Tag: Kathamrita

  • Ramakrishna 446: ঠাকুর তাকিয়ায় হেলান দিয়া বিশ্রাম করিতেছেন

    Ramakrishna 446: ঠাকুর তাকিয়ায় হেলান দিয়া বিশ্রাম করিতেছেন

    মাস্টার: সেই যে আপনি বলেছিলেন, সামান্য আধার হলে ভাব সংবরণ করতে পারে না; বড় আধার হলে ভিতরে খুব ভাব হয়, কিন্তু বাইরে প্রকাশ থাকে না। যেমন বলেছিলেন—সাইয়ের দিঘিতে হাতি নামলে টের পাওয়া যায় না, কিন্তু ডোবাতে নামলে তোলপাড় হয়ে যায় আর পাড়ের উপর জল উপচে পড়ে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ: – “বাহিরে ভাব হলেই তো হবে না। তার আকর আলাদা চাই। আর সব লক্ষণ ভালো, তা ঠিক, কিন্তু…”

    মাস্টার: – “চোখদুটো বেশ উজ্জ্বল — যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ: – “চোখ উজ্জ্বল হলেই হয় না। তবে ঈশ্বরীয় চোখ আলাদা। আচ্ছা, তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলে?”

    মাস্টার: – “আজ্ঞে হ্যাঁ, কথা হয়েছিল। সে ৪–৫ দিন ধরে বলছে, ‘ঈশ্বরচিন্তা করতে গেলেই আর তাঁর নাম জপ করতে গেলেই চোখ দিয়ে জল পড়ে, রোমাঞ্চ হয়’ — এইসব লক্ষণ দেখা যায়।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ: – “তবে আর কী?”

    ঠাকুর চুপ করে থাকেন। মাস্টার কিছুক্ষণ পরে আবার বলতে শুরু করেন —

    মাস্টার: – “সে দাঁড়িয়ে আছে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ: – “কে?”

    মাস্টার: – “পূর্ণ — তার বাড়ির দরজার কাছেই বোধহয় দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কেউ গেলে দৌড়ে আসবে, এসে আমাদের নমস্কার করবে — তারপর চলে যাবে।”

    শ্রী রামকৃষ্ণ- আহা আহা

    ঠাকুর তাকিয়ায় হেলান দিয়া বিশ্রাম করিতেছেন। মাস্টারের সঙ্গে একটি দ্বাদশ বর্ষীয় বালক আশি আছে মাস্টারের স্কুলে পড়ে নাম ক্ষীরোদ।

    মাস্টার বলিতেছেন, এই ছেলেটি বেশ ঈশ্বরের কথায় খুব আনন্দ
    শ্রীরামকৃষ্ণ সহাস্যে- চোখ দুটি যেন হরিণের মতো

    ছেলেটি ঠাকুরের পায়ে হাত দিয়ে ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিল ও অতি ভক্তিভাবে ঠাকুরের পথ সেবা ঠাকুর ভক্তদের কথা কহিতেছেন

    শ্রীরামকৃষ্ণ- মাস্টার কি রাখালের বাড়িতে আছে। তারও শরীর ভালো নয়। ফোড়া হয়েছে একটি ছেলে বুঝি তার হবে শুনলাম

    পল্টু ও বিনোদ সম্মুখে বসে আছেন

  • Ramakrishna 445: ঈশ্বরচিন্তা করতে গেলেই আর তাঁর নাম জপ করতে গেলেই চোখ দিয়ে জল পড়ে, রোমাঞ্চ হয়

    Ramakrishna 445: ঈশ্বরচিন্তা করতে গেলেই আর তাঁর নাম জপ করতে গেলেই চোখ দিয়ে জল পড়ে, রোমাঞ্চ হয়

    শ্রীরামকৃষ্ণ: ওদের বইয়ে অনেক কথা আছে বটে, কিন্তু যারা বই লিখেছে তারা ধারণা করতে পারে না। সাধু সংঘ হলে তবে ধারণা হয়। ঠিক ত্যাগী যদি, সাধু যদি উপদেশ দেয়, তবেই লোকে সে কথা শোনে। শুধু পণ্ডিত যদি বই লিখে বা মুখে উপদেশ দেয়, সে কথা তত ধারণা হয় না। যার কাছে গুড়ের নাগরী আছে, সে যদি রোগীকে বলে গুড় খেও না, রোগী তার কথা তত শোনে না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ: আচ্ছা, পূর্ণের অবস্থা কীরকম দেখেছো? ভাব-ধাব কি হয়?

