মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ আমেরিকা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে না বুঝলে ভারত-মার্কিন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তার প্রভাব পড়তে পারে। নিউ ইয়র্কে এশিয়া সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে এমনই মন্তব্য করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর (S Jaishankar)। তিনি এও বলেন, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ক্রমশ আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, পরস্পরনির্ভরতার কৌশলগত ব্যবহার, দুর্বল সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং শক্তির পরিবর্তিত ভারসাম্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে (Indias Terrorism) আরও জটিল করে তুলেছে।
ভারত-মার্কিন সম্পর্কের প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগের পাশাপাশি বাণিজ্যিক জটিলতার কথাও উল্লেখ করেন। পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশ থেকে দীর্ঘদিন ধরে যে ধরনের সন্ত্রাসবাদের মুখোমুখি ভারত হয়েছে, তা দেশের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উদ্বেগ।
জয়শঙ্করের কথায়, “সম্ভবত খুব কম দেশই আছে, যারা বহু দশক ধরে কোনও প্রতিবেশী দেশের সুপরিকল্পিত ও সচেতন নীতির অংশ হিসেবে আমাদের মতো সন্ত্রাসবাদের শিকার হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ভারতের কাছে যে বিষয়টি মৌলিক গুরুত্ব বহন করে, কোনও অংশীদার দেশ যদি সেটি যথেষ্ট পরিমাণে না বোঝে বা গুরুত্ব না দেয়, তাহলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে তার প্রভাব পড়বেই। তাঁর কথায়, “আমার অন্যতম প্রধান উদ্বেগ যদি আমার অংশীদার সম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি না করেন, তাহলে তার প্রভাব সম্পর্কের উপর পড়বে।”
এই মন্তব্য এমন একটা সময়ে এসেছে, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফার প্রশাসনের সময়ে আমেরিকা ও পাকিস্তানের মধ্যে যোগাযোগ ও ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। ভারতীয় দৃষ্টিকোণ থেকে এই পরিবর্তন পাকিস্তান থেকে আসা সন্ত্রাসবাদ নিয়ে নয়াদিল্লির দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে (S Jaishankar)।
সীমান্তে স্বাভাবিক পরিস্থিতিই ভারত-চিন সম্পর্কের পূর্বশর্ত (S Jaishankar)
ভারত-চিন সম্পর্ক নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, আগের কয়েক বছরের তুলনায় বর্তমানে দুই দেশের সম্পর্ক ভালো অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার পর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও উন্নতি দেখা যাচ্ছে।
জয়শঙ্কর বলেন, “আপনি যদি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ২০২৫ সালের তুলনায় আজ সম্পর্ক কি ভালো? আমি বলব, হ্যাঁ। ২০২৪ সালের তুলনায় বললে, আরও বেশি।”
তবে এই উন্নতিকে দুই দেশের সম্পর্কের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন হিসেবে দেখার বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিদেশমন্ত্রী। তাঁর মতে, ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর দীর্ঘ সামরিক অচলাবস্থার কারণে ভারত ও চিনের মধ্যে স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছিল। সরকারি পর্যায়ের যোগাযোগ, ভিসা প্রদান এবং সরাসরি বিমান পরিষেবাতেও তার প্রভাব পড়েছিল।
সীমান্ত পরিস্থিতির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর কূটনৈতিক যোগাযোগও ধীরে ধীরে ফিরেছে বলে জানান তিনি। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন ধরেই বেজিংকে জানিয়ে এসেছে যে সীমান্তে উত্তেজনা দুই দেশের কারও স্বার্থে নয় (S Jaishankar)।
জয়শঙ্কর বলেন, “যে সমস্যা অন্যদের সুবিধা দেয়, সেই সমস্যার মধ্যে নিজেদের আটকে রাখা উচিত নয়।”
