Tag: Iran US relations

  • Trump Iran War: ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা! ইরান যুদ্ধ থামাতে সেনেটে ঐতিহাসিক ভোট, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বাড়ছে রিপাবলিকান অস্বস্তি

    Trump Iran War: ট্রাম্পকে বড় ধাক্কা! ইরান যুদ্ধ থামাতে সেনেটে ঐতিহাসিক ভোট, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বাড়ছে রিপাবলিকান অস্বস্তি

    সুশান্ত দাস

    ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অন্যতম বড় রাজনৈতিক ধাক্কা দিল মার্কিন সেনেট। ৫০-৪৮ ভোটে সেনেট একটি ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ (War Powers Resolution) অনুমোদন করেছে, যার লক্ষ্য কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান চালানো বন্ধ করা। ঘটনাটিকে ঐতিহাসিক বলে মনে করছেন মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, ১৯৭৩ সালে ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট কার্যকর হওয়ার পর এই প্রথম মার্কিন কংগ্রেসের নিম্ন কক্ষ— হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস (House of Representatives) বা প্রতিনিধি পরিষদ এবং উচ্চকক্ষ সেনেট— কোনও প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সেনা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব পাস করল। যদিও এই প্রস্তাব অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করতে পারবে না, তবুও এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এক গুরুতর রাজনৈতিক সতর্কবার্তা বলে মনে করা হচ্ছে।

    কেন এত গুরুত্বপূর্ণ এই ভোট?

    মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী যুদ্ধ ঘোষণা করার ক্ষমতা কংগ্রেসের হাতে। কিন্তু গত কয়েক দশকে একাধিক প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন সামরিক অভিযান চালিয়েছেন সরাসরি কংগ্রেসের পূর্ণ অনুমোদন ছাড়াই। ইরানের বিরুদ্ধে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের ক্ষেত্রেও একই অভিযোগ উঠেছে। বিরোধীদের দাবি, ট্রাম্প কংগ্রেসকে পাশ কাটিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছেন। সেই কারণেই ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান সেনেটরও এবার ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন। এই ভোট কেবল ইরান যুদ্ধ নিয়ে নয়; এটি মূলত প্রেসিডেন্ট বনাম কংগ্রেস— কার হাতে যুদ্ধ সংক্রান্ত চূড়ান্ত ক্ষমতা থাকবে, সেই সাংবিধানিক প্রশ্নকেও সামনে এনে দিয়েছে।

    ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া: ‘অর্থহীন ও ভুল সময়ের সিদ্ধান্ত’

    সেনেটে ভোটাভুটির পর ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশাল-এ (Truth Social) তিনি এই প্রস্তাবকে “ভুল সময়ের এবং অর্থহীন” বলে মন্তব্য করেন। তিনি আরও দাবি করেন, এই ধরনের পদক্ষেপ ইরানকে “সাহায্য ও মানসিক সমর্থন” জোগাচ্ছে এবং রিপাবলিকান দলের কয়েকজন সদস্য তাঁর কাজকে আরও কঠিন করে তুলছেন। ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়া থেকেই স্পষ্ট, তিনি এই ভোটকে কেবল প্রতীকী ঘটনা হিসেবে দেখছেন না; বরং এটিকে নিজের রাজনৈতিক কর্তৃত্বের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচনা করছেন।

    রিপাবলিকান শিবিরেই ফাটল

    সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, চারজন রিপাবলিকান সেনেটর ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। তাঁরা হলেন— লিসা মার্কাওস্কি, সুজান কলিন্স, র‌্যান্ড পল, বিল ক্যাসিডি। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাট সেনেটর জন ফেটারম্যান John Fetterman ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করে প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিভাজন দেখিয়ে দিচ্ছে যে ইরান যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকান দলের অভ্যন্তরে ক্রমশ অসন্তোষ বাড়ছে।

    যুদ্ধের খরচ নিয়ে উদ্বেগ

    ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে আরেকটি বড় সমস্যা হল যুদ্ধের বিপুল অর্থনৈতিক ব্যয়। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা বাজেটের আবেদন জানিয়েছেন। পেন্টাগনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই খরচ হয়েছে ১১.৩ বিলিয়ন ডলার।

    এর ফলে রিপাবলিকানদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে—

    • ● যুদ্ধ কতদিন চলবে?
    • ● শেষ লক্ষ্য কী?
    • ● মার্কিন করদাতাদের অর্থ কতটা ব্যয় হবে?
    • ● আর এই সংঘর্ষ কি আরেকটি “অনন্ত যুদ্ধ”-এ পরিণত হতে চলেছে?

