মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। রাজ্যে চালু হয়ে গেল কেন্দ্রীয় সরকারের স্বাস্থ্যবিমা যোজনা আয়ুষ্মান ভারত (Ayushman Bharat In Bengal)। এর আওতায় ১৯৫০ ধরনের রোগের চিকিৎসার সুযোগ পাবেন গ্রাহকেরা। মিলবে হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুযোগও। একই সঙ্গে রাজ্যে চালু হল ‘মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য বিমা যোজনা’। রবিবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে আয়োজিত ‘আয়ুষ্মান দিবস’-এর মূল মঞ্চ থেকে এই জোড়া স্বাস্থ্য প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এ দিন তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানান, পূর্বতন সরকারের আমলে ১৬ অগাস্ট দিনটিতে ‘খেলা হবে দিবস’ পালন করা হলেও বর্তমান সরকার মানুষের দীর্ঘায়ু কামনায় দিনটিকে ‘আয়ুষ্মান দিবস’ হিসেবে বেছে নিয়েছে।
স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প বনাম আয়ুষ্মান ভারত
পূর্বতন সরকারের আমলে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে পরিষেবা ঘিরে প্রায়শই অভিযোগ উঠত। বেড পাওয়ার ক্ষেত্রে সমস্যার মুখে পড়তে হত রোগী এবং তাঁর পরিজনদের। এ বার সরকারবদলের পর রাজ্য এবং কেন্দ্রের জোড়া স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্প চালু হল পশ্চিমবঙ্গবাসীর জন্য। কেন্দ্রের আয়ুষ্মান ভারত এবং রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা। পূর্বতন সরকারের স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে প্রথমে হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুযোগ থাকলেও তাতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। একটি পর্যায়ে তা বন্ধও হয়ে যায়। পরে আবার শর্তসাপেক্ষে চালু হয়েছিল। এ বার আয়ুষ্মান ভারতের হাত ধরে সরকারি স্বাস্থ্যবিমায় ফিরছে হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুবিধা।
রাজ্যে আয়ুষ্মান দিবস-এর গুরুত্ব
রবিবার বিকেলে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম থেকে রাজ্যে আনুষ্ঠানিক ভাবে চালু হল আয়ুষ্মান ভারত। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখোপাধ্যায়ের পাশাপাশি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অনুপ্রিয়া প্যাটেল, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার, মহাগুরু মিঠুন চক্রবর্তী, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল এবং জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্তারা। যাঁরা কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যবিমার আওতায় পড়ছেন না, তাঁদের জন্য চালু করা হল মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনাও। পাশাপাশি রাজ্যে সরকারি হাসপাতালগুলিতেও সুলভ মূল্যে ওষুধ এবং চিকিৎসাসামগ্রীর বিক্রয়কেন্দ্র চালু করতেও উদ্যোগী হয়েছে সরকার। ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত তুলে ধরে এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন,“আজকের দিন ১৯৪৬: দ্য গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ডে। ১০ হাজার হিন্দুকে খুন করা হয়েছিল কলকাতাতে। আগের সরকার খেলা হবে দিবস করত। আর বর্তমান সরকার আয়ুষ্মান ভব, আয়ুষ্মান দিবস পালন করছে আপনাদের শতায়ু প্রার্থনা করে।” তিনি কলকাতার ত্রাতা গোপাল মুখোপাধ্যায়কে স্মরণ করে প্রণাম জানান।
চালু হবে ‘অমৃত ফার্মাসি’
মুখ্যমন্ত্রী জানান, শুধু চিকিৎসা পরিষেবা নয়, এবার সরকারি সহয়াতায় মিলবে ওষুধও। রাজ্যের ১০টি সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চালু হবে ‘অমৃত ফার্মাসি’। এখান থেকে ৫০-৮০ শতাংশ ছাড়ে ওষুধ পাওয়া যাবে। এর জন্য ‘হিন্দুস্তান লাইফ কেয়ার লিমিটেড’-এর টেকনিক্যাল ডিরেক্টর (অপারেশনস) বেনি জোসেফের সঙ্গে মউ স্বাক্ষর হয় রাজ্যের। ‘অমৃত ফার্মাসি’ গড়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। তাঁদের কথায়, এটি একটি ভাল উদ্যোগ। এর মানের সঙ্গে আপস করা হবে না, বলেও আশাপ্রকাশ করেন চিকিৎসকরা। এ দিন ‘হিন্দুস্তান লাইফ কেয়ার লিমিটেড’-এর সঙ্গে একটি মউ স্বাক্ষর করে রাজ্য। এই মউ-এর মাধ্যমে রাজ্যের ১০০টি সরকারি হাসপাতালে ‘অমৃত ফার্মাসি’ চালু করার বিষয়ে গাঁটছড়া বাঁধল সরকার। