মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: জনসাধারণের জন্য প্রকল্প নিয়ে রাজনীতি করবেন না। চিংড়িঘাটায় (Chingrighata Metro) দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা মেট্রো প্রকল্প নিয়ে, সোমবার রাজ্য সরকারকে তীব্র ভর্ৎসনা করল সুপ্রিম কোর্ট। ওই প্রকল্পে ৩৬৬ মিটারের বকেয়া কাজ নিয়ে রাজ্য সরকারের মামলায় হস্তক্ষেপও করল না সুপ্রিম কোর্ট। চিংড়িঘাটা মেট্রোর বকেয়া কাজ শেষ করার বিষয়ে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে গত ১১ ফেব্রুয়ারি কোর্টে যায় রাজ্য। কলকাতা হাইকোর্টের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হয় মামলা। সেই মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালতেও ধাক্কা খেল রাজ্য। রাজ্যের মামলায় হস্তক্ষেপই করল না সুপ্রিম কোর্ট। এই বিষয়ে হাইকোর্টের কথা মেনেই রাজ্য সরকারকে কাজ করার নির্দেশ দিল শীর্ষ আদালত (Supreme Court)।
চিংড়িঘাটা মেট্রো নিয়ে রাজ্যের গাফিলতি
রাজ্যের যুক্তি ধোপে টিকল না। ধমক খেয়ে ফিরতে হল সুপ্রিম কোর্ট থেকে। চিংড়িঘাটা মেট্রো লাইন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টালবাহানা চলছে। মাত্র ৩৬৬ মিটার লাইনের কাজ বাকি থাকায় সম্পূর্ণ হচ্ছে না কলকাতা মেট্রোর অরেঞ্জ লাইন। রাজ্য়ের সঙ্গে মেট্রো কর্তৃপক্ষের বারবার সংঘাত তৈরি হয়েছে এই নিয়ে। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে বৈঠকে বসেও কোনও লাভ হয়নি। রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণবও এই ইস্যুতে মুখ খুলেছিলেন। আর এবার সেই ইস্যুতেই রাজ্যকে কার্যত ভর্ৎসনা করল সুপ্রিম কোর্ট। কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারেনি মেট্রো। পুলিশের বিরুদ্ধে কাজ করতে না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। কাজ করার ক্ষেত্রে বারবার বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়েছে রাজ্য। হাইকোর্টের নির্দেশ মানার বদলে সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করে মামলা করেছে রাজ্য সরকার।
হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশে কোনও ত্রুটি নেই
সোমবার সেই মামলাটি ওঠে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিপুল মনুভাই পঞ্চোলীর বেঞ্চে। আদালত মামলায় হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। উল্টে রাজ্য সরকারকে মামলা তুলে নিতে বলা হয়। তা না করা হলে মামলাটি সরাসরি খারিজ করে দেওয়া হবে, জানান বিচারপতি। চিংড়িঘাটা মেট্রোর বকেয়া কাজ নিয়ে রাজ্য সরকার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে গাফিলতি করেছে বলেও মন্তব্য করে আদালত। সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের তরফে বলা হয়েছে, এটা কিছু আধিকারিকের একগুঁয়েমিকেই প্রতিফলিত করছে। যারা আদতে কলকাতা শহরে মেট্রো রেল প্রকল্পটিতে আরও দেরি করতে চায় অথবা বন্ধ করিয়ে দিতে চায়। পাশাপাশি, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দেয়, হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশে কোনও ত্রুটি নেই।
উন্নয়ন অপেক্ষা উৎসব গুরুত্বপূর্ণ!
রাজ্য সরকারের আইনজীবীকে উদ্দেশ্য বলে সুপ্রিম কোর্টের মন্তব্য,‘‘আমরা প্রথমবার দেখছি, কোনও রাজ্য উন্নয়নের বিরোধিতা করছে। এই মামলা এত দূর গড়িয়েছে যে, এখন নির্বাচন বিধির আওতায় পড়ে গিয়েছে। আপনাদের কাছে উৎসব আগে না যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করা আগে? আপনারা হাইকোর্টকে জানিয়েছেন যে, আপনাদের উৎসব আয়োজনের কাজ রয়েছে। তাই নির্মাণকাজের জন্য আপনারা পুলিশি সহায়তা দিতে পারবেন না। আপনাদের কাছে উন্নয়ন অপেক্ষা উৎসবই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। আমরা একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে আশা করি না যে, তারা বলবে পরিবহণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা নির্মাণের কাজটি আপাতত উপেক্ষা করা হোক।’’ আদালত আরও বলে, ‘‘একবার বলা হল উৎসব চলছে, একবার বলা হচ্ছে পরীক্ষা চলছে। এখন বলা হচ্ছে নির্বাচন আছে! এটা কী হচ্ছে?’’ শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই কাজ হবে, হাইকোর্টই সময় বেঁধে দিয়ে কাজ করবে। রাজ্যের প্রতি কড়াভাব দেখিয়েই বিচারপতি বলেন,‘‘সুযোগ দিচ্ছি হয় মামলা তুলে নিন, না হলে খারিজ করে দেব।’’
রাজ্য কী প্রকল্প বন্ধ করিয়ে দিতে চায়?