    মাস্টার: ওই ভাবের অবস্থা বাইরে সেরকম দেখি, দেখতে পাই না। আপনার সেই কথাটি তাকে বলেছিলাম।

    শ্রীরামকৃষ্ণ: কোন কথাটি?

    মাস্টার: সেই যে আপনি বলেছিলেন, সামান্য আধার হলে ভাব সংবরণ করতে পারে না; বড় আধার হলে ভিতরে খুব ভাব হয়, কিন্তু বাইরে প্রকাশ থাকে না। যেমন বলেছিলেন—সাইয়ের দিঘিতে হাতি নামলে টের পাওয়া যায় না, কিন্তু ডোবাতে নামলে তোলপাড় হয়ে যায় আর পাড়ের উপর জল উপচে পড়ে।

    শ্রীরামকৃষ্ণ:
    – “বাহিরে ভাব হলেই তো হবে না। তার আকর আলাদা চাই। আর সব লক্ষণ ভালো, তা ঠিক, কিন্তু…”

    মাস্টার:
    – “চোখদুটো বেশ উজ্জ্বল — যেন ঠেলে বেরিয়ে আসছে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ:
    – “চোখ উজ্জ্বল হলেই হয় না। তবে ঈশ্বরীয় চোখ আলাদা। আচ্ছা, তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছিলে?”

    মাস্টার:
    – “আজ্ঞে হ্যাঁ, কথা হয়েছিল। সে ৪–৫ দিন ধরে বলছে, ‘ঈশ্বরচিন্তা করতে গেলেই আর তাঁর নাম জপ করতে গেলেই চোখ দিয়ে জল পড়ে, রোমাঞ্চ হয়’ — এইসব লক্ষণ দেখা যায়।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ:
    – “তবে আর কী?”

    ঠাকুর চুপ করে থাকেন।
    মাস্টার কিছুক্ষণ পরে আবার বলতে শুরু করেন —

    মাস্টার:
    – “সে দাঁড়িয়ে আছে।”

    শ্রীরামকৃষ্ণ:
    – “কে?”

    মাস্টার:
    – “পূর্ণ — তার বাড়ির দরজার কাছেই বোধহয় দাঁড়িয়ে আছে। আমরা কেউ গেলে দৌড়ে আসবে, এসে আমাদের নমস্কার করবে — তারপর চলে যাবে।”

  • Ramakrishna 444: শুধু পণ্ডিত যদি বই লিখে বা মুখে উপদেশ দেয়, সে কথা তত ধারণা হয় না

    Ramakrishna 444: শুধু পণ্ডিত যদি বই লিখে বা মুখে উপদেশ দেয়, সে কথা তত ধারণা হয় না

    শ্রী রামকৃষ্ণ: ছোটন নরেন আর বাবুরামের জন্য এলাম। পূর্ণকে কেন আনলে না?

    মাস্টার: সভায় আসতে চায় না। তার ভয় হয়—আপনি পাঁচজনের সাক্ষাতে সুখ্যাতি করেন, পাশে বাড়িতে জানতে পারে।

    শ্রী রামকৃষ্ণ: পণ্ডিতদের ও সাধুদের শিক্ষা ভিন্ন—সাধুসঙ্গ।

    শ্রী রামকৃষ্ণ: হ্যাঁ, তা বটে। যদি বলে ফেলি, তো আর বলব না। আচ্ছা, পূর্ণকে তুমি ধর্মশিক্ষা দিচ্ছ? এ তো বেশ।

    মাস্টার: তাছাড়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বইতে, সিলেকশন-এ ওই কথাই আছে—“ঈশ্বরকে দেহ, মন, প্রাণ দিয়ে ভালবাসবে।” একথা শেখালে কর্তারা যদি রাগ করেন, তো কী করা যায়?

    শ্রীরামকৃষ্ণ: ওদের বইয়ে অনেক কথা আছে বটে, কিন্তু যারা বই লিখেছে তারা ধারণা করতে পারে না। সাধু সংঘ হলে তবে ধারণা হয়। ঠিক ত্যাগী যদি, সাধু যদি উপদেশ দেয়, তবেই লোকে সে কথা শোনে। শুধু পণ্ডিত যদি বই লিখে বা মুখে উপদেশ দেয়, সে কথা তত ধারণা হয় না। যার কাছে গুড়ের নাগরী আছে, সে যদি রোগীকে বলে গুড় খেও না, রোগী তার কথা তত শোনে না।

    শ্রীরামকৃষ্ণ:
    আচ্ছা, পূর্ণের অবস্থা কীরকম দেখেছো? ভাব-ধাব কি হয়?

