মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: নাম বদলে গেল শতাব্দী-প্রাচীন ফোর্ট উইলিয়ামের (Fort William Renamed)। সরকারিভাবে এখনও ঘোষণা না হলেও, ভারতীয় সেনার ইস্টার্ন কমান্ডের (Army Eastern Command) সদর দফতরের প্রশাসনিক কাজকর্মে এখন থেকেই নতুন নামে ডাকা হচ্ছে ২৫০ বছরের পুরনো এই সামরিক প্রতিষ্ঠানকে। এই নাম বদল নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল আলোড়ন পড়েছে। তবে, কেন্দ্রের তরফে স্পষ্ট করা হয়েছে, ঐতিহ্যের পুনঃস্থাপন এবং ব্রিটিশ যুগের প্রভাব সরিয়ে ফেলতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঔপনিবেশিকতার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে…
মুঘল এবং ঔপনিবেশিকতার ছায়া থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে মোদি জমানায় দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক থেকে শুরু করে জায়গা ও প্রতিষ্ঠানের নাম বদল করা হয়েছে এবং হয়ে চলেছে। যেমন এলাহাবাদ শহরের নাম পাল্টে করা হয়েছে প্রয়াগরাজ। দেশের ব্যস্ততম মোগলসরাই রেল স্টেশনের নাম পাল্টে করা হয়েছে পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশন। আবার রাজধানীর রাজপথের নাম পাল্টে করা হয়েছে কর্তব্য পথ। সেই ধারাকে অব্যাহত রেখে এবার কলকাতার ফোর্ট উইলিয়ামের (Fort William Renamed) নাম বদলে দেওয়া হল।
এখন থেকে ফোর্ট উইলিয়াম হল ‘বিজয় দুর্গ’
এ প্রসঙ্গে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের মুখপাত্র তথা মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক উইং কমান্ডার হিমাংশু তিওয়ারি সংবাদমাধ্যমকে জানান, ফোর্ট উইলিয়ামকে ‘বিজয় দুর্গ’ (Vijay Durg) নামেই ডাকা হবে। তিনি আরও জানান, গত ২ ডিসেম্বর নাম বদলের নির্দেশ আসে। শুধু ফোর্ট উইলিয়াম নয়, এর মধ্যে থাকা বেশ কয়েকটি জায়গার নামবদলও হয়েছে। যেমন ফোর্টের মধ্যে থাকা সেনা কমান্ডারের বাসভবন কিচেনার হাউসের নতুন নাম হয়েছে মানেকশ হাউস। দক্ষিণ প্রান্তের গেটের নাম ছিল সাউথ গেট বা সেন্ট জর্জ গেট। সেটি হয়েছে শিবাজি দ্বার। আবার পূর্ব প্রান্তের গেটের নাম রাখা হয়েছে স্বর্নিম বিজয় দ্বার। সেনার ইস্টার্ন কমান্ডের (Army Eastern Command) এক সূত্রের মতে, ঔপনিবেশিকতা ছাপ মুছতেই ফোর্ট উইলিয়ামের (Fort William Renamed) নাম বদলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
ফোর্ট উইলিয়ামের ইতিহাস
১৭৭ একর জমির ওপর তৈরি ২৫০ বছরের পুরনো ফোর্ট উইলিয়াম সেই তখন থেকেই কলকাতার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে। জানা যায়, ১৬৯৬ সালে মূল দুর্গটি তৈরি করেছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এর নামকরণ করা হয়েছিল ব্রিটেনের তৎকালীন রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের নামে। কিন্তু, সেই সিপাই বিদ্রোহের সময় এই দুর্গ আক্রমণ করেছিলেন সিরাজ-উদ-দৌলা। তাতে বিস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুর্গটি। পরে, নতুন করে শুরু হয় নির্মাণ। প্রথমে ১৭৫৮ সাল থেকে তৈরি শুরু হয় এই সেনা ছাউনি তৈরির কাজ। পরে ১৭৮১ সালে লর্ড ক্লাইভ দুর্গটি পুনর্নির্মাণ করেন।
নতুন নামকরণের তাৎপর্য (Fort William Renamed)
সেনা সূত্রে খবর, বিজয় দুর্গ নামকরণের নেপথ্যে বড় যুক্তি রয়েছে। মহারাষ্ট্রের সিন্ধুদুর্গে রয়েছে বিজয় দুর্গ। যা ছত্রপতি শিবাজি মহাজারাজের নৌবহরের ঘাঁটি ছিল। বলা হয়, এই দুর্গ অভেদ্য ছিল। পুনর্নির্মাণের পর একবারের জন্যও আক্রমণ হয়নি এই ফোর্ট উইলিয়াম। নতুন আক্রমণ ঠেকাতে এখানে ৪৯৭টি তোপ মোতায়েন করেছিল ব্রিটিশরা। কিন্তু, একবারের জন্যও তা চালাতে হয়নি। আবার কিচেনার হাউসের নাম পাল্টে মানকেশ হাউস করার নেপথ্যেও রয়েছে বড় ইতিহাস। এই বিল্ডিংটি তৈরি করা হয়েছিল সেনা কমান্ডারদের থাকার জন্য। ফিল্ড মার্শাল হোরাশিও হার্বার্ট কিচেনার ছিলেন ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনার তৎকালীন সেনা কমান্ডার। তিনি ফোর্ট উইলিয়ামে ছিলেন ১৯০২-১৯১০ সাল পর্যন্ত। তাঁর নামেই নাম রাখা হয় বিল্ডিংটির (Fort William Renamed)। সেই নাম পাল্টে করা হয়েছে মানেকশ-র নামে, যিনি স্বাধীন ভারতের প্রথম ফিল্ড মার্শাল। শুধু তাই নয়। ১৯৭১-এর যুদ্ধের সময়, তিনি ছিলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান, যার আমলে পাকিস্তান পর্যুদস্ত হয়েছিল এবং জন্ম হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের। সেই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল এই ইস্টার্ন কমান্ড (Army Eastern Command)। এখানেই শেষ নয়। শোনা যায়, ভারতের কাছে ৯০ হাজার পাক সেনার আত্মসমর্পণের পর তাদের তৎকালীন কমান্ডার এএকে নিয়াজিকে এই কিচেনার হাউসেই এনে আটক রাখা হয়েছিল।