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বললেন, ‘‘রাজ্য নিজের সংবিধানগত দায়িত্ব পালনে গাফিলতি দেখাচ্ছে। উন্নয়ন আটকাতে জেদি মনোভাব দেখানো হচ্ছে।’’ আদালতের বক্তব্য, এত অজুহাত দেখালে চিংড়িঘাটা মেট্রো প্রকল্পের বকেয়া কাজ কবে হবে? বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী বলেন, ‘‘আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার আগে এই প্রকল্পের ঘোষণা করা হয়েছিল। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে আপনারা এটিকে আরেকটি অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাবেন, এমনটা আমরা কিছুতেই হতে দেব না।’’
সবকিছুর রাজনীতিকরণ করবেন না
মেট্রো লাইনের কাজে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে, অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছিল মেট্রো কর্তৃপক্ষ। মামলা গড়ায় কলকাতা হাইকোর্টে। কলকাতা হাইকোর্ট বকেয়া কাজ শেষ করার জন্য সময় বেঁধে দিয়েছিল। হাইকোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যায় রাজ্য সরকার। এই মামলা নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘‘সবকিছুর রাজনীতিকরণ করবেন না। এটি একটি উন্নয়নমূলক বিষয়।’’
মুখ্য সচিব এবং ডিজিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা!
এদিন শুনানির সময় পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে বলা হয়,‘‘আমাদের মে মাস পর্যন্ত সময় দিন। নির্বাচন চলছে, তাই এই বিলম্ব।’’ এরপর প্রধান বিচারপতি রাজ্য সরকারের উপর আরও ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘‘হাইকোর্ট খুবই নরম মনোভাব দেখিয়েছে। এটি এমন একটি মামলা যেখানে আপনাদের মুখ্যসচিব এবং ডিজিপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। এই ঘটনায় তাঁদের কর্তব্যের প্রতি সম্পূর্ণ অবহেলা প্রকাশ পাচ্ছে। যেখানে আদতে রাজনীতির কোনও জায়গা নেই, সেখানে এটিকে রাজনীতিকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।’’
চিংড়িঘাটা নিয়ে কী জটিলতা
চিংড়িঘাটায় মাত্র ৩১৬ স্কোয়ার মিটার অংশের জন্য থমকে রয়েছে নিউ গড়িয়া থেকে কলকাতা বিমানবন্দর পর্যন্ত মেট্রোর অরেঞ্জ লাইন সম্প্রসারণের কাজ। এই কাজ সম্পন্ন করতে হলে সাময়িক ভাবে বাইপাসে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। কিন্তু অভিযোগ, রাজ্য সরকার অনুমতি দিচ্ছে না। ফলে কাজও এগোচ্ছে না। কলকাতা হাইকোর্ট এ বিষয়ে রাজ্য, কলকাতার পুলিশ কমিশনার, জয়েন্ট কমিশনার অফ পুলিশ (ট্রাফিক), ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশকে (ট্রাফিক) ছাড়পত্র (এনওসি) দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। জট কাটাতে আদালতের নির্দেশে মেট্রো, রাজ্য এবং নির্মাণকারী সংস্থার একাধিক বৈঠকও হয়েছে। কিন্তু সমাধানসূত্র বেরোয়নি।
কাজ শেষ হতে কতদিন
নির্মাণকারী সংস্থা জানিয়েছিল, সাময়িক যান নিয়ন্ত্রণ করে চিংড়িঘাটায় মেট্রোর বাকি কাজ শেষ করতে ন’মাস লাগবে। কিন্তু হাইকোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও রাজ্য ‘এনওসি’ দেয়নি বলে অভিযোগ। ফলে কাজ শুরু করা যায়নি। বর্ষবরণের অনুষ্ঠান এবং গঙ্গাসাগর মেলার জন্য রাতের ট্রাফিক আটকানো যাবে না বলে আগে জানিয়েছিল সরকার। এবার ভোটের জন্য সমস্যার কথাও বলা হয়েছে। রাজ্যের এই ভূমিকাতেই অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট। বলা হয়েছে, হাইকোর্টের নির্দেশেই কাজ হবে। ইতিমধ্যে গত মাসে মেট্রো রেলওয়ের জেনারেল ম্যানেজার শুভ্রাংশু শেখর মিশ্র জানান, চিংড়িঘাটায় জটের কারণে মেট্রোর অরেঞ্জ লাইনের ‘ডেডলাইন’ আরও এক বছর পিছিয়ে যাচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে অরেঞ্জ লাইনের (নিউ গড়িয়া থেকে বিমানবন্দর মেট্রো করিডর) কাজ শেষ করার যে লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছিল, সেটা পিছিয়ে ২০২৮ সাল করে দেওয়া হয়েছে।