    মাস্টার:
    ওই ভাবের অবস্থা বাইরে সেরকম দেখি, দেখতে পাই না। আপনার সেই কথাটি তাকে বলেছিলাম।

    শ্রীরামকৃষ্ণ:
    কোন কথাটি?

    মাস্টার:
    সেই যে আপনি বলেছিলেন, সামান্য আধার হলে ভাব সংবরণ করতে পারে না; বড় আধার হলে ভিতরে খুব ভাব হয়, কিন্তু বাইরে প্রকাশ থাকে না। যেমন বলেছিলেন—সাইয়ের দিঘিতে হাতি নামলে টের পাওয়া যায় না, কিন্তু ডোবাতে নামলে তোলপাড় হয়ে যায় আর পাড়ের উপর জল উপচে পড়ে।

  • Ramakrishna 443: পণ্ডিতদের ও সাধুদের শিক্ষা ভিন্ন

    Ramakrishna 443: পণ্ডিতদের ও সাধুদের শিক্ষা ভিন্ন

    শ্রীরামকৃষ্ণ বলরামের বৈঠকখানায় কয়েকজন অন্তরঙ্গ ভক্তের সঙ্গে বসিয়া আছেন। মাস্টারমশাই উপস্থিত। কথোপকথন চলছে। ভক্তির কথা ঘিরে। এই দিনটি—সোমবার, ১৮৮৫ সালের ৬ এপ্রিল, বাংলা ১২৯১ সালের চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী তিথি। ঠাকুর তখন কলকাতার ভক্তমন্দিরে এসেছেন। সেখান থেকে পরে যাবেন ফণি গোস্বামীর গলির দেবেন্দ্রর বাড়িতে।

    সত্য কথা — শ্রী রামকৃষ্ণ (ছোট নরেন, বাবুরাম, পূর্ণ)

    ঠাকুর ঈশ্বরপ্রেমে দিবানিশি মাতোয়ারা হয়ে থাকেন। অনুক্ষণ ভাবাবিষ্ট, বহির্জগতের প্রতি তাঁর মনে আদৌ কোনও আকর্ষণ নেই। কেবল অন্তরঙ্গজনদের কথা ভাবেন। যতদিন না তাঁরা তাঁকে পুরোপুরি বুঝতে পারেন, ততদিন তাঁদের জন্য তিনি ব্যাকুল থাকেন। যেমন বাবা-মা অক্ষম সন্তানের জন্য ব্যাকুল হয়ে ভাবেন—‘কী করে এরা মানুষ হবে?’ অথবা যেমন পাখি ব্যাকুল হয় তার শাবকদের লালন-পালনের জন্য।

    শ্রীরামকৃষ্ণ মাস্টারমশায়কে উদ্দেশ করে বললেন, “তিনটের সময় যাব, তাই আসছি, কিন্তু ভারী ধূপ।”

    মাস্টারমশায় বিনয়ভরে বলেন, “আজ্ঞে, হ্যাঁ, আপনার তো অনেক কষ্ট হয়েছে।”

    ভক্তেরা ঠাকুরকে হাওয়া করিতেছেন।

    শ্রী রামকৃষ্ণ: ছোটন নরেন আর বাবুরামের জন্য এলাম। পূর্ণকে কেন আনলে না?

    মাস্টার: সভায় আসতে চায় না। তার ভয় হয়—আপনি পাঁচজনের সাক্ষাতে সুখ্যাতি করেন, পাশে বাড়িতে জানতে পারে।

    শ্রী রামকৃষ্ণ: পণ্ডিতদের ও সাধুদের শিক্ষা ভিন্ন—সাধুসঙ্গ।

    শ্রী রামকৃষ্ণ: হ্যাঁ, তা বটে। যদি বলে ফেলি, তো আর বলব না। আচ্ছা, পূর্ণকে তুমি ধর্মশিক্ষা দিচ্ছ? এ তো বেশ।

    মাস্টার: তাছাড়া বিদ্যাসাগর মহাশয়ের বইতে, সিলেকশন-এ ওই কথাই আছে—“ঈশ্বরকে দেহ, মন, প্রাণ দিয়ে ভালবাসবে।” একথা শেখালে কর্তারা যদি রাগ করেন, তো কী করা যায়?

