Tag: Kolkata Renames Suhrawardy Avenue

  • Gopal Patha: ৮০ বছরের ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সংশোধন! সুরাবর্দির নাম সরিয়ে কলকাতায় গোপাল পাঁঠার নামে রাস্তা

    Gopal Patha: ৮০ বছরের ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সংশোধন! সুরাবর্দির নাম সরিয়ে কলকাতায় গোপাল পাঁঠার নামে রাস্তা

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কলকাতা পুরসভার (KMC) সিদ্ধান্তে এবার নতুন নাম পেল পার্ক সার্কাস এলাকার সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ (Suhrawardy Name Removed)। ২০ জুন জারি করা এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, রাস্তার নতুন নাম হবে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ (Gopal Patha)। পশ্চিমবঙ্গ দিবসের আবহে নেওয়া এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি লেখেন, ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবসের শুভক্ষণে সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ-এর নাম পরিবর্তন করে স্বর্গীয় গোপাল মুখার্জির নামে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’ করার জন্যে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের গৃহীত ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে আন্তরিকভাবে সাধুবাদ জানাই। এটি শুধুমাত্র একটি নাম পরিবর্তন নয়, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন।’

    কার নামে ছিল সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ?

    কলকাতার এই রাস্তার নামকরণ হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। নামটি রাখা হয়েছিল বিশিষ্ট চিকিৎসক, শিক্ষাবিদ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য স্যার হাসান সুরাবর্দির (Sir Hassan Suhrawardy) নামে। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের একজন খ্যাতনামা সার্জন এবং জনজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের কাছে এই নামটি যুক্ত হয়ে যায় তাঁর ভাইপো হুসেন সঈদ সুরাবর্দির (Huseyn Shaheed Suhrawardy) সঙ্গে, যিনি ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (Premier) ছিলেন এবং কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন।

    কে ছিলেন গোপাল পাঁঠা?

    গোপাল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, যিনি ‘গোপাল পাঁঠা’ নামে বেশি পরিচিত, ছিলেন কলকাতার এক প্রভাবশালী স্থানীয় সংগঠক। ১৯৪৬ সালের ডিরেক্ট অ্যাকশন ডে (Direct Action Day)-এর সময় তিনি হিন্দু মহল্লাগুলির আত্মরক্ষার জন্য স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বলে বহু ঐতিহাসিক ও সামাজিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর সমর্থকদের দাবি, দাঙ্গার সময় তিনি এবং তাঁর সহযোগীরা বহু মানুষের প্রাণ রক্ষা করেন এবং কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ সংগঠিত করেন। এই কারণে অনেকের কাছে তিনি ‘বউবাজারের সিংহ’ বা ‘কলকাতার রক্ষাকর্তা’ হিসেবেও পরিচিত।

    ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা ও সুরাবর্দি বিতর্ক

    ১৯৪৬ সাল, নেহরু তখন দিল্লিতে অন্তর্বর্তীকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী। আর অখণ্ড বাংলার শাসনের দায়িত্ব পেয়েছিল মুসলিম লিগ এবং মুখ‍্যমন্ত্রী ছিলেন সুরাবর্দি। তাঁর নির্দেশেই ১৬ অগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’-র প্রেক্ষিতে কলকাতায় ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটে, যা পরবর্তী সময়ে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ নামে পরিচিত হয়। কলকাতায় ছিল মহড়া, আর পুরো বিষয়টি কার্যকর করা হয় নোয়াখালিতে। ১৯৩১ সালে কলকাতায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে ৩১.৭০ শতাংশ ছিল বাইরের রাজ‍্য থেকে আসা এবং ৩০ শতাংশ ছিল কলকাতার বাইরের জেলাগুলি থেকে আসা লোকজন। ৬০ লক্ষ মানুষের বাস কলকাতায় ছিল ১২০০ জনের পুলিশ বাহিনী, এর মধ্যে মুসলমান ৬৩ জন। এছাড়া ডেপুটি কমিশনার ও একজন ও.সি ছিলেন মুসলমান। মুসলমান দাঙ্গাবাজদের বেশির ভাগ ছিল গ্রাম থেকে আসা লোক। এর মধ্যে ছিল মুসলমান শ্রমিক, কষাই, খালাসি, ছ‍্যাকড়া গাড়ির চালক।

