Tag: India Hypersonic Missile

  • BrahMos-II Hypersonic Missile: ছোট হাইপারসনিক ব্রহ্মস বানাতে হাত মেলাল ভারত-রাশিয়া, কাঁপছে শত্রুশিবির

    BrahMos-II Hypersonic Missile: ছোট হাইপারসনিক ব্রহ্মস বানাতে হাত মেলাল ভারত-রাশিয়া, কাঁপছে শত্রুশিবির

    সুশান্ত দাস

    ভারত ও রাশিয়ার দীর্ঘদিনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অন্যতম সফল প্রকল্প ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র এবার আরও আধুনিক রূপ পেতে চলেছে। দুই দেশ যৌথভাবে ব্রহ্মসের ছোট আকারের হাইপারসনিক সংস্করণ (BrahMos-II) তৈরির কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভারতে নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ। এই নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে আরও দ্রুত, দূরপাল্লার এবং বহুমাত্রিক আঘাত হানার সক্ষমতা দেবে বলে মনে করা হচ্ছে। ব্রহ্মসের প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আলিপভ বলেন, “ব্রহ্মস ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার এক প্রতীকী উদাহরণ। বর্তমানে এর ছোট এবং হাইপারসনিক সংস্করণ তৈরির কাজ চলছে, যা ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীর মাল্টি-ডোমেন স্ট্রাইক ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।”

    কী এই ব্রহ্মস?

    ব্রহ্মস হল ভারত ও রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি সুপারসনিক ক্রুজ মিসাইল। ব্রহ্মপুত্র এবং মস্কভা নদীর নামের সংমিশ্রণ থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘ব্রহ্মস’। বর্তমানে এটি বিশ্বের দ্রুততম কার্যকর সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রগুলির অন্যতম। ব্রহ্মস অ্যারোস্পেসের তথ্য অনুযায়ী, এই ক্ষেপণাস্ত্র স্থল, সমুদ্র, আকাশ এবং সাবমেরিন— সব ধরনের প্ল্যাটফর্ম থেকেই উৎক্ষেপণ করা যায়। ভারতীয় সেনা, নৌবাহিনী এবং বায়ুসেনা— তিন বাহিনীর কাছেই এটি ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতীয় বায়ুসেনার সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান থেকে ব্রহ্মসের বিমান-উৎক্ষেপণযোগ্য সংস্করণ সফলভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। পাশাপাশি যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিন থেকেও এর বিভিন্ন সংস্করণ ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ঘণ্টায় প্রায় ম্যাক ৩, অর্থাৎ শব্দের গতির তিনগুণ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে।

    অপারেশন ‘সিঁদুর’-এ ব্রহ্মসের ব্যবহার

    ডেনিস আলিপভ স্মরণ করিয়ে দেন, গত বছর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সংঘটিত স্বল্পস্থায়ী সামরিক সংঘর্ষ ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ ব্রহ্মস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তাঁর দাবি, ওই সংঘর্ষে ভারত ১৫ থেকে ২০টি ব্রহ্মস ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে এবং পাকিস্তানের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে ক্ষয়ক্ষতি ঘটায়। যদিও এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য সব তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি, তবুও ব্রহ্মসের কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

    হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র কী?

    সাধারণভাবে ম্যাক ৫ বা তার বেশি গতিতে উড়তে সক্ষম ক্ষেপণাস্ত্রকে হাইপারসনিক বলা হয়। ব্রহ্মস অ্যারোস্পেসের ভবিষ্যৎ প্রকল্প ‘ব্রহ্মস ২’-কে একটি হাইপারসনিক অস্ত্র হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে ব্যবহার করা হবে অত্যাধুনিক ‘এয়ার-ব্রিদিং স্ক্র্যামজেট’ ইঞ্জিন প্রযুক্তি।

    এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রের মূল সুবিধা হল—

    • ● লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছতে অত্যন্ত কম সময় লাগে।
    • ● প্রতিপক্ষের প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ কমে যায়।
    • ● আধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে আটকানো অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে।
    • ● উচ্চ গতি, নির্ভুলতা এবং বেঁচে থাকার ক্ষমতার সমন্বয় তৈরি হয়।

    সামরিক কৌশলবিদদের মতে, ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে হাইপারসনিক অস্ত্রই বড় শক্তিগুলির প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হতে চলেছে।

    কেন গুরুত্বপূর্ণ যৌথ উন্নয়নের এই সিদ্ধান্ত?