    ট্রাম্পের নতুন ইরান চুক্তি নিয়েও ক্ষোভ

    যুদ্ধের পাশাপাশি ট্রাম্পের প্রস্তাবিত নতুন ইরান চুক্তিও বিতর্কের কেন্দ্রে।খবরে বলা হয়েছে, চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল নিয়ে আলোচনা চলছে। রিপাবলিকান দলের রক্ষণশীল ও কট্টরপন্থী অংশের মতে, যুদ্ধ করে আবার ইরানকে অর্থ সাহায্য দেওয়ার যুক্তি ভোটারদের কাছে ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে।

    ফলে ট্রাম্প এখন দুই দিক থেকেই চাপের মুখে—

    • ● যুদ্ধপন্থীরা চুক্তি নিয়ে অসন্তুষ্ট।
    • ● যুদ্ধবিরোধীরা যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অসন্তুষ্ট।

    মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জন্য কতটা বিপজ্জনক?

    রাজনৈতিকভাবে এটাই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন (Midterm Elections) যত এগিয়ে আসছে, ততই রিপাবলিকান প্রার্থীরা নিজেদের আসন নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছেন। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘস্থায়ী বিদেশি যুদ্ধ প্রায়শই ক্ষমতাসীন দলের জন্য রাজনৈতিক বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।

    ১. স্বাধীন ভোটারদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে

    মার্কিন নির্বাচনে ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ বা নির্দলীয় ভোটারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি তাঁদের মধ্যে এই ধারণা তৈরি হয় যে ট্রাম্প কংগ্রেসকে উপেক্ষা করে দেশকে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছেন, তাহলে বহু সুইং স্টেটে রিপাবলিকান প্রার্থীরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

    ২. ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংঘর্ষ

    ট্রাম্পের রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম ভিত্তি ছিল ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি। তিনি বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে আমেরিকাকে আর বিদেশি যুদ্ধের জালে জড়াবেন না। কিন্তু ইরান সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিরোধীরা সহজেই প্রশ্ন তুলতে পারবে— “যে নেতা অন্তহীন যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনিই কি নতুন যুদ্ধ শুরু করলেন?” এই প্রশ্ন রিপাবলিকান ভোটব্যাঙ্কের একটি অংশকে বিচলিত করতে পারে।

    ৩. রিপাবলিকান ঘাঁটিতেই বিভাজন

    র‌্যান্ড পলের মতো নেতারা প্রকাশ্যে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় দলের অভ্যন্তরীণ বিভাজন সামনে এসেছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই বিভাজন যদি আরও বাড়ে, তাহলে রিপাবলিকানদের নির্বাচনী প্রচারে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে।

    ৪. যুদ্ধের ব্যয় বড় ইস্যু হয়ে উঠতে পারে

    মুদ্রাস্ফীতি, ঋণ এবং বাজেট ঘাটতির মতো অর্থনৈতিক ইস্যুগুলি ইতিমধ্যেই ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তার মধ্যে আরও ৮০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ ব্যয় অনুমোদনের প্রশ্ন উঠলে ডেমোক্র্যাটরা এটিকে বড় নির্বাচনী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

    কংগ্রেস কি সত্যিই ট্রাম্পকে থামাতে পারবে?

    বাস্তবিক অর্থে এখনই নয়। এই প্রস্তাব মূলত রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। প্রেসিডেন্ট চাইলে এটিকে উপেক্ষা করতে পারেন অথবা ভেটো দিতে পারেন।

    তবে কংগ্রেসের হাতে আরও শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে—

    • ● যুদ্ধের অর্থ বরাদ্দ আটকে দেওয়া,
    • ● প্রতিরক্ষা বাজেটে শর্ত আরোপ করা,
    • ● নতুন আইন পাস করার চেষ্টা করা।

    ফলে যুদ্ধ বন্ধ না হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তা স্পষ্ট।

    ট্রাম্পে বাড়ছে অনাস্থা!

    সেনেটের ৫০-৪৮ ভোট শুধু একটি প্রতীকী প্রস্তাব নয়। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান নীতির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের প্রকাশ্য অনাস্থার বার্তা। ১৯৭৩ সালের পর এই প্রথম কংগ্রেসের দুই কক্ষ একসঙ্গে কোনও প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সেনা সরানোর আহ্বান জানাল। তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ থামবে না, কিন্তু রাজনৈতিক অভিঘাত গভীর। রিপাবলিকান শিবিরে ফাটল, যুদ্ধের বাড়তি খরচ, ইরান চুক্তি নিয়ে অসন্তোষ এবং সাংবিধানিক প্রশ্ন— সব মিলিয়ে ট্রাম্প এমন এক বিতর্কের মুখে পড়েছেন যা আগামী মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দলের জন্য বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে। ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন একটাই— ইরান যুদ্ধ কি ট্রাম্পের জন্য নতুন বিদেশনীতি সংকট, নাকি সেটাই ২০২৬ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা হয়ে উঠবে?

