Tag: Krishnakanter Will

  • Bankim Chandra Chattopadhyay: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘বন্দে মাতরমে’র প্রভাব, জাতীয় চেতনার অমর পথপ্রদর্শক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

    Bankim Chandra Chattopadhyay: ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ‘বন্দে মাতরমে’র প্রভাব, জাতীয় চেতনার অমর পথপ্রদর্শক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

    মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: অসংখ্য আত্মত্যাগ, সংগ্রাম এবং প্রেরণাদায়ী ব্যক্তিত্বের অবদানে সমৃদ্ধ ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস। সেই সব মহাপুরুষদের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় অনন্য। তাঁর অমর সৃষ্টি ‘বন্দে মাতরম’ শুধু একটি গান নয়, বরং স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম শক্তিশালী মন্ত্রে পরিণত হয়েছিল। সশস্ত্র বিপ্লবী থেকে শুরু করে অহিংস জাতীয় আন্দোলনের কর্মী—সবার কণ্ঠেই ধ্বনিত হয়েছে এই গান, যা ভারতবাসীর মধ্যে দেশপ্রেম, আত্মমর্যাদা এবং স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে শক্তি জুগিয়েছিল।

    বঙ্কিমচন্দ্রের দেশপ্রেম (Bankim Chandra Chattopadhyay)

    ১৮৩৮ সালের ২৭ জুন (কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে অবশ্য ২৬ জুন উল্লেখ রয়েছে) বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনার নৈহাটির কাঁঠালপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁর পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সমৃদ্ধ ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবারের সদস্য। মা দুর্গাদেবী ছিলেন ভারতীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধে গভীরভাবে আস্থাশীল। শৈশব থেকেই বঙ্কিমচন্দ্রের মনে রোপিত হয় দেশপ্রেম, আত্মসম্মান ও সাংস্কৃতিক চেতনার বীজ। প্রথমে হুগলি কলেজ এবং পরে প্রেসিডেন্সি কলেজে শিক্ষালাভ করেন বঙ্কিমচন্দ্র। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় তিনি স্নাতক স্তরের ছাত্র ছিলেন। ব্রিটিশদের নির্মম দমননীতি এবং গণহত্যার খবর তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছিল। বিদ্রোহের কারণ ও ব্যর্থতার পেছনের বাস্তবতা তিনি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছিলেন। একই বছরে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রথম ভারতীয় স্নাতক হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের অধীনে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে যোগ দেন। পরে বঙ্গ সরকারের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৮৬৯ সালে আইনশাস্ত্রে উত্তীর্ণ হওয়ার পর তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে সমাজের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদিত করেন।

    ‘বঙ্গদর্শন’

    ভারতের গৌরবময় অতীত এবং ঔপনিবেশিক শাসনের কাছে অনেক ভারতীয়ের আত্মসমর্পণের মানসিকতা তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। তাই সাহিত্যকে তিনি জাতীয় চেতনা জাগরণের অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনা ‘Rajmohan’s Wife’ ইংরেজিতে লেখা হলেও, সেখানে ঔপনিবেশিক সমাজের বাস্তব চিত্র উঠে আসে। ১৮৬৫ সালে প্রকাশিত প্রথম বাংলা উপন্যাস ‘দুর্গেশনন্দিনী’ ভারতীয় সভ্যতার অন্তর্নিহিত শক্তিকে তুলে ধরে পাঠকদের নতুনভাবে প্রাণিত করে। এরপর প্রকাশিত হয় ‘কপালকুণ্ডলা’। ১৮৭২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রভাবশালী মাসিক পত্রিকা ‘বঙ্গদর্শন’, যা দ্রুতই জাতীয়তাবাদী সাংবাদিকতার এক গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে পরিণত হয়। ‘বঙ্গদর্শনে’ নিয়মিতভাবে বাংলার গৌরবময় ইতিহাস ও ভারতের প্রাচীন সভ্যতা নিয়ে প্রবন্ধ প্রকাশিত হত। এখানেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘বিষবৃক্ষ’, যেখানে সমাজের দুর্বলতা ও সংকীর্ণতার প্রতীকী বিশ্লেষণ করা হয়। একইভাবে ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’ ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গও ফুটে ওঠে।

