মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: রাজ্যের নবনির্বাচিত বিধায়কদের উদ্দেশে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, বিধানসভার মর্যাদা এবং উন্নয়নমুখী রাজনীতির বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত বিধায়কদের বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি একদিকে যেমন বাংলার ঐতিহাসিক গৌরব পুনরুদ্ধারের ডাক দেন, তেমনই নাম না করে পূর্বতন তৃণমূল সরকারের তীব্র সমালোচনাও করেন। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, অতীতে রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামোয় এমন এক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হত না। তাঁর কথায়, ‘‘একজন বিধায়ক বা সাংসদের ফোন পর্যন্ত অনেক সময় প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকরা ধরতেন না।’’ বিরোধী দলের প্রতিনিধিদের সরকারি অনুষ্ঠান কিংবা প্রশাসনিক বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হত না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
বিধানসভার ইতিহাস তুলে ধরে শ্যামাপ্রসাদকে স্মরণ
ভাষণের শুরুতেই বাংলার বিধানসভার ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি বলেন, ‘‘দেশভাগের কঠিন সময় অবিভক্ত বাংলার একাংশকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত রাখতে বিধানসভা এবং শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’’ তাঁর দাবি, সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত না হলে আজকের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ সম্ভব হত না।
‘৩৪ বছর পার্টি অফিস থেকেই সব নিয়ন্ত্রণ হত’
অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসনে প্রশাসনের বড় অংশ দলীয় নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হত। পাশাপাশি, গত ১৫ বছরের তৃণমূল সরকারের সময়ও গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। যদিও কোনও দলের নাম তিনি সরাসরি উল্লেখ করেননি। নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে শুভেন্দু জানান, বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন তাঁকে একাধিক প্রশাসনিক বৈঠকে ডাকা হয়নি। এমনকি বহুবার বিধানসভা থেকে সাসপেন্ডও করা হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি।
‘এখন সব বিধায়কই সমান গুরুত্ব পাচ্ছেন’
বর্তমান সরকারের দেড় মাসের কাজের খতিয়ান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘সরকার প্রশাসনিক বৈঠকে শাসক ও বিরোধী— উভয় পক্ষের বিধায়কদেরই আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।’’ বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কোনও রাজনৈতিক বিভাজন রাখা হয়নি বলে দাবি তাঁর। বাংলার উন্নয়নের জন্য দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
বিধায়কদের দায়িত্ব নিয়ে কী বললেন ওম বিড়লা?
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা। তিনি নবনির্বাচিত বিধায়কদের উদ্দেশে বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য, যা স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্রে গোটা দেশের কাছে অনুপ্রেরণা।’’ জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, সংসদীয় ঐতিহ্য রক্ষা এবং শুধু নিজের কেন্দ্র নয়, গোটা রাজ্যের উন্নয়নের দায়িত্বও প্রতিটি বিধায়কের বলে উল্লেখ করেন তিনি। ওম বিড়লা আরও জানান, এবারের বিধানসভায় ১২১ জন নতুন বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন, যা একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তাঁদের সংসদীয় রীতি-নীতি ও সাংবিধানিক মূল্যবোধ মেনে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
শুভেন্দুর প্রশংসায় হরিবংশ, ডিজিটাল বিধানসভার ঘোষণা রিজিজুর
রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ নারায়ণ সিং বলেন, ‘‘খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।’’ তাঁর বিশ্বাস, নতুন সরকার বাংলার অতীত গৌরবকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম হবে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু ঘোষণা করেন, ‘‘আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভাকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা হবে।’’ ‘ওয়ান নেশন, ওয়ান অ্যাপ্লিকেশন’ প্রকল্পের আওতায় দেশের সমস্ত বিধানসভাকে একটি অভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
কারা ছিলেন অনুষ্ঠানে?
বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারের এই প্রশিক্ষণ শিবিরে উপস্থিত ছিলেন লোকসভার অধ্যক্ষ ওম বিড়লা, রাজ্যসভার ডেপুটি চেয়ারম্যান হরিবংশ নারায়ণ সিং, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কিরেণ রিজিজু, রাজ্য বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বসুসহ একাধিক রাজ্যের বিধানসভার অধ্যক্ষরা। উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ওড়িশা এবং উত্তরাখণ্ডের প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
