মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: দেশবাসীকে এক বছর সোনা না কেনার আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এর কয়েক দিনের মধ্যেই কঠোর পদক্ষেপ করল কেন্দ্র। সোনা ও রূপোর আমদানি শুল্ক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে করা হল ১৫ শতাংশ। আজ, ১৩ মে থেকে সোনার ওপর এখন ১০ শতাংশ বেসিক কাস্টমস ডিউটি (BCD) এবং ৫ শতাংশ এগ্রিকালচার ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেস (AIDC) ধার্য হবে। আগে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫ এবং ১ শতাংশ। একটি নোটিশের মাধ্যমে এই পরিবর্তনের কথা ঘোষণা করেছে অর্থমন্ত্রক।
অর্থনৈতিক বার্তা (PM Modi)
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এটি শুধু কর বৃদ্ধি নয়, এটি একটি বড় অর্থনৈতিক বার্তা। ইরান যুদ্ধজনিত বৈশ্বিক চাপের মধ্যে ডলার সাশ্রয়, সোনার চাহিদা কমানো এবং ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার (Forex Reserves) রক্ষা করাই এর উদ্দেশ্য। আগে বেসিক কাস্টমস ডিউটি ছিল ৫ শতাংশ, এখন সেটাই হয়েছে ১০ শতাংশ। এআইডিসি আগে ছিল ১ শতাংশ, এখন হল ৫ শতাংশ। বিজ্ঞপ্তিতে গয়নার কিছু যন্ত্রাংশ ও শিল্পক্ষেত্রের কিছু কাঁচামালের শুল্কও সংশোধন করা হয়েছে। ব্যবহৃত ক্যাটালিস্ট (মূল্যবান ধাতুযুক্ত ছাই) পুনর্ব্যবহার কিংবা উদ্ধারের ক্ষেত্রে ৪.৩৫-৫ শতাংশের কম শুল্ক রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সরকার নয়া আমদানির বদলে পুনর্ব্যবহারের দিকেই উৎসাহ দিচ্ছে স্বর্ণশিল্পকে।
সোনার দাম দিতে হয় মার্কিন ডলারে
ভারতে সোনা উৎপাদন হয় না। দেশের প্রায় সম্পূর্ণ চাহিদাই মেটানো হয় আমদানির মাধ্যমে। দাম দিতে হয় মার্কিন ডলারে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মোট আমদানি বিলের ৯-১০ শতাংশ ছিল সোনা আমদানি। মোট হিসেবে ভারত সোনা আমদানিতে ৭১.৯৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে। এটি রেকর্ড। যদিও মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং অপরিশোধিত তেলের চড়া দরের কারণে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার আগের চেয়ে কমে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা ভান্ডারের (IMF) আশঙ্কা, যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে ভারতের কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট (CAD) আরও বাড়তে পারে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার বাঁচাতে তাই ভারত আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ করছে। হিসেবটা সহজ, দেশবাসী সোনা কম কিনলে দেশ থেকে কম ডলার বেরিয়ে যাবে। সোনার আমদানি ৩০-৪০ শতাংশ কমলে বছরে সাশ্রয় হতে পারে ২০-২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত।
খুচরো গয়নার দামেও প্রভাব
এই শুল্ক বৃদ্ধির ফলে সোনা সঙ্গে সঙ্গে আরও দামী হয়ে যাবে। খুচরো গয়নার দামেও এর প্রভাব পড়বে দ্রুত। সকাল ৯:৫৯-এ এমসিএক্সে (MCX) সোনার দাম ছিল ১,৬৩,০০০ টাকা, রূপোর দাম ২,৯৬,৬০০ টাকা — উভয়ই ৬ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রতিবেদন লেখার সময় ভারতে ২৪ ক্যারেট সোনার দাম ছিল প্রতি গ্রাম প্রায় ১৫,৪৭৫ টাকা, আর রূপোর দাম ঘোরাফেরা করেছে প্রতি কেজি ২,৭৮,০০০ থেকে ২,৯০,০০০ টাকার মধ্যে। ভারতে সোনা কেনা একদিকে সাংস্কৃতিক (বিয়ে, উৎসব), অন্যদিকে আর্থিক (নিরাপদ বিনিয়োগ) বিষয়।সরকার মূলত এই দুই প্রবণতাকেই টার্গেট করছে। চড়া দরের কারণে লগ্নি হিসেবে সোনা কেনার পরিমাণ কমাবে, প্রধানমন্ত্রীর আবেদন আনুষ্ঠানিক বা অনুষ্ঠানভিত্তিক কেনাকাটাও কমাতে পারে, ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই গোল্ড ইটিএফের (Gold ETF) দিকে ঝুঁকছিলেন। প্রশ্ন হল, এখন কী হতে পারে? বিনিয়োগকারীরা গোল্ড ইটিএফ বা ডিজিটাল গোল্ডের দিকে যেতে পারেন, গয়না কেনা পিছিয়ে যেতে পারে, পুরানো সোনা বদলে নতুন গয়না নেওয়ার প্রবণতাও বাড়তে পারে।
কেন এই শুল্ক বৃদ্ধি অর্থনীতির সহায়ক?
