মাধ্যম নিউজ ডেস্ক: এই দেশের ৮৭ শতাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী, অথচ সেখানেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ‘হর হর মহাদেব’ ধ্বনি! শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, ২০২৬ সালের এই বসন্তে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া (Indonesia) সাক্ষী থাকল এক ঐতিহাসিক শিবরাত্রির (Maha Shivaratri)।
‘শিব গৃহ নৃত্য’ (Indonesia)
ইন্দোনেশিয়ার (Indonesia) জাভাতে অবস্থিত নবম শতাব্দীর বিস্ময় প্রাম্বানান মন্দিরে এই প্রথমবার আয়োজিত হলো মাসব্যাপী ‘প্রাম্বানান শিব উৎসব’। ১৭ জানুয়ারি ২০২৬-এ ১৫০ জন শিল্পীর মোহনীয় ‘শিব গৃহ নৃত্য’ বা তাণ্ডব নৃত্যের মাধ্যমে উৎসবের সূচনা হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি মহাশিবরাত্রির (Maha Shivaratri) পুণ্য তিথিতে ১,০০৮টি প্রদীপের আলোয় সেজে ওঠে প্রাচীন এই মন্দির প্রাঙ্গণ।
মন্দিরের উচ্চতা ৪৭ মিটার
প্রাম্বানান মন্দির কেবলমাত্র একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নয়, বরং ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার (Indonesia) প্রাচীন আত্মিক সম্পর্কের জীবন্ত দলিল। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম শিব মন্দির। মূল মন্দিরের উচ্চতা ৪৭ মিটার। মন্দিরটি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বরকে উৎসর্গ করা। আজও এখানে নিয়মিত মঞ্চস্থ হয় রামায়ণ ব্যালে, যা প্রমাণ করে রামায়ণ-মহাভারত কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় আবদ্ধ নয়।
বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা
প্রাম্বানান মন্দির নির্মাণ শুরু হয় প্রায় ৮৫০ খ্রিস্টাব্দে, সম্ভবত সঞ্জয় রাজবংশের আমলে। প্রায় ২৪০টি মন্দির নিয়ে গঠিত এই মন্দিরচত্বরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে ৪৭ মিটার উচ্চতার শিব মন্দির, যা স্থাপত্যশৈলী ও কারুকার্যে অনন্য। মন্দিরের দেয়ালে খোদাই করা রয়েছে রামায়ণের কাহিনি। ১৯৯১ সালে প্রাম্বানানকে ইউনেসকো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেওয়া হয়। বর্তমানে এটি ইন্দোনেশিয়ার (Indonesia) অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক (Maha Shivaratri) এখানে ভিড় জমান।
বিশ্ববাসীর কাছে এক বড় দৃষ্টান্ত
ইন্দোনেশিয়া (Indonesia) বিশ্বের বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ কিন্তু প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের প্রতি যে সম্মান প্রদর্শন করেছে, তা বিশ্ববাসীর কাছে এক বড় দৃষ্টান্ত। ২০২৬-এর এই শিবরাত্রি উদযাপন প্রমাণ করল, প্রাম্বানান মন্দির এখন আর কেবল পাথরের স্থাপত্য নয়, বরং বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি হিন্দুদের এক সজীব আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। এ দেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ২৭ কোটি, যার মধ্যে ৮৭.০৬ শতাংশই মুসলিম। কিন্তু এত কিছুর পরেও ইন্দোনেশিয়া কোনও ইসলামিক রাষ্ট্র নয়; সংবিধান অনুযায়ী এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। ভারতীয় পরম্পরার শিকড়ের সন্ধান এখনও এখানে উপলব্ধ।
১৯১৮ সালে মন্দিরের পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভূমিকম্প এবং আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণে মন্দিরটি ব্যাপক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯১৮ সালে মন্দিরের পুনর্নির্মাণ কাজ শুরু হয়। মন্দিরের মহিমা, স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতকে সামনে রেখে বলা যায়, প্রম্বানন মন্দির কেবল হিন্দুধর্মের এক অনন্য নিদর্শনই নয়, ইন্দোনেশিয়ার (Indonesia) সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
এই রাষ্ট্রে হিন্দু সংস্কৃতির ছাপ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। ইন্দোনেশিয়া তার পুরনো সংস্কৃতিকে অস্বীকার করেনি। ১৩ শতকের শেষ দিকে পূর্ব জাভায় ‘মাজাপাহিত সাম্রাজ্য’ নামের হিন্দু সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়, যাকে ইন্দোনেশিয়ার স্বর্ণযুগ বলা হয়। আজও ইন্দোনেশিয়ার ইসলামি সংস্কৃতিতেও হিন্দু ও বৌদ্ধ প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। বহু মানুষের নাম, স্থানের নাম ও সংস্কৃতিতে আরবি ও সংস্কৃত উভয় উৎসের প্রভাব রয়েছে। মহাভারত ও রামায়ণের কাহিনিও সে দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে গেছে। সেখানে পুতুলনাচ ও বিভিন্ন পরিবেশনার মাধ্যমে রামায়ণ–মহাভারত মঞ্চস্থ করা হয়। আর এবার সেই দেশেই মহাসমারোহে পালিত হলো শিবরাত্রি (Maha Shivaratri)।