  • Ramakrishna 442: ঠাকুর ঈশ্বরপ্রেমে দিবানিশি মাতোয়ারা হয়ে থাকেন

    Ramakrishna 442: ঠাকুর ঈশ্বরপ্রেমে দিবানিশি মাতোয়ারা হয়ে থাকেন

    তাই বুঝি ঠাকুর বলেছিলেন— “মান কয়েলই তো কয়েলি, আমরাও তোর মানে আছি।” আত্মীয় হতে যিনি পরম আত্মীয়, তাঁর উপর অভিমান না করলে আর কাদের উপর করবেন?

    ধন্য নরেন্দ্রনাথ! তোমার উপর এই পুরুষোত্তমের (ঠাকুরের) এত ভালোবাসা! তোমাকে দেখেই এত সহজে ঈশ্বরচিন্তার উদ্দীপনা জাগে।

    এইরূপ ভাবনাচিন্তা করতে করতে গভীর রাত্রে, শ্রীরামকৃষ্ণকে স্মরণ করতে করতে ভক্তেরা গৃহে প্রত্যাবর্তন করছিলেন।

    ১৮৮৫ সালের ৬ এপ্রিল। স্থান: বলরাম মন্দির। সময়: দুপুর তিনটে। চৈত্র মাসের তীব্র রৌদ্র।

    শ্রীরামকৃষ্ণ বলরামের বৈঠকখানায় কয়েকজন অন্তরঙ্গ ভক্তের সঙ্গে বসিয়া আছেন। মাস্টারমশাই উপস্থিত। কথোপকথন চলছে। ভক্তির কথা ঘিরে। এই দিনটি—সোমবার, ১৮৮৫ সালের ৬ এপ্রিল, বাংলা ১২৯১ সালের চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী তিথি। ঠাকুর তখন কলকাতার ভক্তমন্দিরে এসেছেন। সেখান থেকে পরে যাবেন ফণি গোস্বামীর গলির দেবেন্দ্রর বাড়িতে।

    সত্য কথা — শ্রী রামকৃষ্ণ (ছোট নরেন, বাবুরাম, পূর্ণ)

    ঠাকুর ঈশ্বরপ্রেমে দিবানিশি মাতোয়ারা হয়ে থাকেন। অনুক্ষণ ভাবাবিষ্ট, বহির্জগতের প্রতি তাঁর মনে আদৌ কোনও আকর্ষণ নেই। কেবল অন্তরঙ্গজনদের কথা ভাবেন। যতদিন না তাঁরা তাঁকে পুরোপুরি বুঝতে পারেন, ততদিন তাঁদের জন্য তিনি ব্যাকুল থাকেন। যেমন বাবা-মা অক্ষম সন্তানের জন্য ব্যাকুল হয়ে ভাবেন—‘কী করে এরা মানুষ হবে?’ অথবা যেমন পাখি ব্যাকুল হয় তার শাবকদের লালন-পালনের জন্য।

    শ্রীরামকৃষ্ণ মাস্টারমশায়কে উদ্দেশ করে বললেন, “তিনটের সময় যাব, তাই আসছি, কিন্তু ভারী ধূপ।”

    মাস্টারমশায় বিনয়ভরে বলেন, “আজ্ঞে, হ্যাঁ, আপনার তো অনেক কষ্ট হয়েছে।”

  • Ramakrishna 441: আত্মীয় হতে যিনি পরম আত্মীয়, তাঁর উপর অভিমান না করলে আর কাদের উপর করবেন?

    Ramakrishna 441: আত্মীয় হতে যিনি পরম আত্মীয়, তাঁর উপর অভিমান না করলে আর কাদের উপর করবেন?