  • India: জ্বলছে ইরান, দেশে ফের ‘রাজতন্ত্র’ ফেরার জল্পনা, কেন শাহি-শাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত?

    India: জ্বলছে ইরান, দেশে ফের ‘রাজতন্ত্র’ ফেরার জল্পনা, কেন শাহি-শাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারত?

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: ইরানজুড়ে ঘটে চলা বিক্ষোভ সাম্প্রতিক বছরের যে কোনও আন্দোলনের তুলনায় অনেক বেশি আক্রমণাত্মক, দৃঢ় এবং দীর্ঘস্থায়ী বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা (India)। আগের দফাগুলির বিক্ষোভের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির একটি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এবার ওয়াশিংটন প্রকাশ্যেই এই আন্দোলনকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত স্পষ্ট হওয়ায়, তেহরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা আর নিছক গল্প-গুজব নয়। কূটনৈতিক ও কৌশলগত মহলে বিষয়টি এখন নীরবে হলেও গুরুত্ব সহকারে আলোচিত হচ্ছে। এহেন পরিস্থিতিতে যে একাধিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে, তার মধ্যে অন্যতম হল, ইরানে শাহ শাসনের প্রত্যাবর্তন। বিশেষ করে, বর্তমানে বিতাড়িত ক্রাউন প্রিন্সের নেতৃত্বে পাহলভি রাজবংশ পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা উঠছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের সময় তিনি ছিলেন মাত্র ১৮ বছরের তরুণ। তখনই নির্বাসনে যেতে হয় তাঁর পরিবারকে (India)।

    পুরনো রাজতন্ত্রকে ফের নয়া মোড়কে উপস্থাপন (India)

    চার দশক পর সেই পুরনো রাজতন্ত্রকে ফের নয়া মোড়কে উপস্থাপন করার চেষ্টা চলছে ‘স্থিতিশীলতা’, ‘ধারাবাহিকতা’ এবং ‘বিশ্ব মঞ্চে ইরানের প্রত্যাবর্তনে’র প্রতীক হিসেবে। ইরানে যদি সত্যিই কোনও পাল্টা বিপ্লব হয়, তার ফল হতে পারে নানা রকম। তবে ভারতের কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি হবে, শাহ-নেতৃত্বাধীন শাসনব্যবস্থার পুনরাগমন। এই উদ্বেগের কারণ এই নয় যে, নয়াদিল্লি বর্তমান ইরানি ধর্মীয় শাসকদের প্রতি কোনও সহানুভূতি পোষণ করে। ভারতের দুশ্চিন্তা অনেক বেশি কাঠামোগত ও কৌশলগত। একজন পুনঃপ্রতিষ্ঠিত শাহ আদতে স্বাধীন শক্তি হবেন না, বরং তিনি হবেন পশ্চিমী, বিশেষ করে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে ওঠা শাসক। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে এমন সরকারের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থাকাই স্বাভাবিক (India)।

    মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়

    এর ফলে ইরান আবারও সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ে ঢুকে পড়বে, মার্কিন জ্বালানি নীতি, নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থা এবং পশ্চিম এশিয়ায় ওয়াশিংটনের আঞ্চলিক অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলবে তেহরান। ভারতের দৃষ্টিতে এই পরিবর্তনই যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ইরান যদি পুরোপুরি মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে, তাহলে ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং কৌশলগত স্বার্থে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এই কারণেই, ইরানের বর্তমান অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য সরকার পরিবর্তনের ওপর নজর রাখছে নয়াদিল্লির কূটনৈতিক মহল। যদি ইরান ভবিষ্যতে আমেরিকা-নির্ভর বা ওয়াশিংটনের অধীন এক শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত হয়, তাহলে দেশটির কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পরিসর মারাত্মকভাবে সংকুচিত হবে। এমন ইরান ভারতের স্বার্থে এমন কোনও ব্যতিক্রম তৈরি করতে আগ্রহী বা সক্ষম হবে না, যা আমেরিকার নীতির পরিপন্থী (India)।