অপরিহার্য আমদানি যেমন অপরিশোধিত তেলের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে (ভারত আমদানি করে ৮৮ শতাংশ তেল), কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ডেফিসিট কমতে পারে এবং টাকার মান স্থিতিশীল থাকতে পারে, কমবে জল্পনামূলক সোনা মজুতের চেষ্টা। পুনর্ব্যবহার এবং দেশীয় মূল্য সংযোজনও বাড়বে। যদিও বুলিয়ন ব্যবসায়ীদের সতর্কতা, ফের হতে পারে কালোবাজারির রমরমা। শুল্কের পার্থক্য বেশি হলে চোরাচালান লাভজনক হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে শুল্ক কমানোর পর এই প্রবণতা কমেছিল। কিন্তু এখন ১৫ শতাংশ শুল্কের ফলে প্রতিবেশী দেশ হয়ে অবৈধ আমদানি বাড়তে পারে, নগদ লেনদেন বাড়তে পারে, কাস্টমস ও ডিআরআইয়ের জন্য নজরদারি কঠিন হতে পারে।
কী বলছে বণিক মহল
অল ইন্ডিয়া জেমস অ্যান্ড জুয়েলারি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান রাজেশ রোকড়ে বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়িতার আহ্বান এবং বুলিয়নের ওপর আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির ফলে ব্যবসা কঠিন হয়ে পড়বে। শিল্পমহলের আশঙ্কা, এর ফলে কালোবাজারি বাড়বে এবং দেশে সমান্তরাল অর্থনীতি গড়ে উঠতে পারে।” এর প্রভাব পড়বে বুলিয়ন ব্যবসায়ী ও জুয়েলারিদের ওপরও। এটি সরাসরি তাঁদের ব্যবসায় আঘাত হানবে, কমতে পারে ক্রেতার সংখ্যা, স্টকের খরচ বাড়ায় কার্যকরী মূলধনের চাপ বাড়বে, গয়নার যন্ত্রাংশের ওপরও জারি ৫-৫.৪ শতাংশ শুল্ক। সব মিলিয়ে একদিকে জীবিকার উদ্বেগ, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ — এই দুইয়ের মধ্যেই বিভক্ত শিল্পমহল। মালাবার গোল্ড অ্যান্ড ডায়মন্ডস সরকারকে গোল্ড মাইটাইজেশন স্কিম (GMS) শক্তিশালী করার প্রস্তাব দিয়েছে। এটি প্রধানমন্ত্রীর ‘দায়িত্বশীল সোনা ব্যবহার’ সংক্রান্ত আহ্বানকে সমর্থন করে।
চেয়ারম্যান এম পি আহম্মদ অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন এবং বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের কাছে এই প্রস্তাব জমা দিয়েছেন। এদিকে, কেন্দ্রের এই পদক্ষেপের প্রতিবাদে দোকানও বন্ধ রেখেছে কয়েকটি ব্যবসায়ী সংগঠন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ‘প্ররোচনা ও মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে নীতি প্রয়োগ’। প্রথমে প্রধানমন্ত্রীর নৈতিক আবেদন, তারপর সরকারের আর্থিক বাধা। বার্তা স্পষ্ট, ভারতের ডলারের ভান্ডার কমিয়ে দিচ্ছে সোনা, তাই আপাতত সোনা কেনা কমান।