    সম্প্রতি ভারত ব্রহ্মস-২ প্রকল্পকে কিছুটা পিছিয়ে দিয়ে নিজস্ব হাইপারসনিক প্রযুক্তি উন্নয়নের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিরক্ষা মহলে আলোচনা চলছিল। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, একটি হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মার্কিন ডলার বা তারও বেশি হতে পারে। এত ব্যয়বহুল অস্ত্র সাধারণ লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সবসময় অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক নয়। এছাড়া স্ক্র্যামজেট ইঞ্জিন প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কিছু সীমাবদ্ধতার কথাও উঠে এসেছিল। ফলে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ নীতির আওতায় দেশীয় প্রযুক্তি বিকাশে জোর দিচ্ছে নয়াদিল্লি। তবে নতুন করে যৌথ উন্নয়নের ঘোষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দুই দেশই প্রযুক্তিগত সহযোগিতার নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে।

    ছোট ব্রহ্মস কেন বড় পরিবর্তন আনতে পারে?

    এমনিতে, ব্রহ্মসের ছোট সংস্করণ নিয়ে আগে থেকেই কাজ করছে ভারত। এই আরও ছোট, হালকা, পরবর্তী প্রজন্মের ‘ব্রহ্মস-এনজি’কে (BrahMos-NG) বুদ্ধিমান এবং স্টেলথ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ক্ষেপণাস্ত্র করে তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। যা নিয়ে ইতিমধ্যেই ভারতে কাজ অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছে। মূলত, এয়ার লঞ্চড ভার্সান বা যুদ্ধবিমান থেকে নিক্ষেপযোগ্য করার লক্ষ্যেই এই বিশেষ সংস্করণ তৈরি করার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে ব্রহ্মস সুখোই সু-৩০ যুদ্ধবিমান থেইকে নিক্ষেপ করা যায়। কারণ, এত ভারী ক্ষেপণাস্ত্র বহন করার ক্ষমতা শুধুমাত্র সুখোইয়ের মতো ভারী যুদ্ধবিমানের রয়েছে। কিন্তু ভারত চাইছে, কেবলমাত্র সু-৩০ নয়, ব্রহ্মস যাতে বাকি যুদ্ধবিমান যেমন তেজস, রাফাল সর্বত্র প্ল্যাটফর্মেই বহনযোগ্য হয়। সেই জন্য হালকা, ছোট সংস্করণ তৈরি করা হচ্ছে।

    এই ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য সুবিধাগুলি হল—

    • ● একাধিক ধরনের যুদ্ধবিমানে সহজে বহন করা যাবে।
    • ● একই বিমানে আগের তুলনায় বেশি সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা সম্ভব হবে।
    • ● দ্রুত মোতায়েন করা যাবে।
    • ● রেডারে ধরা পড়ার সম্ভাবনা কমবে।
    • ● সামরিক অভিযানে আরও বেশি নমনীয়তা তৈরি হবে।

    প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ছোট আকারের কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর অস্ত্রই ভবিষ্যতের চাহিদা।

    ১৯৯৮ থেকে আজ: ব্রহ্মসের যাত্রাপথ

    ১৯৯৮ সালে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তির ভিত্তিতে ব্রহ্মস অ্যারোস্পেস প্রতিষ্ঠিত হয়। গত আড়াই দশকে প্রকল্পটি শুধুমাত্র একটি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বরং এটি দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে ঐতিহ্যগত ‘ক্রেতা-বিক্রেতা’ মডেল থেকে প্রযুক্তি ভাগাভাগি, যৌথ গবেষণা এবং যৌথ উৎপাদনের স্তরে উন্নীত করেছে। আলিপভ বলেন, ব্রহ্মস প্রকল্পই পরবর্তীকালে সুখোই-৩০ এমকেআই যুদ্ধবিমান এবং টি-৯০ ট্যাঙ্কের ভারতে লাইসেন্সপ্রাপ্ত উৎপাদনের পথ প্রশস্ত করেছিল। তিনি একে-২০৩ রাইফেলের যৌথ উৎপাদনকেও এই সহযোগিতার সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।

