মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: কাশ্মীরে জঙ্গি অনুপ্রবেশ নিয়ে বিস্ফোরক দাবি করলেন পাকিস্তানের ধর্মীয় প্রচারক আল্লামা নাসির মাদনি। তাঁর দাবি, লস্কর-ই-তৈবার (LeT) প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ সইদ কাশ্মীরে প্রায় ১০ হাজার জঙ্গিকে পাঠিয়েছিল। গত ১৪ অগাস্ট পাকিস্তানের বাহাওয়ালনগরে লস্কর-ঘনিষ্ঠ একটি সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় মাদনি এই মন্তব্য করেন বলে জানা গিয়েছে। বক্তৃতায় মাদনি হাফিজ সইদকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেন, যে তথাকথিত ‘মাতৃভূমির’ জন্য আত্মত্যাগ করেছে। একইসঙ্গে তিনি দাবি করেন, সইদ হাজার হাজার জঙ্গিকে কাশ্মীরের দিকে পাঠিয়েছিল। তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলির প্রচার ও নিয়োগের অভিযোগ বহু পুরনো। নাসির মাদনির সাম্প্রতিক বক্তব্য সেই বিতর্ককেই ফের উসকে দিল।
পাকিস্তানের নজরে কাশ্মীর
কাশ্মীর দীর্ঘদিন ধরেই পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলির প্রচার, নিয়োগ এবং জঙ্গি কার্যকলাপের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। লস্কর-ই-তৈবা ও জইশ-ই-মহম্মদ (JeM)-এর মতো সংগঠনগুলি কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদকে ধর্মীয় বা জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। বাস্তবে এই সংগঠনগুলির বিরুদ্ধে সাধারণ নাগরিক, নিরাপত্তারক্ষী এবং রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তুর উপর একাধিক হামলার অভিযোগ রয়েছে। কাশ্মীরে জঙ্গি কার্যকলাপের জন্য বারবার পড়শি দেশ পাকিস্তানের দিকে আঙুল তুলেছে ভারত। পাকিস্তানের একাধিক জঙ্গিগোষ্ঠী যে ভারতে ক্রমাগত নাশকতা চালাতে চাইছে তার ভুরি ভুরি প্রমান রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান কখনও জঙ্গিদের সঙ্গে যোগের কথা স্বীকার করেনি।
ভারতের দাবিই সত্য প্রমাণিত
একটা দেশ যারা জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে, সুযোগ সুবিধা দিয়ে, সবরকমের সাহায্য করে অন্য দেশে নাশকতার জন্য পাঠাচ্ছে, আন্তর্জাতিক চাপের ফলে তারা নিজেদের ভাল প্রমাণিত করার চেষ্টা করছে। কখনও বলছে, তাদের দেশই জঙ্গিদের নিশানায় রয়েছে। কখনও আবার কোনও জঙ্গিনেতার বিরুদ্ধে পদক্ষেপের কথা বলছে। ইসলামাবাদের বিপক্ষে এই অভিযোগ বহুবার করেছে ভারত। সেই অভিযোগ যে সত্যি তা এই ধরনের ভিডিও বারবার প্রমাণ করে।
হাসপাতালের শয্যা থেকে ফের প্রকাশ্যে
নাসির মাদনির এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন কয়েক সপ্তাহ আগেই তাঁর শারীরিক অসুস্থতার খবর প্রকাশ্যে এসেছিল। গত ৩ জুলাই পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের জাহানিয়ানের একটি মসজিদে শুক্রবারের ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে পাক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে তাঁর হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়া বা কার্ডিয়াক অ্যারেস্টের আশঙ্কার কথা জানানো হয়। পরে তাঁকে মুলতানের চৌধরি পারভেজ এলাহি ইনস্টিটিউট অব কার্ডিওলজিতে ভর্তি করা হয় এবং তাঁর শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানানো হয়েছিল। অসুস্থতার পর প্রকাশ্যে ফিরে এসে তাঁর এমন মন্তব্যই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।
