মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভবিষ্যতে কোনও যুদ্ধ বাঁধলে তাতে তুরস্কের সেনাবাহিনীকে অংশ নিতে হতে পারে কি না, তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা চুক্তিতে (Turkish Parliament) সংসদের অনুমোদন ঘিরেই এই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তুরস্কের বিরোধী সাংসদদের আশঙ্কা, এই চুক্তির ফলে ভবিষ্যতে পাকিস্তানের হয়ে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার জন্য আঙ্কারার উপর চাপ তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের তরুণদের অন্য দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার লড়াইয়ে বলি না করার জন্য প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে সতর্ক করেছেন (Pakistan) বিরোধী নেতারা।
যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (Turkish Parliament)
গত ৭ অগাস্ট সৌদি আরবের মক্কায় তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে ১৬টি ধারাসংবলিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গত ৫ নভেম্বর তুরস্কের সংসদে এই চুক্তির অনুমোদনের পক্ষে ভোট পড়ে ২৭৯টি, বিপক্ষে ১১৯টি। মোট ৫৯২ সদস্যের সংসদে ভোটদানে অংশ নেন ৩৯৮ জন সাংসদ। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের নেতৃত্বাধীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি এবং তাদের সহযোগী ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টি এই চুক্তিকে সমর্থন করে। তবে বিরোধী সাংসদদের একাংশের প্রশ্ন, পাকিস্তান ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে কোনও সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে এই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তুরস্কের কী ধরনের দায়িত্ব তৈরি হবে?
কুর্দিপন্থী পিপলস ইকুয়ালিটি অ্যান্ড ডেমোক্রেসি পার্টির নেতা গুলিস্তান কিলিচ কোচাইগিত সংসদে চুক্তির অনুমোদনের বিরোধিতা করেন। তাঁর বক্তব্য, অন্য দেশের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার জন্য তুরস্কের তরুণদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়।
চুক্তির শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন কোকায়েলির সাংসদ লুৎফু তুর্ককানও। তাঁর আশঙ্কা, এই প্রতিরক্ষা চুক্তি তুরস্কের জাতীয় নিরাপত্তা, বিদেশনীতি এবং সামরিক দায়িত্বের উপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান সংঘাত তৈরি হলে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তুরস্কের উপর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কা বিরোধীদের
চুক্তির পারস্পরিক সহায়তার শর্ত নিয়েই বিরোধীদের মূল উদ্বেগ। ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে পাকিস্তান আক্রান্ত হলে তুরস্ককে কী ধরনের সহায়তা দিতে হবে, তা নিয়ে সংসদে প্রশ্ন তোলেন বিরোধী সাংসদরা।
তুর্ককানের প্রশ্ন, আগামী দশ বছরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি, বিভিন্ন দেশের সরকার ও জোটের পরিবর্তন এবং পাকিস্তান-ভারত সম্পর্কের ওঠানামার মতো বিষয়গুলি বিবেচনা না করে তুরস্ক কেন দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে আবদ্ধ হবে?
চুক্তির আরও একটি শর্ত নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন তিনি। ওই শর্ত অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ১০ বছর কোনও সদস্য দেশ চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না। তুর্ককানের মতে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলে গেলে এমন চুক্তি তুরস্কের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হয়ে উঠতে পারে। অথচ সেই পরিস্থিতিতেও দেশকে পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতি মেনে চলতে বাধ্য হতে হবে।
তবে চুক্তিতে ভারতকে সরাসরি কোনও শত্রুরাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। একইভাবে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলেই তুরস্ককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে যোগ দিতে হবে, এমন কোনও বাধ্যবাধকতার কথাও স্পষ্টভাবে বলা নেই। বিরোধীদের আশঙ্কা, যৌথ প্রতিরক্ষার বিস্তৃত শর্তের কারণে সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার জন্য তুরস্কের উপর চাপ তৈরি হতে পারে।
চুক্তিতে কী কী শর্ত রয়েছে?