    সু-৫৭ যুদ্ধবিমান ও এস-৪০০ উৎপাদনের ইঙ্গিত

    রুশ রাষ্ট্রদূত জানান, ভবিষ্যতে রাশিয়ার পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান সু-৫৭-ভিত্তিক প্রকল্প এবং এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উৎপাদন ক্ষেত্রেও ভারত-রাশিয়া সহযোগিতা বাড়তে পারে। এমন উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও গভীর হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

    রাশিয়াও কিনতে চায় ব্রহ্মস

    এক সময় রাশিয়া ছিল ব্রহ্মস প্রকল্পের প্রযুক্তিগত অংশীদার। এবার সেই রাশিয়াই নিজ সেনাবাহিনীতে ব্রহ্মস অন্তর্ভুক্ত করার আগ্রহ দেখিয়েছে। ব্রহ্মস অ্যারোস্পেসের চেয়ারম্যান ও ম্যানেজিং ডিরেক্টর জয়তীর্থ জোশী জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা চলছে এবং ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনাও বিবেচনা করা হচ্ছে। যৌথ ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলেকজান্ডার ম্যাকসিচেভ জানান, রুশ নৌবাহিনী এবং স্থলবাহিনীর জন্য ব্রহ্মস সরবরাহ করতে কোম্পানি প্রস্তুত।

    বিশ্ববাজারে বাড়ছে ব্রহ্মসের চাহিদা

    শুধু ভারত নয়, আন্তর্জাতিক বাজারেও দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ব্রহ্মস। ২০২২ সালে ফিলিপাইনস ৩৭৫ মিলিয়ন ডলারের চুক্তিতে ব্রহ্মস কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম ব্যাচ সরবরাহ করা হয়। ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে দ্বিতীয় ব্যাচ পৌঁছে যায়। সম্প্রতি ভিয়েতনামের সঙ্গে ৬২০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তির কথাও নিশ্চিত করেছে ভারত। এমনকি, ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য চুক্তি নিয়ে উন্নত পর্যায়ের আলোচনা চলছে। ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক চাহিদার ফলে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ব্রহ্মস অ্যারোস্পেসের আয় প্রায় ৪৮.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

    ভারতের প্রতিরক্ষা কূটনীতির নতুন মুখ

    বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রহ্মস এখন আর শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়। এটি ভারতের প্রতিরক্ষা রফতানি, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং কৌশলগত কূটনীতির অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ছোট আকারের ব্রহ্মস-এনজি এবং ভবিষ্যতের হাইপারসনিক ব্রহ্মস-২ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ভারত শুধু নিজের সামরিক শক্তিই বাড়াবে না, বরং বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারেও আরও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান অর্জন করতে পারবে। ভারত-রাশিয়া প্রতিরক্ষা সহযোগিতার নতুন অধ্যায় হিসেবে এই প্রকল্পগুলির দিকে এখন নজর রাখছে আন্তর্জাতিক মহল।

  • LR-AShM: হাইপারসনিক যুদ্ধের জন্য তৈরি! প্রজাতন্ত্র দিবসে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রকাশ্যে এনে এই বার্তাই দিল ভারত

    LR-AShM: হাইপারসনিক যুদ্ধের জন্য তৈরি! প্রজাতন্ত্র দিবসে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র প্রকাশ্যে এনে এই বার্তাই দিল ভারত

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ৭৭তম প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে (Republic Day Parade 2026) প্রথম বারের মতো প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হল ভারতের প্রথম লং-রেঞ্জ অ্যান্টি-শিপ মিসাইল (LR-AShM)। একটি মোবাইল লঞ্চারে মোতায়েন করা এই অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা প্রদর্শন করা হয়। একটি ৬x৬ ট্রাকের ওপর নির্মিত ওই মোবাইল লঞ্চারকে কার্তব্য পথ দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।

