মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: মাওবাদী-মুক্ত ভারত! কিছুদিন আগেই ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তবে ঝাড়খণ্ডের শীর্ষ মাওবাদী নেতা মিসির বেসরা অধরাই ছিলেন। অবশেষে কোবরা বাহিনীর ‘জালে’ ধরা পড়লেন তিনি। ঝাড়খণ্ড পুলিশ এবং সিআরপিএফ-র এলিট কোবরা ব্যাটালিয়নের রুদ্ধশ্বাস যৌথ অভিযানে গ্রেফতার হলেন মাওবাদী এই শীর্ষ নেতা (Misir Besra Arrested)। তাঁর মাথার দাম ছিল ১ কোটি টাকা। ধানবাদ-গিরিডি সীমানার মানিয়াদি এলাকা থেকে বেসরা ও তাঁর দুই দুর্ধর্ষ সহযোগীকে পাকড়াও করে নিরাপত্তা বাহিনী। মিসির ছিলেন একমাত্র জীবিত মাওবাদী পলিটব্যুরো সদস্য।
কীভাবে ধরা পড়লেন মিসির
পুলিশ সূত্রে জানা যাচ্ছে, গত প্রায় দুই দশক ধরে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল মিসির। সম্প্রতি পুলিশের কাছে খবর আসে শীর্ষ এই মাওবাদী নেতা ঝাড়খণ্ডের পারশনাথ পাহাড় সংলগ্ন জঙ্গলে কয়েকজন সঙ্গীকে নিয়ে লুকিয়ে রয়েছে। এরপরই সিআরপিএফ, গিরিডি ও ধানবাদ থানার পুলিশ একযোগে তল্লাশি শুরু করে। রাত ৯টা নাগাদ ধানবাদ-গিরিডি সীমানার জঙ্গলে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে। তার সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়েছে সংগঠনের আঞ্চলিক কমিটির সদস্য মেহনত ওরফে মোচ্ছু এবং সক্রিয় সদস্য গৌরব ওরফে সৌরভ। অভিযানে দুই গ্রামবাসীকেও আটক করা হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে মাওবাদী সংগঠনের নেটওয়ার্ক, পলাতক সদস্যদের অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে। মিসিরের বিরুদ্ধে ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওড়িশা এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন থানায় ১৫৪টির বেশি মামলা রয়েছে। জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA) দ্বারা তদন্ত করা হচ্ছে এমন তিনটি মামলাতেও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রায় দু’ দশক ধরে অধরা
ধানবাদ পুলিশের একটি সূত্র জানাচ্ছে. প্রায় দু’ দশক ধরে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিয়ে মিসির পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন। ২০০৭ সালে ঝাড়খণ্ড থেকে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু ২০০৯ সালে বিহার পুলিশের হেফাজত থেকে মিসির পালিয়ে গিয়েছিলেন। ওই বছর তাঁকে বিহারের লখিসরাই জেলার আদালতে পুরোনো একটি মামলায় হাজির করানোর জন্য পুলিশ নিয়ে গিয়েছিল। সেই সময়ে মাওবাদীরা আদালত চত্বরে মিসির বেসরাকে ছাড়াতে আচমকা হামলা চালায়। তাতেই পালিয়ে যান মিসির। মিসিরের গ্রেফতার নিয়ে তাঁর ছেলে সিদ্ধার্থর দাবি, পুলিশ বা সিআরপিএফ-এর তরফ থেকে তাঁর বাবার গ্রেফতার নিয়ে বুধবার সকাল পর্যন্ত তাঁকে খবর দেওয়া হয়নি। তিনি সূত্র মারফত জেনেছেন তাঁর বাবার গ্রেফতার হওয়ার খবর। সিদ্ধার্থর দাবি, ১৫ দিন আগেও পুলিশ তাঁদের বাড়িতে এসে তাঁকে বলেছিল, বাবাকে চিঠি লিখে আত্মসমর্পণের ব্যাপারে অনুরোধ করতে। একই সঙ্গে মিসিরের ছেলে জানিয়েছেন, ২০ বছর তিনি বাবাকে দেখেননি। বাবা জীবিত রয়েছেন জেনে তিনি খুশি।
মিসির বেসরা কে?
