মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ইতিহাস তৈরি করল ভারতীয় রেল। বৃহস্পতিবার দেশের প্রথম হাইড্রোজেন-চালিত ট্রেনের (Hydrogen Train) উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রাথমিকভাবে হরিয়ানায় ৮৯ কিলোমিটার দূরত্বের জিন্দ-সোনিপত রুটে চলবে দূষণমুক্ত আধুনিক ইকো-ফ্রেন্ডলি প্রযুক্তির এই ট্রেন। শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী হরিয়ানার জিন্দ রেলস্টেশন থেকে সবুজ পতাকা নেড়ে ওই পরিবেশবান্ধব ট্রেন যাত্রার সূচনা করেন। এর ফলে, হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন পরিচালনাকারী দেশগুলির তালিকায় নাম জুড়ে গেল ভারতের। এদিন জিন্দের একলব্য স্টেডিয়ামে প্রায় ১৪,৭০০ কোটি টাকার বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং উদ্বোধনও করেছেন প্রধানমন্ত্রী।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতেও উন্নয়ন যাত্রা অব্যাহত
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেন যাত্রার সূচনা করে এনডিএ সরকারের জমানায় নানা উন্নয়ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। পাশাপাশি সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে সঙ্কটের প্রসঙ্গ তুলে এদিন প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেলের সঙ্কট হলেও আমাদের কোনও উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ ব্যাহত হয়নি। ২০১৪-র আগে হরমুজ সঙ্কট হলে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যেত!’’ পূর্বতন ইউপিএ সরকারের জমানায় জ্বালানি মজুত ও সরবরাহের বিষয়টি উপেক্ষিত ছিল— এই বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করেন মোদি।
হাইড্রোজেন ট্রেনকে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র উদাহরণ
হাইড্রোজেন ট্রেনকে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র আদর্শ উদাহরণ বলেও চিহ্নিত করেন প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে মোদির দাবি, তাঁর ১২ বছরের প্রধানমন্ত্রিত্বে দেশের ৯৯ শতাংশ রেলপথেরই বৈদ্যুতিকরণ হয়েছে। হাইড্রোজেন ট্রেনের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী শুক্রবার জিন্দের একলব্য স্টেডিয়াম থেকে কুরুক্ষেত্র অঞ্চলে নির্মিত এলিভেটেড রেলওয়ে ট্র্যাক জাতির উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। সেই সঙ্গে ১২,৪৭০ কোটি টাকার জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তিনি। ভিওয়ানির ‘পণ্ডিত নেকি রাম শর্মা গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ’ এবং মহেন্দ্রগড়ের কোরিওয়াসে ‘মহর্ষি চ্যবন মেডিক্যাল কলেজ’ এবং ‘রাও তুলারাম হাসপাতাল’ হরিয়ানাবাসীর উদ্দেশে উৎসর্গ করেন। ঘটনাচক্রে, আর মাস সাতেক পরেই হরিয়ানার পড়শি রাজ্য পঞ্জাবে বিধানসভা নির্বাচন। তার আগে মোদি শুক্রবার আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে শিখ ধর্মের ইতিহাস ও গুরুদের অবদান তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নেটমাধ্যমে কুরুক্ষেত্রের ‘শিখ মিউজিয়াম’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছেন।
কী বিশেষত্ব হাইড্রোজেন ট্রেনের?