    লোকের খোসামোদ করে বেড়ান কলকাতা থেকে। তাদের গাড়ি করে আনতে গৃহস্থ ভক্তদের সর্বদা বলেন— ‘ওদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াও, তাহলে তোমাদের ভালো হবে।’ একে মায়া নয়, স্নেহ নয়— বিশুদ্ধ ঈশ্বরপ্রেম। মাটির প্রতিমাতে যতভাবে ষোড়শ উপাচারে ঈশ্বরের পূজা ও সেবা হয়, আর শুদ্ধ নরদেহে কি হতে পারে না? তাছাড়া এরাই ভগবানের প্রত্যেক লীলার সহায়, জন্মে জন্মে সাঙ্গোপাঙ্গ।
    নরেন্দ্রকে দেখতে দেখতে বাহ্যজগৎ ভুলে গেলেন, ক্রমে ‘দেহী’ নরেন্দ্রকে ভুলে গেলেন। বাহ্যিক মানুষকে ভুলে, ‘প্রকৃত মানুষ’-কে দর্শন করিতে লাগলেন।
    অখণ্ড সচ্চিদানন্দে মন লীন হইলো। যাকে দর্শন করে কখনো অবাক, স্পন্দনহীন হয়ে চুপ করে থাকেন, কখনো বা ‘ওম ওম’ বলেন, কখনো বা ‘মা মা’ করে পালকের মতো ডাকেন।
    নরেন্দ্রর ভিতর তাঁকে (ঈশ্বরকে) বেশি প্রকাশ পেতে দেখেন। ‘নরেন্দ্র নরেন্দ্র’ করে পাগল!
    নরেন্দ্র অবতার মানেন নাই— তাঁর আর কী হয়েছে? ঠাকুরের দিব্য চক্ষু! তিনি দেখলেন যে এ অভিমান হতে পারে, তিনি যে বড় আপনার লোক! তিনি যে আপনার মা পাতানো, মাথানত— তিনি কেন বুঝিয়ে দেন না? তিনি দপ করে আলো জ্বেলে দেন না!

    তাই বুঝি ঠাকুর বলেছিলেন—
    “মান কয়েলই তো কয়েলি, আমরাও তোর মানে আছি।”
    আত্মীয় হতে যিনি পরম আত্মীয়, তাঁর উপর অভিমান না করলে আর কাদের উপর করবেন?

    ধন্য নরেন্দ্রনাথ!
    তোমার উপর এই পুরুষোত্তমের (ঠাকুরের) এত ভালোবাসা!
    তোমাকে দেখেই এত সহজে ঈশ্বরচিন্তার উদ্দীপনা জাগে।

    এইরূপ ভাবনাচিন্তা করতে করতে গভীর রাত্রে, শ্রীরামকৃষ্ণকে স্মরণ করতে করতে ভক্তেরা গৃহে প্রত্যাবর্তন করছিলেন।

    ১৮৮৫ সালের ৬ এপ্রিল।
    স্থান: বলরাম মন্দির। সময়: দুপুর তিনটে।
    চৈত্র মাসের তীব্র রৌদ্র।

    শ্রীরামকৃষ্ণ বলরামের বৈঠকখানায় কয়েকজন অন্তরঙ্গ ভক্তের সঙ্গে বসিয়া আছেন।
    মাস্টারমশাই উপস্থিত। কথোপকথন চলছে। ভক্তির কথা ঘিরে। এই দিনটি—সোমবার, ১৮৮৫ সালের ৬ এপ্রিল, বাংলা ১২৯১ সালের চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের সপ্তমী তিথি।
    ঠাকুর তখন কলকাতার ভক্তমন্দিরে এসেছেন।
    সেখান থেকে পরে যাবেন ফণি গোস্বামীর গলির দেবেন্দ্রর বাড়িতে।

  • Ramakrishna 440: গৃহস্থ ভক্তদের সর্বদা বলেন— ওদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াও, তাহলে তোমাদের ভালো হবে

    Ramakrishna 440: গৃহস্থ ভক্তদের সর্বদা বলেন— ওদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াও, তাহলে তোমাদের ভালো হবে

    “পরিত্রাণায় সাধুনাং, বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম, ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবানি যুগে যুগে। কি ভালোবাসা! নরেন্দ্রর জন্য পাগল, নারায়ণের জন্য ক্রন্দন। বলতেন, “এরা ও অন্যান্য ছেলেরা—রাখাল, ভবনাথ, পূর্ণ, বাবু—মিথ্যে নয়, এরা সাক্ষাৎ নারায়ণ। আমার জন্য দেহধারণ করে এসেছে।” এই প্রেম তো মানুষের জ্ঞানের নয়, এ প্রেম ঈশ্বরপ্রেম।

    ছেলেরা শুদ্ধ আত্মা। স্ত্রীলোক অন্যভাবে স্পর্শ করেনি, বিষয়কর্ম করেনি। এদের লোভ, অহংকার, হিংসা ইত্যাদির স্ফূর্তি হয়নি। তাই ছেলেদের ভিতর ঈশ্বরের বেশি প্রকাশ। কিন্তু এ দৃষ্টি কার ছিল? ঠাকুরের। অন্তর্দৃষ্টি। সমস্ত দেখেছেন, দেখছেন। এ বিষয়ে সত্য, সরল, উদার, ঈশ্বরভক্ত। তাই এরূপ ভক্ত দেখলে—“এই সাক্ষাৎ নারায়ণ” বলে সেবা করেন। তাদের নাম, তাদের দেখিবার জন্য কাঁদেন। কলকাতায় ছুটে ছুটে যান।