    হিন্দুদের প্রতিরোধে নেতৃত্বে গোপাল

    মুসলিম লিগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজে ভূমিকা ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের শিক্ষিত যুবক, ছাত্র সমাজ ও মধ্যবিত্তদের। ১৯৪৬-এর ১৬ আগস্টের সকালে মুসলিম লিগ যখন অ্যাকশান শুরু করে, তখনও পর্যন্ত কলকাতার হিন্দুরা বিষয়টা বুঝে উঠতে পারেনি। কারণ, ওই দিন বিকেলে কলকাতার তথাকথিত প্রগতিশীল “ধর্মনিরপেক্ষ” হিন্দুরা ময়দানে মনুমেন্টের তলায় মুসলিম লিগ ও ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির যৌথ মিটিং শুনতে গিয়েছিল। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লিগের নেতৃত্বে ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ শুরু হলে রুখে দাঁড়ান গোপাল মুখোপাধ্যায় ও তাঁর ভারতীয় জাতীয় বাহিনী। মূলত একার হাতেই সেদিন কলকাতাকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি। প্রবাদ হয়ে গিয়েছে গোপাল ছিলেন বলে টালা ট্যাঙ্ক আছে, শিয়ালদহ স্টেশন আছে, আপনি, আমি রয়েছি। আর সেই প্রবাদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের উল্টোদিকে এক চিলতে মাংসের দোকান। প্রসঙ্গত ১৯৪৬ সালের ১৬ অগস্ট ‘গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং’ রুখে ছিলেন যিনি সেই গোপাল মুখোপাধ্যায়েরও পাঁঠার মাংসের দোকান ছিল। যে কারণে গোপাল পাঁঠা নামেই তিনি পরিচিতি লাভ করেন। তাঁকে স্মরণ করেই এবার থেকে বেনিয়াপুকুর এলাকার রাস্তার নাম সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ থেকে বদলে হল গোপাল মুখার্জি রোড।

    কেন বদলানো হল রাস্তার নাম?

    রাজ্য বিজেপি এবং বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের মতে, গোপাল মুখোপাধ্যায়ের অবদান দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত হয়েছে। তাঁদের দাবি, কলকাতার ইতিহাসে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি দিতেই এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সমালোচকদের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ ইতিহাসের জটিল ঘটনাগুলিকে একপাক্ষিকভাবে ব্যাখ্যা করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাঁদের বক্তব্য, সুরাবর্দি অ্যাভিনিউয়ের নামটি মূলত স্যার হাসান সুরাবর্দির সম্মানে রাখা হয়েছিল, যাঁর পরিচয় তাঁর রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত ভাইপোর থেকে আলাদা। এই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তে খুশি গোপাল মুখোপাধ্যায় তথা গোপাল পাঁঠার পরিবার। তারা বলছে, ‘এক ঐতিহাসিক দিনে, ঐতিহাসিক ভুলের, ঐতিহাসিক সংশোধন হল। মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে আমরা খুশি। অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ পরিবারের দাবি, এমন উদ্যোগ অনেক আগেই নেওয়া উচিৎ ছিল। আবেগে ভাসছেন তাঁরা।

    রাজনৈতিক তাৎপর্য

    পর্যবেক্ষকদের মতে, রাস্তার নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত কেবল প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং ইতিহাস, পরিচয় ও স্মৃতির রাজনীতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। একপক্ষ এটিকে ‘ঐতিহাসিক সংশোধন’ বলে মনে করছে, অন্যপক্ষের মতে এটি ইতিহাসের পুনর্ব্যাখ্যার অংশ। ফলে গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নামে রাস্তার নামকরণ শুধুমাত্র একটি নাম পরিবর্তন নয়, বরং বাংলার বিভাজন-পূর্ব ইতিহাস, ১৯৪৬ সালের দাঙ্গা এবং স্বাধীনতার আগে-পরে রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কথায়, পশ্চিমবঙ্গের ‘প্রকৃত নায়কদের’ স্মরণ এবং ইতিহাসের ‘ভুল সংশোধনের’ সময় এসে গিয়েছে।

LinkedIn
Share