    বৃহত্তর কৌশল

    এর প্রথম এবং সবচেয়ে তাৎক্ষণিক ধাক্কা আসবে যোগাযোগ ও সংযোগ ক্ষেত্রে। বর্তমানে ইরানের মাধ্যমেই ভারত মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানে সীমিত হলেও একটি বিকল্প স্থলপথ পেয়ে থাকে। এই সুযোগটি সম্ভব হয়েছে কারণ বর্তমান তেহরান মার্কিন চাপ উপেক্ষা করতে রাজি। ঠিক এই রাজনৈতিক ফাঁকফোকরের মধ্যেই টিকে আছে ভারতের চাবাহার বন্দর প্রকল্প, সেখানে ভারতের উপস্থিতি এবং পশ্চিমমুখী স্থলপথে পৌঁছনোর বৃহত্তর কৌশল। কিন্তু শাহ-নেতৃত্বাধীন ইরান সেই ফাঁক বন্ধ করে দেবে। মধ্য এশিয়া কোনও পশ্চিম-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল নয়, সেখানে মূল প্রভাব রাশিয়া ও চিনের। ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ইরান সেই ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে বেমানান হয়ে পড়বে, যার মাধ্যমে ভারত ওই অঞ্চলে পৌঁছতে চায়।

    চাবাহার বন্দর

    এর প্রত্যক্ষ ফল হবে চাবাহার বন্দরে ভারতের বিনিয়োগ এবং রাশিয়াগামী নর্থ-সাউথ করিডর-সহ সংশ্লিষ্ট স্থলপথ কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাওয়া (India)। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি জটিল হবে। যুক্তরাষ্ট্রঘনিষ্ঠ ইরানকে কাবুল সম্ভবত অবিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে দেখবে। এর ফলে আফগানিস্তান আরও একবার পাকিস্তানের প্রভাববলয়ে ফিরে যেতে পারে, যে পরিস্থিতি এড়াতে ভারত গত কয়েক দশক ধরে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে কাজ করে এসেছে। তবে ভারতের অস্বস্তির কারণ কেবল সংযোগ ব্যবস্থা নয়। এর গভীরে রয়েছে ইতিহাসের স্মৃতি। শেষবার যখন ইরানে শাহ শাসন ছিল, তখন ভারতের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় পাহলভি রাজতন্ত্র শুধু পশ্চিমের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিল না, বরং অঞ্চলটিতে পশ্চিমী নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ছিল।

    পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ায় ইরান

    এই অবস্থানের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পড়েছিল ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে। সেই সময় ইরানের পশ্চিমঘেঁষা অবস্থান ভারতের কৌশলগত স্বার্থের পক্ষে ছিল না—এই স্মৃতি এখনও দিল্লির নীতিনির্ধারকদের মনে টাটকা রয়েছে (India)। ১৯৬৫ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে পশ্চিমী দেশগুলি থেকে সরাসরি সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে ইসলামাবাদের জন্য। বিশেষ করে পাক  বিমান বাহিনীর যুদ্ধ প্রস্তুতি বজায় রাখা তখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই সঙ্কটের সময়ে পাকিস্তানের পাশে দাঁড়ায় ইরান। তৎকালীন শাহের শাসনাধীন ইরান কার্যত মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে পাকিস্তানের জন্য অস্ত্র সংগ্রহে। পশ্চিমি দেশগুলির কাছ থেকে সরাসরি অস্ত্র কিনতে না পারায়, তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করে তা তেহরান হয়ে পাকিস্তানে পাঠানোর ব্যবস্থা করে ইরান (India)।

    পাকিস্তানের হাতে যুদ্ধবিমান

    ১৯৬৬ ও ১৯৬৭ সালে ইরান প্রায় ৯০টি অতিরিক্ত এফ-৮৬ সাবার যুদ্ধবিমান  তুলে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল। এই যুদ্ধবিমানগুলি ছিল কানাডায় নির্মিত কানাডায়ার সিএল-১৩ এমকে৬ মডেল, যা আগে পশ্চিম জার্মানির লুফটওয়াফের (West German Air Force) অধীনে ছিল। জার্মান মজুত থেকে এই বিমানগুলি সংগ্রহ করে ইরানের মাধ্যমে পাকিস্তানে পাঠানো হয়। প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। লুফটওয়াফের পাইলটরা বিমানগুলি উড়িয়ে তেহরানে নিয়ে আসতেন, তারপর ইরানি পাইলটরা পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ইউনিফর্ম পরে সেগুলি পাকিস্তানে নিয়ে যেতেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গোটা প্রক্রিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অজান্তে হওয়া সম্ভব ছিল না। যদিও ওয়াশিংটন প্রকাশ্যে ভারত ও পাকিস্তান, দুই দেশকেই অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় রেখেছিল, বাস্তবে এই লেনদেন ঘটেছে আমেরিকার নীরব সম্মতিতেই। কারণ ইরান তখন আমেরিকার অন্যতম ঘনিষ্ঠ আঞ্চলিক মিত্র ছিল (India)।

