিলেন শুধু পরিবারের মুখে দু’বেলা খাবার তুলে দেওয়ার আশায়। দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে সন্তান ও পরিবারের জন্য একটু ভালো ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নই ছিল তাঁদের। কিন্তু সেই স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত জঙ্গি হামলায় (Kulgam Terror Attack) থেমে গেল। দুই পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, সন্ত্রাসের বলি শুধু নিরাপত্তা বাহিনী নয়, কখনও কখনও সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষও হয়ে ওঠেন।
