সুশান্ত দাস
ভবিষ্যতের যুদ্ধ যে ড্রোনকেন্দ্রিক হতে চলেছে, সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই বড় পদক্ষেপ করল ভারতীয় সেনাবাহিনী। এবার সেনার বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন অপারেশনকে আরও শক্তিশালী করতে গড়ে তোলা হচ্ছে বিশেষ ‘বাজ ব্যাটালিয়ন’ (Baaz Battalions)। এই নতুন ইউনিটের মূল কাজ হবে দীর্ঘক্ষণ আকাশপথে নজরদারি, নির্ভুল লক্ষ্যভেদ, লইটারিং মিউনিশন পরিচালনা এবং আধুনিক ড্রোন যুদ্ধ পরিচালনা (Indian Army Drone Warfare)। সদ্যপ্রাক্তন সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী এই উদ্যোগের কথা ঘোষণা করেছেন। অপারেশন সিঁদুর-এর অভিজ্ঞতা এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে শুরু করে পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক সংঘর্ষ বিশ্লেষণ করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সেনা সূত্রের দাবি। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এখন শুধু স্থলসেনাই নয়, আকাশে থাকা মানববিহীন ড্রোনও যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে।
কেন আলাদা ‘বাজ ব্যাটালিয়ন’?
এতদিন ভারতীয় সেনার বিভিন্ন ইনফ্যান্ট্রি, আর্টিলারি বা অন্যান্য ইউনিটের সঙ্গে ছোট ড্রোন ডিটাচমেন্ট যুক্ত থাকত। তাদের প্রধান কাজ ছিল নজরদারি, শত্রুপক্ষের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং আর্টিলারিকে লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করা। কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, ড্রোনের ব্যবহার এখন অনেক বেশি বিস্তৃত।
বর্তমানে ড্রোনের মাধ্যমে—
- ● শত্রুপক্ষের গভীরে নজরদারি চালানো যায়।
- ● ট্যাঙ্ক, বাঙ্কার ও আর্টিলারি ধ্বংসে নির্ভুল হামলা চালানো সম্ভব।
- ● লয়টারিং মিউনিশন বা কামিকাজে (সুইসাইড ড্রোন) হিসেবে সরাসরি আঘাত হানা যায়।
- ● একসঙ্গে বহু ড্রোন ব্যবহার করে সোয়ার্ম অ্যাটাক (Swarm Attack) চালানো যায়।
- ● হামলার পর ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন (Battle Damage Assessment) করা সম্ভব।
- ● ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে শত্রুর যোগাযোগ ব্যবস্থা শনাক্ত ও ব্যাহত করা যায়।
এই বহুমুখী দায়িত্ব পালনের জন্যই শুধুমাত্র ড্রোন অপারেশনের উদ্দেশ্যে পৃথক, বিশেষ প্রশিক্ষিত এবং স্বাধীন ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।
কী কাজ করবে বাজ ব্যাটালিয়ন?
সেনা সূত্রে জানা গিয়েছে, নতুন বাজ ব্যাটালিয়ন (Baaz Battalions) আধুনিক ড্রোন যুদ্ধের প্রায় সমস্ত ক্ষেত্রেই কাজ করবে।
এই ইউনিটগুলির প্রধান দায়িত্বের মধ্যে থাকবে—
- ● দীর্ঘমেয়াদি ইন্টেলিজেন্স, সার্ভেল্যান্স ও রিকনেস্যান্স (ISR) পরিচালনা।
- ● দূরপাল্লার আকাশ নজরদারি।
- ● নির্ভুল ড্রোন হামলা।
- ● লয়টারিং মিউনিশন পরিচালনা।
- ● আর্টিলারি ও ক্ষেপণাস্ত্র ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয়।
- ● ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও কাউন্টার-ড্রোন ব্যবস্থার সঙ্গে যৌথ অভিযান।
- ● আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা—উভয় ধরনের অভিযানে পদাতিক বাহিনীকে সহায়তা।
প্রতিটি ব্যাটালিয়নে এক ধরনের নয়, বরং একাধিক শ্রেণির মানববিহীন আকাশযান (UAV) মোতায়েন করা হবে বলে জানা গিয়েছে।
‘অশ্বিনী’ প্রকল্পের সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?
অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, সেনার অশ্বিনী (Ashini) প্রকল্প থাকতেই আবার নতুন ‘বাজ ব্যাটালিয়ন’-এর প্রয়োজন কেন? আসলে দুটি উদ্যোগের উদ্দেশ্য এক নয়। অশ্বিনী প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিটি ইনফ্যান্ট্রি ব্যাটালিয়নের কাছে ছোট আকারের ট্যাকটিক্যাল ড্রোন পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এগুলি মূলত সীমিত দূরত্বে নজরদারি, শত্রুর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং যুদ্ধক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে, বাজ ব্যাটালিয়ন (Baaz Battalions) হবে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও বিশেষায়িত ড্রোন যুদ্ধ ইউনিট। এগুলির কাজ শুধুমাত্র নজরদারিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, দীর্ঘপাল্লার অপারেশন, নির্ভুল হামলা, লয়টারিং মিউনিশন ব্যবহার এবং বৃহৎ পরিসরে ড্রোন যুদ্ধ পরিচালনাই হবে মূল লক্ষ্য। সহজভাবে বললে, অশ্বিনী যেখানে সামনের সারির সেনাদের হাতে ‘চোখ’ তুলে দেয়, সেখানে Baaz Battalions ভারতীয় সেনার পূর্ণাঙ্গ ড্রোন যুদ্ধক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য তৈরি করা হচ্ছে।
ভবিষ্যতের যুদ্ধের প্রস্তুতি
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, অপারেশন সিন্দুর-এর অভিজ্ঞতা এবং আন্তর্জাতিক সংঘর্ষের সাম্প্রতিক প্রবণতা ভারতীয় সেনাকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন আর কেবল সহায়ক প্রযুক্তি নয়, বরং যুদ্ধের অন্যতম নির্ণায়ক অস্ত্র। সেই কারণেই ড্রোনকে শুধুমাত্র নজরদারির মাধ্যম হিসেবে না দেখে, গোয়েন্দা অভিযান, নির্ভুল আঘাত, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার এবং সমন্বিত যুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসছে ভারতীয় সেনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বাজ ব্যাটালিয়ন’ গঠন সেই দীর্ঘমেয়াদি সামরিক রূপান্তরেরই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

