মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দীর্ঘ শিল্পঐতিহ্যের শহর দুর্গাপুর (Durgapur Industry Corridor) আসন্ন বাজেটে প্রস্তাবিত ইন্টিগ্রেটেড ইস্ট কোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর থেকে বড়সড় সুবিধা পেতে পারে। ‘পুর্বোদয়া স্টেটস’ উদ্যোগের আওতায় গড়ে ওঠা এই করিডরের একটি সুসংযুক্ত নোড দুর্গাপুরে হলে শিল্পখাতে খরচ কমবে বলে মনে করছেন শহরের শিল্পপতিরা। রবিবার বাজেটে দুর্গাপুরে নয়া শিল্প করিডরের ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। বাজেট ভাষণে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী দাবি করেন, পূর্ব ভারত এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়নের জন্য বাড়তি জোর দেওয়া হচ্ছে। সেই রেশ ধরে ইন্টিগ্রেটেড ইস্ট-কোস্ট করিডর তৈরি করা হবে। আর তার একটি কেন্দ্র তৈরি করা হবে দুর্গাপুরে।
পূর্বোদয় পরিকল্পনার অংশ দুর্গাপুর শিল্প করিডর
২০২৬-২৭ আর্থিক বছরের বাজেটে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের দিকে বিশেষ নজর দেওয়ার কথা জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন৷ পূর্বোদয়, অর্থাৎ পূর্বের উদয় নামে একটি পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন তিনি৷ বাজেট বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেন, ‘‘আমি একটি সুসংযুক্ত দুর্গাপুর নোড-সহ একটি সমন্বিত পূর্ব উপকূল শিল্প করিডর (ইস্ট-কোস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর) গড়ে তোলা, পূর্বোদয় প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি রাজ্যে পাঁচটি পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন এবং চার হাজার ই-বাসের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব করছি।’’এই ঘোষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, শিল্পশহর দুর্গাপুরকে কেন্দ্র করে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল করিডর তৈরি করা, যার মাধ্যমে পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নতিও করা যাবে৷ কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর সেই ঘোষণার পর অত্যন্ত আশাবাদী দুর্গাপুর বণিক সভা।
শিল্প-মানচিত্রে ফের শক্ত জায়গায় দুর্গাপুর
অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পূর্ব ভারতের শিল্প সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এই করিডর উৎপাদন, লজিস্টিক্স ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নেবে। দুর্গাপুরের ঐতিহ্যবাহী শিল্প পরিকাঠামো এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে সামনে রেখে এই অঞ্চলকে শিল্প মানচিত্রে আরও শক্তপোক্ত জায়গা করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে কেন্দ্র। ইস্পাত শিল্পের জন্য পরিচিত দুর্গাপুরে সেলের (SAIL) অন্যতম পুরনো কারখানা দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট (DSP) অবস্থিত। শ্যাম স্টিলের ডিরেক্টর ললিত বেরিওয়ালা বলেন, এই করিডর চালু হলে এলাকার লজিস্টিক ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। তাঁর কথায়, দুর্গাপুরের অধিকাংশ শিল্পই বাইরে থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে এবং প্রায় ৭০ শতাংশ প্রস্তুত পণ্য রাজ্যের বাইরে পাঠানো হয়। সে ক্ষেত্রে একটি শিল্প করিডর শিল্পগুলির জন্য অত্যন্ত লাভজনক হবে। অন্ডালের বিমানবন্দর পরিচালনাকারী বেঙ্গল অ্যারোট্রোপলিস (BAPL)-এর ডিরেক্টর উৎসব পারেখ জানান, এই প্রস্তাব নিয়ে তাঁরা অত্যন্ত উৎসাহী। তিনি বলেন, “এখানে পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য আমরা ইতিমধ্যেই রাজ্য সরকারের সঙ্গে কাজ করছি।”
দক্ষিণবঙ্গের অলিখিত রাজধানী হতে পারে দুর্গাপুর