    প্রজাতন্ত্র দিবসের শো-স্টপার…

    প্রজাতন্ত্র দিবসের কুচকাওয়াজে শো-স্টপার বা অন্যতম আকর্ষণ ছিল এই দূরপাল্লার হাইপারসনিক জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র। কারণ, এই প্রথম সরকারি স্তরে এই ক্ষেপণাস্ত্রের উপস্থিতিকে স্বীকৃতি দেওয়া হল। ভারতীয় নৌবাহিনীর জন্য এই ক্ষেপণাস্ত্রটি তৈরি করেছে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা গবেষণা সংস্থা ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (DRDO)। এটি একটি দূরপাল্লার হাইপারসনিক গ্লাইড অস্ত্র, যা মূলত সমুদ্রভিত্তিক আঘাত হানার (maritime strike) জন্য ডিজাইন করা হয়েছে। এই প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রথমবার এই কর্মসূচির সরকারি স্তরে স্বীকৃতি মিলল। এতদিন প্রকল্পটি অনেকটাই গোপনীয়তার মধ্যে রাখা হয়েছিল। ভারতের হাইপারসনিক অস্ত্র (LR-AShM) কর্মসূচিতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক তৈরি করেছে এই ক্ষেপণাস্ত্র।

    পাল্লা প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার

    প্রতিরক্ষা আধিকারিকরা জানিয়েছেন, এই ব্যবস্থা সমুদ্রের গভীরে শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ ও নৌসম্পদে আঘাত হানতে সক্ষম, যা বিতর্কিত সামুদ্রিক অঞ্চলে শত্রু নৌবহরের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করবে। ফলে, এই ক্ষেপণাস্ত্র ভারতের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সমুদ্রসীমা নিয়ন্ত্রণ (sea-denial) সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করবে। বর্তমান সংস্করণের পাল্লা প্রায় ১৫০০ কিলোমিটার বলে মনে করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে উন্নত সংস্করণে এই পাল্লা আরও বাড়ানো হতে পারে। এই ক্ষেপণাস্ত্র হাইপারসনিক গতিতে, অর্থাৎ ম্যাক ৫-এর (শব্দের গতির ৫ গুণ) বেশি গতিতে উড়তে সক্ষম। ফলে শত্রুপক্ষের নৌবাহিনীর প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।

    ‘বুস্ট-গ্লাইড’ প্রযুক্তি

    প্রযুক্তিগত দিক থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র (LR-AShM) একটি দুই ধাপের সলিড প্রপালশন রকেট মোটর ব্যবস্থায় চালিত। প্রথম ধাপ ক্ষেপণাস্ত্রটিকে দ্রুত হাইপারসনিক গতিতে পৌঁছে দেয় এবং মাঝপথে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর দ্বিতীয় ধাপ সক্রিয় হয়ে গতিবেগ বজায় রাখে ও আরও বাড়ায়। দ্বিতীয় ধাপের জ্বালানি শেষ হওয়ার পর ক্ষেপণাস্ত্রটি একটি আনপাওয়ার্ড গ্লাইড পর্যায়ে প্রবেশ করে। এই পর্যায়ে এটি জটিল বায়ুমণ্ডলীয় কৌশল প্রদর্শন করতে করতে নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুর দিকে এগিয়ে যায়। প্রচলিত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এই গ্লাইড যানটি উড়ানের মাঝপথে দিক পরিবর্তন করতে পারে, যার ফলে একে প্রতিহত করা অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে। এই গ্লাইড পর্যায়ই ক্ষেপণাস্ত্রটির অনিশ্চিত গতিপথ নিশ্চিত করে এবং শত্রু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে আটকানোর সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত আধিকারিকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রটি বিভিন্ন ধরনের অপারেশনাল পরিস্থিতিতে কাজ করার মতো করে পরিকল্পিত হয়েছে। এটি স্থির ও চলমান—উভয় ধরনের লক্ষ্যবস্তুকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধ্বংস করতে সক্ষম। কুচকাওয়াজে (Republic Day Parade 2026) যে লঞ্চারটি প্রদর্শিত হয়, তা ছিল সড়কপথে চলাচলযোগ্য ক্যানিস্টারযুক্ত ব্যবস্থা। এতে বোঝা যাচ্ছে, এই ক্ষেপণাস্ত্র মূলত উপকূল বা স্থল থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র। তবে, রণতরী থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য সংস্করণও তৈরি করা হচ্ছে বলে প্রতিরক্ষা সূত্রে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রের (LR-AShM) অন্তর্ভুক্তি ভারতের সামুদ্রিক যুদ্ধক্ষমতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতের নৌযুদ্ধের ক্ষেত্রে দেশকে প্রযুক্তিগতভাবে আরও শক্ত অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করবে।

