মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কমনওয়েলথ গেমসে ভারতকে প্রথম সোনা এনে দিলেন সোনার মেয়ে মীরাবাঈ চানু (Mirabai Chanu)। ফের দেশের মুখ উজ্জ্বল করলেন ভারতের ভারোত্তোলন তারকা। রবিবার গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত ২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসে ম্যাজিক দেখালেন মণিপুরের মেয়ে। এই নিয়ে পরপর তিনবার কমনওয়েলথ গেমসে (Commonwealth Games 2026 Glasgow) সোনা জেতার অনন্য নজির গড়লেন ৩১ বছর বয়সি মীরাবাঈ (India first gold CWG 2026)। অন্যদিকে, মণিপুর থেকে সেনাছাউনি হয়ে গ্লাসগো, ভারতের হয়ে রুপো জিতে আবেগে ভাসলেন ঋষিকান্ত সিং চানামবাম (Rishikant Singh)। নিজের ঐতিহাসিক সাফল্য তিনি উৎসর্গ করলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) এবং গোটা দেশকে। একইসঙ্গে ভারতীয় ক্রীড়ার উন্নয়নে সরকারের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন এই ভারতীয় ভারোত্তোলক।
প্রধানমন্ত্রী মোদির শুভেচ্ছা-বার্তা
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কমনওয়েলথ গেমস ২০২৬-এ ভারতের হয়ে পদকজয়ী ভারোত্তোলক মীরাবাই চানু ও ঋষিকান্ত সিংকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রধানমন্ত্রী মোদি লিখেছেন, “ভারতীয় ভারোত্তোলনের ইতিহাসে আরও একটি গৌরবময় অধ্যায় যোগ হল। প্রতিভাবান মীরাবাই চানু আবারও কমনওয়েলথ গেমসে নিজের অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন। ৪৮ কেজি বিভাগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে তিনি সোনার পদক জিতেছেন। টানা তৃতীয়বার কমনওয়েলথ গেমসে সোনা এবং মোট চতুর্থ কমনওয়েলথ পদক জিতে তিনি প্রতিটি ভারতীয়র কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। তাঁকে আন্তরিক অভিনন্দন। ভবিষ্যতের জন্য রইল অনেক শুভেচ্ছা।” প্রধানমন্ত্রী ঋষিকান্ত সিংয়ের পারফরম্যান্সেরও প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, অভিষেক কমনওয়েলথ গেমসেই রুপোর পদক জিতে ঋষিকান্ত ভারতীয় ভারোত্তোলনের ভবিষ্যতের জন্য নতুন আশা জাগিয়েছেন। তাঁর এই সাফল্য দেশের তরুণ ক্রীড়াবিদদের আরও অনুপ্রাণিত করবে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
মীরাবাঈ ম্যাজিকে মাত গ্লাসগো
সোনা জেতার পাশাপাশি রবিবার নিজের পুরনো রেকর্ড ভেঙে নতুন কমনওয়েলথ ও গেমস রেকর্ড গড়লেন মীরাবাঈ চানু। সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টে মোট ১৯০ কেজি ওজন তুলে তিনি শীর্ষে। যার মধ্যে স্ন্যাচ বিভাগে ছিল ৮৫ কেজি এবং ক্লিন অ্যান্ড জার্ক বিভাগে ১০৫ কেজি। প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই জয়ের অন্যতম প্রধান দাবিদার ছিলেন মীরাবাঈ। তবে সতর্কতার সঙ্গে প্রতি পদক্ষেপে এগিয়েছেন তিনি। স্ন্যাচ রাউন্ডের প্রথম চেষ্টা নিখুঁত না হলেও, দ্বিতীয় চেষ্টায় ৮২ কেজি তুলে গেমস রেকর্ড তৈরি করেন। এর পর নিজেরই গড়া গত বছরের ৮৪ কেজির রেকর্ড ভেঙে ৮৫ কেজি ওজন তুলে গড়ে তোলেন নতুন কমনওয়েলথ রেকর্ড। ক্লিন অ্যান্ড জার্ক রাউন্ডেও খানিকটা নাটকীয়তা ছিল। মীরাবাঈয়ের প্রথম প্রচেষ্টাটি বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু মানসিকভাবে শক্ত থেকে দ্বিতীয়বার যখন তিনি মঞ্চে আসেন, তখন তাঁর চোখে ছিল শুধুই জয়ের জেদ। গর্জন করে নিখুঁত ছন্দ বজায় রেখে ১০৫ কেজি ওজন মাথার উপর তুলে ধরেন তিনি। বিচারকদের সংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরো স্টেডিয়াম হাততালিতে ফেটে পড়ে এবং মীরাবাঈয়ের মুখে ফিরে আসে তাঁর সেই পরিচিত হাসি।
পরবর্তী লক্ষ্য এশিয়ান গেমস
