তানিয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাল
চিনি বিপজ্জনক। কিন্তু শুধু চিনিই সমস্যা তৈরি করছে না। বরং, চিনির সঙ্গে বিপদ বাড়াচ্ছে প্রতি দিনের কিছু অভ্যাস। ভারতে ডায়াবেটিস আক্রান্তের হার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই রোগের দাপট বাড়ছে। যা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। দীর্ঘ সুস্থ জীবন যাপনের অন্যতম শর্ত রক্তে শর্করার পরিমাণ স্বাভাবিক থাকতে হবে। কিন্তু আধুনিক জীবন যাপনের জেরে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। ডায়াবেটিস রুখতে অনেকেই চিনিকে খাবারের তালিকা থেকে বাদ রাখছেন। কিন্তু তারপরেও বিপদ আটকানো যাচ্ছে না। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ভারতের তরুণ প্রজন্মের ডায়াবেটিস আক্রান্তের কারণ শুধুই চিনি নয়। বরং, তার নেপথ্যে রয়েছে আরও কয়েকটি কারণ। এমনটাই সাম্প্রতিক গবেষণায় জানিয়েছেন একদল গবেষক-চিকিৎসক।
কী বলছে সাম্প্রতিক গবেষণা? ডায়াবেটিসের নেপথ্যে কোন কারণ দায়ী?
সাম্প্রতিক এক বিজ্ঞান বিষয়ক গবেষণাপত্রে প্রকাশিত হয়েছে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডায়াবেটিসের দাপট বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, তাঁদের জীবন যাপনের অভ্যাস এবং খাদ্যাভাস।
ব্যালেন্স খাবার নিয়ে ধারণার অভাব!
গবেষক-চিকিৎসকদের একাংশ জানাচ্ছেন, তরুণ প্রজন্মের অনেকেই চিনি খাওয়া নিয়ে সতর্ক। কিন্তু তাঁরা সুষম খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত নন। তাঁদের খাবারে নিয়মিত প্রোটিন, ভিটামিন এবং কার্বোহাইড্রেটের ব্যালেন্স থাকছে না। সকাল থেকে রাত, প্রত্যেকদিন একাধিকবার তাঁরা প্রয়োজনের অতিরিক্ত পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার খাচ্ছেন। কিন্তু প্রয়োজন মাফিক প্রোটিন এবং ভিটামিন শরীর পাচ্ছে না। সকালের জলখাবারে পরোটা, দুপুরে ভাত কিংবা রাতে রুটি বা ভাতের মতো কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার থাকছে। চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে খাওয়া হচ্ছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় সব্জি, ডাল, ডিম, পনীর খাওয়া হয় না। সকালের জলখাবার হোক বা দুপুরের খাবার, ভাত কিংবা রুটির সমান পরিমাণ সব্জি, ডাল খাওয়া জরুরি। এই সম্পর্কে এখনও অধিকাংশ মানুষ সচেতন নন। এই অসচেতনতা ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
শারীরিক পরিশ্রমের সুযোগ কম!
তরুণ প্রজন্মের একাংশের দিনের বেশিরভাগ সময় চেয়ার কিংবা সোফায় বসে কাটাতে হয়। গবেষক চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, কাজের ধরণ বদলে গিয়েছে। আধুনিক জীবনে অধিকাংশ পেশায় চেয়ার কিংবা সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করার রেওয়াজ। দিনের ৯-১০ ঘণ্টা বসেই কাটছে। আবার বাড়ি ফিরে অবসর যাপন বসেই হয়। সোফায় বা বিছানায় বসে মোবাইলে সময় কাটানো হলো দিন শেষের নিজেস্ব সময় কাটানোর পথ। আর এই সবটাই অত্যন্ত বিপজ্জনক। তাঁরা জানাচ্ছেন, দিনের দীর্ঘসময় বসে থাকার ফলে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়। শারীরিক পরিশ্রম না হলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
খাবারের সময়!
বিশেষজ্ঞদের একাংশ জানাচ্ছেন, কখন খাবার খাওয়া হয়, তার উপরে একাধিক রোগের দাপট নির্ভর করে। তরুণ প্রজন্মের একাংশ অনেক রাতে খাবার খায়। এমন অনেকেই রাত বারোটার পরে খাবার খায়। এই অতিরিক্ত রাতে খাবার খাওয়ার অভ্যাস ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
অনিদ্রা!
তরুণ প্রজন্মের একাংশের অন্যতম বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হলো অনিদ্রা। রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে ডায়াবেটিসের মতো রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায় বলেই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁরা জানাচ্ছেন, ঘুম হলে মস্তিষ্ক, পেশি এবং স্নায়ুর বিশ্রাম হয়। কার্যক্ষমতা বাড়ে। তেমনি পর্যাপ্ত ঘুম হলে শরীরের একাধিক হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে। পর্যাপ্ত ঘুম হলে ইনসুলিন হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকে। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রাও বজায় থাকে।
কী পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা?
তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতে চিনি খাওয়া বাদ দেওয়ার পাশপাশি আরও কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন বলেই জানাচ্ছেন চিকিৎসকদের একাংশ। তাঁদের পরামর্শ, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন জরুরি। শুধু চিনি বাদ দিলেই হবে না। ডায়াবেটিস রুখতে চিনির পাশপাশি অতিরিক্ত তেলেভাজা জাতীয় খাবার, কার্বোহাইড্রেট জাতীয় খাবার বাদ দিতে হবে। অতিরিক্ত ওজনের সমস্যা হতে পারে এমন খাবার খাওয়া চলবে না। তাছাড়া নিয়মিত শরীরিক কসরত করতে হবে। নিজস্ব সময় কাটানো শুধুই মোবাইল দেখায় আবদ্ধ করলে চলবে না। বরং যোগাভ্যাস কিংবা হাঁটাহাঁটির জন্য কিছুটা সময় বরাদ্দ করতে হবে। তাছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে অল্প পরিমাণে খাওয়া, অতিরিক্ত রাতে খাবার না খাওয়ার মতো অভ্যাস তৈরি করতে হবে। পাশপাশি নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম হচ্ছে কিনা সেদিকেও নজর দিতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে আর দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের সমস্যা হলে প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নেওয়া দরকার বলেই মনে করছেন চিকিৎসক মহল।
