মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইর মৃত্যুর পরে ইরানের (Iran Israel Conflicts) হয়ে মূলত সামনে এসেছিলেন আলি লারিজানি (Ali Larijani)। ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং আমেরিকাকে ক্রমাগত আক্রমণ শানিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। তাঁকে হত্যা করতে তৎপর হয়ে উঠেছিল ইজরায়েল ও আমেরিকা। অবশেষে এল সাফল্য। নিহত ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলি লারিজানি। ইজরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছেন বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানি। এই খবর নিশ্চিত করেছে তেহরানও। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ বিবৃতি জারি করে লারিজানির মৃত্যুর খবর জানিয়েছে। সেই বিবৃতিতে লারিজানিকে ‘শহিদ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। লারিজানির মৃত্যুতে শোকপ্রকাশ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। একই সঙ্গে লারিজানির মৃত্যুর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তিনি।
দেশসেবার জন্য প্রাণ উৎসর্গ
শুধু লারিজানি নন, ইজরায়েলি হামলায় একই সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে তাঁর পুত্র এবং দেহরক্ষীরও। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের উপ-প্রধান আলিরেজা বায়েতও প্রয়াত হয়েছেন ইজরায়েল হামলায়। লারিজানির ওপর ইজরায়েলি হামলার সময় তাঁর সঙ্গেই ছিলেন আলিরেজা। একই হামলায় আলি লারিজানির ছেলে মোর্তেজা লারিজানিও (Morteza Larijani) প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া বাসিজ বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলাইমানির (Gholam Reza Soleimani) মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত করেছে ইরান। তাঁদের প্রতি শোকজ্ঞাপন করেছে কাউন্সিল। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইরানের অগ্রগতি এবং ইসলামি বিপ্লবের জন্য আজীবন লড়াই করেছেন লারিজানি। দেশসেবার জন্য এই মৃত্যু তাঁর দীর্ঘ দিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেছে। দেশের জন্য দীর্ঘদিন কাজ করার পর তিনি ‘শহিদের মর্যাদা’ অর্জন করেছেন।
লারিজানির মৃত্যুর প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি
মঙ্গলবার দুপুরে (ভারতীয় সময়) ইজরায়েলের তরফে দাবি করা হয়, বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন লারিজানি! সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ দাবি করেছেন, লারিজানি নিহত হয়েছেন। তবে ইরান সেই সময় ইজরায়েলের দাবি উড়িয়ে দেয়। তেহরান-সহ ইরানের বেশ কয়েকটি জায়গায় বিমান হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল বাহিনী। ইরানের সরকারি সংবাদসংস্থা তাসমিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সে দেশের সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক মেজর জেনারেল আমির হাতানি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, লারিজানির মৃত্যুর প্রতিশোধ হবে ‘চূড়ান্ত এবং দুঃখজনক’।
ট্রাম্পকে ‘নির্মূল’ করে দেওয়ার সরাসরি হুমকি
দিন কয়েক আগেই এক্স হ্যান্ডলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘নির্মূল’ করে দেওয়ার সরাসরি হুমকি দিয়েছিলেন লারিজানি। তাঁর বার্তা ছিল, ‘‘আপনার থেকেও বড়রা ইরানকে নির্মূল করতে পারেনি। নিজেরটা দেখুন, না হলে আপনাকেই নির্মূল করে দেওয়া হবে।’’ সেই বার্তা প্রকাশ্যে আসার পরই শোরগোল পড়ে যায়। সোমবার লারিজানি ঘোষণা করেন, আমেরিকা এবং ইজরায়েলের বিরুদ্ধে সমস্ত মুসলিম দেশের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। তার আগেই তাঁর মাথার দাম ঠিক করে রেখেছিল আমেরিকা। কিছুদিন আগেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই-সহ (Mojtaba Khamenei) দেশের প্রশাসনের শীর্ষ ১০ জন কর্মকর্তার ছবি প্রকাশ করে তাঁদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিল আমেরিকা। সেই তালিকার একেবারে উপরের দিকেই ছিলেন ইরানের নিরাপত্তা উপদেষ্টা।
কে ছিলেন আলি লারিজানি?
আলি লারিজানি (Ali Larijani) ইরানের রাজনীতির অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব (Secretary of Iran’s Supreme National Security Council) হিসেবে তিনি দেশের নিরাপত্তা ও কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংস্কৃতি মন্ত্রী, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থার প্রধান, সংসদের স্পিকার-সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ২০২৫ সালে আবার সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান লারিজানি। দেশের রাজনৈতিক, সামরিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় রক্ষায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতেন। লেফটেন্যান্ট লারিজানি ছিলেন সদ্যনিয়ত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের অন্যতম বিশ্বস্ত সঙ্গী। লারিজানির মৃত্যু ইরানের রাজনীতিতে বড় শূন্যতা তৈরি করল বলেই মনে করা হচ্ছে।
রেজা সোলাইমানি কে?
তরুণ বয়সে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরে যোগ দেন রেজা সোলেইমানি। ধীরে ধীরে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার হন। পরে আইআরজিসির কয়েকটি ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন। ২০১৯ সাল থেকে বাসিজ বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন গোলাম রেজা সোলেইমানি। আইআরজিসির অধীন এই স্বেচ্ছাসেবী আধাসামরিক বাহিনীতে আনুমানিক সাড়ে চার লাখ সদস্য রয়েছে। এ বাহিনীর নেতা হিসেবে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচিত ছিলেন সোলাইমানি। ইরান সরকারের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত সোলাইমানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও কানাডাসহ একাধিক দেশ ও সংস্থার নিষেধাজ্ঞা ছিল।
ইরানের শীর্ষ স্তরের নেতাদের ‘নির্মূল’ করাই লক্ষ্য
ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বার বার লারিজানিকে ‘দুর্বৃত্তদের প্রধান’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, ইরানের শীর্ষ স্তরের নেতাদের ‘নির্মূল’ করাই লক্ষ্য। তবে এ-ও জানান, কাজটা সহজ নয়। নেতানিয়াহুর কথায়, ‘‘এক বারে ঘটবে না। সহজ হবে না। তবে আমরা যদি লক্ষ্যে অবিচল থাকতে পারি তবে ইরানের মানুষ তাদের নেতৃত্বকে উৎখাত করতে পারবে।’’ ইজরায়েল দাবি করেছে, ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) পরিকাঠামো লক্ষ্য করে চালানো হামলায় আলি লারিজানি ও রেজা সোলেইমানি দুই নেতাকে নিশানা করা হয়েছিল।
