মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: এজলাসে তুমুল বাকবিতণ্ডা। আই প্যাকের (I PAC Ed Hearing) ঘটনায় ইডির দায়ের করা মামলা গিয়েছে পিছিয়ে। কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ এই মামলার শুনানি করবেন আগামী ১৪ জানুয়ারি। তবে সূত্রের খবর, শুক্রবারই মামলার শুনানি চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির সচিবালয়ে জরুরী বেঞ্চে আবেদন করছে ইডি। লিখিত ভাবে আবেদন করতে চলেছে কেন্দ্রীয় এজেন্সি। গোয়েন্দারা চাইছেন, দ্রুত এই মামলার শুনানি হোক। না হলে নথি নষ্ট করার ভয় রয়েছে। প্রয়োজনে এজলাস বদলাতেও আপত্তি নেই গোয়েন্দাদের। তবে, ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করলে আরও অনেক প্রমাণ লোপাট হওয়ার আশঙ্কা করছে তারা। যদিও প্রধান বিচারপতি টি শিবজ্ঞানম জানিয়ে দেন, যেহেতু জুডিশিয়াল অর্ডার হয়েছে, তাই বদল করা সম্ভব নয়। সেই কারণে ১৪ই জানুয়ারিতেই হবে শুনানি।
এজলাসে চরম বিশৃঙ্খলা
শুনানির আগেই কলকাতা হাইকোর্টের এজলাসে চরম বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। তার জেরে শুক্রবার জোড়া আইপ্যাক মামলার শুনানিই হল না হাইকোর্টে। প্রাথমিকভাবে যা খবর, আগামী ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সেই মামলার পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর সেই পরিস্থিতিতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) যে সিবিআই তদন্ত, নথি ফেরতের মতো একগুচ্ছ আর্জি জানিয়েছিল, সেগুলি পূরণ হল না। ফলে বৃহস্পতিবার কলকাতা লাউডন স্ট্রিটে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়ি থেকে বের করে আনা ‘সবুজ ফাইল’ এবং সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের অফিস থেকে বের করে আনা একগুচ্ছ নথি আরও বেশি সময়ের জন্য নিজের কাছে বা তৃণমূলের কাছে রাখার সুযোগ পেলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে ফাইল বা নথির মধ্যে তৃণমূলের প্রার্থীতালিকা, কৌশলের মতো বিভিন্ন বিষয় আছে,বলে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি। কিন্তু ইডির দাবি, এর ফলে সুকৌশলে নথি নষ্ট করা হতে পারে।
নথি ও ডিভাইস ফেরতের উপরে জোর দেয় ইডি
এমনিতে হাইকোর্টে যে পিটিশন দাখিল করেছে ইডি, তাতে নথি ফেরতের বিষয়ের উপরে জোর দেয় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। ইডির তরফে অভিযোগ করা হয়েছে যে তল্লাশি চলছে বলা সত্ত্বেও ঘটনাস্থলে মুখ্যমন্ত্রী ঢুকে পড়েন। জোর করে কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে থাকা একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র এবং ডিজিটাল ডিভাইস ছিনিয়ে নেওয়া হয়। জোর করে নিয়ে যাওয়া সেইসব নথি যেন ফিরিয়ে দেওয়া হয় ইডিকে। যতক্ষণ না ইডির হাতে সেই নথি বা ডিভাইস আসছে, ততক্ষণ কোনওরকম তথ্য বিকৃত যাতে না করা হয়, সেই নির্দেশ দেওয়া হোক।
সিবিআই তদন্তের আর্জি জানায় ইডি
পাশাপাশি পুরো ঘটনায় সিবিআই তদন্তের আর্জি জানায় ইডি। হাইকোর্টে ইডির তরফে আর্জি জানানো হয় যে দ্রুত সিবিআই এফআইআর দায়ের করুক। দ্রুত তদন্ত শুরু করুক কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিস এবং লাউডন স্ট্রিটে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে তল্লাশির সময় যে মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্য পুলিশ-প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা গিয়েছিলেন, তা নিয়ে তদন্ত করা হোক। যাবতীয় নিয়ম-কানুন মেনেই তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছিল বলে ইডির তরফে দাবি করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণের দাবি তোলে ইডি
সেইসঙ্গে ইডির তরফে দাবি করা হয়, সল্টলেকে আইপ্যাকের অফিস এবং লাউডন স্ট্রিটে আইপ্যাকের কর্ণধারের বাড়িতে যে সিসিটিভি ফুটেজ আছে, তা সংরক্ষণ করে রাখা হোক। রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দেওয়া হোক যে ইডির তদন্তে যেন বাধা না দেওয়া হয়। প্রসঙ্গত, আইপ্যাক কাণ্ডে মামলা ও পালটা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে নথি ছিনতাইয়ের অভিযোগ তুলে মামলা দায়ের করেছে ইডি। আবার পালটা মামলা করেছে তৃণমূল কংগ্রেসও। হাইকোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের বেঞ্চে একসঙ্গে দুটি মামলার শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আইনজীবীদের প্রবল ভিড়, বিশৃঙ্খলার জেরে শুনানি পিছিয়ে গিয়েছে।
ইডি অফিসারদের হুমকি
ইডি সূত্রে খবর, নথি রাজ্য সরকারের হাতে থাকলে তা বিকৃত করতে সময় লাগবে না। কারণ, ইডির দাবি, আইপ্যাকের থেকে কোনও জিনিস বাজেয়াপ্ত করলে তদন্তকারী অফিসারদের গ্রেফতার করা হবে, বলে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ডিজি রাজীব কুমার হুঁশিয়ারি দেন। এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) সূত্রে জানানো হয়েছে, তল্লাশির সময় ঘটনাস্থলে রাজ্য পুলিশের ডিজি উপস্থিত ছিলেন। তিনি নাকি ইডি আধিকারিকদের বলেন যে পঞ্চনামায় যেন কোনও কিছুর উল্লেখ না করা হয়। কেন্দ্রীয় সংস্থার তিন আধিকারিককে বলেন যে ইডি যেন দেখায় যে তল্লাশি অভিযান থেকে কিছু পাওয়া যায়নি। সেই কাজটা না করলে তাঁদের গ্রেফতার করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। যদিও বিষয়টি নিয়ে রাজ্য পুলিশ বা রাজ্য সরকারের তরফে কোনও মন্তব্য করা হয়নি।
এজলাসে কেন এমন অচলাবস্থা
শুক্রবার বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে এই মামলার শুনানি নির্ধারিত ছিল। সকাল থেকেই হাইকোর্ট চত্বরে নিরাপত্তা এবং আইনজীবীদের তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু শুনানি শুরুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে এজলাসের ভেতর আইনজীবীদের একাংশ এবং সাধারণ মানুষের ভিড় এতটাই বেড়ে যায় যে তিল ধারণের জায়গা ছিল না। ক্রমশ বাড়তে থাকা হট্টগোল এবং ভিড়ের চাপে আদালতের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত হতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে বিচারপতি শুভ্রা ঘোষ স্পষ্ট জানান, এমন বিশৃঙ্খল পরিবেশে আইনি শুনানি চালানো সম্ভব নয়। এরপরই তিনি আসন ছেড়ে উঠে যান। বিরোধীদের দাবি, রাজ্যের শাসকদলের তরফে পরিকল্পনা করে আদালত চত্বরে এই বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়েছিল। এর ফলে নথিগুলি আরও কিছুদিন নিজের কাছে রাখার সুযোগ পেলেন মুখ্যমন্ত্রী তথা রাজ্যের শাসকদল।