চুক্তির প্রথম ধারায় বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলির কোনও একটির ভৌগোলিক অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমান্তের উপর হুমকি তৈরি হলে তা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে অন্য (Turkish Parliament) সদস্য দেশগুলি।
দ্বিতীয় ধারায় আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোনও সদস্য দেশ অন্য কোনও দেশ বা দেশগুলির গোষ্ঠীর সশস্ত্র আক্রমণ কিংবা সামরিক আগ্রাসনের শিকার হলে বাকি সদস্য দেশগুলিকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দ্রুত সহায়তা করতে হবে।
এ ছাড়াও চুক্তিতে একাধিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— গোয়েন্দা তথ্যের আদানপ্রদান, সামরিক প্রশিক্ষণ ও যৌথ মহড়া, সামরিক রসদ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সহযোগিতা, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উন্নয়ন ও আদানপ্রদান এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে যৌথ সহযোগিতা।
তবে কোনও পরিস্থিতিতে কী ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে, তা সংশ্লিষ্ট দেশগুলির মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা হবে। এক্ষেত্রে প্রতিটি দেশের নিজস্ব সম্পদ, সামরিক সক্ষমতা এবং সামর্থ্য বিবেচনায় রাখা হবে।
অর্থাৎ, এই চুক্তির লক্ষ্য শুধু যুদ্ধকালীন পারস্পরিক সহায়তা নয়। বরং তিন দেশের মধ্যে নিয়মিত সামরিক যোগাযোগ, সমন্বয় এবং সহযোগিতার পরিসর আরও বাড়ানো। কোনও সম্ভাব্য হুমকি সরাসরি সশস্ত্র সংঘাতে পরিণত হওয়ার আগেই যাতে তিন দেশ নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে, সেই ব্যবস্থাও তৈরি করা হয়েছে।
সংসদের অনুমোদন ছাড়া কি তুরস্ক সেনা পাঠাতে পারবে?
চুক্তি অনুমোদিত হলেও এর অর্থ এই নয় যে, অন্য কোনও সদস্য দেশ যুদ্ধে জড়ালেই তুরস্ক সরকার নিজের সিদ্ধান্তে সেনাবাহিনী পাঠাতে পারবে।
তুরস্কের সংবিধানের ৯২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সাধারণভাবে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে বিদেশে মোতায়েন করার জন্য সংসদের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে পাকিস্তানের সমর্থনে তুরস্ক সেনা পাঠাতে চাইলে সরকারকে সংসদে পৃথক প্রস্তাব পেশ করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিতে হবে।
তুরস্কের সরকারি মহলের বক্তব্য, দেশ কখন যুদ্ধে অংশ নেবে, সেই সিদ্ধান্ত অন্য কোনও রাষ্ট্র নিতে পারে না। সংসদের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা সেনা মোতায়েনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সুরক্ষা হিসেবে কাজ করবে। ফলে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার অর্থ স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুদ্ধে যোগ দেওয়া নয়।
তবে বিরোধীদের যুক্তি, সরাসরি সেনা পাঠানোর বাধ্যবাধকতা না থাকলেও পারস্পরিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতির কারণে আন্তর্জাতিক সংকটের সময়ে আঙ্কারার উপর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ তৈরি হতে (Turkish Parliament) পারে।
চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ নেই!
চুক্তির মেয়াদ ও তা থেকে বেরিয়ে আসার শর্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ১০ বছর কোনও সদস্য দেশ একতরফাভাবে তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না।
প্রথম ১০ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কোনও দেশ চুক্তি থেকে সরে আসতে চাইলে বাকি দুই সদস্য দেশকে কূটনৈতিক মাধ্যমে লিখিতভাবে জানাতে হবে। অন্তত তিন মাস আগে এই বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে।
তুর্ককানের প্রশ্ন, আগামী দিনে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, সামরিক জোট কিংবা জাতীয় নিরাপত্তার অগ্রাধিকার বদলে গেলে তুরস্কের হাতে কতটা স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকবে? বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হলে এই চুক্তি আঙ্কারাকে কঠিন কূটনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড় করাতে পারে বলেই তাঁর আশঙ্কা।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তান (Pakistan) ও সৌদি আরবের সঙ্গে তুরস্কের এই প্রতিরক্ষা চুক্তি পশ্চিম এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। যদিও চুক্তিতে ভারতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি এবং তুরস্কের সেনা মোতায়েনের জন্য সংসদীয় অনুমোদন বাধ্যতামূলক, তবুও ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের (Turkish Parliament) প্রেক্ষাপটে এই চুক্তির প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই ধারণা ওয়াকিবহাল মহলের।
