মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কলকাতার রেড রোডে ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্বাধীনতা দিবসের বিশেষ অনুষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের পাশাপাশি দেশবাসীকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানান মুখ্যমন্ত্রী। স্বাধীনতা দিবসের মঞ্চ থেকে রাজনৈতিক সংকীর্ণতা দূরে সরিয়ে রেখে হাতে হাত মিলিয়ে বাংলা গড়ার আহ্বান জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এদিন দেশবাসীর উদ্দেশে তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে সকলকে একসঙ্গে বাংলার উন্নয়নে কাজ করতে হবে। কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, সুরক্ষা এবং নগরায়নের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে ফের তার পুরনো গৌরবের জায়গায় নিয়ে যাওয়ার বার্তাও দেন মুখ্যমন্ত্রী। রেড রোডে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়কেরা।
রাজনৈতিক সংকীর্ণতা দূর করুন
বদলের বাংলায় রেড রোডে ইতিহাস। স্বাধীনতা দিবসে রেড রোডে বাজল বন্দে মাতরম। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নেতাজির মূর্তিতে মাল্যদানের পর পতাকা উত্তোলন করেন। কর্মক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য ১৪ জন আইপিএসকে ‘মুখ্যমন্ত্রীর পদক’ প্রদান করেন। তার আগে রাজ্যবাসীর উদ্দেশে ভিডিওবার্তায় সকলকে শুভেচ্ছা জানান মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘আসুন রাজনৈতিক সংকীর্ণতা দূরে সরিয়ে রেখে, হাতে হাত মিলিয়ে বাংলা গড়ার কাজ করি।’’ তাঁর বক্তব্যে বাংলার উন্নয়নের জন্য দলমত নির্বিশেষে সকলের অংশগ্রহণের উপর জোর দেওয়া হয়। স্বাধীনতা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গ গৌরবের মাটি। এই মাটিতেই জন্মেছেন বীর বিপ্লবী নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ক্ষুদিরাম বসু এবং মাতঙ্গিনী হাজরার মতো স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। তাঁদের আত্মত্যাগ ও আদর্শকে সামনে রেখে নতুন বাংলা গড়ার সংকল্প নেওয়ার কথাও বলেন তিনি।
উন্নয়ন ও ঐক্যের বার্তা
শুভেন্দুর কথায়, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, মহিলাদের ক্ষমতায়ন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গকে আবারও দেশের অন্যতম অগ্রণী রাজ্যে পরিণত করাই সরকারের লক্ষ্য। স্বাধীনতা দিবসের মঞ্চ থেকেই উন্নয়ন ও ঐক্যের বার্তা দিয়ে সেই লক্ষ্যে সকলকে একযোগে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান মুখ্যমন্ত্রী। শুভেন্দু বলেন, ‘‘কর্মসংস্থান, নারীর ক্ষমতায়ন, সুরক্ষাকে সুদৃঢ় করতে চাই। যে সংকল্প নিয়ে সরকারে এসেছি, তাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করব।’’ এই প্রথমবার রেড রোডে প্যারেডে কম্যান্ডার এবং সহকারী দু’জনে ছিলেন। কুচকাওয়াজের পর মোট ১২টি ট্যাবলো প্রদর্শিত হয়। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্য়ায়ের ট্যাবলো দেখানো হয়। তারপর একে একে অন্নামৃত, কন্যারত্ন ও অন্নপূর্ণা যোজনা, আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির, দুর্গাশক্তি বাহিনী, কলকাতা পুলিশ এবং কলকাতা পুরসভার ট্যাবলো প্রদর্শিত হয়।
পুলিশের সঙ্গে কেন্দ্রীয় বাহিনী
স্বাধীনতা দিবসে রেড রোডের নিরাপত্তায় এবছরই পুলিশের সঙ্গে রয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। কলকাতাজুড়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব অতিরিক্ত প্রায় তিন হাজার পুলিশ। রেড রোডকে ১৩টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। প্রত্যেক সেক্টরের দায়িত্বে একজন করে ডিসি পদমর্যাদার পুলিশকর্তা। ১৩টি জোনের আওতায় ৮০টি সেক্টর। এ ছাড়াও নিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার, যুগ্ম কমিশনার, ২০ জন ডিসি, ৪০ জন অ্যাসিস্ট্যান্ট পুলিশ কমিশনার। সারা শহরজুড়ে টহল দিচ্ছে ন’টি পিসিআর ভ্যান, তিনটি কুইক রেসপন্স টিম। নজরদারির জন্য শহরে ১৯টি পুলিশ পিকেট, মেট্রো স্টেশনে ২৫টি পিকেট, ২৪টি পিকেট শহরের বিভিন্ন বাজার ও শপিং মলে, কালীঘাট মন্দির ছাড়াও সাতটি ধর্মস্থানে। শহরের ২৩টি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় নাকা চেকিংয়ের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। যে কোনওরকম নাশকতা এড়াতে দর্শকদের সঙ্গে মিশে রয়েছে সাদা পোশাকের পুলিশ।