হাফিজ সইদকে ঘিরে বিতর্ক
লস্কর-ই-তৈবার প্রতিষ্ঠাতা হাফিজ সইদ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত। ২০০৮ সালের মুম্বই সন্ত্রাসবাদী হামলার সঙ্গে লস্কর-ই-তৈবার জঙ্গিদের যোগ ছিল। ওই হামলায় ১৬০-রও বেশি মানুষ নিহত হন। পাকিস্তানের আদালতও সন্ত্রাসে অর্থ জোগানের মামলায় হাফিজ সইদকে দোষী সাব্যস্ত করে। বর্তমানে সে পাকিস্তানে কারাবন্দি রয়েছে, এমনই দাবি ইসলামাবাদের। তবে, বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, হাফিজ এখন আর পাঁচজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করে। তার জীবন-যাপন আর পাঁচজনের মতোই। পাকিস্তান প্রশাসনের তরফে তাকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে। এই জঙ্গির জন্য পাক সরকার ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা রেখেছে। একই সঙ্গে ব্যক্তিগত রক্ষীও রয়েছে হাফিজের। তাদের ২৪ ঘণ্টা সঙ্গে রাখে সে।
কাশ্মীরে হাজার হাজার জঙ্গি পাঠানোর দাবি
নাসির মাদনির বক্তব্যের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল, তিনি সইদকে সন্ত্রাসবাদী নেতা হিসেবে না দেখিয়ে তথাকথিত জাতীয় স্বার্থে আত্মত্যাগকারী ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে কাশ্মীরে হাজার হাজার জঙ্গি পাঠানোর যে দাবি তিনি করেছেন, তা পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠনগুলির দীর্ঘদিনের কার্যকলাপ নিয়ে ফের প্রশ্ন তুলেছে। তবে ‘১০ হাজার জঙ্গি’ পাঠানোর দাবিটি নাসির মাদনির বক্তব্যের ভিত্তিতেই সামনে এসেছে। এই নির্দিষ্ট সংখ্যার কোনও তথ্য এখনও সামনে আসেনি।
নাসির মাদনি কে
নাসির মাদনিকে বিভিন্ন রিপোর্ট ও অনলাইন সূত্রে লস্কর-ই-তৈবা এবং জইশ-ই-মহম্মদের মতো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে দাবি করা হয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমে মাদনির একটি উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় বক্তা ও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিতির কথাও উঠে এসেছে। ২০২০ সালে তাঁকে বন্দুকের মুখে অপহরণ ও মারধরের অভিযোগও প্রকাশ্যে এসেছিল। পরে এই ঘটনায় কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
সতর্ক ভারতীয় গোয়েন্দারা
স্বাধীনতা দিবসের আগে ও পরে পাকিস্তান থেকে লস্কর জঙ্গিদের বিভিন্ন দাবিকে উড়িয়ে না দিয়ে সতর্ক রয়েছে ভারত। নিয়ন্ত্রণ রেখা (LoC) থেকে শুরু করে উপত্যকার প্রধান শহর ও সড়কগুলোতে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। সন্দেহভাজন গতিবিধির সুনির্দিষ্ট খবরের ভিত্তিতে শ্রীনগর, উধমপুর, পুঞ্চ, ডোডা এবং রিয়াসির মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে সেনা, জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ ও সিআরপিএফ যৌথভাবে বড় ধরনের তল্লাশি চালাচ্ছে। ড্রোনের মাধ্যমে সীমান্ত এবং পাহাড়ি বনাঞ্চলে সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানো হচ্ছে। সিসিটিভি এবং ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়ানো হয়েছে। অনলাইন র্যাডিক্যালাইজেশন এবং ডিজিটাল মাধ্যমে জঙ্গি নিয়োগ রুখতে কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স কাশ্মীর (CIK) উপত্যকার বিভিন্ন জেলায় দফায় দফায় অভিযান চালাচ্ছে।