মিসিরের আদি বাড়ি ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার হারলাডিহিতে। ঝাড়খণ্ড পুলিশের একটি সূত্রের দাবি, মাওবাদীদের সংগঠনের শীর্ষস্তরের নেতা ও তাদের পলিটব্যুরোর শেষ জীবিত সদস্য মিসির। পলিটব্যুরোর অন্য সদস্যরা হয় পুলিশের হাতে ধরা পড়েছেন, নয়ত পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে গুলির লড়াইয়ে নিহত হয়েছেন। ৬৬ বছর বয়সি ওই নেতার মাথার দাম ছিল এক কোটি টাকা। সংগঠনের তাত্ত্বিক নেতা ও অপারেশনাল কম্যান্ডার ছিলেন তিনি। সংগঠনের নেতা ও কর্মীদের কাছে তিনি ভাস্কর ও সাগর নামেও পরিচিত। নিষিদ্ধ সিপিআই (মাওবাদী)-র সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক সংস্থা পলিটব্যুরোর সদস্য হিসেবে ঝাড়খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায় মাওবাদী কার্যকলাপ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মিসিরের। নিরাপত্তা সংস্থার দাবি, সারান্ডা, পোরাহাট ও কোলহানের জঙ্গল এলাকায় সংগঠনের ঘাঁটি শক্তিশালী করা, সশস্ত্র হামলার পরিকল্পনা, নতুন ক্যাডার নিয়োগ, তোলাবাজি এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মাওবাদী ইউনিটের মধ্যে সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিল সে।
পলাতক মাওবাদীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ধৃত মেহনত ওরফে মোচ্ছু, বিভীষণ বা কুম্বা মুর্মু ধানবাদ জেলার বারওয়াড্ডা থানার ঘোড়াবান্ধা গ্রামের বাসিন্দা। সংগঠনের আঞ্চলিক কমিটির সদস্য ছিল মোচ্ছু। তার গ্রেফতারির জন্য ঝাড়খণ্ড সরকার ১৫ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। তদন্তকারীদের দাবি, মিসির বেসরার অন্যতম ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে সারান্ডা-পোডাহাট অঞ্চলে সংগঠনের কার্যকলাপ, তোলাবাজি, ক্যাডার পরিচালনা এবং প্রচার কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা ছিল মোচ্ছুর। আর এক ধৃত গৌরব ওরফে সৌরভও সংগঠনের সক্রিয় সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। তার কাছ থেকেও সংগঠনের কাঠামো, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য পলাতক মাওবাদীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলতে পারে বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
মাওবাদীদের সাংগঠনিক কাঠামোয় শেষ পেরেক!
ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী দমনে আরও একটি বড় সাফল্যের কথা জানায় পুলিশ। মোট ১৬ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছেন। তাঁদের মধ্যে ছয়জনের মাথার দাম মিলিয়ে ছিল ৩৯ লক্ষ টাকা। আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে রয়েছেন সন্তোষ মাহাত ওরফে বাসুদেব দা ওরফে দিলীপ। তাঁর বিরুদ্ধে ১২৮টি মামলা রয়েছে এবং মাথার দাম ছিল ১৫ লক্ষ টাকা। এছাড়া সংগঠনের দুই সাব-জোনাল কমিটি সদস্য ও দুই এরিয়া কমিটি স্তরের নেতাও অস্ত্র ছেড়েছেন। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালে ঝাড়খণ্ডে মাওবাদী বিরোধী অভিযানে এখনও পর্যন্ত ৯৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। আত্মসমর্পণ করেছেন ৪৫ জন। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ২২ জন মাওবাদী। ঝাড়খণ্ড পুলিশ জানিয়েছে, মিসির বেসরার গ্রেফতরি রাজ্যে মাওবাদী সংগঠনের সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধাক্কা। পুলিশের দাবি, বর্তমানে ঝাড়খণ্ডে সক্রিয় মাওবাদীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। রাজ্যজুড়ে মাত্র ১৭ জন সক্রিয় মাওবাদী জঙ্গি বর্তমানে পলাতক।