দূরদর্শনে শুভেন্দুর বক্তব্য
দীর্ঘ ২০ বছর পর বাংলার কোনও মুখ্যমন্ত্রী আবারও বার্তা দিলেন দূরদর্শনে। শুভেন্দু অধিকারী এদিন প্রথমবার মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে। দূরদর্শনে তাঁর বক্তব্য সম্প্রচারিত হয় দিল্লিতে লালকেল্লার অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার ঠিক পরেই। বক্তব্যের শুরুতেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুকে স্মরণ করলেন তিনি। তারপর নিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নাম। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘বন্দে মাতরম। প্রিয় পশ্চিমবঙ্গ বাসী, আজ স্বাধীনতার ৮০তম বর্ষপূর্তির পবিত্র দিনে প্রতিটি নাগরিককে জানাই আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। আজ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি সেই সকল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের যাঁদের সংগ্রামের মাধ্যমে আমরা পেয়েছি স্বাধীনতার মুক্ত আকাশ।’ এরপরই একে একে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, ক্ষুদিরাম বসু, মাতঙ্গিনী হাজরা, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বিনয়-বাদল দীনেশের নাম।
বিকশিত ভারতে পশ্চিমবঙ্গ অন্যতম চালিকাশক্তি
আড়াই মিনিটের এই বার্তায় শুভেন্দু অধিকারী বলেন, ‘তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের শিখিয়েছে স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক জয় নয়, বরং দেশকে আরও এগিয়ে যাওয়ার এক পবিত্র অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকারকে সঙ্গে নিয়েই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিকশিত ভারত ২০৪৭-এর স্বপ্ন দেখেছেন। সেই স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে পশ্চিমবঙ্গ হবে অন্যতম চালিকাশক্তি। সেই লক্ষ্যে যুব সমাজের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করা, মা-বোনেদের আরও স্বনির্ভর করে তোলা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কৃষি-শিল্প থেকে সমাজের প্রতিটি স্তরে উন্নয়ন পৌঁছে দিতে আমাদের সরকার বদ্ধপরিকর।’
এই প্রথম স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু
মুখ্যমন্ত্রী তেরঙার তাৎপর্যও এদিনের বার্তায় তুলে ধরেন। তিনি জানান, এটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের গর্ব। জাতীয় সঙ্গীত ও জাতীয় গানের মর্যাদাও অক্ষুন্ন রাখার কথা বলেন শুভেন্দু। উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৬ সালে স্বাধীনতা দিবসে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য দূরদর্শনে বার্তা দিয়েছিলেন। তারপর বাংলার আর কোনও মুখ্যমন্ত্রী স্বাধীনতা দিবসে দুরদর্শনে বক্তব্য রাখেননি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জমানায় দুরদর্শনে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ বন্ধ ছিল ১৫ বছর। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আবার চালু হল সেই রীতি। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এবারের স্বাধীনতা দিবসটা অন্যরকম। রয়েছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম তারা উদযাপন করছে ১৫ অগাস্ট। মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার পর এই প্রথম স্বাধীনতা দিবসের সরকারি অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন শুভেন্দু অধিকারী।
