মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে রেল যোগাযোগের নতুন ইতিহাস তৈরি করতে চলেছে ভারত। সব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে লাদাখে (Ladakh Rail) তৈরি হবে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা হবে প্রায় ১৭,২৪৪ ফুট বা ৫,২৫৬ মিটার। এর ফলে চিনের তিব্বতে অবস্থিত বিশ্বের বর্তমান সর্বোচ্চ রেলস্টেশন (World’s Highest Railway Station) তাংগুলার রেকর্ড ভেঙে যাবে। লাদাখ পর্যন্ত রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক মানচিত্রে আরও একবার জায়গা করে নেবে ভারতীয় রেল। কেন্দ্রীয় আধিকারিক সূত্রে খবর, বিলাসপুর-মানালি-লে রেলপথ প্রকল্পকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক।
আনুমানিক খরচ প্রায় ১ লক্ষ ৩১ হাজার কোটি টাকা
প্রস্তাবিত এই রেলপথ (Ladakh Rail) হিমাচল প্রদেশের বিলাসপুর থেকে শুরু হয়ে মানালি, সিসু, দারচা, কেলং, সারচু, পাং, রুমসে, উপশি এবং খারু হয়ে পৌঁছবে লেহতে। মোট ৪৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। রেল মন্ত্রক সূত্রে খবর, প্রকল্পের বিস্তারিত সম্ভাব্যতা ও নির্মাণ সংক্রান্ত রিপোর্ট (ডিপিআর) তৈরি হয়ে গিয়েছে। সমীক্ষার কাজও শেষ। প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী, এই প্রকল্পে খরচ হতে পারে প্রায় ১ লক্ষ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন!
এই প্রকল্পের অন্যতম আকর্ষণ টাংলাং লা গিরিপথের নীচে প্রস্তাবিত রেলস্টেশন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫,২৫৬ মিটার উচ্চতায় তৈরি হলে এটিই হবে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলস্টেশন (World’s Highest Railway Station)। বর্তমানে এই রেকর্ড রয়েছে চিনের তিব্বতে অবস্থিত তাংগুলা রেলস্টেশনের দখলে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা প্রায় ৫,০৬৮ মিটার। অর্থাৎ, চিনের সেই রেকর্ডের থেকেও প্রায় ১৮৮ মিটার বেশি উচ্চতায় রেলস্টেশন তৈরি করতে চলেছে ভারত।
রেলপথের অর্ধেকেরও বেশি অংশ পাহাড়ের ভিতরে
ভারতের অন্যতম উচ্চতম মোটরযান চলাচলের উপযোগী গিরিপথ টাংলাং লা লে-মানালি জাতীয় সড়কের উপর অবস্থিত। তবে সেখানে রেলপথ তৈরি করা মোটেই সহজ কাজ নয়। বরং ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া এবং পাহাড়ের গঠন নির্মাণকাজকে অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং করে তুলবে। প্রস্তাবিত রেলপথের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার অংশ সুড়ঙ্গের ভিতর দিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ, মোট রেলপথের অর্ধেকেরও বেশি অংশ থাকবে পাহাড়ের ভিতরে।
ভারতীয় রেলের অন্যতম কঠিন প্রকল্প
হিমালয়ের কঠিন ভূপ্রকৃতি, পাহাড়ের ভিতরের শিলাস্তরের অনিশ্চয়তা, খাড়া ঢাল এবং প্রচণ্ড ঠান্ডার সঙ্গে মোকাবিলা করেই এগোতে হবে নির্মাণকাজ। ফলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে এটি ভারতীয় রেলের অন্যতম কঠিন প্রকল্প হতে চলেছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথ
শুধু পর্যটন নয়, জাতীয় নিরাপত্তার দিক থেকেও এই রেলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। লাদাখ ভারতের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী অঞ্চল। বর্তমানে দেশের অন্যান্য অংশ থেকে লেহতে পৌঁছনোর প্রধান মাধ্যম সড়ক ও বিমানপথ। শীতকালে তুষারপাত এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে মানালি-লে সড়কপথে যাতায়াত অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে রেল যোগাযোগ চালু হলে যাত্রী পরিবহণের পাশাপাশি খাদ্যসামগ্রী, নির্মাণের উপকরণ এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়া অনেক সহজ হবে। কমবে পরিবহণের খরচ। উপকৃত হবেন হিমাচল প্রদেশ ও লাদাখের প্রত্যন্ত এলাকার বাসিন্দারা। পর্যটনের প্রসার, স্থানীয় অর্থনীতির উন্নতি এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগও তৈরি হবে।
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে এই রেলপথের ভূমিকা
প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও এই রেলপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রেলপথের মাধ্যমে দ্রুত ও বৃহৎ পরিমাণে সেনা, অস্ত্র, জ্বালানি এবং ভারী সামরিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে লাদাখের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। এমনকী রেলপথের কয়েকটি স্টেশনে সামরিক প্রয়োজনে বিশেষ লুপ লাইন তৈরির সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এখনও এই প্রকল্পের নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি। কবে কাজ শুরু হবে বা কবে শেষ হবে, তা-ও নির্দিষ্ট করে জানানো হয়নি।
রেল যোগাযোগে গত এক দশকে বড় পরিবর্তন
