মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দুর্গাপুজোর আবহেই পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্প বিনিয়োগের একাধিক ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বুধবার হলদিয়ায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে তৈরি দেশের বৃহত্তম ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন কেন্দ্রের উদ্বোধন করেন তিনি। একই সঙ্গে নদিয়ার হরিণঘাটায় ক্যাম্পা কোলার নতুন কারখানা তৈরির ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। হলদিয়ায় আরও দুটি শিল্পপ্রকল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। রাজ্যে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং আমদানি নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে এই উদ্যোগগুলি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
হলদিয়ায় ৬ হাজার কোটির ফেনল-অ্যাসিটোন কারখানা
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেডের সম্পূর্ণ অধীনস্থ সংস্থা অ্যাডপার্মা প্রাইভেট লিমিটেড এই ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন কেন্দ্রটি তৈরি করেছে। প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা এই কারখানা দেশের বৃহত্তম ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন কেন্দ্র বলে জানানো হয়েছে।
শিল্পপ্রকল্পটির উদ্বোধন করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, হলদিয়ায় ইতিমধ্যেই ৬ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। পাশাপাশি আরও ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ পাইপলাইনে রয়েছে। তাঁর বক্তব্য, এই কারখানা চালু হওয়ায় রাসায়নিকের জন্য বিদেশ থেকে আমদানির উপর নির্ভরতা কমবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যপূরণেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে হলদিয়ার শিল্পাঞ্চলে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারখানায় সরাসরি প্রায় ৪০০ জনের কর্মসংস্থান হয়েছে। পরোক্ষভাবে কাজ পেয়েছেন আরও প্রায় ১,০০০ জন। ফলে স্থানীয় অর্থনীতি এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
হরিণঘাটায় ক্যাম্পা কোলা, ২৮ অক্টোবর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
রাজ্যে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম বড় ঘোষণা এসেছে ক্যাম্পা কোলাকে ঘিরে। নদিয়ার হরিণঘাটায় এই পানীয় সংস্থার কারখানা তৈরি করতে চলেছে রিলায়েন্স গোষ্ঠী। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ২৮ অক্টোবর, বুধবার প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে।
রাজ্যে শিল্প ও উৎপাদন ক্ষেত্রকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এই উদ্যোগকে দেখা হচ্ছে। এর আগে লাক্স কোজি এবং আমূলের মতো সংস্থার কারখানা ঘিরেও রাজ্যে শিল্প সম্প্রসারণের উদ্যোগের কথা সামনে এসেছে। পাশাপাশি পূর্ব মেদিনীপুরের দাদনপাত্রবাড়ে গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিনিয়োগ টানতে শিল্পপতিদের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ রাখছে রাজ্য সরকার। মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির মতো শিল্পপতিদের সঙ্গে বৈঠকের কথাও উঠে এসেছে। নিউটাউনে আদানি গোষ্ঠীর হাসপাতাল প্রকল্পের পাশাপাশি রাজ্যে নতুন শিল্প ও পরিকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
হলদিয়ায় পেপসির প্ল্যান্ট, তৈরি হবে চিকিৎসা সরঞ্জামও
হলদিয়াকে ঘিরে আরও দুটি শিল্পপ্রকল্পের কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর ঘোষণা অনুযায়ী, প্রায় ৯৮ একর জমিতে পেপসির উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে উঠবে। অন্যদিকে, প্রায় ৫০ একর জমিতে চিকিৎসা সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি তৈরির কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এই দ্বিতীয় প্রকল্পের সঙ্গে প্রভিস কোম্পানির নাম উল্লেখ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এই প্রকল্পগুলি বাস্তবায়িত হলে হলদিয়ার শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ক্ষেত্রের পরিধি আরও বাড়তে পারে। রাসায়নিক শিল্পের পাশাপাশি পানীয় এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনের মতো পৃথক ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে স্থানীয় কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সহায়ক শিল্প ও পরিষেবা ক্ষেত্রেও নতুন কাজের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
এ ছাড়া হলদিয়ায় আইডব্লিউএল এবং আইওসিএলের প্ল্যান্টের জন্যও কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে এই প্রকল্পগুলির বিনিয়োগের অঙ্ক ও বাস্তবায়নের সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি।
শ্রমিকদের চিকিৎসায় ৫০ শয্যার ট্রমা সেন্টার
শিল্প বিনিয়োগের পাশাপাশি হলদিয়ার শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা পরিষেবার উন্নয়নেও জোর দিয়েছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা, ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে হলদিয়ায় ৫০ শয্যার একটি ট্রমা সেন্টার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে।
শিল্পাঞ্চলে কাজ করার সময় দুর্ঘটনা ঘটলে শ্রমিকদের দ্রুত চিকিৎসা দেওয়াই এই কেন্দ্র তৈরির অন্যতম উদ্দেশ্য। উন্নত জরুরি চিকিৎসার পরিকাঠামো গড়ে উঠলে দুর্ঘটনাগ্রস্ত শ্রমিকদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভাতার বদলে দক্ষতা ও স্বনির্ভরতায় জোর
শিল্পপ্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কর্মসংস্থান ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী স্থানীয় যুবক-যুবতীদের শিল্পের উপযোগী করে তুলতে প্রশিক্ষণ এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টের উপর জোর দেন।
তাঁর বক্তব্য, আর্থিক সহায়তার উপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে স্বনির্ভর হয়ে ওঠা প্রয়োজন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভাতা নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে আত্মনির্ভর হতে হবে। এটাই আজ আমাদের শপথ হওয়া উচিত।’
রাজ্যে নতুন শিল্পপ্রকল্প তৈরি হলে সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য স্থানীয় যুবক-যুবতীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ কর্মী তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন সংস্থাগুলির কর্মী নিয়োগ সহজ হবে, তেমনই স্থানীয় স্তরে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে।
দীপাবলির আগে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণার ইঙ্গিত
রাজ্যে আরও বিনিয়োগ টানতে নতুন শিল্পনীতি তৈরির কাজ চলছে বলেও জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। দিওয়ালির আগেই সেই নীতি ঘোষণা করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। তবে নতুন শিল্পনীতির নির্দিষ্ট রূপরেখা এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিনের। রাজ্যের ক্ষমতার পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে শিল্পের অভাব ও কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগের বিষয়টি উঠে এসেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে নতুন বিনিয়োগ, উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপন এবং পরিকাঠামো উন্নয়নকে সামনে রেখে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরির বার্তা দিচ্ছে রাজ্য সরকার।
হলদিয়ার ফেনল-অ্যাসিটোন কারখানা, হরিণঘাটায় ক্যাম্পা কোলার প্রকল্প এবং হলদিয়ায় প্রস্তাবিত পেপসি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদন কেন্দ্র—সব মিলিয়ে রাজ্যে শিল্প বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এই উদ্যোগগুলির দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পগুলি কত দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, কতটা কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং স্থানীয় যুবক-যুবতীরা সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারেন, তার উপর।