    লোকের খোসামোদ করে বেড়ান কলকাতা থেকে। তাদের গাড়ি করে আনতে গৃহস্থ ভক্তদের সর্বদা বলেন— ‘ওদের নিমন্ত্রণ করে খাওয়াও, তাহলে তোমাদের ভালো হবে।’ একে মায়া নয়, স্নেহ নয়— বিশুদ্ধ ঈশ্বরপ্রেম। মাটির প্রতিমাতে যতভাবে ষোড়শ উপাচারে ঈশ্বরের পূজা ও সেবা হয়, আর শুদ্ধ নরদেহে কি হতে পারে না? তাছাড়া এরাই ভগবানের প্রত্যেক লীলার সহায়, জন্মে জন্মে সাঙ্গোপাঙ্গ।
    নরেন্দ্রকে দেখতে দেখতে বাহ্যজগৎ ভুলে গেলেন, ক্রমে ‘দেহী’ নরেন্দ্রকে ভুলে গেলেন। বাহ্যিক মানুষকে ভুলে, ‘প্রকৃত মানুষ’-কে দর্শন করিতে লাগলেন।
    অখণ্ড সচ্চিদানন্দে মন লীন হইলো। যাকে দর্শন করে কখনো অবাক, স্পন্দনহীন হয়ে চুপ করে থাকেন, কখনো বা ‘ওম ওম’ বলেন, কখনো বা ‘মা মা’ করে পালকের মতো ডাকেন।
    নরেন্দ্রর ভিতর তাঁকে (ঈশ্বরকে) বেশি প্রকাশ পেতে দেখেন। ‘নরেন্দ্র নরেন্দ্র’ করে পাগল!
    নরেন্দ্র অবতার মানেন নাই— তাঁর আর কী হয়েছে? ঠাকুরের দিব্য চক্ষু! তিনি দেখলেন যে এ অভিমান হতে পারে, তিনি যে বড় আপনার লোক! তিনি যে আপনার মা পাতানো, মাথানত— তিনি কেন বুঝিয়ে দেন না? তিনি দপ করে আলো জ্বেলে দেন না!

  • Ramakrishna 439: ছেলেরা শুদ্ধ আত্মা, স্ত্রীলোক অন্যভাবে স্পর্শ করেনি, বিষয়কর্ম করেনি

    Ramakrishna 439: ছেলেরা শুদ্ধ আত্মা, স্ত্রীলোক অন্যভাবে স্পর্শ করেনি, বিষয়কর্ম করেনি

    আমি বুঝেছি, এর অর্থ এই যে— সময় না হলে, তীব্র বৈরাগ্য না এলে, ছাড়লে কষ্ট হবে। ঠাকুর যেমন নিজে বলেন— “ঘায়ে মামড়ে ঘা শুকোতে না শুকোতেই যদি তা ছিঁড়ে ফেলো, তবে রক্ত পড়ে, কষ্ট হয়। কিন্তু যখন ঘা শুকিয়ে যায়, তখন মামড়ে নিজেই খসে পড়ে।”

    সাধারণ লোকে, যাদের অন্তর্দৃষ্টি নেই, তারা বলে— “এখনও সংসার ত্যাগ করনি?” সদগুরু অহেতুক কৃপাসিন্ধু, প্রেমের সমুদ্র। জীবের কিছু মঙ্গল হয়— এই চেষ্টাই তিনি নিশিদিন করে চলেছেন।

    আর গিরিশের কি বিশ্বাস! দুদিন দর্শনের পরেই বলেছিলেন, “প্রভু, তুমি ঈশ্বর, মানুষদেহ ধারণ করে এসেছ আমার পরিত্রাণের জন্য।” গিরিশ ঠিক তো বলেছেন? ঈশ্বর মানুষদেহ ধারণ না করলে ঘরের লোকের মতো কে শিক্ষা দেবে? কে জানিয়ে দেবে ঈশ্বরই বস্তু, আর সব অবস্তু? কে ধরায় পতিত দুর্বল সন্তানকে হাত ধরে তুলবে? কে কামিনী-কাঞ্চনাসক্ত বাসনা-স্বভাবপ্রাপ্ত মানুষকে আবার পূর্ববৎ অমৃতের অধিকারী করবে? আর তিনি মানুষরূপে সঙ্গে সঙ্গে না বেড়ালে, তাঁর তদ্গত তন্তু আত্মা—যারা ঈশ্বর বই আর কিছু ভালোবাসে না—তারা কী করে দিন কাটাবেন?