    অস্ত্রচুক্তির সঙ্গে কারা যুক্ত

    এই অস্ত্রচুক্তির সঙ্গে যুক্ত জার্মান অস্ত্র ব্যবসায়ী গেরহার্ড মার্টিন্স পরে দাবি করেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই সাবার যুদ্ধবিমান হস্তান্তরের বিষয়ে সম্পূর্ণ অবগত ছিল এবং পাকিস্তানের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। মার্কিন কংগ্রেস সদস্য স্টুয়ার্ট সাইমিংটন, যিনি এই চুক্তি নিয়ে তদন্ত পরিচালনা করেছিলেন, তিনিও জানান, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি জানত যে বিমানগুলি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের কাছেই পৌঁছবে। ১৯৭১ সালের মধ্যে এই যুদ্ধবিমানগুলিতে সাইডউইন্ডার ক্ষেপণাস্ত্রও সংযোজন করা হয়। ১৯৭১ সালের ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের সময় এই সমর্থন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের অবস্থান যখন দ্রুত অবনতি হচ্ছিল, তখন ইরান প্রকাশ্যে ভারতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। শাহ প্রকাশ্যে ভারতের ভূমিকার নিন্দা করেন এবং সংঘর্ষকে আগ্রাসন হিসেবে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দেন যে পাকিস্তানের ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রশ্নে তেহরান সম্পূর্ণভাবে ইসলামাবাদের পাশে রয়েছে।

    ইরানের কোনও আগ্রাসী উদ্দেশ্য নেই

    নয়াদিল্লিকে পাঠানো এক কড়া বার্তায় ইরানের তৎকালীন শাসক ঘোষণা করেছিলেন, “ইরানের কোনও আগ্রাসী উদ্দেশ্য নেই, কিন্তু পাকিস্তানকে নিশ্চিহ্ন করার কোনও প্রচেষ্টা আমরা মেনে নেব না। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতকে আমাদের এই অবস্থান সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকতে হবে। আমরা ইরানের সীমান্তে আর একটি ভিয়েতনাম চাই না (India)।” এই বক্তব্য শুধু আদর্শগত অবস্থান বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের প্রতিফলন নয়। শাহের দৃষ্টিতে পাকিস্তান ছিল পশ্চিমী ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ফ্রন্টলাইন স্টেট’, অস্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিরোধক এবং সোভিয়েত প্রভাব ঠেকানোর সহযোগী শক্তি। অন্যদিকে, নিরপেক্ষ জোটভুক্ত হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ক্রমশ ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠা ভারত এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে পারেনি।

    শাহ-শাসিত ইরান নিরপেক্ষ ছিল না

    ভারতের নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়টি ছিল স্পষ্ট। শাহ-শাসিত ইরান নিরপেক্ষ ছিল না, ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তিও ছিল না। বরং পাকিস্তানকে সক্রিয়ভাবে সহায়তা করছিল, একটি এমন পশ্চিমী নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হিসেবে, যেখানে ভারতের স্বার্থকে অগ্রাহ্য করা হয়েছিল। এই কাঠামোগত বাস্তবতা সহজে বদলে যাওয়ার নয়। ২০২৫ সালে যদি ইরানে পুনরায় রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেই সরকার আবারও টিকে থাকা ও বৈধতার জন্য পশ্চিমী সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল হবে। এই নির্ভরশীলতা পাকিস্তান প্রশ্নে, আঞ্চলিক সংঘাতে, জ্বালানি সরবরাহ এবং নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলবে (India)। বিশেষত যুবরাজের মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা এই ইঙ্গিতই দেয় যে, ভবিষ্যতের কোনও শাহ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য আবারও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সামরিক-কূটনৈতিক সমীকরণে ঝুঁকবেন।

    ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে আসা শিক্ষা থেকে এটা স্পষ্ট যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের অধীনস্থ একটি ইরান ভারতের জন্য কখনও ততটা সহায়ক হয়নি, যতটা হয়েছে একটি স্বাধীন, সীমাবদ্ধ হলেও কৌশলগতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও পশ্চিমী চাপের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া (India) ইরান।

     

LinkedIn
Share