মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: এক ঐতিহাসিক রায়ে নির্বাচন কমিশনের (ECI) ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ সংক্ষেপে এসআইআর (SIR) বা ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াকে বৈধ ঘোষণা করল সুপ্রিম কোর্ট। বুধবার আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিল, এই উদ্যোগ সংবিধানের “স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন” নিশ্চিত করার মূল উদ্দেশ্যকে শক্তিশালী করে এবং নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক ক্ষমতার মধ্যেই থেকে এই পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দেয়। ২০২৫ সালের জুন মাসে দায়ের হওয়া একাধিক রিট পিটিশনের শুনানির পর এই সিদ্ধান্ত সামনে আসে। মামলাগুলিতে বিহারে শুরু হওয়া প্রথম দফার এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়াকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল।
কী ছিল মামলাকারীদের অভিযোগ?
আবেদনকারীদের দাবি ছিল, নির্বাচন কমিশন এই বিশেষ পুনর্বিবেচনার মাধ্যমে কার্যত নাগরিকত্ব নির্ধারণকারী সংস্থার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, যাঁরা ইতিমধ্যেই ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, তাঁদের আবার নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য করা আইনের পরিপন্থী। মামলাকারীদের আরও অভিযোগ ছিল, এই প্রক্রিয়া সাধারণ ভোটারদের উপর অতিরিক্ত নথিপত্রের চাপ তৈরি করছে এবং বহু মানুষের ভোটাধিকার ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। তবে সুপ্রিম কোর্ট এই সমস্ত যুক্তি খারিজ করে দেয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ
রায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ এবং ১৯৫০-এর জনপ্রতিনিধি আইনের (Representation of the People Act) ২১(৩) ধারার অধীনে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পুনর্বিবেচনা চালানোর পূর্ণ ক্ষমতা রয়েছে। আদালত পর্যবেক্ষণ করে, আইন যখন কমিশনকে “যে কোনও সময় বিশেষ পুনর্বিবেচনা” করার অনুমতি দিয়েছে, তখন শুধুমাত্র নিয়মিত পুনর্বিবেচনার প্রচলিত পদ্ধতির সঙ্গে সম্পূর্ণ মিল না থাকার কারণে এসআইআরকে অবৈধ বলা যায় না। বেঞ্চের মতে, এই এসআইআর (SIR) কোনওভাবেই বিদ্যমান আইনকে প্রতিস্থাপন করছে না, বরং সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদের মূল উদ্দেশ্যকে কার্যকর করছে।
“ভোটার তালিকার বিশ্বাসযোগ্যতা জরুরি”
সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্টভাবে জানায়, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন শুধুমাত্র ভোটগ্রহণের ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে না, বরং নির্ভর করে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা, স্বচ্ছতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার উপর। আদালতের মতে, এই পরিস্থিতিতে ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ একটি প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক পদক্ষেপ। আদালত উল্লেখ করে, নির্বাচন কমিশন যে কারণগুলি দেখিয়ে এসআইআর (SIR) চালু করেছে, তা যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত। যেমন—
- ● চার দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশে পূর্ণাঙ্গ নিবিড় সংশোধন হয়নি
- ● বছরের পর বছর ব্যাপক হারে নাম সংযোজন ও বিয়োজন হয়েছে
- ● দ্রুত নগরায়ন ও অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের ফলে ডুপ্লিকেট বা ভুল এন্ট্রির সম্ভাবনা বেড়েছে
নাগরিকত্ব যাচাইয়ের ক্ষমতা রয়েছে কমিশনের
রায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল নাগরিকত্ব যাচাই প্রসঙ্গে আদালতের অবস্থান। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভোটার তালিকা প্রস্তুতি বা সংশোধনের সময় নির্বাচন কমিশন নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত প্রশ্ন পরীক্ষা করতে পারে। তবে আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে, কমিশনের এই সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধুমাত্র ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি বা বাদ পড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অর্থাৎ, কাউকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া মানেই তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্ব চূড়ান্তভাবে বাতিল হয়ে যাওয়া নয়। শীর্ষ আদালত জানায়, নাগরিকত্ব সংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নাগরিকত্ব আইন (Citizenship Act) অনুযায়ী নির্ধারিত উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে।
ভোটারদের নথি চাওয়া বৈধ
সুপ্রিম কোর্ট আরও বলে, ভোটারদের কাছ থেকে নথি চাওয়া মানেই তাঁদের নাগরিকত্বের পূর্বধারণাকে অস্বীকার করা নয়। আদালতের মতে, এটি কেবলমাত্র একটি যাচাইকরণ প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কমিশন বিদ্যমান তথ্য পুনরায় নিশ্চিত করতে বা প্রয়োজন হলে সংশোধন করতে পারে।
যাঁদের নাম বাদ, তাঁদের তালিকা কেন্দ্রকে পাঠানোর নির্দেশ
রায়ে সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে, যাঁদের নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহের ভিত্তিতে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তাঁদের নাম চার সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠাতে হবে।
ইতিমধ্যেই দুই দফা সম্পন্ন
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই দেশের বহু অংশে এসআইআর সম্পন্ন করেছে।
প্রথম দফা
বিহার (সেপ্টেম্বর ২০২৫-এ শেষ)
দ্বিতীয় দফা
এপ্রিল ২০২৬-এ সম্পন্ন হয়েছে নিম্নলিখিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে—
- ● ছত্তিশগড়
- ● গোয়া
- ● গুজরাট
- ● কেরলম
- ● মধ্যপ্রদেশ
- ● রাজস্থান
- ● তামিলনাড়ু
- ● উত্তরপ্রদেশ
- ● পশ্চিমবঙ্গ
এছাড়াও—
- ● আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ
- ● লাক্ষাদ্বীপ
- ● পুদুচেরি
তৃতীয় দফার প্রস্তুতি
নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই তৃতীয় দফার ঘোষণা করেছে। আগামী মাসগুলিতে ১৬টি রাজ্য ও ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এই প্রক্রিয়া চালানো হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ● অন্ধ্রপ্রদেশ
- ● কর্নাটক
- ● তেলঙ্গানা
তৃতীয় দফা সম্পূর্ণ হলে হিমাচল প্রদেশ, জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ বাদে গোটা দেশেই এসআইআর (SIR) কার্যকর হয়ে যাবে।
রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ভবিষ্যতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। একদিকে নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা আরও স্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত হল, অন্যদিকে ভোটার তালিকা সংশোধন ও নাগরিকত্ব যাচাই নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে সুপ্রিম কোর্ট গুরুত্বপূর্ণ দিশা দেখাল। তবে বিরোধী দল ও নাগরিক অধিকার সংগঠনগুলির একাংশ এখনও আশঙ্কা প্রকাশ করছে যে, বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে বহু প্রকৃত নাগরিক হয়রানির শিকার হতে পারেন। ফলে আগামী দিনে এসআইআর (SIR)-এর বাস্তব কার্যকারিতা এবং তার প্রশাসনিক প্রয়োগ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