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী অনুপ্রিয়া জানান, ইতিমধ্যে বেশ কিছু রাজ্যে এই অমৃত ফার্মাসি চালু হয়ে গিয়েছে। এ বার পশ্চিমবঙ্গেও তা চালু হবে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ওষুধ এবং চিকিৎসাসামগ্রী ৫০-৮০ শতাংশ ছাড়ে কেনা যাবে। এখান থেকে ক্যানসার এবং হৃদ্রোগের চিকিৎসার জন্য ব্র্যান্ডেড এবং জেনেরিক ওষুধ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি স্টেন্ট, পেসমেকারের মতো সরঞ্জামও পাওয়া যাবে সস্তায়।
সুবিধা পাবেন ৬ কোটি রাজ্যবাসী
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু জানান, আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্পের সুবিধা পাবে প্রায় ১ কোটি ৪৩ লক্ষ পরিবার। অর্থাৎ, প্রায় ৬ কোটি রাজ্যবাসী এর সুবিধা পাবেন। সত্তরোর্ধ্ব প্রত্যেক রাজ্যবাসীই এর সুবিধা পাবেন। পাশাপাশি ৮০ লক্ষ রাজ্যবাসী পাবেন মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা। এ দিন যে দু’টি প্রকল্প চালু হল, তাতে সারা দেশের ৩৮,৬০৪টি হাসপাতালে চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়া যাবে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, পূর্বতন সরকারের আমলে স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পে ১৭০০ রোগের চিকিৎসা পাওয়া যেত। এখন ১৯৫০ রোগের চিকিৎসা পাওয়া যাবে। মুখ্যমন্ত্রী এদিন জানান, এর সঙ্গে ৪৬৭টি ‘প্রধানমন্ত্রী জনঔষধী কেন্দ্র’ এবং চোখের নিখরচায় চিকিৎসার জন্য ‘সুদৃষ্টি’ প্রকল্প রূপায়ণের কথাও।
মিলবে হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুযোগ
রাজ্যে নতুন দুই স্বাস্থ্যবিমা প্রকল্পের সূচনার সময়েই হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুযোগের কথা উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী। জানান, আয়ুষ্মান ভারত, মুখ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্যবিমা যোজনা— উভয় ক্ষেত্রেই এই সুবিধা মিলবে। শুভেন্দু বলেন, “স্বাস্থ্যমন্ত্রী আমাকে বলতে বারণ করেছিলেন। তা-ও বলে দিলাম।” বস্তুত, রাজ্যে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে প্রথমে হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুযোগ ছিল। কিন্তু সরকারি মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকেরা ডিপার্টমেন্টে না থেকে নার্সিংহোমে গিয়ে হাঁটু প্রতিস্থাপন করছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। স্বাস্থ্য ভবন হাঁটু অস্ত্রোপচারের বিল দেখে হতবাক হয়ে যায়। শুরু হয় তদন্ত। তার পর থেকে স্বাস্থ্যসাথীতে হাঁটু প্রতিস্থাপনের সুবিধা বন্ধ হয়ে যায়। পরে শর্তসাপেক্ষে তা চালুও হয়েছিল। এ বার ফের তা পুরোদমে চালু হচ্ছে নতুন দুই সরকারি স্বাস্থ্যবিমার হাত ধরে।
গরিব মানুষ ভাল পরিষেবা পাবেন
রাজ্যের স্বাস্থ্য কমিশনের সদস্য তথা চিকিৎসক নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজ্যের আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া শ্রেণি ভীষণ ভাবে উপকৃত হবেন। তিনি বলেন, “এটা অনেক আগে হওয়ার কথা ছিল। আমরা জানি আয়ুষ্মান দিবস (কেন্দ্রীয় সরকারের) এপ্রিল মাসে। কিন্তু আজ প্রথম শুরু হল পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যে কালো দিন ছিল। কালো দিনটা এ বার ভাল দিন হল। এর মাধ্যমে অনেকে, বিশেষ করে গরিবেরা ভাল রকম পরিষেবা পাবেন।” বস্তুত, ২০১৮ সালে দেশে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প চালু করে নরেন্দ্র মোদির সরকার। তবে পূর্বতন রাজ্য সরকারের আমলে তা পশ্চিমবঙ্গে বাস্তবায়িত হয়নি। এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন অফ প্রাইভেট হসপিটাল্স অ্যান্ড নার্সিংহোমস-এর সম্পাদক রাজীব পাণ্ডে বলেন, “এটা আমাদের কাছে খুশির খবর। অন্য রাজ্যের রোগীরাও আমাদের কাছে আসতে পারবেন। এখানের বাসিন্দারা অন্য রাজ্যে গেলেও চিকিৎসা করাতে পারবেন।”