    “পরিত্রাণায় সাধুনাং, বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম, ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবানি যুগে যুগে। কি ভালোবাসা! নরেন্দ্রর জন্য পাগল, নারায়ণের জন্য ক্রন্দন। বলতেন, “এরা ও অন্যান্য ছেলেরা—রাখাল, ভবনাথ, পূর্ণ, বাবু—মিথ্যে নয়, এরা সাক্ষাৎ নারায়ণ। আমার জন্য দেহধারণ করে এসেছে।” এই প্রেম তো মানুষের জ্ঞানের নয়, এ প্রেম ঈশ্বরপ্রেম।

    ছেলেরা শুদ্ধ আত্মা। স্ত্রীলোক অন্যভাবে স্পর্শ করেনি, বিষয়কর্ম করেনি। এদের লোভ, অহংকার, হিংসা ইত্যাদির স্ফূর্তি হয়নি। তাই ছেলেদের ভিতর ঈশ্বরের বেশি প্রকাশ। কিন্তু এ দৃষ্টি কার ছিল? ঠাকুরের। অন্তর্দৃষ্টি। সমস্ত দেখেছেন, দেখছেন। এ বিষয়ে সত্য, সরল, উদার, ঈশ্বরভক্ত। তাই এরূপ ভক্ত দেখলে—“এই সাক্ষাৎ নারায়ণ” বলে সেবা করেন। তাদের নাম, তাদের দেখিবার জন্য কাঁদেন। কলকাতায় ছুটে ছুটে যান।

  • Ramakrishna 438: সময় না হলে, তীব্র বৈরাগ্য না এলে, ছাড়লে কষ্ট হবে

    Ramakrishna 438: সময় না হলে, তীব্র বৈরাগ্য না এলে, ছাড়লে কষ্ট হবে

    আমার তাঁর বাক্যে ঈশ্বরকৃপায় বিশ্বাস হয়েছে। আমি বিশ্বাস করবো, অন্য যা করে করুক আমি এই দুর্লভ বিশ্বাস কেন ছাড়বো? বিচার থাক, জ্ঞানচর্চা করে কি একটা ফার্স্ট হতে হবে?

    গভীর রজনীর মধ্যে বাতায়নপথে চন্দ্রকিরণ আসিতেছে, আর ফার্স্ট নাকি? একাকী ঘরের মধ্যে হায়! কিছুই জানিতে পারিলাম না! সায়েন্স, ফিলোসফি—বৃথা অধ্যয়ন করিলাম! এই জীবন, নে ধিক!

    এই বলিয়া বিষের শিশি লইয়া আত্মহত্যা করিতে বসবেন না। এলাস্টারের মতো অজ্ঞানের বোঝা বইতে না পেরে শিলাখণ্ডের উপর মাথা রেখে মৃত্যুর অপেক্ষাও করিব না।

    আমার এসব ভয়ানক পণ্ডিতদের মতো এক ছটাক জ্ঞানে রহস্য ভেদ করতে যাবার প্রয়োজন নাই। বেশ কথা—গুরুবাক্যে বিশ্বাস।

    “বেশ কথা, গুরু বিশ্বাস। হে ভগবান, আমায় ওই বিশ্বাস দাও— আর মিছামিছি ঘুরিয়ে দিও না।
    যা হবার নয়, তা খুঁজতে যেও না। আর ঠাকুর যা শিখিয়েছেন, যেন তোমার পাণিপদে দেশশুদ্ধ ভক্তি হয়, অমলা ভক্তি। অহেতুক ভক্তি নয়।
    আর যেন তোমার ভুবনমোহিনী মায়ায় মুগ্ধ না হই। কৃপা করে এই আশীর্বাদ করো।”

    শ্রীরামকৃষ্ণের অদৃষ্ট-নির্ধারিত প্রেমের কথা ভাবতে ভাবতে, ‘মনি’ সেই তমসাচ্ছন্ন রাত্রিতে রাজপথ দিয়ে বাড়ি ফিরছেন। মনে মনে ভাবছেন— কী ভালোবাসা! গিরিশকে ভালোবেসেছেন এমনভাবে, যে গিরিশ থিয়েটারে যাবেন, তবুও তাঁর বাড়িতে যেতে হবে।

    শুধু তাই নয়, ঠাকুর এমনও বলেননি যে— “সব ত্যাগ করো, আমার জন্য গৃহ-পরিজন, বিষয়-সম্পত্তি সব ছেড়ে দিয়ে সন্ন্যাস অবলম্বন করো।”