    কালজয়ী সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’

    ১৮৭৬ সালের ৭ নভেম্বর কাঁঠালপাড়ায় তিনি রচনা করেন কালজয়ী সঙ্গীত ‘বন্দে মাতরম’। ১৮৮২ সালে প্রকাশিত তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘আনন্দমঠে’ গানটি অন্তর্ভুক্ত হয়। ‘বন্দে মাতরমে’র প্রথম দু’টি স্তবক সংস্কৃত ভাষায় এবং পরবর্তী অংশ বাংলা ভাষায় রচিত। শ্রীঅরবিন্দ এই গানের প্রথম ইংরেজি অনুবাদ করেন। সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রচিত ‘আনন্দমঠ’ শুধু একটি সাহিত্যকর্ম নয়, বরং জাতীয়তাবাদ, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতীক হয়ে ওঠে। প্রকাশের পর থেকেই ‘বন্দে মাতরম’ দেশজুড়ে জনসভা, আন্দোলন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান স্লোগানে পরিণত হয়।

    বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের প্রভাব

    বঙ্কিমচন্দ্রের শেষ উপন্যাস ‘সীতারামে’ (১৮৮৬) মধ্যযুগীয় নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চিত্র ফুটে ওঠে। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে ‘মৃণালিনী’, ‘ইন্দিরা’, ‘রাধারাণী’, ‘দেবী চৌধুরাণী’, ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’ এবং ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’। ধর্ম, সমাজ, রাজনীতি ও সমসাময়িক নানা বিষয় নিয়ে তিনি অসংখ্য প্রবন্ধ এবং কবিতাও লিখেছিলেন। তাঁর সাহিত্যকর্ম ভারতের প্রাচীন সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও সভ্যতার মূল্যবোধকে নতুনভাবে তুলে ধরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ‘কৃষ্ণচরিত্র’ গ্রন্থে তিনি আদর্শ সমাজ গঠনের নৈতিক ভিত্তি ব্যাখ্যা করেন। ‘ধর্মশাস্ত্রে’ দেশপ্রেমকে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেন। ‘লোক রহস্যে’  পরনির্ভরশীল রাজনীতির সমালোচনা করে আত্মনির্ভরতার আহ্বান জানান। ‘আমার দুর্গোৎসবে’ বিধবা বিবাহ, নারীর স্বাধীনতা এবং অন্ধ পাশ্চাত্য অনুকরণের বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, মাতৃভূমি কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, বরং পূজার যোগ্য এক জীবন্ত জননী।

    হিন্দু সমাজের সমালোচনা

    হিন্দু সমাজের সাংস্কৃতিক বিভ্রান্তি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত মন্তব্য—“হিন্দু সমাজ কুমারসম্ভব ছেড়ে সুইনবার্ন পড়ে, ভগবদ্গীতা ছেড়ে মিল পড়ে, আর ওড়িশার পাথরের ভাস্কর্য উপেক্ষা করে ইংরেজদের পোর্সেলিন পুতুলের প্রশংসা করে”—আজও সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা ও বৌদ্ধিক স্বাধীনতার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়। ১৮৯৪ সালের ৮ এপ্রিল প্রয়াত হন বঙ্কিমচন্দ্র। তাঁর মৃত্যু কেবল একটি জীবনের সমাপ্তি, যদিও তাঁর চিন্তা, সাহিত্য, আদর্শ এবং ‘বন্দে মাতরম’ আজও ভারতের জাতীয় চেতনা, সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ও স্বাধীনতার ইতিহাসে চির অম্লান হয়ে রয়েছে।

     

LinkedIn
Share