মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: শুরুতেই ব্যর্থ ‘ইসলামাবাদ টক্স’ (Islamabad Talk Collapses)। ফলে নতুন করে ইরান বনাম আমেরিকা-ইজরায়েলের যুদ্ধ (US Iran War) বাধা এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশ। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ থামাতে গত ১১ এপ্রিল ‘ইসলামাবাদ টক্স’ আয়োজিত হয় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানে। সেখানে যোগ দেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স ও ইরানি পার্লামেন্টের অধ্যক্ষ মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। বেশ কিছু ক্ষণ পর শান্তি বৈঠক থেকে বেরিয়ে দু’পক্ষই জানিয়ে দেয় যে আলোচনা ফলপ্রসু হয়নি। পরে এই নিয়ে আলাদা আলাদা করে বিবৃতি দিয়েছেন ভান্স ও গালিবাফ। সেখানে একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপাতে দেখা গিয়েছে তাঁদের।
বৈঠক ভেঙে যাওয়ার প্রেক্ষাপট
এই বৈঠককে গত কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর একটি বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছিল। বৈঠক শেষে ভ্যান্স স্পষ্টভাবে জানান, “ইরান আমাদের চূড়ান্ত প্রস্তাব মানতে অস্বীকার করেছে।” অন্যদিকে তেহরানের অভিযোগ—মার্কিন দাবি “অতিরিক্ত” এবং “আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী”। ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য আমেরিকার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন ভান্স। তা ছাড়াও ইসলামাবাদে গিয়েছিলেন বিশেষ মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্টিভ উইটকফ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জারেড কাশনার। ভান্স তাঁর বিবৃতিতে বলেছেন, ‘‘আমরা কোনও সমঝোতায় পৌঁছোতে পারিনি। এই খবর আমেরিকার চেয়ে ইরানের জন্য বেশি খারাপ। সমঝোতা ছাড়াই আমরা আমেরিকায় ফিরে যাচ্ছি। আমাদের শর্তগুলো খুব পরিষ্কার ভাবে ওঁদের জানিয়েছি, কী আমরা চাই এবং কী চাই না। যতটা সম্ভব স্পষ্ট করেই আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। ওরা সেটা মানতে চায়নি।’ বৈঠক চলাকালীন ট্রাম্পের সঙ্গে অনবরত যোগাযোগ রেখেছিলেন ভান্সরা। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, ৬ থেকে ১২ বার ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁদের ফোনে কথা হয়েছে। ট্রাম্পের বলে দেওয়া প্রস্তাবগুলিই ইরানের সামনে রেখেছিলেন ভান্স। তাতে ইরানের জবাব, তাদের অবস্থান ফোনেই ট্রাম্পকে তিনি জানান। তবে শেষ পর্যন্ত কোনও সুরাহা হল না।
আলোচনা ভাঙার পিছনে কারণ
ইসলামাবাদ বৈঠকের ব্যর্থতা শুধু একটি কূটনৈতিক পরাজয় নয়—এটি পুরো পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালী এখন বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক ‘চোকপয়েন্ট’। যুদ্ধ থামার বদলে পরিস্থিতি আরও জটিল ও অস্থির হয়ে উঠছে। যদিও এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি শেষ হয়নি, কিন্তু পরিস্থিতি অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। যে কোনও সময় আবার বড় আকারে হামলা শুরু হতে পারে। ইসলামাবাদে আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে।
পারমাণবিক চুক্তি
একটি জায়গাতেই ইরান-আমেরিকা (US Iran War) আলোচনা ধাক্কা খেয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ভান্স। জানিয়েছেন, ইরানের কাছ থেকে পারমাণবিক বোমা তৈরি না-করার নিশ্চয়তা চান তাঁরা। তা মেলেনি। ভান্সের কথায়, ‘‘সহজ সত্যিটা হল, আমরা ইরানের কাছ থেকে পরমাণু বোমা তৈরি না-করার বিষয়ে একটা ইতিবাচক নিশ্চয়তা চাই। ওদের বলতে হবে যে, ওরা বোমা বানাবে না এবং পরমাণু বোমা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা উপাদানও হাতে রাখবে না। আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মূল লক্ষ্য এটাই। সেই সমঝোতাতেই আমরা পৌঁছোতে চেয়েছি। ভান্সের এই বিবৃতির পর ইরান দাবি করেছে, আমেরিকার অবাস্তব, অযৌক্তিক দাবির কারণেই পাকিস্তানে আয়োজিত বৈঠক ভেস্তে গিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল ইরান যেন স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা ত্যাগ করে। কিন্তু ইরান এটিকে তার সার্বভৌম অধিকারে হস্তক্ষেপ বলে প্রত্যাখ্যান করে।
হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ
হরমুজ প্রণালী—বিশ্বের প্রায় ২০% তেল পরিবহনের পথ—এই সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু। ইরান দাবি করে, তারা এই প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে টোল আদায় করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর সম্পূর্ণ বিরোধিতা করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৈঠক ব্যর্থ হওয়ার পর ইঙ্গিত দেন, ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে “নৌ অবরোধ” (Naval Blockade) ব্যবহার করা হতে পারে। এই পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে, ইরানের তেল রফতানি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে—যার বড় প্রভাব পড়বে চীন ও ভারতের মতো দেশগুলিতে। বর্তমানে হরমুজ প্রণালী প্রায় বন্ধ। কয়েকটি জাহাজই কেবল ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। ইরানের পাতা মাইন (naval mines) বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেবানন ইস্যু
ইরান চেয়েছিল লেবানন-এ হেজবোল্লাহ-র বিরুদ্ধে ইজরায়েল-এর হামলা বন্ধ হোক। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল জানায়, এটি আলাদা বিষয়—এবং হামলা চলতেই থাকবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। সরবরাহ চেইন ব্যাহত হচ্ছে। বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে কাতার ও কুয়েত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ তারা সম্পূর্ণভাবে এই প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল। আলোচনা ভেস্তে যাওয়ায় সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপগুলি চোখে পড়েতে পারে। বেড়ে যাবে মার্কিন নৌবাহিনীর টহল ও জাহাজ আটক-এর ঘটনা। ইরানের জ্বালানি পরিকাঠামোতে হামলা চালাতে পারে আমেরিকা। ইরানের পক্ষ থেকে প্রক্সি যুদ্ধের বিস্তার ঘটতে পারে।