ভারত-চিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্যের মূল নীতি হল, “সীমান্তের পরিস্থিতিই সম্পর্কের পরিস্থিতি নির্ধারণ করে।” তাঁর কথায়, “সীমান্তে উত্তেজনা থাকবে, আবার সম্পর্ক স্বাভাবিক থাকবে—এটা হতে পারে না।” সীমান্তে স্বাভাবিক পরিস্থিতি যত এগোবে, ততই বৃহত্তর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নতির পরিবেশ তৈরি হবে বলে তিনি মনে করেন।
বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বের দিকে এগোচ্ছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বাইরে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন নিয়েও বক্তব্য রাখেন জয়শঙ্কর। তাঁর মতে, বিশ্ব ক্রমশ আরও বহুমেরুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে।
একসময় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্থিতিশীল শক্তি এবং ব্যবস্থার রূপ নির্ধারণকারী দেশ হিসেবে আমেরিকার যে ভূমিকা ছিল, তাতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিভিন্ন জোটের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের পাশাপাশি আমেরিকা এখন আরও বেশি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আমেরিকা ও চিনের সম্পর্কের প্রসঙ্গে জয়শঙ্কর বলেন, দুই দেশ কিছু বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছতে পারলেও সামগ্রিক সম্পর্ক এখনও প্রতিযোগিতামূলক। তাঁর কথায়, “বিশ্বের বাকি দেশগুলির বিষয়ে তারা দু’জনে কতটা একমত হতে পারে, তারও সীমা রয়েছে।”
এই পরিস্থিতিতে ভারত-সহ অন্যান্য দেশের সামনে অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনা এবং কোনও একটি দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে বলে জানান তিনি।
জয়শঙ্করের কথায়, “আমরা কীভাবে ঝুঁকি কমাব? কীভাবে অংশীদারিত্বে বৈচিত্র্য আনব? নতুন অংশীদার কারা হতে পারে? ইতিমধ্যে থাকা কোনও অংশীদারিত্ব থেকে কীভাবে আরও বেশি মূল্য পাওয়া যেতে (Indias Terrorism) পারে?”
“পরস্পরনির্ভরতা বাস্তবতা, প্রতিযোগিতা মানসিকতা”
বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জয়শঙ্কর যুদ্ধ, অর্থনৈতিক চাপ, দুর্বল সরবরাহ-শৃঙ্খল এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কৌশলগত চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা, আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির উপর তৈরি হওয়া চাপের কথা উল্লেখ করেন। খাদ্য, জ্বালানি, সার ও অর্থব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের ঝুঁকির বিষয়টি তুলে ধরেন তিনি (S Jaishankar)।
জয়শঙ্কর বলেন, “আমাদের সময়ের পরস্পরবিরোধী বাস্তবতা হল, দেশগুলি গভীরভাবে পরস্পরনির্ভরশীল হয়েও একই সময়ে সেই পরস্পরনির্ভরতাকে কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছে। পরস্পরনির্ভরতা বাস্তবতা, প্রতিযোগিতা হল মানসিকতা।”
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ, নিষেধাজ্ঞা, ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা এবং বাজারে প্রবেশাধিকারের মতো বিষয়গুলিকেও কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর মতে, এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থার উপর যেসব দেশের প্রভাব রয়েছে, তারা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের বিরুদ্ধে সেই প্রভাব ব্যবহার করার সুযোগ পায়।
জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতি আন্তর্জাতিক কৌশলগত হিসাবকে আরও জটিল করে তুলেছে বলেও মন্তব্য করেন বিদেশমন্ত্রী। নতুন সামরিক সক্ষমতা দেশগুলিকে আরও বেশি ঝুঁকি নেওয়ার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলেও (Indias Terrorism) সতর্ক করেন তিনি।
এই পরিস্থিতিতে কূটনীতিকে তিনি চরম কঠিন এক খেলা হিসেবে বর্ণনা করেন। তাঁর মতে, সরকারগুলিকে একদিকে তাৎক্ষণিক সংকট সামলাতে হয়, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি বিরোধ মেটানোর জন্য প্রয়োজনীয় ধৈর্যও (S Jaishankar) ধরে রাখতে হয়।