লাদাখের এই প্রস্তাবিত প্রকল্পের পাশাপাশি গত এক দশকে দেশের রেল পরিকাঠামো সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে বলে দাবি কেন্দ্রের। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ৩৪,৪২৮ কিলোমিটার নতুন রেললাইন চালু হয়েছে। তুলনায় ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে নতুন রেললাইন চালু হয়েছিল ৭,৫৯৯ কিলোমিটার। অর্থাৎ, আগের পাঁচ বছরের তুলনায় নতুন রেললাইন সম্প্রসারণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জম্মু-কাশ্মীরের উধমপুর-শ্রীনগর-বারামুলা রেলপথ এবং মিজোরামের বাইরাবি-সাইরাং রেলপথের মতো প্রকল্পের মাধ্যমে দুর্গম এলাকাও দেশের রেল মানচিত্রে যুক্ত হয়েছে। একসময় ভৌগোলিক প্রতিকূলতার কারণে যে সমস্ত অঞ্চলে রেল যোগাযোগ পৌঁছনো কঠিন ছিল, সেখানে এখন ট্রেন চলাচলের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
রেললাইনের সংস্কার ও পুনর্নবীকরণ
২০১৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রায় ৫৪,৬০০ কিলোমিটার রেললাইনের সংস্কার ও পুনর্নবীকরণ করা হয়েছে। পাশাপাশি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশের ৮৫ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি রেলপথে ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার বা তার বেশি গতিতে ট্রেন চালানোর পরিকাঠামো তৈরি হয়েছে। ২০১৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ৩১,৪৪৫ কিলোমিটার। ফলে ট্রেন চলাচলের গতি ও দক্ষতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে।
বন্দে ভারত, দেশে প্রথম সেমি হাইস্পিড ট্রেন
২০১৯ সালে দেশে প্রথম সেমি হাইস্পিড ট্রেন বন্দে ভারত এক্সপ্রেস চালু করে কেন্দ্র। দেশীয় প্রযুক্তি ও উৎপাদনের উপর জোর দিয়ে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কর্মসূচির আওতায় তৈরি এই ট্রেন ভারতীয় রেলের আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়। ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে বন্দে ভারত পরিষেবা। যাত্রীদের জন্য দ্রুত ও উন্নতমানের রেল পরিষেবার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
উত্তর-পূর্ব রেল মানচিত্রে নতুন সংযোজন
উত্তর-পূর্ব ভারতেও রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। মিজোরামের সাইরাং পর্যন্ত রেল যোগাযোগ চালু হওয়া তার অন্যতম উদাহরণ। অন্যদিকে, সিকিমও শীঘ্রই দেশের রেল মানচিত্রে যুক্ত হতে চলেছে সেভক-রংপো রেলপথের মাধ্যমে। কাশ্মীর উপত্যকাকেও দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে রেলপথে যুক্ত করা হয়েছে। ভারত ও ভুটানের মধ্যে রেল যোগাযোগ স্থাপনের পরিকল্পনাও বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
রেলপথের প্রায় ৯৯.৬ শতাংশ বিদ্যুতায়ন
রেল পরিকাঠামোর আধুনিকীকরণে আরও একটি বড় পদক্ষেপ হল রেলপথের বিদ্যুতায়ন। বর্তমানে দেশের ব্রডগেজ রেল নেটওয়ার্কের প্রায় ৯৯.৬ শতাংশ বিদ্যুতায়িত। ২০১৪ সালের আগে এই হার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। এর ফলে ডিজেলের উপর নির্ভরতা কমেছে। বিদ্যুৎচালিত ট্রেন পরিচালনায় খরচও তুলনামূলকভাবে কম। কেন্দ্রের দাবি, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রেলের বিদ্যুতায়নের ফলে প্রায় ১৮০ কোটি গ্যালন ডিজেল সাশ্রয় হয়েছে। ডিজেলচালিত ট্রেনের তুলনায় বিদ্যুৎচালিত ট্রেন পরিচালনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম খরচ হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে বছরে প্রায় ৬,০০০ কোটি টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।
পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর
পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডর (ডিএফসি)। পশ্চিম ডেডিকেটেড ফ্রেট করিডরের শেষ তিনটি অংশ গত সেপ্টেম্বরে দেশকে উৎসর্গ করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ২০০৬ সালে তৎকালীন মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকার এই প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিল। জমি অধিগ্রহণ, চুক্তি সংক্রান্ত জটিলতা এবং নির্মাণের নানা সমস্যায় দীর্ঘদিন আটকে ছিল কাজ। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পন্ন হয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য, রেলপথের বিদ্যুতায়ন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি বিদেশ থেকে তেল আমদানির উপর নির্ভরতা কমাতেও সাহায্য করেছে।
চেনাব সেতুর পর লাদাখে নতুন রেকর্ডের অপেক্ষা
ইতিমধ্যেই বিশ্বের সর্বোচ্চ রেল আর্চ ব্রিজের মালিক ভারত। জম্মু-কাশ্মীরে চেনাব নদীর উপর নির্মিত চেনাব রেল সেতু নদীর জলস্তর থেকে প্রায় ১,১৭৮ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। উচ্চতার নিরিখে প্যারিসের আইফেল টাওয়ারের থেকেও প্রায় ৩৫ মিটার উঁচু এই সেতু। গত বছর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই সেতুর উদ্বোধন করেন। এবার বিলাসপুর-মানালি-লে রেলপথ (Ladakh Rail) বাস্তবায়িত হলে বিশ্বের সর্বোচ্চ রেলস্টেশনের (World’s Highest Railway Station) রেকর্ডও ভারতের দখলে আসবে। তবে তার আগে রয়েছে কঠিন নির্মাণ চ্যালেঞ্জ, বিপুল আর্থিক বিনিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদনের প্রশ্ন। সব বাধা অতিক্রম করে প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারতীয় রেলের ইতিহাসে তা নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।