এই সাফল্যের পরও পা মাটিতেই রাখছেন মণিপুরের এই ভারোত্তোলক। মীরাবাঈ জানান, তাঁর মূল লক্ষ্য এখন আগামী সেপ্টেম্বর মাসের এশিয়ান গেমস। এশিয়ান গেমসে পদক জয়ই তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় স্বপ্ন। গ্লাসগো গেমসে নিজেকে খুব একটা চাপ না দিয়ে, এশিয়ান গেমসের প্রস্তুতির কথা মাথায় রেখেই পরিকল্পনা করেছিলেন তিনি। তবে মীরাবাঈয়ের রবিবারের এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখে ক্রীড়াপ্রেমীদের বিশ্বাস, আসন্ন এশিয়ান গেমসেও তাঁর গলায় সোনার পদক দেখা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। এদিন সোনা জয়ের পরে আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন ৩১ বছরের তারকা। মা এবং কোচকে ধন্যবাদ জানিয়ে কেঁদে ফেলেন মণিপুরের মেয়ে। ২০১৪ সালে ২০ বছরের এক তরুণী প্রতিভা গ্লাসগো থেকে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন, সেই মেয়েই ১২ বছর পরে ওই শহর ছাড়লেন কমনওয়েলথ গেমসের টানা চতুর্থ পদক নিয়ে। তার মধ্যে তিনটিই সোনার পদক। আর সেই রেকর্ড সোনা জয়ের পরে নিজের প্রজন্মের ভারতের সেরা ভারোত্তোলক বলেন, ‘গত তিনদিন ধরে আমি খাইনি। আমার ওজন বজায় রাখার কাজটা অত্যন্ত কঠিন ছিল। আমি পরিবারকে এই সোনার পদককে উৎসর্গ করতে চাই।’
প্রধানমন্ত্রী মোদিকে পদক উৎসর্গ
মীরাবাঈ চানুর পদক জয়ের ঠিক আগে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে পুরুষদের ৬০ কেজি ভারোত্তোলনে রুপোর পদক জেতেন মণিপুরেরই ছেলে ঋষিকান্ত। জয়ের পর আবেগঘন প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই রুপোর পদক শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি গোটা দেশের। তিনি বলেন, “আমি এই রুপোর পদক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং সমগ্র দেশকে উৎসর্গ করছি। আজকের এই সাফল্যের পিছনে রয়েছে আমার কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি ভারত সরকার, ইন্ডিয়ান ওয়েটলিফটিং ফেডারেশন, সাপোর্ট স্টাফ এবং আমার বন্ধুদের অবদান।” ২০২২ সালে বার্মিংহাম গেমসে প্রথমবার কমনওয়েলথ মঞ্চে অভিষেক হয় ঋষিকান্তের। সে বার ৫৫ কেজি বিভাগে নেমেছিলেন। কিন্তু পদক আসেনি। খালি হাতেই ফিরতে হয়। এরপর হতাশায় না ভুগে নিজেকে আরও ধারালো করেন। ওজন বাড়িয়ে লুফে নেন নতুন চ্যালেঞ্জ। ৫৫ কেজি থেকে উঠে আসেন সদ্য চালু হওয়া ৬০ কেজি বিভাগে। আর এখানেই লুকিয়ে সাফল্যের আসল চাবিকাঠি। ২০২৫ সালে আমেদাবাদে আয়োজিত কমনওয়েলথ ভারোত্তোলন চ্যাম্পিয়নশিপে (Commonwealth Weightlifting Championships) অনায়াসে সোনা জয়।
সরকারের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা
ঋষিকান্তের মতে, ভারতীয় ক্রীড়ার বিকাশে কেন্দ্রীয় সরকারের ধারাবাহিক সমর্থন বড় ভূমিকা পালন করেছে। তিনি জানান, খেলাধুলাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের উদ্যোগই তাঁকে আরও ভালো করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তাই নিজের এই সাফল্য প্রধানমন্ত্রী মোদিকে উৎসর্গ করাই তাঁর কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। মণিপুরের ইম্ফলের ছেলে ঋষিকান্ত। তাঁর এই সাফল্যের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অবদান ভারতীয় সেনার (Indian Army)। স্পোর্টস সিস্টেম বা নির্দিষ্ট ক্রীড়া কর্মসূচির হাত ধরেই আসল প্রতিভার বিকাশ। সঠিক প্রশিক্ষণ, নিখুঁত গাইডেন্স এবং লাগাতার সমর্থন—সবটাই পেয়েছিলেন সেনাশিবির থেকে। বর্তমানে তিনি ভারতীয় সেনার হয়েই প্রতিনিধিত্ব করেন। হালকা ওজনের ক্যাটেগরিতে দেশের অন্যতম সেরা ভারোত্তোলক হিসেবে নিজেকে ইতিমধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন (Indian Weightlifter)।
গেমসে পদক তালিকায় ভারত
চানুর সোনা এবং ঋষিকান্তের রুপো জয়ের সুবাদে গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের পদক তালিকায় সপ্তম স্থানে উঠে এসেছে ভারত। একটি সোনা, একটি রুপো এবং একটি ব্রোঞ্জ জিতেছে। ১২টি সোনা, পাঁচটি রুপো এবং সাতটি ব্রোঞ্জ নিয়ে শীর্ষে আছে অস্ট্রেলিয়া।