গত ২২ মে দেশের প্রথম হাইড্রোজেন–চালিত ট্রেনে যাত্রী পরিবহণের অনুমোদন দিয়েছিল ভারতীয় রেল বোর্ড। জানানো হয়েছিল, এটি বিশ্বের দীর্ঘতম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন–চালিত ব্রডগেজ ট্রেন হতে চলেছে। হয়েছিল ট্রায়াল রানও। এ বার যাত্রী নিয়ে ট্র্যাকে ছুটবে রেল। হাইড্রোজেনকে বিশ্বের অন্যতম ‘পরিচ্ছন্ন জ্বালানি’ হিসেবে ধরা হয়। তাই ইকো-ফ্রেন্ডলি পরিবহণের দুনিয়ায় নতুন দিশা খুলে যেতে চলেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞদের একাংশ। হাইড্রোজেন থেকে তৈরি হয় বিদ্যুৎ। তা দিয়েই ছুটবে এই ট্রেন। এই প্রক্রিয়ায় কোনও ধোঁয়া বা ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হয় না। বেরয় শুধু জলীয় বাষ্প। কার্বন নিঃসরণ প্রায় শূন্য বললেই চলে। এই কারণেই বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে ফসিল ফুয়েলের জায়গায় ধীরে ধীরে জায়গা নিচ্ছে হাইড্রোজেন জ্বালানি। জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, জাপান ও চিনের মতো দেশে ট্রেন-বাস চলছে হাইড্রোজেনে। এ বার এই তালিকায় যুক্ত হতে চলেছে ভারতের নাম। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হয়েছে এই হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন। রেল বোর্ডের তরফে এই প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে ‘Hydrogen for Heritage’।
হাইড্রোজেন ট্রেনে নীল রঙের নকশা
ভারতের প্রথম হাইড্রোজেন ট্রেনের নীল রঙটি শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, এর পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। বিশ্বের প্রথম হাইড্রোজেন যাত্রীবাহী ট্রেনটি (যা ২০১৮ সাল থেকে জার্মানিতে চলছে) উজ্জ্বল নীল রঙের। কানাডা, জাপান এবং চীনে চলাচলকারী হাইড্রোজেন ট্রেনগুলোও নীল রঙের। আসলে, হাইড্রোজেন ট্রেন জলের (H₂O) সঙ্গে সংযুক্ত থাকে। সাধারণ ট্রেন ডিজেল বা বিদ্যুতে চলে, কিন্তু হাইড্রোজেন ট্রেন সম্পূর্ণ ভিন্ন উপায়ে কাজ করে। এর জন্য ট্রেনের বিশেষ ট্যাঙ্কে হাইড্রোজেন গ্যাস ভরা হয়। ফুয়েল সেলে হাইড্রোজেন + অক্সিজেন বিদ্যুৎ উৎপন্ন করে এবং শুধুমাত্র জলীয় বাষ্প নির্গত হয়। এতে কোনও ধোঁয়া বা দূষণ হয় না, এবং একে সবুজ বা পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তি বলা হয়। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলে যখন হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন মিলিত হয়, তখন শুধু জল (H₂O) উৎপন্ন হয়। নীল রঙকে জল, আকাশ এবং পরিচ্ছন্নতার প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাপানের হাইবারি ট্রেনটিও নীল রঙের এবং এতে জলের নকশা রয়েছে। জার্মানির হাইড্রোজেন ট্রেন, কোরাডিয়া আইলিন্ট, সেটিও উজ্জ্বল নীল রঙের। ফলস্বরূপ, ভারতের হাইড্রোজেন ট্রেনটিও নীল রঙের হবে।
কোন কোন রুটে চলবে?
হরিয়ানার জিন্দ (Jind) থেকে সোনিপত (Sonipat) পর্যন্ত ৮৯ কিলোমিটার রুটে চলবে হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন। পথে পান্ডু পিন্দারা জংশন, ললিত খেরা হল্ট, ভামভেওয়া, ইসাপুর খেরি হল্ট, বুটানা হল্ট, খান্দরাই হল্ট, রাবরাহ হল্ট, লাথ হল্ট, মোহানা এবং বারওয়াসনি হল্ট-সহ একাধিক স্টেশনে থামবে। ভারতীয় রেলওয়ে জানিয়েছে, এই রুটে সফল যাত্রার পরে কালকা-শিমলা রুটেও চালু হতে পারে হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন।
কত হবে ট্রেনের গতি?
ভারতীয় রেল জানিয়েছে, ২৪০০ কিলোওয়াটের ইঞ্জিন নিয়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৭৫ কিমি বেগে ছুটতে পারবে এই ট্রেন। সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার। জিন্দে হাইড্রোজেল রিফুয়েলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি ভরা হবে। তবে শুধু গতি নয়, ট্রেনের ডিজ়াইন ও পরিষেবাতেও রয়েছে চমক। থাকছে দু’টি হাইড্রোজেন ড্রাইভিং পাওয়ার কার এবং আটটি যাত্রিবাহী কোচ। ২,৬০০ জন যাত্রী নিয়ে মোট ১০টি কোচ ছুটবে। প্রতিটি পাওয়ার কারে থাকছে হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল, লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারি এবং হাইড্রোজেন সংরক্ষণের বিশেষ সিলিন্ডার। পাওয়ার কারগুলি ১,২০০ কিলোওয়াট (প্রায় ১,৬০০ হর্সপাওয়ার) শক্তি উৎপাদনে সক্ষম।