    প্রথম সম্পূর্ণ দেশীয় হাইপারসনিক অস্ত্র ব্যবস্থা

    লং-রেঞ্জ অ্যান্টি-শিপ মিসাইল (LR-AShM)-এর বিশেষত্ব শুধু এর গতিতে নয়, বরং এতে ব্যবহৃত দেশীয় প্রযুক্তিতেও। ক্ষেপণাস্ত্রটির অ্যাভিওনিক্স ও উন্নত সেন্সর প্যাকেজ সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি। ফলে এটি বিশ্বের প্রথম দিকের এমন হাইপারসনিক গ্লাইড অস্ত্রগুলোর অন্যতম, যেখানে ন্যাভিগেশন, গাইডেন্স ও টার্মিনাল নির্ভুলতার জন্য পুরোপুরি দেশীয় প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করা হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ওয়ারহেড বহনে সক্ষম এই ক্ষেপণাস্ত্রটি কোয়াজি-ব্যালিস্টিক পথে উড়ে হাইপারসনিক গতিতে চলাচল করে। এটি প্রাথমিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ ম্যাক ১০ গতিবেগ অর্জন করতে পারে এবং ধারাবাহিক বায়ুমণ্ডলীয় ‘স্কিপ’ বা লাফের মাধ্যমে গড়ে ম্যাক ৫ গতিতে অগ্রসর হয়। এই বিশেষ ফ্লাইট প্রোফাইলের ফলে ক্ষেপণাস্ত্রটি একই সঙ্গে উচ্চ গতি, অসাধারণ কৌশলগত চলাচল ক্ষমতা ও গোপনীয়তা বজায় রাখতে পারে, যার ফলে প্রচলিত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে এই ক্ষেপণাস্ত্রকে রোখা অত্যন্ত কঠিন করে তোলে।

    নজর এড়িয়ে আঘাত হানার ক্ষমতা

    দূরপাল্লার হাইপারসনিক জাহাজ-বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র (LR-AShM)-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল এর দীর্ঘ সময় ধরে রেডারের নজর এড়িয়ে চলার ক্ষমতা। কম উচ্চতায় হাইপারসনিক গতিতে উড়ে যাওয়ায় এটি শত্রুপক্ষের স্থলভিত্তিক ও জাহাজভিত্তিক রেডার ব্যবস্থার চোখে ধরা পড়ে মূলত শেষ ধাপে। দেশীয়ভাবে তৈরি উন্নত সেন্সর ব্যবস্থার সাহায্যে ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রান্তিক পর্যায়ে চলমান লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে পারে। এই সক্ষমতা দ্রুত পরিবর্তনশীল যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এর বিধ্বংসী ক্ষমতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। উচ্চ গতি, নিম্ন উচ্চতায় উড়ান এবং চরম কৌশলগত গতিবিধির সমন্বয়ে ক্ষেপণাস্ত্রটিকে একটি অত্যন্ত মজবুত ও কার্যকর অস্ত্রব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যা ঘন প্রতিরক্ষা বলয় ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম।

    এলিট ক্লাবে ভারত…

    এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চিনের মতো হাইপারসনিক অ্যান্টি-শিপ অস্ত্র (LR-AShM) সক্ষমতাসম্পন্ন দেশের তালিকায় ভারতের নাম যুক্ত হল। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে, বিশেষ করে ভারত মহাসাগরে সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও নৌ-প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় এই অস্ত্রের প্রকাশ্য প্রদর্শন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তবে সরকার এখনও এই ক্ষেপণাস্ত্রের কার্যকরী মোতায়েনের সময়সূচি বা নির্দিষ্ট ব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।

LinkedIn
Share