    আমি বুঝেছি, এর অর্থ এই যে— সময় না হলে, তীব্র বৈরাগ্য না এলে, ছাড়লে কষ্ট হবে।
    ঠাকুর যেমন নিজে বলেন— “ঘায়ে মামড়ে ঘা শুকোতে না শুকোতেই যদি তা ছিঁড়ে ফেলো, তবে রক্ত পড়ে, কষ্ট হয়। কিন্তু যখন ঘা শুকিয়ে যায়, তখন মামড়ে নিজেই খসে পড়ে।”

    সাধারণ লোকে, যাদের অন্তর্দৃষ্টি নেই, তারা বলে— “এখনও সংসার ত্যাগ করনি?”
    সদগুরু অহেতুক কৃপাসিন্ধু, প্রেমের সমুদ্র। জীবের কিছু মঙ্গল হয়— এই চেষ্টাই তিনি নিশিদিন করে চলেছেন।

  • Ramakrishna 436: আমার এসব ভয়ানক পণ্ডিতদের মতো এক ছটাক জ্ঞানে রহস্য ভেদ করতে যাবার প্রয়োজন নাই

    Ramakrishna 436: আমার এসব ভয়ানক পণ্ডিতদের মতো এক ছটাক জ্ঞানে রহস্য ভেদ করতে যাবার প্রয়োজন নাই

    সত্যই কি ঈশ্বর মানুষদেহ ধারণ করে আসেন? অনন্তকে শান্ত হয়? বিচার তো অনেক হলো — কি বুঝলাম? বিচারের দ্বারা কিছুই বুঝলাম না। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ অতিব স্পষ্ট বললেন — “যতক্ষণ বিচার, ততক্ষণ বস্তু লাভ হয় নাই, ততক্ষণ ঈশ্বরকে পাওয়া যায় নাই।”

    তাও বটে। এই তো এক ছটাক বুদ্ধি — এর দ্বারা আর কী বুঝবো ঈশ্বরের কথা? তবে আবদার, বিশ্বাস কিরূপে হয়?

    ঠাকুর বললেন — “ঈশ্বর যদি দেখিয়ে দেন দপ করে, তাহলে একদণ্ডেই বোঝা যায়।”

    তাহলে একদণ্ডেই বোঝা যায় গ্যোতে মৃত্যুশয্যায় বলেছিলেন “লাইট, মোর লাইট!” তিনি যদি দপ করে আলো জ্বেলে দেখিয়ে দেন।

    যেমন প্যালেস্টাইনের মূর্খ ধীবরেরা যিশুকে অথবা শ্রীবাসাদি ভক্ত শ্রীগৌরাঙ্গকে পূর্ণাবতার দেখেছিলেন।

    যদি দপ করে তিনি না দেখান তাহলে উপায় কী? কেন যে কালে ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ বলেছেন, “কথা শেখালে অবতার বিশ্বাস করব?” তিনিই শিখিয়েছেন—বিশ্বাস, বিশ্বাস আর বিশ্বাস।

    “তোমার এই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা,
    এ সমুদ্রে আর কভু হবো নাকো পথহারা।”

    আমার তাঁর বাক্যে ঈশ্বরকৃপায় বিশ্বাস হয়েছে। আমি বিশ্বাস করবো, অন্য যা করে করুক আমি এই দুর্লভ বিশ্বাস কেন ছাড়বো? বিচার থাক, জ্ঞানচর্চা করে কি একটা ফার্স্ট হতে হবে?

    গভীর রজনীর মধ্যে বাতায়নপথে চন্দ্রকিরণ আসিতেছে, আর ফার্স্ট নাকি? একাকী ঘরের মধ্যে হায়! কিছুই জানিতে পারিলাম না! সায়েন্স, ফিলোসফি—বৃথা অধ্যয়ন করিলাম! এই জীবন, নে ধিক!

    এই বলিয়া বিষের শিশি লইয়া আত্মহত্যা করিতে বসবেন না। এলাস্টারের মতো অজ্ঞানের বোঝা বইতে না পেরে শিলাখণ্ডের উপর মাথা রেখে মৃত্যুর অপেক্ষাও করিব না।

    আমার এসব ভয়ানক পণ্ডিতদের মতো এক ছটাক জ্ঞানে রহস্য ভেদ করতে যাবার প্রয়োজন নাই। বেশ কথা—গুরুবাক্যে বিশ্বাস।

LinkedIn
Share