মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: জইশ-ই-মহম্মদ (JeM)-যোগের সন্দেহে ধৃত হামিম মণ্ডলকে জেরা করে বড় সাফল্য পেল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশ্যাল টাস্ক ফোর্স (STF)। হামিমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী তথা বান্ধবী অর্পিতা সরকারকে ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জ থেকে গ্রেফতার করেছে তদন্তকারীরা। অভিযোগ, প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমলা ও রাজনৈতিক নেতাদের ‘হানিট্র্যাপ’-এ ফাঁসিয়ে সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহের কাজে ব্যবহৃত হতেন অর্পিতা। তদন্তকারীদের দাবি, এই তথ্যের ভিত্তিতেই সম্ভাব্য হামলার ছক তৈরি করা হত।
হামিমকে জেরা করেই সামনে আসে অর্পিতার নাম
শুক্রবার বর্ধমানের রেনেসাঁ কমপ্লেক্স থেকে হামিম মণ্ডলকে গ্রেফতার করে এসটিএফ। আদালত তাকে ১৪ দিনের STF হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। এরপর কলকাতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন তদন্তকারীরা। এসটিএফ সূত্রের দাবি, জেরার সময় হামিমের কাছ থেকেই অর্পিতা সরকারের নাম উঠে আসে। সেই সূত্র ধরেই শুক্রবার রাতেই ঝাড়খণ্ডের সাহেবগঞ্জে অভিযান চালিয়ে অর্পিতাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তাকে বর্ধমান থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। শনিবার তাকে আদালতে পেশ করা হবে।
‘হানিট্র্যাপ’-এর মাধ্যমে চলত তথ্য সংগ্রহ?
তদন্তকারীদের দাবি, অর্পিতাকে একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা হত। তাঁর কাজ ছিল বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি, প্রশাসনিক আধিকারিক, আমলা এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করা। অভিযোগ, সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তাঁদের ব্যক্তিগত ও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করা হত। এসটিএফ-এর হাতে আসা তথ্য অনুযায়ী, হামিমের নির্দেশেই এই যোগাযোগ তৈরি করা হয়েছিল। হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটসহ একাধিক ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণও তদন্তকারীদের হাতে এসেছে বলে জানা গিয়েছে। তদন্তকারীরা এখন অর্পিতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হামিমের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে চাইছেন। একই সঙ্গে জানতে চাইছেন, গোটা নেটওয়ার্কে তাঁর প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল এবং আর কারা এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত।
বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের নিশানায় রাখার অভিযোগ
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, হামিমকে ব্যবহার করে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিজেপি ও আরএসএস নেতার গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের পরিকল্পনা ছিল পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই-এর। সেই উদ্দেশ্যে একটি নেটওয়ার্কও গড়ে তোলা হয়েছিল বলে তদন্তকারীদের অনুমান। তবে হামিম সেই পরিকল্পনায় কতটা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিল এবং সেই তথ্য কীভাবে বিদেশি হ্যান্ডলারদের কাছে পৌঁছত, তা এখনও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও নিশানা করার অভিযোগ
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও নিশানা করা হয়েছিল বলে সন্দেহ তদন্তকারীদের। হামিমের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে মুখ্যমন্ত্রী-সহ একাধিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া গিয়েছে বলে দাবি এসটিএফ-এর। এমনকি, শুভেন্দু অধিকারী নিউটাউনের ফ্ল্যাটে যে রাস্তায় যাতায়াত করতেন, সেই রুটে হামিম রেকিও করেছিল বলে তদন্তে জানা গিয়েছে। এই বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। আন্তর্জাতিক যোগ মিলেছে। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। এসটিএফ তদন্ত করছে। ধৃতের মোবাইল-সহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস থেকে কী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’
জিম থেকেই ধরা পড়ে হামিম
শুক্রবার সকালে বর্ধমানের অভিজাত আবাসন রেনেসাঁ হাউজিং কমপ্লেক্সের জিম থেকে হামিম মণ্ডলকে গ্রেফতার করে এসটিএফ। তদন্তে জানা গিয়েছে, সে পূর্ব বর্ধমান জেলার কুসুমগ্রামের বাসিন্দা। তবে তার পরিবারের শিকড় মন্তেশ্বর থানার দীর্ঘনগর গ্রামেও রয়েছে। হামিমের বাবা মনিরুদ্দিন মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে হাওড়ার পিলখানা এলাকায় বসবাস করতেন। কয়েক মাস আগে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বর্ধমানের রেনেসাঁ কমপ্লেক্সের রোহিনী টাওয়ারে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন। গ্রেফতারের পর তদন্তকারীরা সেখানে পৌঁছে দেখেন ফ্ল্যাটে তালা ঝুলছে। প্রতিবেশীদের দাবি, হামিমের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগের কথা তাঁরা কল্পনাও করতে পারেননি। তাঁদের বক্তব্য, আচরণে কোনও অস্বাভাবিকতা কখনও চোখে পড়েনি।
হাওড়ায় চাকরির আড়ালে চলছিল নাশকতার প্রস্তুতি?
তদন্তে জানা গিয়েছে, হামিম হাওড়ার পিলখানার একটি রেডিমেড পোশাক কারখানায় বারকোড লাগানোর কাজ করত। কিন্তু এসটিএফ-এর দাবি, এই চাকরির আড়ালেই সে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল নিউটাউনেও।তদন্তকারীরা এখন হামিম ও অর্পিতার মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছেন। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে গোটা নেটওয়ার্ক, সম্ভাব্য বিদেশি যোগাযোগ এবং আরও কোনও সহযোগী এই চক্রে যুক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে হামিম ও অর্পিতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্ত আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে STF। তদন্তকারীদের মতে, এই মামলায় আগামী কয়েক দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে।