দুর্গাপুর (Durgapur Industry Corridor) চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি চন্দন দত্ত বলেন, ‘‘দুর্গাপুর শিল্পনগরী থেকে স্বাস্থ্য নগরী এবং শিক্ষা নগরীতেও পরিণত হয়েছে। যদিও দুর্গাপুরে একের পর এক ভারী শিল্প বন্ধ হওয়ার পর, তা আর খোলা হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই দুর্গাপুর তার গৌরব অনেকখানি হারিয়েছে। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রীর বাজেট অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বেকার সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের অলিখিত রাজধানী হয়ে যেতে পারে দুর্গাপুর।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘পাশাপাশি অন্ডাল বিমাননগরীতে যে কারগো পরিষেবা চালু হয়েছে, তার আরও উন্নতি হলে আশপাশের জেলা বীরভূম, বাঁকুড়া, নদিয়া , পুরুলিয়া, পূর্ব বর্ধমান এমনকী প্রতিবেশী রাজ্য বিহার, ঝাড়খণ্ড দারুণভাবে উপকৃত হবে। মুম্বইয়ের পুনে এবং নয়াদিল্লির নয়ডা যেভাবে উন্নয়ন ঘটছে, কলকাতা থেকে মাত্র ১৮০ থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে দুর্গাপুরে সেই উন্নয়নে জরুরি।’’
দুর্গাপুরের কী কী সুবিধা
দুর্গাপুরকে এই করিডোরের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে লৌহ-ইস্পাত এবং ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বিপুল বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হবে। বার্জার পেইন্টসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও অভিজিৎ রায় বলেন, দুর্গাপুর সংলগ্ন পানাগড়ে তাঁদের প্রস্তাবিত উৎপাদন কেন্দ্রের ক্ষেত্রে এই শিল্প করিডর লজিস্টিক ও সংযোগ ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, আসানসোল চেম্বার অব কমার্সের সম্পাদক শম্ভু ঝা বলেন, দুর্গাপুরকে বড় শিল্পের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা উচিত এবং এই করিডর পরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সময়কালে দুর্গাপুরে ডিভিসির ৮০০ মেগা ওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন পরিবেশবান্ধব নতুন ইউনিট গড়ার প্রস্তুতি চলছে। সেই প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় বাজেটে দুর্গাপুরকে নিয়ে নতুন করে শিল্প করিডর গড়ার ঘোষণা অত্যন্ত আশাবাদী দুর্গাপুরের আমজনতা।
শিল্পের জোয়ার আসবে জেলায় জেলায়
দীর্ঘদিন ধরে শিল্প বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান ঘিরে যে প্রশ্ন উঠছিল পশ্চিমবঙ্গে, বাজেটের এই ঘোষণায় তারই একটি সম্ভাব্য উত্তর মিলেছে বলে মনে করছেন শিল্প ও রাজনৈতিক মহলের একাংশ। রাজ্য সরকার যেখানে বারবার কেন্দ্রের বিরুদ্ধে ‘বঞ্চনা’র অভিযোগ তুলে এসেছে, সেখানে দুর্গাপুরে শিল্প করিডরের প্রস্তাব বাংলাকে ঘিরে কেন্দ্রের আগ্রহই স্পষ্ট করছে বলে দাবি বিজেপি নেতৃত্বের। যদিও বাজেটে এই প্রকল্পের আর্থিক পরিমাণ বা নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা করা হয়নি, তবুও শিল্প মহলের মতে এটি বাংলার শিল্প পুনরুজ্জীবনের পথে এক গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। দুর্গাপুর পশ্চিমের বিজেপি বিধায়ক লক্ষ্মণ ঘোড়ুই বলেন,‘‘আমরা বলেছিলাম, বিজেপি ক্ষমতায় এলে রাজ্যে শিল্পায়ন হবে। ক্ষমতায় আসার আগেই কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী দুর্গাপুরে শিল্পের কথা ঘোষণা করলেন। এ বার আর দুর্গাপুর ও আশপাশের যুবকদের ভিন রাজ্যে কাজে যেতে হবে না।’’ বিজেপির মুখপাত্র সুমন্ত মণ্ডল বলেন, ‘‘এই রাজ্যের শিল্প সম্ভাবনা দেখা দিল আবার দুর্গাপুরকে সামনে রেখেই। তৃণমূল কংগ্রেসের ইউনিয়ন তাদের জঙ্গিপনার কারণে এ রাজ্যে শিল্প আসেনি। আবার নতুন করে শিল্প আসবে, এটা বেকার যুবকদের কাছে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এই রাজ্যে বিজেপির সরকার গঠিত হলে শিল্পের জোয়ার আসবে জেলায় জেলায়।’’









